Home ফিচার বৃষ্টি এলো টাপুর টুপুর -মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম

বৃষ্টি এলো টাপুর টুপুর -মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম

বন্ধুরা কেমন আছ? আশা করি আল্লাহর রহমতে তোমরা সবাই ভালো আছ। এই লেখাটা যখন পড়ছ তখন হয়তো তোমার বাড়ির টিনের চালে ঝুম ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। অথবা তোমার বাড়ির ব্যালকনিতে টাপুর টুপুর ছন্দে বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রীষ্মের দাবদাহ শেষে প্রকৃতিকে শান্ত ও সজীব করতে বর্ষাকালের আগমন হয়। আচ্ছা তোমরা কি কখনো ভেবেছ, মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি হয়? আসলে এসবই আল্লাহর রহমত। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে মিশে থাকে সেই রহমতের বার্তা।

বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। আর আমাদের ছয়টি ঋতুর মধ্যে বর্ষা হলো দ্বিতীয়। বর্ষা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঋতু। একটু সহজভাবে বললে বলতে হবে, বর্ষা আমাদের দেশে আশীর্বাদের মতো। এ সময়ে বাংলার প্রকৃতি অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়। পানিতে ভরে ওঠে খাল-বিল-নদী-নালা। গ্রামের মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। খালে-বিলে ফুটে থাকে শাপলা-পদ্ম-কলমি ফুল। বৃষ্টির পানিতে গ্রীষ্মে শুকিয়ে যাওয়া গাছের পাতাগুলো সবুজ হয়ে ওঠে। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। প্রকৃতিতে যেন সবুজের মেলা বসে।

বনে বনে ফুটে থাকে কেয়া, কামিনী, হিজল, তমাল, জারুল, বকুল, সোনালু, করবীসহ নানান ফুল। বৃষ্টিভেজা কদম ফুলের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। আর বিলে-ঝিলে নানা প্রজাতির দেশি মাছের মেলা বসে। গ্রামে বর্ষা মানেই মানুষের অলস সময় কাটে। গ্রামের মানুষেরা এ সময় গল্প-গুজব ও কেউ কেউ লুডু-দাবা খেলে সময় কাটায়। পানিতে ডুবে থাকা মাঠে ফুটবল, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুটসহ নানান ঐতিহ্যবাহী খেলায় মেতে ওঠে গ্রামের শিশু-কিশোররা।

আমাদের সবার প্রিয় কবি ফররুখ আহমেদ বর্ষা নিয়ে লিখেছেন-
বৃষ্টি এলো কাশবনে
জাগলো সাড়া ঘাসবনে
বকের সারি কোথায় রে
লুকিয়ে গেলো বাঁশবনে।
নদীতে নাই খেয়া যে
ডাকলো দূরে দেয়া যে
কোন সে বনের আড়ালে
ফুটলো আবার কেয়া যে।
গাঁয়ের নামটি হাটখোলা
বৃষ্টি-বাদল দেয় দোলা
রাখাল ছেলে মেঘ দেখে
যায় দাঁড়িয়ে পথ ভোলা।
মেঘের আঁধার মন টানে
যায় সে ছুটে কোনখানে
আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে
আমন ধানের মাঠ পানে।

পল্লীকবি জসীম উদদীন তার ‘পল্লী-বর্ষা’ কবিতায় পল্লী প্রকৃতিতে বর্ষার এক অনবদ্য ছবি এঁকেছেন। তাঁর ভাষায়-
‘আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রােতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘বর্ষা-বিদায়’ কবিতায় বর্ষাকে ‘বাদলের পরী’, ‘কাজল-মেয়ে’, ‘জলের দেশের কন্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখেছেন-
‘ওগো বাদলের পরী!
যাবে কোন্ দূরে, ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী!
ওগো ও ক্ষণিকা, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজ তব?
পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন দেশ অভিনব?
…………………………..।
ওগো ও কাজল মেয়ে,
উদাস আকাশ ছলছল চোখ তব মুখে আছে চেয়ে।
কাশফুল সম শুভ্র ধবল রাশ রাশ শ্বেত মেঘে
তোমার তরীর উড়িতেছে পাল উদাস বাতাস লেগে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘আষাঢ়’ কবিতায় বর্ষাকালে গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন এভাবে-
‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,
কালি-মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ চাহিরে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’

তবে, তোমরা যারা শহরে থাক তারা বর্ষার সৌন্দর্যকে পুরোপুরি উপভোগ করতে পার না। কিন্তু, তোমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ- বৃষ্টি শেষে শহরের পিচঢালা সড়কটিও অপরূপ সাজে সেজে ওঠে। যা দেখলে অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে ওঠে মন। রাস্তার পাশের ধুলোজমা গাছগুলো হয়ে ওঠে সবুজ-সতেজ। খিচুড়ি আর মাংসভুনা খাওয়ার মাধ্যমে বর্ষা উদযাপন করে শহরের মানুষ।

বর্ষার শুরুতে মেঘমুক্ত আকাশে হঠাৎ করে কালো মেঘের আসর বসে। কখনো কখনো কালো মেঘের দাপটে চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসে। দিনকেও তখন সন্ধ্যার মতো লাগে। প্রকৃতিতে নতুন আবহ সৃষ্টি হয়। সকাল-সন্ধ্যায় বাড়ির আনাচে-কানাচে ব্যাঙ ডাকে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।

