Home নিবন্ধ অপারেশন রেসকিউ অব দ্য হলি কাবা -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

অপারেশন রেসকিউ অব দ্য হলি কাবা -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

হিজরি ১৪০০ সালকে স্বাগত জানানোর জন্য সারা বিশ্বের মুসলমানরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ওআইসির পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাপী নানা উদ্দীপনামূলক কর্মসূচি। বিভিন্ন দেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, পোস্টার-লিফলেট বিতরণ সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র‌্যালি আয়োজন এবং ম্যাগাজিন ছাপার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করে। মুসলিম বিশ্বের ইসলামিক সংগঠনসমূহও নেয় নানা গঠনমূলক কর্মসূচি।
পহেলা মুর্হরম ১৪০০ হিজরি যখন সারা বিশ্বের মুসলমানগণ হিজরি সালকে স্বাগত জানাচ্ছে ঠিক সেদিন পবিত্র মক্কায় ঘটেছিল এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। যা কারবালার পর এজিদী বাহিনী কর্তৃক কাবার অবমাননা ও হত্যাকাণ্ডকেও হার মানায়। সে সময় কাবাঘরের নিরাপত্তার জন্য বর্তমানের মতো কোনো কড়াকড়ি ছিল না। কাবাঘরসহ তার আশপাশও ছিল বর্তমানের তুলনায় ক্ষুদ্র। ভয়ঙ্কর এ ঘটনা বিশ্বব্যাপী তুমুল উদ্বেগ ও আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সেদিন কাবা শরিফের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সুবাইলের ইমামতিতে সবে ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে। তারিখটা ২০ নভেম্বর ১৯৭৯ সাল। ১৪শ হিজরির প্রথম দিন, পহেলা মুর্হরম। কাবা শরিফের ভেতর নামাজের কাতারে ৫০ হাজার মুসল্লি। নামাজের সালাম ফিরানোর সাথে সাথে কাবা শরিফের ভেতর শুরু হয় গোলাগুলি।
প্রায় সাড়ে তিন শ’ সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের কয়েকজন কাবার পাহারায় নিয়োজিত পুলিশদের হত্যা করে, কাবা শরিফের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়ে মুসল্লিদের দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে পড়ে। অন্য একটা দল কাবা শরিফের ভূ-গর্ভস্থ অংশ থেকে বেরিয়ে এসে আকাশে গুলি ছুড়তে থাকে। সামনের কাতার থেকে একজন বেশ আক্রমণাত্মকভাবে উঠে এসে কাবা শরিফের ঈমাম মুহাম্মাদ ইবনে সুবাইলের কাছ থেকে মাইক কেড়ে নেয়।
মাইক হাতে লোকটি সৌদি আরব সরকারের দুঃশাসনের এবং দুর্নীতির বিবরণ দিতে শুরু করে। মুসল্লিরা সব স্তম্ভিত। মাইক হাতে লোকটি হলো জুহাইমান আল ওতাইবি (Juhayman al-Oteibi) যে এক সময় সৌদি ন্যাশনাল গার্ডে চাকরি করতো। সে এই পুরো আক্রমণের নেতা।
সৌদি আরব সরকারের দুঃশাসন আর পৃথিবীজুড়ে অন্যায় ও পাপকর্মের বিবরণ দিয়ে জুহাইমান উপস্থিত ৫০,০০০ মুসল্লিকে বোঝাতে চাইছিল যে, একটা পরিবর্তন আবশ্যিক। কিছুক্ষণ বক্তৃতা দেওয়ার পর মুসল্লিদের হতবিহ্বল করে দিয়ে জুহাইমান বললো, “একমাত্র ইমাম মাহদীর কাছেই আছে পরিত্রাণের উপায় এবং তিনি আজকে আমাদের মাঝে উপস্থিত রয়েছেন।” এরপর সে বলা শুরু করলো রাসূল সা: ইমাম মাহদীর আগমন সম্পর্কে কী কী বলে গিয়েছেন।
