Home খেলার চমক ফিরে আসা -আবু আবদুল্লাহ

ফিরে আসা -আবু আবদুল্লাহ

রমজান মাস। ইফতারির ১৫ মিনিট পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ। যে কোন ফুটবলারের জন্য ‘বিগ ম্যাচ’। ছোটোখাটো কত অজুহাতেই তো কত মানুষ রোজা ত্যাগ করে! তবে ¯্রষ্টার প্রতি যার অসীম ভালোবাসা থাকে তার পক্ষেই সম্ভব ইফতারির পর পরই এমন ম্যাচ খেলতে নামা। করিম বেনজেমা শুধু নামলেনই না, সেই ম্যাচে চেলসির বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে রিয়াল মাদ্রিদকে তুলেছেন গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে।
অবহেলার জবাব কীভাবে দিতে হয় কিংবা কীভাবে দুর্দান্ত রূপে প্রত্যাবর্তন করতে হয় এই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বে তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ করিম বেনজেমা। ফ্রান্স ও রিয়াল মাদ্রিদের এই স্ট্রাইকারকে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে মেনে নিচ্ছেন সবাই। অথচ অবহেলা আর অযত্নে বেনজেমা হারিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন; কিন্তু জেদ, মেধা আর পরিশ্রম এক হলে যে সব কিছু জয় করা যায় সেটি তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত একটি মৌসুম কাটিয়েছেন। ফ্রান্সকে উয়েফা ন্যাশন্স লিগ জিতিয়েছেন। এবং একটা সময় যে ফ্রান্স জাতীয় দল তাকে অবহেলা করেছে, তারাই এখন করিম বেনজেমার ওপর ভরসা করছে সবচেয়ে বেশি। আরব মুসলিম হওয়ার কারণে ইউরোপে অনেক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন; কিন্তু বেনজেমা নিজের প্রতিভা দিয়ে সব কিছুর জবাব দিয়েছেন।
ফ্রান্সের শহর লিওঁতে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেন করিম মোস্তফা বেনজেমা। উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী হয়েছিল তার পরিবার। এই শহরেই বেনজেমার ক্লাব ফুটবলে হাতেখড়ি। আট বছর বয়সের সময় স্থানীয় ব্রন টেরাইলন এসসি নামের একটি ক্লাবে ফুটবল শিখতে শুরু করেন। ক্লাবটির হয়ে অনূর্ধ্ব-১০ পর্যায়ে লিঁও যুব একাডেমির বিরুদ্ধে এক ম্যাচে দুই গোল করার পর লিঁও কর্তৃপক্ষ বেনজেমার মাঝে ভবিষ্যৎ তারকার ছায়া দেখতে পায়। দ্রুত তারা তাকে দলে ভেড়ায়।
এরপর বিখ্যাত ক্লাবটির অ্যাকাডেমিতে ফুটবলার হিসেবে বেড়ে ওঠা করিম বেনজেমার। ক্লাবটির হয়ে পরপর চারটি লিগ শিরোপা জেতেন। প্রথম তিনটি মৌসুম গড়পড়তা খেললেও ২০০৭-০৮ মৌসুমে করেন ৩১ গোল, যার মধ্যে ছিল একটি হ্যাটট্রিক। যার কারণে ফরাসি লিগ ওয়ানের বর্ষসেরা ফুটবলারে খেতাব পান। পরের মৌসুমটিও ভালো কাটে। ফলে তার ওপর নজর পড়ে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের।
ওই সময়ই ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার জিনেদিন জিদানের সাথে তার তুলনা দিতে শুরু করেন অনেকে। আলজেরিয়ান শেকড়, মুসলিম পরিচয়, ভালো ফুটবলার- সব মিলিয়ে ফরাসি তারকা জিদানের সাথেই সবচেয়ে বেশি তুলনা করা হতো করিম বেনজেমার। স্কিল, গতি আর ফিনিশিং-তাকে তারকার মর্যাদা এনে দেয়। গোল করা এবং করানো- দুটোতেই দক্ষতার পরিচয় দিতে থাকেন।
এই পারফরম্যান্সের কারণে ফ্রান্স জাতীয় দলেও ডাক আসে তার। ২০০৭ সালের মার্চে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রীতিম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় এই স্ট্রাইকারের। তার আগে অবশ্য ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলেও খেলেছেন। ২০০৪ সালে ফ্রান্সের হয়ে জিতেছে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ।