বর্ষা মানেই নৌকা বাইচ। এদেশের গ্রামের মানুষের কাছে খুব পরিচিত একটি খেলা। বর্ষার সময় নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয় নানা এলাকায়। প্রতি বর্ষায় সুরমা নদীতে এই নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সুনামগঞ্জের কালনী নদীতেও আরেকটি বড়ো নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বর্ষাকালে বাংলাদেশের প্রতিটা অঞ্চলেই এমন নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। নৌকা বাইচে এক সুরে নৌকার প্রতিযোগীরা গান গায়। নৌকার গতি অনুসারে অনেক নৌকার সুন্দর সুন্দর নামও রাখা হয়। যেমন ঝড়ের পাখি, পঙ্খীরাজ, সাইমুন, তুফান মেল, ময়ূরপঙ্খী, অগ্রদূত, সোনার তরী ইত্যাদি।

বর্ষায় গাছে গাছে নেচে ওঠে বৃষ্টিভেজা ফুলের গুচ্ছ। বর্ষায় অনেক ফুল ফোটে। এজন্য মনে হয় বর্ষাকে বলা হয় প্রকৃতির রানী। বর্ষার দু’মাস পালাক্রমে নানা ফুল ফোটে। বর্ষার শুরুতেই ফুটতে শুরু করে কদম ফুল। দেখতে সম্পূর্ণ গোল বৃত্তাকার ফুলটির মিষ্টি ঘ্রাণে মুখরিত হয় চারদিক। মূলত আষাঢ় শ্রাবণ এ দুই মাসই এই ফুলের দেখা মেলে। বর্ষা ঋতুর আরেকটি ফুল হচ্ছে দোপাটি। এগুলো আবার কিছু ক্ষেত্রে জোড়ায় জোড়ায় হয়ে থাকে। আর রঙের দিক দিয়েও দোপাটি সাজে বাহারি রঙের পসরাতে। কোনোটি লাল অথবা বেগুনি, আকাশি, নীল সাদাসহ নানা রং হয়ে থাকে দোপাটি। বাদল দিনের আরেকটি ফুল কামিনী। এর মিষ্টি ঘ্রাণে ম-ম করে ওঠে চারপাশ। ঝোপের মতো গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিয়ে থাকা সাদা ফুলগুলো মিষ্টি সুবাসের সঙ্গে স্নিগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কামিনী গাছ খুব বেশি লম্বা হয় না। এসব ফুলের পাশাপাশি বর্ষার আরেকটি ফুল হচ্ছে দোলনচাঁপা। সাদা রঙের দোলনচাঁপার বড়ো বড়ো প্রজাপতির মতো পাপড়ি বৃষ্টি ভেজার স্নিগ্ধতায় নিজেকে আছন্ন করে রাখে। তাই হয়তো এ ফুলকে বাটারফ্লাই লিলি নামেও ডাকা হয়। বর্ষার আরেকটি ফুল হচ্ছে শাপলা। শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। জলে থই থই বর্ষায় পুকুরে কিংবা ঝিলের পানিতে শাপলা ফুটে প্রকৃতির সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্ষার প্রকৃতিকে সাজাতে পালাক্রমে ফোটে কদম, বেলি, কেয়া। আবার কখনো বকুলের সুভাসও ভেসে বেড়ায়।

এতক্ষণ তো অনেক কিছু বললাম। এবার একটু তোমাদের জ্ঞান দেওয়া কথা বলি। এগুলো কিন্তু মেনে চললে তোমাদের জন্যই মঙ্গল হবে। আসলে বর্ষাকালে বারবার ভেজা, ভ্যাপসা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় অনেকের হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে। বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে কাপড় শুকালে ঠান্ডা লাগতে পারে। বর্ষায় অণুজীবদের আবির্ভাব ঘটে অস্বাভাবিক হারে। শ্বাসযন্ত্রের রোগ, পেটের রোগ, ভাইরাস জাতীয় রোগ ইত্যাদির জন্য অনুকূল পরিবেশ বর্ষাকাল। তাই এ সময় এসব রোগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সুতরাং এ সময় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের অসুখ-বিসুখ হওয়ার প্রবণতা থাকে বেশি। বর্ষায় যেসব রোগ হতে পারে তার মধ্যে অন্যতম ফ্লু জাতীয় রোগ, শ্বাসযন্ত্রের রোগ বা হাঁপানি, সিওপিডি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়া। তাই এই সময় প্রত্যেকের উচিত ভারী কাপড় পরিহার করে হালকা-ঢিলেঢালা পোশাক পরা। বর্ষাকালের অধিকাংশ রোগই পানিবাহিত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার গ্রহণে অনেকের হজমে গোলমাল দেখা দেয়। তখন পেটের অসুখ, ডায়রিয়া, এমিবিয়াসিস, হেপাটাইটিস বা জন্ডিস হতে পারে। এ ছাড়া আমাশয়, উদরাময়, টাইফয়েড জ্বর দেখা যায় বেশি বর্ষা মৌসুমে। দূষিত পানি ও খাদ্য এসব রোগ ঘটানোর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করে। তাই সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি পালন এ সময় খুবই জরুরি। বৃষ্টির এই সময়ে হতে পারে ত্বকের রোগ বা ডার্মাটাইটিস। ছত্রাকের কারণে বেশি হয় ত্বকের রোগ। অ্যালার্জিও হতে পারে। রাইনাইটিস, এটোপিক ডার্মাটাইটিস, নেত্রবর্ণ প্রদাহ (চোখ ওঠা) দেখা যায় বর্ষাকালে বেশি। বর্ষাকাল মানেই মশার ডিম পাড়ার সময়। তাই মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বর বর্ষার অসুখ। সুতরাং এ সময় সাবধানে থাকবে। তাহলে এসব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।

SHARE

Leave a Reply