Home গল্প দুরন্ত তিন ভাই -কামাল হোসাইন

দুরন্ত তিন ভাই -কামাল হোসাইন

হাসিব সিফাত আর তুষার- সকলের কাছে ত্রিরত্ন হিসেবে পরিচিত ওরা। হাসিব সবার বড়ো। পরস্পর চাচাতো ভাই ওরা। ভয়ভীতি বলতে কিচ্ছুটি নেই ওদের মনে। সারাক্ষণ দাপিয়ে বেড়ায় সারা গ্রাম। কখনো কখনো পাশের গ্রামেও। বয়সে তেমন বেশি না হলেও ওদের কাজকর্ম অনেকটা বড়োদের মতোই।
পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে ওদের কাজ হচ্ছে কোন গাছে পাখি বাসা বাঁধল, কোন পাখি ডিম পাড়ল, কোন বাসায় কয়টা ছানা ফুটল… এসব।
ওদের বাড়ির অদূরেই আছে এক মস্ত জঙ্গল। সেখানে অনেক অনেক গাছপালা। বয়সী গাছের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আকাশের দিকে মাথা তুলে সেসব গাছ দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। ওসব গাছের বেড় পাওয়া হাসিবদের আট-দশ জনের কম্মো নয়। ফলে ওসব গাছে কেউ চড়তেও সাহসী হয় না। ওসব গাছে প্রচুর পাখপাখালির আবাস। দিনরাত কিচিরমিচির লেগেই থাকে। বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, কড়াই, মেঘ শিরীষ- এসব হচ্ছে এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড়ো বড়ো গাছ।
এসব গাছে বক, শালিক, হরিয়াল, টিয়া, পেঁচা, শংখচিল, মানিকজোড়, সারস, ঘুঘুসহ অনেক অনেক প্রজাতির পাখি বাস করে। গাছের ডালে ডালে মৌমাছির বিশাল বিশাল মধুভরা চাক।
এই বনে এক সময় নাকি শজারু, খাটাস, বাঘডাস, বুনো শূকর, মেছোবাঘ থাকত। কোনো এক সময় নাকি একটা বাঘও দেখা গিয়েছিল। সে অনেককাল আগের কথা। লোকে বলে, ওই বাঘ নাকি সুন্দরবন থেকে এখানে চলে এসেছিল।
গ্রামের লোক সে সময় টিন বাজিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে সেই বাঘকে এলাকা ছাড়া করেছিল। তার পর থেকে অনেক বছর ভয়ে কেউ ও জঙ্গল মাড়ায়নি। এখানে জঙ্গলের কাছাকাছি থাকা ফসলের জমিতে চাষাবাদের কাজে কেউ একা যায় না। বরং দলবেঁধে যেতে হয়। যাতে হিংস্র কোনো জন্তু আক্রমণ করলেও সকলে মিলে মোকাবিলা করতে পারে।
তবে হ্যাঁ, অনেকদিন আর তেমন করে বাঘের দেখা মেলেনি। মানে এই গল্পটা বেশ আগের।
এখন আর তেমন ভয় নেই বললেই চলে। কিন্তু হাসিব সিফাত তুষার তেমনই দুরন্ত, যেখানে নিষিদ্ধের বাতাবরণ, সেখানেই তাদের থাকতে হবে। দেখতে হবে কেন সেই নিষিদ্ধের দেয়াল তোলা। সেই দেয়াল টপকানোই যেন তাদের অন্যতম কাজ। ওরাও তাই ওইসব ভয়ডর উপেক্ষা করে এক বিকেলে ওই জঙ্গলের কিছু অংশ ঘুরবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। সঙ্গে লাঠি আর গুলতি। সিফাতের হাতের টিপ দারুণ। মানে গুলতিতে হাত বেশ পাকা। সহজে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না বললেই চলে। মাটির বানানো গুরোল অথবা কাচের মার্বেল দিয়ে ও গুলতি চালায়। ওর সাগরেদ হচ্ছে তুষার। সব সময় ওর পিছু পিছু থাকে সে যোগ্য শিষ্যের মতো।
সেদিন বিকেল। জ্যৈষ্ঠ মাস। খানিকটা গরম আবহাওয়া। কথামতো তিনজন ঘর থেকে বের হলো। বাড়ির কাউকে জানাল না। ওরা এমনই। জানালে যে ওদেরকে কেউ যেতে দেবে না, এটা ওরা জানে। তাই না জানিয়েই এই অভিযান। অভিযান বলতে তেমন কিছু নয়, যেহেতু ওই জঙ্গলকে সবাই এড়িয়ে চলে, সে কারণেই ওদের যেতে হবে। গোটা জঙ্গল ঘুরে দেখে আসতে হবে। এর আগে অবশ্য ওই জঙ্গলের আশপাশে ঘুরেও এসেছে ওরা। ভেতরে ঢোকেনি কখনো। আজ ঢুকবে, এজন্য ওদের মনের মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতির অনুরণন।