ঘটনার আকস্মিকতা কাটার আগেই সে উপস্থিত মানুষদের মধ্যে থেকে দ্বিতীয় একজন ব্যক্তিকে দাঁড়াতে বললো। সেই ব্যক্তি দাঁড়ালো এবং ধীরগতিতে রূকনে ইয়ামেনি এবং মাকামে ইব্রাহিমের মধ্যবর্তী স্থানে এসে অবস্থান গ্রহণ করলো। এই দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ছিলো মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ আল-কাহতানি (Mohammad bin Abdullah al-Qahtani) (তথাকথিত ইমাম মাহাদী)। সে সত্যিই কুরাইশ বংশের কাহতান গোত্রের অধিবাসী ছিল।
প্রতি নামাজের পর জানাজা হয় কাবা শরিফে। জানাজার জন্য সেদিন জুহাইমানের সহযোগীরা হারাম শরিফে প্রবেশ করেছিল বেশ কয়েকটি কফিন নিয়ে, যার কোনটিতেই লাশ ছিল না। কফিন ভর্তি ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। তখন অবশ্য কাবা শরিফের বর্ধিতকরণের কাজ চলছিল। এর সুযোগ নিয়ে জুহাইমান কিছু পিকআপ ট্রাকে আরও কিছু আগ্নেয়াস্ত্র কাবার ভূ-গর্ভস্থ অংশে আগের দিন চালান করে দিয়েছিল।
তখন বিন লাদেন গ্রুপের দ্বারা মসজিদ সম্প্রসারণ করা হচ্ছিল। বিন লাদেন গ্রুপের একজন এই ঘটনা দেখে ফোন করে বাইরে জানিয়ে দেয়, ঠিক এরপরই সন্ত্রাসীরা কেটে দেয় টেলিফোন লাইন। কিন্তু বিশ্ব জেনে যায় কাবায় কিছু একটা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই সেই ধনী বিন লাদেন গ্রুপ, যার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ বিন লাদেন। তার পুত্রই ওসামা বিন লাদেন। তবে বিন লাদেন গ্রুপের সাথে আল-কায়েদার কোনো সম্পর্ক ছিল না। এবং এখনো সুনামের সাথে সৌদি আরবের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি।
সন্ত্রাসীরা মসজিদের ওপরে ‘ডিফেন্সিভ পজিশনে’ চলে যায়। তারা, মিনারে মিনারে ‘স্নাইপার’ রাখে। আর বাকি সবাই আশ্রয় নেয় মাটির নিচে। বাইরের কেউ জানত না ভেতরে ক’জন জিম্মি। কেউ জানত না ভেতরে কী হচ্ছে, কেমন ক্ষয়ক্ষতি; এরা কারা, কী চায়, কী করবে?
প্রিন্স (যুবরাজ) ফাহাদ তখন তিউনিসিয়াতে মিটিংয়ে ছিলেন, আর ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান প্রিন্স আবদুল্লাহ ছিলেন মরক্কোতে। তাই কিং (বাদশাহ্) খালিদ এই মিশনের দায়িত্ব দিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স সুলতানের ওপর, সাথে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স নায়েফ।
এক শ’ পুলিশ মসজিদ পুনরুদ্ধার করতে চেষ্টা করে, কিন্তু অধিকাংশ পুলিশ সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারায়। ভেতরে জিম্মিকারীরা সংখ্যায় প্রচুর অনুমান করে পরে পুলিশের সাথে সৌদি আর্মি আর ন্যাশনাল গার্ড যোগদান করে। মিনারে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সন্ত্রাসীদের সাথে পেরে ওঠে না যৌথবাহিনী। প্রচুর সৈনিক স্নাইপারের গুলিতে নিহত হয়।
জরুরি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সৌদি সরকার মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ভেতর সবচেয়ে চৌকস পাকিস্তানি আর্মি স্পেশাল ফোর্সের সাহায্য চায়। পাকিস্তানি আর্মি এসে সম্মিলিতভাবে নতুন করে ছক কষে। রাতের মধ্যে পুরো মক্কা খালি করে ফেলা হয়! শূন্য হয়ে যায় মক্কা নগরী।
এই পর্যায়ে এসে সম্মিলিত বাহিনীকে ধর্মীয় বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বাইরে যতটুকু খবর গেছে, তা থেকে ফতোয়া কমিটি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিল, এটি কি আসলেই ইমাম মাহদী আগমনের ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে মিলে যাচ্ছে? নাকি বানোয়াট? অনেক কিছুই মিলছে, আবার মিলছেও না। তাছাড়া হারাম শরিফে রক্তপাতের আদেশ কি দেওয়া উচিত হবে? ইত্যাদি। উল্লেখ্য, মানুষতো অনেক দূর, সাধারণ অবস্থায় মক্কাতে গাছও উপড়ে ফেলা যায় না, পাতাও ছেঁড়া হয় না গাছের প্রাণ নিধনও হারাম। ফতোয়া কমিটির প্রধান আবদুল্লাহ ইবনে বাজ সংশয়ে পড়ে যান।