তবে রিয়াল মাদ্রিদে শুরুটা ভালো ছিল না। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, গঞ্জালো হিগুইন, রাউল গঞ্জালেসের মতো তারকার ভিড়ে তাকে খুব একটা সুযোগ দিতে পারেনি ক্লাবটি। ধীরে ধীরে নিজেকে পরিণত করেছেন বেনজেমা। রাউল ও হিগুইন ক্লাব ছাড়ার পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সাথে জুটি বেঁধে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখাতে শুরু করেন।
২০১৮ সালে চ্যম্পিয়ন্স লিগ জেতায় করিম বেনজেমার ছিল বড়ো অবদান। ওই বছর রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সব দায়িত্ব পড়ে বেনজেমার ওপর। ভালোভাবেই সেটি পালন করতে শুরু করেন। ২০১৯-২০ মৌসুমে ক্লাবটিকে এনে দেন স্প্যানিশ লা লিগার শিরোপা। লিগে বেনজেমা করেন ২০ গোল। পুরো মৌসুমে করেন ২৭ গোল। সেবারই তিনি গোলসংখ্যায় ফ্রাঙ্ক পুসকাসকে ছাড়িয়ে যান।
২০২১ সালটিতে নিজেকে আরো ছাড়িয়ে যান এই স্ট্রাইকার। লিগে সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে করেন হ্যাটট্রিক। ২০২২ সালে বেনজেমার গোলবন্যা অব্যাহত থাকে। এই বছর সম্ভবত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড়ো একটি ঘটনার জন্ম দেন বেনজেমা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ১৬ ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদ খেলতে নেমেছিল পিএসজির বিপক্ষে। মেসি, নেইমার, এমবাপ্পেদের বিপক্ষে বেনজেমা একাই রিয়ালকে জয় এনে দিয়েছেন। মাত্র ১৭ মিনিটের মাঝে পরপর তিন গোল করে রিয়ালের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেন।
এদিন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন এই ফরাসি। এরপর দলকে তুলেছেন সেমিফাইনালে। কোয়ার্টার ফাইনালে চেলসির বিপক্ষেও পেয়েছেন হ্যাটট্রিক। ওই ম্যাচের আগে সারাদিন রোজা ছিলেন। ইফতারির মাত্র ১৫ মিনিট পর শুরু হয়েছে ম্যাচ। তবে মাঠে এতটুকু ক্লান্ত মনে হয়নি তাকে!
ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে ফ্রান্সের জাতীয় দল থেকেও আবার ডাকতে বাধ্য হয়েছে বেনজেমাকে। কোচের সাথে মতানৈক্যের কারণে মাঝখানে কয়েক বছর তাকে জাতীয় দলের বাইরে রাখা হয়েছিল। খেলা হয়নি ২০১৮ সালের বিশ্বকাপও; কিন্তু ২০২১ ইউরোতে তাকে আবার দেখা গেছে ফ্রান্সের জার্সিতে। এই দফায় দলে ফিরেই ফ্রান্সকে এনে দিয়েছেন উয়েফা ন্যাশন্স লিগের শিরোপা। সুস্থ থাকলে কয়েক মাস পরে কাতার বিশ্বকাপেও বেনজেমার দিকেই তাকিয়ে থাকবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
এই লেখা যখন লিখছি তখন ২০২১-২২ মৌসুমে স্প্যানিশ লা লিগার ৬টি ম্যাচ বাকি আছে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইফনালও সামনে। তবে তার আগেই বেনজেমা চলতি বছর ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের সবচেয়ে বড়ো দাবিদার হয়ে উঠেছেন। মেসি, রোনালদোর ফর্ম যখন পড়তির দিকে- তখন হয়তো তার হাতেই উঠতে পারে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার পুরস্কারটি।
এর আগে চারবার ফ্রান্সের বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছেন বেনজেমা। এছাড়াও ক্যারিয়ার জুড়ে পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। বয়স এখন ৩৪ বছর। আর খুব বেশি দিন হয়তো তাকে ফুটবল মাঠে দেখা যাবে না। তবে শেষ সময়টাতে ফুটবল বিশ্বকে নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়ে যাচ্ছেন আরব বংশোদ্ভূত এই স্ট্রাইকার।
ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক বেনজেমা। রোজা রেখে ম্যাচ খেলতে সমস্যা হয় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, কোনো সমস্যা নেই। রোজা আমার জীবনের অংশ এবং আমার ধর্মে রোজা রাখা বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, কাজেই আমার জন্য এটি খুবই গুরত্বপূর্ণ এবং রোজা পালনের সময় আমি খুব চনমনে থাকি।

SHARE

Leave a Reply