ওরা পুব পাশের পায়ে চলা পথ দিয়ে সামনে এগুবে- এমনই কথা। তাই করল। একটা দারুণ সুনসান পরিবেশ। ঘোর লাগা একটা অনুভূতিও। পাখির ডাক ছাড়া তেমন কোনো শব্দ নেই বললেই চলে। মাথা উঁচু করে বিশাল বিশাল গাছের মগডাল দেখার চেষ্টা করল ওরা। তবে এখানে এসেই বুঝল, গাছগুলো দূর থেকে যতটা বিশাল দেখা যায়, তার চেয়েও বিশাল আকৃতির। বাইরে ঝকঝকে রোদ থাকলেও এখানে প্রায় অন্ধকার। সন্ধ্যা নামলে আরো ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায় গোটা জঙ্গল।
পায়ের নিচে কেবল শুকনো পাতার মচমচে শব্দ। শুরুতে একটু ভয় ভয় করলেও এখন মনটা ওদের বেশ ফুরফুরে। ওদের দেখে দুটো খরগোশ দৌড়ে পালাল। তারপর একটু দূরে গিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাতে লাগল। সিফাত গুলতি ওঠাল। খরগোশদ্বয় যেন ব্যাপারটা টের পেল, তারপর লাফাতে লাফাতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অনেক দিনের পরিকল্পনার ফসল আজকের এই অভিযান ওদের। তাই সেই উদ্দেশ্য সফল করতে পারায় মনটা ওদের বেশ হালকা হয়ে আছে। খুশিতে হাসিব মুখে শিস বাজাতে লাগল।
কিছু সময় পর হঠাৎ কেমন একটা গর্জন শুনতে পেল ওরা। গর্জনের সাথে গোঙানিও। ওরা আঁতকে উঠল। কীসের গর্জন? শব্দটা তাদের আরো নিকটবর্তী হলো। বেশিক্ষণ গেল না ওই অবস্থাটা। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় হুড়মুড় করে বিশাল ওজনদার কী যেন আছড়ে পড়ল ওদের অনেকটা কাছেই। এমতাবস্থায় ওরা যেন বিমূঢ় হয়ে পড়ল। যেখানে ছিল, সেখানেই স্ট্যাচু হয়ে রইল। নড়তে-চড়তে একদম ভুলে গেল। মুখ শুকিয়ে আমসি। এরকম কিছুর জন্য ওরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেল যেন।
ওরা যখন পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখল, তখন ওদের আরেক দফা চমকে ওঠার পালা। বিশালদেহী সেটা তো একটা বাঘ! একেবারে র‍য়েল বেঙ্গল টাইগার! কিন্তু ওরা লক্ষ করল, ওদের সামনে এসে পড়েও বাঘটা তেমন করেই গোঙাচ্ছে। তার সঙ্গে গর্জনটাও অব্যাহত রয়েছে। তবে বাঘের যে ধর্ম, সে অনুযায়ী তার শিকার তখন হবার কথা হাসিবরা। তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু তার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না এই বাঘের তরফে। উঠেও এল না সেখান থেকে। উল্টো সে কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। চোখ দুটোতে কোনো হিংস্রতা নেই। বরং সেখানে কেমন কাতরতা। বাঘটা যে তাদেরকে আক্রমণ করবে না, বা করতে পারবে না- এটা কিন্তু বুঝে নিয়েছে ওরা।
সিফাতরা এই ব্যাপারটা লক্ষ করে কিছুটা স্বাভাবিক হলো। স্বরূপে ফিরল।
হাসিব বলল, আয় আমার পিছু পিছু। আমার মনে হয়, বাঘটা কোনো বিপদে পড়েছে। সে আমাদের সাহায্য চায়। যে কারণে সে আমাদের নাগালে পেয়েও আক্রমণ করল না। দ্যাখ, কেমন অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে! সে স্বাভাবিক থাকলে আমরা এতক্ষণ আস্ত থাকতাম না। সোজা ওর পেটে গিয়ে ঢুকতাম। বিকেলের নাস্তা বানাত আমাদের।
সিফাত বলল, ঠিক বলেছ ভাই। আমারও তাই মনে হচ্ছে। চলো আমরা ওর কাছে যাই।
তবে তুষার একটু গাইগুঁই করছিল। ও বলল, না বাবা, আমি যাব না। গেলে তোরা যা। আমি বাড়ি যাব।…
সিফাত ওর কথা শুনে বলল, তুই একটা আস্ত হাঁদারাম! এলাম একসঙ্গে, একা ফিরে যাবি? ঠিক আছে, যা। তবে এই বনে এরকম আরো একটা বাঘ নেই, সে কথা তো আমরা কেউই জানি না। সে যদি তোর ঘাড় মটকে দেয়, তাহলে তুই একা কী করবি?
