Home গল্প মনা -গোলাম মাওলা

মনা -গোলাম মাওলা

সন্ধ্যের আজান হচ্ছে। দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে সূর্যের লাল আলোর সাথে আঁধারের খেলা চলছে। পাখিদের কিচির মিচির আওয়াজে পুরো বাগান ভরে গেছে। পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরছে। মনাকে দেখে ওরা ভয় পেয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে বসেছে। এ গাছে মনে হয় চড়–ই আর শালিকের থাকার স্থান। ওরা চিৎকার করে প্রতিবাদ করছে। সরে যাও আমাদের জায়গা থেকে। মনা পাখিদের বিরক্ত না করে চুপ চাপ বসে থাকে। অপরের বাড়িতে বসে বিবাদ করা যায় না।
এ আমগাছের কাঁচা-মিঠে আম খেয়েছে ও কতদিন। অন্য গাছের কাঁচা আম টক হলেও এ গাছের কাঁচা আম মিষ্টি। তাইতো এ গাছের দুই ডালের মাঝের এ জায়গাটা ওর প্রিয়। চেয়ারের মতো করে একটা বড়ো ডালের ওপর বসে আছে হেলান দিয়ে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। সেই বিকাল থেকে এখানে বসে আছে। পেটে কয়েকটা আম ছাড়া কিছু পড়েনি। না পড়েছে..। সুমির দাদির দুধ চুরি করে খেয়েছে। ওদের রান্নাঘরে চুলোর ওপর ছিল হাঁড়িটা। সরের ফাঁক গলে পাটকাঠি ঢুকিয়ে কিছুটা দুধও খেতে পেরেছে। কিন্তু সুমি চলে আসায় বেশি পারেনি।
– ও মা দেখ, মনা দুধ চুরি করে খাইছে!
পেছনে সুমির গলায় চিৎকার শুনতে শুনতে দৌড়ে পালায়। সুমি মনে হয় ততক্ষণে ওর মার কাছে নালিশ করেছে। আচ্ছা পাজি মেয়ে, এ কাঁচা-মিঠে আম কি ওকে ও দেয়নি কখনো। হিংসুটে। এখনো আধ-খাওয়া একটা আম আছে। ওর ছোটো চাকুটা দিয়ে এক চিলতে কেটে মুখে দেয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সকল আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। কী যেন একটা নীরবতা নেমে আসে পুরো বাগান জুড়ে। খালপাড় কবরস্থানের পাশে এ বাগানে সাধারণত কেউ আসে না। তালুকদার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান। দিনের বেলায়ও এখানে নীরব থাকে। কয়েকটা আমগাছ আর বুনো গাছগাছালিতে ঢাকা এ অঞ্চল। কেউ কেউ বলে এখানে নাকি জিন-পরীদের থাকার স্থান। ভূতও থাকতে পারে কবরে। অন্ধকার রাতে কবরবাসীরাও নাকি বের হয়। মনা এসব ভয় মানে না। দুরন্ত বালক ভয়কে পাত্তা দেয় না।
– মনা, ও মনা বাড়ি আয়।
বিকাল বেলা ও শুনছিল ওর মার ডাক। মা নিশ্চয় এখনো ওকে খুঁজছে। খোকাদের বাড়ি, নসুদের বাড়ি আরো কত জায়গায়। মনা তাই ওদিকে পা বাড়ায়নি। ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। যদিও জানে মা তাকে দু-একটা ঘা দিলেও তেমন লাগে না। কিন্তু বাজান। বাজান যেদিন ধরে সেদিন প্রচণ্ড মার মারে। এই তো গতবার শেখদের বাড়ির টালি ভাঙার কারণে মেরেছিল। আচ্ছা ওর কি দোষ। বরই পাড়তে গিয়ে ঢিলটা ওদের রান্নাঘরের টালিতে পড়েছিল। তাতেই লঙ্কাকাণ্ড। ও শুধু বাজানরে ভয় পায়। ভীষণ ভয় পায়। মারার সময় বাজানের কোনো দয়া মায়া থাকে না।
আচ্ছা ওর কী দোষ। ডাংগুলিটা যে বাজানের মাথায় লাগবে তা ও কি জানতো? বাজানের মাথায় ও রক্ত দেখেছে। তারপরই দে ছুট। ও জানে বাজান এখন ওকে ধরতে পারলে আস্ত রাখবে না। ছুটতে ছুটতে নদীর পাড়ে গিয়েছিল। নদীতে অন্য ছেলেদের সাথে গোছল করে, ডাংগুলি খেলে বিকেল বেলায় এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
বেশি নীরব হয়ে গেছে চারিদিক। ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছে না। জোনাকি পোকা ওর চারপাশে ঘুর ঘুর করছে। কয়েকটা নিয়ে পকেটে রাখে। পকেট আলোকিত হয় নীল আলোয়। সবাই বলে, জোনাকি পোকা নিয়ে খেললে নাকি রাতে বিছানায় হিসু করে। সে তো ছোটোবেলায়। এখনতো ও করে না। পকেট থেকে গুলতিটা বের করে। পেয়ারার ডাল দিয়ে বানানো। এটা ওর সারাক্ষণের সাথী। পকেটে এখনো কতগুলো মার্বেল আছে। কেউ কাছে এলে ও গুলতি দিয়ে তার বুক ফুটো করে দেবে। সে জিন-পরী বা ভূত যাই হোক।
আজ মনে হয় পূর্ণিমা। চাঁদের আলো পড়েছে দূরের ঐ কবরের ওপর। কেমন যেন ছম ছম করে ওর বুক। ভূতের বিষয়টা মাথায় আসে। রাত বাড়লে কিছু একটা ঘটতে পারে। পরিবেশটা ওর ভালো লাগে না। ও বুঝতে পারে বেশিক্ষণ এখানে থাকা যাবে না। গাছ থেকে নেমে পড়ে। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ করে। পাখিদের নীরবতা একটু ভঙ্গ হয়।
