Home গল্প ওরা ফুল হয়ে গেল -খাতুনে জান্নাত কণা

ওরা ফুল হয়ে গেল -খাতুনে জান্নাত কণা

অনেকদিন আগের কথা। তখন ইসলামপুরে বিদ্যুৎ ছিল না। ঢেংগারগড় গ্রামে এক চাষি ছিলেন। তার দুটো গরু ভীষণ দুষ্ট ছিল। একদিন তাই দুটো গরুকেই বিক্রি করে দেবেন ভাবলেন। ইসলামপুর থানার গরুর হাটে তাদের নিয়ে গেলেন। হাটে নেওয়ার আগে তাদের ভালো করে গোসল করিয়েছেন, খাইয়েছেন। তেল চিকচিকে শরীরে ওরা মালিকের পাশে, গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে জাবর কাটছিল। এমন সময় এক ক্রেতা এসে গরুর দাম করল। মালিকের দাম পছন্দ হওয়ায় গরু দুটো বিক্রি করে দিলেন। মেলান্দহ থেকে আসা লোকটি গরু নিয়ে রওয়ানা হলো। পথে যেতে যেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। গরু দুটোকে একটা গাছের সাথে বেঁধে, নতুন মালিক একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা দূরে অন্য এক গাছের নিচে গিয়ে বসলেন। সুযোগ বুঝে অমনি দুই গরু দড়ি ছিঁড়ে নিয়ে দৌড় দিলো। দৌড়াতে দৌড়াতে মাঠ, প্রান্তর, পেরিয়ে হাজির হলো, ময়মনসিংহের গাড়ো পাহাড়ে।
সেখানে তারা দু’জনই মনের সুখে চরে বেড়াতে লাগল। ঘাস-লতাপাতা খায় ঝরনার পানিতে গোসল সারে আর পাহাড়ের গুহায় ঘুমায়। এমনি করে দিন তাদের ভালোই কাটছিল। কিন্তু সেই পাহাড়ে থাকতো কতগুলো তাগড়া শেয়াল। গরু দুটো দেখে তাদের খুব লোভ হতো। মনে মনে ভাবতো ওরা দু’জন যদি কোনোভাবে মরে যায় তো আমরা ওদের গোশত খেতে পারি।
একদিন তারা সবাই মিলে গোপন মিটিং বসালো। শেয়ালের দলনেতা বলল-
: ওদেরতো সহজে মরণ হবে বলে মনে হয় না। দু’জনই শক্তিশালী আর চালাক। সবচেয়ে বড়ো কথা দু’জন একসাথে থাকে। ওদের দু’জনকে আলাদা করতে হবে। তোমরা বুদ্ধি বের করো কীভাবে ওদের আলাদা করবে।
পুঁচকে এক শেয়াল বলল,
: আমার মাথায় এক বুদ্ধি এসেছে। লোভ দেখাতে হবে। পাহাড়ের কোনায় এক মুনী থাকে। প্রতি পূর্ণিমায় একটা করে পাঁঠা বলি দেয়। মুনীর ওখানে অনেক ঘন সবুজ ঘাস আছে। মিষ্টি পানির ব্যবস্থাও আছে। আম-কাঁঠালের গাছ আছে বেশ কতগুলো। মুনীকে আমাদের দলে টানবো। তাকে দুটো পাঁঠা গিফ্ট করে সবকিছু বুঝিয়ে বলে আসবো। তারপর গরু দুটোকে বুদ্ধি দেব ওখানে যেতে। যেহেতু প্রচুর খাবার আছে ঐ লোভে যাবে। এক গরুকে বলে নিষেধ করে দেব সঙ্গের অন্য গরুকে যেন এ কথাটা না বলে। তারপর মুনী আমাদের গরু দুটো মারতে সাহায্য করবে।
: পাগল আর কাকে বলে? মুনী সাহায্য করবে গরু ধরতে? গরুতো ওদের দেবতা। হিন্দু মুনী উল্টো গরুর পূজা করবে। তার চাইতে অন্য বুদ্ধি বের করো তোমরা।
নেতার কথায় সবাই সায় দিলো। চুপচাপ ভাবছে কী করা যায়! খুব লোভ হচ্ছে ওদের গরুর গোশত খাওয়ার। কিন্তু উপায় বের করত পারছে না। অবশেষে ছুঁচালো দাঁতের এক শেয়াল বলল,
: শোনো শেয়াল ভাইরা। আমার দাঁতে পাগলামির বিষ আছে। সুযোগমত আমি একটা গরুকে কামড়ে দেব। ওটা অসুস্থ হয়ে মরে যাবে। পরেরটা তখন এমনিতেই একা হয়ে যাবে। ওকে তখন আমরা জ্যান্ত কামড়ে, কাবু করে ফেলে, তারপর খেয়ে নেব।
: হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার একটা কথার মত কথা বলেছ। ঠিক আছে। এই সিদ্ধান্তই ঠিক রইল। কিন্তু ছুঁচালো দাঁতকে তোমরা পেছন থেকে সাহায্য করবে। যেন গরুরা ওর ক্ষতি করার আগেই পালাতে পারে।
সবাই সমস্বরে বলল,
: হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা সাহায্য করবো।
এক গিরগিটি সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। শেয়ালদের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত সে শুনে ফেলল। গরু দুটোকে গিরগিটি খুব পছন্দ করতো। কেমন আপন মনে খায় দায় ঘুরে বেড়ায়। কারো সাথেও নেই পাছেও নেই। অথচ দুষ্ট শেয়ালেরা তাকে মারতে চাইছে। দৌড়ে গিয়ে সে গরুদের কানে কানে কথাগুলো বলে দিলো। শুনেতো ওদের দু’জনের মন খারাপ। “এখন কী করা যায়?” ভাবতে বসল। শেষে দু’জন মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, প্রথম মালিক ঢেংগারগড়ের সেই চাষিটার কাছেই ওরা ফিরে যাবে। সামনে কোরবানির ঈদ। চাষিকে বলবে ওদের দু’জনকেই যেন একসাথে, আল্লাহর নামে কোরবানি দেওয়া হয়। কারণ শেয়াল-কুকুরে কামড়ে খাওয়ার চাইতে আল্লাহর নামে কোরবানি হয়ে যাওয়াটাই ভালো। চাষিতো ওদের ভাষা বুঝে। কাজেই সমস্যা হবে না নিশ্চয়ই! এ ব্যাপারে দু’জনেই একমত হলো। পরদিন সকালে সূর্য উঠার আগেই ওরা রওয়ানা হলো ইসলামপুরের উদ্দেশে। সন্ধ্যার আগে গিয়ে পৌঁছতে পারল সেই গ্রামে। চাষি তাগড়া, তেজী গরু দুটোকে দেখে ভীষণ অবাক। নিজের গরু বলেতো প্রথমটায় চিনতেই পারল না। কিন্তু যখন ওরা আগের মতই দুষ্টুমি শুরু করল, চাষির তখন চিনতে ভুল হলো না। বলল,
: কী ব্যাপার? তোরা দু’জন নাকি পালিয়ে গিয়েছিলি? এজন্য তো লোকটা এসে আমার কাছে টাকা ফেরত নিয়ে গেছে। বাহ্! বেশ সুন্দর স্বাস্থ্য হয়েছে তোদের। কোথায় ছিলি? কেমন ছিলি?
: সব বলছি উস্তাদ। আগে আমাদের কিছু খেতে দিন।
চাষি তখন ওদের খাবার দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। চাষির বৌ ওদের জন্য খৈল, খড়, লবণ-পানি সব নিয়ে এলো। খেয়ে-দেয়ে শান্ত হয়ে গরু দুটো তখন সব কথা খুলে বলল। শুনে চাষির চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
: তোদের কোরবানি দিতে আমার খুব খারাপ লাগবে।
: তা লাগুক। আমরা চাই আপনার হাতেই এই ঈদে কোরবানি হবো। আমাদের বিমুখ করবেন না মনিব।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল চাষি।
: বেশ। তোরা যা চাইছিস, তাই-ই হবে।
দেখতে দেখতে কোরবানির ঈদ চলে এলো। তাগড়া জোয়ান তেজী গরু দুটো কোরবানি দেওয়ার সময় চাষি কিছুতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। সবাই সেই গরু দুটোর গোশত রান্নার পর তৃপ্তি সহকারে খেল। গোশতের বেশ প্রশংসাও করল। কিন্তু চাষি তিন দিন ধরে সেই গরুর জন্য কাঁদলেন। হাড়গোড়গুলো জড়ো করে বাগানের কোনায় পুঁতে রাখলেন। আশ্চর্য! সেই পুঁতে রাখা জায়গায় এক নাম না জানা ফুলের গাছ গজিয়ে গেল। গাছটা ধীরে ধীরে বড়ো হলো।
সারা বছরই তাতে প্রচুর ফুল ধরে। ফুলের সাথে সুগন্ধে এলাকাটা সুবাসিত হয়ে ওঠে। আজও সেই ফুল গাছটিতে ফুল ধরে ঝরে যায়।

SHARE

Leave a Reply