একথা শুনে তুষার যেন কিছুটা ভয় পেল। আর তাই পেছনে পা বাড়াল না সে। ওদের সঙ্গে সামনে এগুতে রাজি হলো।
হাসিবের পকেটে একটা টর্চ লাইট ছিল। ওটা বের করে সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে সামনে এগোল। এতক্ষণে ওরা বুঝল, বাঘটা রীতিমতো কাতরাচ্ছে। গোঙানিটা সে কারণেই। ওরা সাবধানে আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল।
বাঘটা তখন কাত হয়ে শুয়ে রয়েছে। হাসিবরা আরো একটু নিকটবর্তী হলো। ওরা তখন মাত্র গজ কয়েক দূরে। ভালো করে টর্চের আলো বাঘটার শরীরে ফেলতেই ওদের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। দেখল, বাঘটার পাঁজরের কাছ থেকে রক্ত ঝরছে। সেখানকার বেশটা জায়গা ভিজে গেছে।
ওরা আস্তে আস্তে সাহস ফিরে পাচ্ছে বাঘটার নিষ্ক্রিয়তার সুবাদে। আরো কাছে গেল ওরা। ভালো করে দেখল যে, ওর শরীরের ওখানটাতে গভীর এক ক্ষত। মনে হয় কোনো ধারাল কিছু দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়েছে। আর তাতে সে খুবই আহত হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুর্বল হয়ে পড়েছে বাঘটা। চলৎশক্তি হারিয়েছে সে।
হাসিবরা এই মুহূর্তে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। সে পশু হলেও তারও তো ভালোভাবে বাঁচার, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। এভাবে দেখে ওরা তো তাকে ফেলে চলে যেতে পারে না। যদিও সে এরকম অসুস্থ না থাকলে কী করত, তাও বলা মুশকিল। তবে বড়ো কথা হচ্ছে, সে এখন অসুস্থ। তাকে সাধ্যমতো সাহায্য করা দরকার। তাই ওরা ভাবল, না, বাঘটাকে এভাবে বেঘোরে মরতে দেওয়া যাবে না। আর এ বিষয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপটাও সেরে নিল। যেভাবেই হোক, বাঘটাকে সাহায্য করতেই হবে। ওরা একটা অসহায় প্রাণীকে সাহায্য করার দারুণ এক সুযোগ পেয়েছে, এই সুযোগ কিছুতেই ওরা হাতছাড়া করবে না।
বয়সে বড়ো হওয়ায় ওদের ভেতরে হাসিব একটু বেশিই সাহসী। তাই ও বাঘের একেবারে কাছে চলে গেল। কোথা থেকে যেন ওর ভেতর এই সাহসটা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আর কী করল জানো? বাঘের কাছে গিয়ে ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। হাসিবের দেখাদেখি সিফাত আর তুষারও বাঘের গায়ে ভয়ে ভয়ে হাত বুলাতে লাগল। বাঘের গায়ে হাত বুলানো, ভাবতে পারো! দারুণ এক অনুভূতি। তবে বাঘটা কিন্তু কিছুই করল না। আদর পেয়ে যেন চোখটা বুজে এল ওর। আরামে অনেকটা বিড়ালের মতো গলা দিয়ে গরগর শব্দ বেরুতে লাগল।
সিফাত বলল, আমাদের বেশি দেরি করা চলবে না ভাই। খুব দ্রুত আমাদের পশু চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগাযোগ করে ডাক্তার আনতে হবে। ওকে চিকিৎসা করাতে হবে। না হলে বেচারা বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাবে। আমরা এটা দেখার পর তা হতে দিতে পারি না।
তুষার বলল, হ্যাঁ ভাইয়া, তুমি ঠিক বলেছ। চলো, ডাক্তার ডেকে আনি। দেরি হলে বাঘের ওই ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হয়ে যাবে। তখন ওকে কিছুতেই বাঁচানো যাবে না।
হাসিব বলল, তবে হ্যাঁ, আমাদের সবাইকে এখান থেকে গেলে হবে না। আমি এখানেই থাকছি। আমার মনে হয় আমি যতক্ষণ ওর গায়ে হাত বুলাতে থাকব, ততক্ষণ ও এখান থেকে নড়বে না। আমরা সবাই একে ফেলে গেলে ও এখানে নাও থাকতে পারে। আর তাই তোরা জলদি গিয়ে ডাক্তার সাহেবকে ডেকে নিয়ে আয়। পশু হাসপাতালের ডাক্তারকে তো তোরা চিনিস!