কাবা শরিফের পুরো নিয়ন্ত্রণ তখন জুহাইমানের হাতে। সে কাবা শরিফের সবক’টি টেলিফোন লাইন কেটে দিলো। কাবা শরিফের মিনারের ওপর তার বাহিনীর লোক নিয়োজিত করলো যাতে কেউ সামনে আসলেই তাকে হত্যা করা যায়। তারপর মাইকে (যার আওয়াজ মক্কার অনেক জায়গায় শোনা যেত) সে দাবি জানালো রাজ পরিবারের ক্ষমতা তার কাছে হস্তান্তর করার জন্য।
সৌদি আরব সরকার এই প্রথম এই রকম ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন হলো। কাবা শরিফে কী ঘটছে তা তাদের কাছে ধোঁয়াটে। যখন বুঝলো যে সন্ত্রাসীরা কাবা শরিফ দখল করে নিয়েছে, তখন তারা ঠিক করতে পারলো না তাদের কী করা উচিত। কারণ কাবা শরিফে সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা নিষিদ্ধ। সৌদি আরব সরকার আগেই ফতোয়া কমিটির প্রধান আবদুল আজিজ বিন বাজের কাছে ফতোয়া চায়। আবদুল আজিজ অন্য উলামাদের সাথে পরামর্শ করে ফতোয়া দিলেন যে, এ পরিস্থিতিতে কাবা শরিফ সন্ত্রাসীদের থেকে পুনরুদ্ধার করতে সৌদি আরব সরকার পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারবে। সৌদি আরব সরকার তাৎক্ষণিক সেনাবাহিনী ও সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের সৈন্য পাঠাল। কিন্তু মিনারে মিনারে ওত পেতে থাকা জুহাইমান বাহিনী গুলি করে সহজেই সৈন্যদের হত্যা করতে লাগল।
কাবা শরিফের ভেতরে ৫০ হাজার মুসলমান হয়ে পড়ল অবরুদ্ধ। সঙ্কটের মধ্য দিয়ে তিন দিন কেটে গেল। সৌদি আরব সরকার অসহায়, এই বিপর্যয় সামলানো তাদের জন্য কঠিন। কিন্তু এক সময়ে সবার জন্য খাবার সরবরাহ করতে না পেরে সাধারণ মুসল্লি নারী-পুরুষদের জুহাইমান বাহিনী বাইরে যেতে অনুমতি দিলো। এই সুযোগে কাবা শরিফের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সুবাইল, যিনি জুহাইমান আর কথিত ইমাম মাহদীর কথা ও আচরণে বুঝতে পেরেছিলেন যে, পুরো ঘটনাটি উগ্র এবং বিপথগামী কোনো গোষ্ঠীর কাজ, তিনি মহিলাদের বোরকা পরে গোপনে মুক্তিপ্রাপ্তদের সাথে কৌশলে বেরিয়ে গেলেন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করলেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জুহাইমান ও কথিত ইমাম মাহদীকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানালো। কিন্তু জুহাইমান অনমনীয়। সে মাইকে তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করতে লাগল। তার দাবি দাওয়ার মধ্যে ছিল নারীদের যে কোন রকমের শিক্ষা থেকে বিরত রাখা, সৌদি আরবের সব টেলিভিশন কেন্দ্র বাজেয়াপ্ত করা ও সৌদি আরব থেকে সব অমুসলিম বিতাড়িত করা। সৌদি আরব সরকার দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানায়। কেটে গেল আরো কয়েকদিন।
এমতাবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অবরোধের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের ভাতে মারা হবে। কিন্তু বোঝা গেল, তারা প্রচুর খেজুর নিয়ে ঢুকেছে, কিন্তু জমজম কূপ থাকায় পানির সমস্যা নেই তাদের।