ধীর কদমে গোয়াল ঘরের পাশে এসে দাঁড়ায় মনা। বাড়িটা নীরব হয়ে আছে। আচ্ছা ওকে মনে হয় সবাই ভুলে গেছে। কেউ ভাবে না ওকে নিয়ে। কেমন একটা খারাপ অনুভূতি লাগে। নিজের প্রতি ওর রাগ হয়। ও মনে হয় একটু বেশি দুষ্টু। কারো কথা শোনে না; পড়াশোনা করে না; সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। একটা ভালো ছেলের কোন গুণ নেই ওর মাঝে। কিন্তু পড়াশুনা তো ওর ভালো লাগে না। স্কুল পালানো ওর স্বভাব। স্যাররা প্রতিদিনই ওর বাজানের কাছে নালিশ করে। পাড়ার সবার নালিশে প্রতিদিন বিচার বসে ওর। তাই মনে হয় ও বাড়ি না থাকায় সবাই খুশি হয়েছে। আপদ গিয়েছে। নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। এ সংসারে ওর প্রয়োজন মনে হয় ফুরিয়ে গেছে।
আচ্ছা আমি যদি ভালো হয়ে যাই, তবে কি সবাই আমাকে ভালোবাসবে? আদর করবে? ও হিসেব করে, কী সব করতে হবে ভালো ছেলে হতে- লেখাপড়া করতে হবে, স্কুলে যেতে হবে, পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের সাথে মেলামেশা করা যাবে না, ডাংগুলি খেলা যাবে না, নদীতে দল বেঁধে গোসল করা যাবে না, ইত্যাদি। নাহ্, এত কিছু মনে হয় ছাড়া যাবে না।
আচ্ছা, মা কি রাতের খাবার সবাইকে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। ওর জন্য কিছু রাখেনি। বুকের ভেতর একটা শূন্যতা অনুভব করে। চোখে পানি আসে। সেটা কি খিদের জ্বালায় না দুঃখে তা বুঝতে পারে না। ও মনে হয় এ পরিবারের কেউ না। ওকে ছাড়া সবাই কেমন বসে আছে। ঘরের মধ্যে হারিকেন জ্বলছে। ও বোঝার চেষ্টা করে কী হচ্ছে ঘরের ভেতর। বাজান কী করছে। ওকে নিয়ে কি কোনো কথা হচ্ছে?
দুধেল গাইটা শুয়ে পড়েছে। ওকে উঠিয়ে দুধ খাওয়া যেত। গাইটা ওকে কিছু বলবে না। ওর সাথে খুব ভাব। মনা গোয়াল ঘরে সন্তর্পণে ঢুকে পড়ে। এমন সময় ও দেখতে পায় মা বের হয়েছে। হারিকেন হাতে। পুকুর পাড়, ঘরের পেছন, খড়ের পালা সব দেখে। ও বুঝতে পারে মা ওকে খুঁজছে। সারাদিন লুকিয়ে থাকলেও বাড়িতে না এসে থাকতে পারবে না মনা ওর মা জানে।
– মনা, ও মনা (উচ্চ স্বরে মা ডাকে) .. আয় বাজান.. তোর বাপ তোরে মারবে না.. সারা সন্ধ্যে সে তোরে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে ওর মা উঠানে দাঁড়ায়। একটা ক্লান্তি ভাব তার মাঝে। মনা বুঝে উঠতে পারে না। মার কাছে যাবে কি না? গেলে কী হবে ভেবে পায় না। একসময় মনা আস্তে আস্তে মার কাছে যায়।
– মা,
ওর মা চমকে ওঠে। ঘুরে ওকে দেখতে পায়। হাত ধরে ফেলে।
– পাজি ছাওয়াল… আর কত জ্বালাবি?
পিঠের ওপর এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আরো একটা দিতে যায়… এমন সময় শুনতে পায়…
– মর্জিনা… ওরে মারিস না… সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি… কয়ডা খাইতে দে…
মনা তাকিয়ে দেখে ওর বাজান উঠানে প্রবেশ করেছে। মাথায় তার বান্ডেজ। ওর কাছে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে। হু হু করে কেঁদে ওঠে…
– কই ছিলিস বাপ… সারা গ্রাম তোরে খুঁজে বেড়াইছি…
কঠিন মানুষটার মাঝে যে এত ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল তা মনা বুঝতে পারেনি আগে। পাষাণের বুক চিড়ে ঝরনাধারা বয়ে যায়। মানুষটা ওকে যে কী ভালোবাসে তা এতদিন বুঝেনি। ওর মাও কেঁদে ওঠে। জড়িয়ে ধরে ওকে। মনা বুঝতে পারে না। সবাই ওকে এত ভালোবাসে। এমন সময় ওর মা ওর পিঠে আরো একটা আঘাত করে-
– পাজি ছাওয়াল। তোর বাপও কিছু মুখে দেয় নাই। সারা গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে মানুষটা কাহিল হইয়া গেছে।
মনা বাজানকে জড়িয়ে ধরে। হু হু করে ওঠে ওর বুকের ভেতর। বাজানের বুকের ঘ্রাণ ও পায়। পরম শান্তি খুঁজে পায় বুকের মাঝে। সারাদিনের সব কথা একে একে ওর মনে পড়ে।
– বাজান, আর আমি তোমাগো জ্বালাবো না… ভালো হয়ে যাব… ডাংগুলি খেলবো না… পড়াশুনা করবো…

SHARE

Leave a Reply