দেরি করিস না, সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। এখনই যা…
সিফাত আর তুষার ব্যাপারটা আগেই বুঝেছে, তাই ওরা আর দেরি করল না। ওরা অনেকটা দৌড়ে বের হয়ে এল জঙ্গল থেকে। রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে থাকে পশু হাসপাতালের দিকে। জঙ্গল থেকে খুব বেশি দূরেও নয় হাসপাতাল। আধা ঘণ্টার মতো রাস্তা। ওরা হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে হাজির হলো হাসপাতালের গেটে। তখন হাসপাতালের ডাক্তার তমিজ উদ্দিন মিয়া কোথাও বেরুচ্ছিলেন। আর একটু দেরি হলে তাকে পাওয়া যেত না। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে।
এই এলাকার ছেলে হিসেবে ডাক্তার সাহেব ওদেরকে ভালো করেই চেনেন। ওরা দুরন্ত। বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়, এটাও তার জানা।
ডাক্তার সাহেবকে ব্যাপারটা খুলে বলতেই তিনি বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। শত হলেও তিনি পশুদেরই ডাক্তার। পশুদের প্রতি আলাদা একটা টান তার আছে। তাছাড়া বাঘের চিকিৎসার সুযোগ পাওয়াটাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার বলতে হবে। তাই তিনি ওদেরকে অবিশ্বাস না করে আস্থা রাখলেন এবং তার সঙ্গে আরো একজনকে সহযোগী করে ওষুধপত্র গুছিয়ে ছুটলেন জঙ্গলের দিকে।
মোটামুটি এক ঘণ্টার মধ্যেই সিফাত আর তুষার ডাক্তারসহ জঙ্গলে ঢুকে গেল।
হাসিব সেই আগের মতোই বাঘের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর বাঘের ক্ষতস্থানে বসা মশা-মাছি তাড়িয়ে দিচ্ছে খুব নিষ্ঠার সঙ্গে। আর বাঘটা তখনো চোখ বন্ধ করে গলায় গম্ভীর একটা গরগর শব্দ তুলছে। ক্ষতস্থানে ব্যথা হলেও তার শরীরে আদরের পরশ পেয়ে সে সব ভুলে শুয়ে আছে শান্ত হয়ে। তার হিংস্রতার নখর মেলেনি মোটেও।
আরো ক’জনের উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুলল বাঘটা। ডাক্তার সাহেবরা প্রথমে হাসিবদের মতো করে ভয় পেলেও স্বয়ং হাসিবের বাঘের কাছ ঘেঁষে বসে সেবা করতে দেখে সাহসী হলেন। তিনি ওদের তিন ভাইকে প্রথমে অনেক ধন্যবাদ দিলেন এবং দেরি না করে তিনি ওষুধের ব্যাগ খুলে তার কাজ শুরু করে দিলেন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাঘের সামনের-পেছনের দুই পা বেঁধে নিলেন শক্ত করে। বলা তো যায় না, কখন সে ক্ষেপে গিয়ে আক্রমণ করে বসে! তাই এই অতিরিক্ত সতর্কতা।
তারপর ডাক্তার তমিজ উদ্দিন মিয়া কড়া ডোজের ঘুমপাড়ানি ওষুধ পুশ করলেন বাঘের শরীরে। মোটা ইঞ্জেকশনের সুঁই ফোটানোর সময় বাঘটা তেড়েফুঁড়ে উঠতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। অবশ্য তার শরীরে পূর্ণ শক্তি থাকলে এই মামুলি বাঁধন তার কাছে নস্যি ছিল।
যা হোক, কোনো বিপদ ঘটল না। একটু নড়াচড়া করল বটে, তবে খুব বেশি নয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল বাঘটা।