সুতরাং এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে সৌদি সরকার ফ্রান্সের কাছে কমান্ডো সহযোগিতা চায়। ফ্রান্স সরকার সাথে সাথে তিনজন কমান্ডো পাঠায়, যারা প্রত্যেকে ৩০০ সন্ত্রাসীকে প্রতিরোধে সক্ষম।
দেখা দেয় আরেক বিপত্তি। তিনজন কমান্ডো ছিল অমুসলিম। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কোনো অমুসলিম হারাম শরিফে প্রবেশ করতে পারে না। বিষয়টি জানানোর পর পেশাদারিত্বের স্বার্থে তিনজন কমান্ডো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে সম্মত হন। পরে একটি সংক্ষিপ্ত ধর্মান্তর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অপারেশনে অংশ নেন।
তিন কমান্ডোর নেতৃত্বে সৌদি সেনাবাহিনী ও পাকিস্তানি স্পেশাল ফোর্স কয়েকবার আন্ডারগ্রাউন্ড সুড়ঙ্গ দিয়ে অপারেশনের চেষ্টা করে। তারা কাউকে নিশানা করতে ব্যর্থ হয়। কাবাঘরের আন্ডারগ্রাউন্ড সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না।
তখন কাবা শরিফের নির্মাণকাজে নিয়োজিত ছিল বিন লাদেন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে জেনে নেয় কাবা শরীফের ভেতরের বিবরণ। কাবা শরিফের নিচে রয়েছে কয়েকশো ঘর, রয়েছে হাজারটা গলি। এসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বিন লাদেন কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানায়। ততক্ষণে সৌদি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে আসা ফরাসি বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর সাথে যোগ দেয় পাকিস্তানের এক বিশেষ কমান্ডো দল। তিন দেশের বাহিনী মিলে পরিকল্পনা করে কাবা শরিফ পুনরুদ্ধারের।
নয় দিনের মাথায় সন্ত্রাসীমুক্ত করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিত বাহিনী তাদের ট্যাংক ও কামান বহর নিয়ে কাবা শরিফের কাছে অবস্থান নেয়। সকাল গড়িয়ে দুপুর আসে। এক পর্যায়ে তারা শুরু করে গোলা ছোড়া। ফরাসি বিশেষ কমান্ডো বাহিনী সৌদি আরবের পদাতিক বাহিনীকে নিয়ে এগিয়ে যায় দ্রুত। জুহাইমানের বাহিনী অবস্থান নেয় কাবা শরিফের ফটকের কাছে ও ভূ-গর্ভস্থ অংশে। হয় তুমুল যুদ্ধ।
ভূগর্ভস্থ অংশ থেকে সন্ত্রাসীদের বের করে আনতে ফরাসি বিশেষ কমান্ডো বাহিনী এরপর পানি দিয়ে কাবা শরিফের পুরো মেঝে (আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্ট) পরিপূর্ণ করে দেয় এবং তার মধ্যে বৈদ্যুতিক তার ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎতাড়িত করে দেয় পুরো জায়গাটা। এতে জুহাইমান বাহিনী কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। হয়ে পড়ে কিছুটা ছন্নছাড়াও। এবার সেনাবাহিনী শুরু করে বেপরোয়া গুলি। হেলিকপ্টার থেকে পাকিস্তানি কমান্ডোরা মিনারে মিনারে নেমে গুলি চালাতে থাকে। এতে মৃত্যু হয় কথিত ঈমাম মাহদী মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ্সহ তার বেশ কিছু অনুসারীর।
তখনো ভূ-গর্ভের উঁচু অংশে লুকিয়ে আছে কিছু সন্ত্রাসী। এদের কব্জা করার জন্য ফরাসি বিশেষ বাহিনী তাদের সাথে আনা বিষবাষ্প ভূ-গর্ভস্থ ঘরগুলোতে ছড়িয়ে দেয়। তারপরও কিছু সন্ত্রাসী রয়ে যায়। এবার সৌদি আরবের সেনাবাহিনী ওপর থেকে ভূ-গর্ভস্থ অংশে গর্ত করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে ভেতরে থাকা সন্ত্রাসী অনেকে মারা যায়, বাকিরা বেরিয়ে আসে। সেনাবাহিনী তখন ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী জুহাইমান ও তার ৬৭ জন সহযোগীকে গ্রেফতার করে।
এই ঘটনায় ১২৭ জন সেনাবাহিনী সদস্য এবং পুলিশ সদস্য মারা যায়, আহত হয় ৪৫১ জন। জুহাইমান বাহিনীর মারা যায় ২৬০ জন সন্ত্রাসী। কাবা শরিফ সন্ত্রাসীদের দখলে থাকে ২০ নভেম্বর হতে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ পর্যন্ত মোট ১৫ দিন। এই পুরো সময় পবিত্র হারাম শরিফে কোনো রকম তাওয়াফ হয়নি, হয়নি আজান, হয়নি জামাতে নামাজ।
অনেক অনুসন্ধানের পর জানা যায় যে, এরা সৌদি রাজতান্ত্রিক শাসনবিরোধী মুতাইরী ও উতাইবা গোত্রের লোক। তারা ‘আরব গণ ইউনিয়ন’ এর সদস্য। রুশপন্থী দক্ষিণ ইয়েমেনের সাথে ছিল তাদের বিশেষ সংযোগ। বিপথগামী ধর্মচ্যুতদের (মুরতাদ) কাছ থেকে যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার নির্মিত। তবে এ মারাত্মক ঘটনার নেপথ্য নায়কদের পরিচয় এখনো পুরোপুরিভাবে অনুদ্ঘাটিত।
কাবাকে জিম্মি করার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় সারা বিশ্বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের দোসররা একতরফাভাবে অপপ্রচার চালাতে থাকে যে, সদ্য সংঘটিত সফল ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরানের শিয়ারা তাদের নেতা ইমাম খোমেইনির নির্দেশে কাবা শরিফ দখল করে নিয়েছে। (উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী শিয়া-সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধিয়ে দেওয়া) কিন্তু ইহুদি-মার্কিনিদের এ অপকৌশল বুমেরাং হয়ে আঘাত হানে আমেরিকানদের ওপর। এ মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে যাবার পর ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রূহুল্লাহ্ খোমেইনি এটিকে ইহুদি-নাসারার চক্রান্ত বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “সন্দেহ নেই, এটা সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকান ক্রিমিনাল সিআইএ আর আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদীদের ষড়যন্ত্র।” ফলে সারা বিশ্বে মুসলিমদের মধ্যে আমেরিকা বিরোধী বিদ্বেষ দ্রুত গড়ে উঠতে থাকে। কাবা দখলের প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। পাকিস্তানের বিক্ষুব্ধ মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস পুড়িয়ে দেয়। লিবিয়ার ত্রিপোলিতেও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ভেঙে পুড়িয়ে দেয় ক্ষুব্ধ মানুষজন। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে, কাবা শরিফ অপবিত্র ও জিম্মিকরণে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কোনো হাত ছিল না। বরং বিশেষজ্ঞগণের বিশ্বাস রুশঅস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মুসলমানদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করেছিল মার্কিন সিআইএ ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোশাদ।
তথাকথিত ইমাম মাহদী সেই ঘটনাতে নিহত হয়। জুহাইমান আর তার ৬৭ অনুসারী গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারের তিন দিন পর জুহাইমান এবং তার সকল সহযোগীর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
হিজরি ১৪০০ সাল উদ্যাপনের যে কর্মসূচি মুসলমানরা বিশ্বব্যাপী গ্রহণ করেছিল তা নকল মাহদীর আবির্ভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

SHARE

Leave a Reply