ডাক্তার সাহেব তার সহকারীকে নিয়ে লেগে গেলেন পরবর্তী কাজে। ওষুধপত্র বের করলেন। বাঘের ক্ষতস্থান ভায়োডিন আর তুলো দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে চোখা বল্লমের আঘাত। ডাক্তার তমিজ উদ্দিন মিয়া বললেন, দু’একদিন আগেই কেউ বাঘটাকে এমন নির্মমভাবে মারতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরো বললেন, তোমাদের সামনে যদি বাঘটি আজ না পড়ত, তাহলে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যেত সে। তোমরা ভয় না পেয়ে যে সাহসিকতা নিয়ে বাঘটার কাছে এসে বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করেছ, এবং বুদ্ধি খাটিয়ে আমাকে ডেকে এনেছ, তার জন্য তোমরা অনেক বড়ো পুরস্কার পাওয়ার দাবি রাখো।
এসব কথা হাসিবরা কানে তুলল কি না বোঝা গেল না। ওরা ডাক্তারদের সঙ্গে বাঘের চিকিৎসাকাজে সাহায্য করতে লাগল। বাঘের ক্ষতস্থানে ভালোমতো ড্রেসিং করে ওষুধ লাগানো হলো। ক্ষতটা যাতে দ্রুত সেরে ওঠে, তার জন্য অনেক পাওয়ারফুল ইঞ্জেকশন দেওয়া হলো। ডাক্তার বললেন, এরকম করে আরো একদিন শুশ্রƒষা করতে পারলে তার বেঁচে ওঠাটা নিশ্চিত হওয়া যেত। কিন্তু তাকে তো এভাবে আটকে রাখা আমাদের কম্মো নয়। এখন আমরা যা করতে পারি, তা হলো একে ঘুম পাড়িয়ে রেখে সরকারের উচ্চমহলে খবর দিতে পারি। যারা এসব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করে থাকেন। খবর পেলে তারা একে নিয়ে গিয়ে যথাযথ চিকিৎসা দিয়ে আবার তার আবাসে ছেড়ে দিতে পারবেন।
ডাক্তার তমিজ উদ্দিন মিয়া তাই করলেন। নিজেই সরকারের উচ্চমহলে ফোন করে সবকিছু জানালেন। ফোন পাবার পর সংশ্লিষ্ট মহলও খুব দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন। এক দিনের মাথায় বিশাল এক খাঁচাসদৃশ লরি এসে হাজির ওই জঙ্গলে। এর মাঝে ডাক্তার তমিজ বাঘটা যাতে আরো বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকে, তার জন্য আবার কড়া ডোজের ঘুমের ইঞ্জেকশন দিলেন। এতে করে বাঘটার অন্তত আটচল্লিশ ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকার ব্যবস্থা হলো।
প্রায় পনেরো-বিশজন লোক বাঘটাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাকড়াও করে খাঁচাবন্দি করলেন। এতে এলাকার সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন!
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যারা নিয়োজিত, তাদের একজন কর্তাব্যক্তি হাসিব, সিফাত আর তুষারের সাহসিকতার জন্য ধন্যি ধন্যি করলেন। তিনি আরো জানালেন, সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের সাহসিকতা ও বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসার জন্য নিশ্চয়ই বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করবে।
খবর পেয়ে অনেক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়া সেই গ্রামে এসে হাজির। তারা হাসিবদের নিয়ে প্রতিবেদন করলেন। মানে রাতারাতি ওরা বিখ্যাত হয়ে গেল।
এতে হাসিব, সিফাত, তুষাররা তো খুশিই, তার সঙ্গে তাদের এই মহতী কাজে বাড়ির অন্যরাও খুশি। এই ঘটনার পর গ্রামের অনেকেই বললেন, ওরা দুরন্ত হলেও ওদের এই চমৎকার কাজ সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

SHARE

Leave a Reply