Home স্মরণ রাজপুত্তুর কবি -নাসির হেলাল

রাজপুত্তুর কবি -নাসির হেলাল

এই হিং নেবে হিং, কিশমিশ, খুবানি, আঙুর, পেস্তা, বাদাম, আখরোট নে-বে? লম্বা পিরহানের জেবে কলসি ভাঙা চাড়া, কড়ি এসব ভরে ঝুমুর ঝুমুর শব্দ তুলে দরাজ গলায় হেঁকে চলেছে এক কিশোর। বড়ো বড়ো উজ্জ্বল দুটো চোখ। যেন সে চোখ দিয়ে ঠিকরে পড়ছে সত্যের দ্যুতি। লম্বা বাঁকানো বাঁশির মতো নাক, প্রশস্ত কপাল, ঘাড় অবধি নেমে যাওয়া ঝাঁকড়া চুল- সব মিলিয়ে এক অপরূপ রাজপুত্তুর। কাবুলিওয়ালা সাজার ইচ্ছায় যে রাজপুত্তুর বেশ হাঁক-ডাক করতো।
রাজপুত্তুরটির যেমন ছিল দরাজ গলা, আগুনঝরা চোখ, বাবরি দোলানো চুল, তেমনি ছিলো দুরন্ত সাহস। ভয় কখনো তাঁর দিলে বাসা বাঁধেনি। যা সত্য, যা সুন্দর তা সে আজীবনই মেনে চলেছে, সমাজেও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
তোমার হয়তো ভাবছো, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের কোনো রাজপুত্তুরের কথা বলছি। আসলে তা নয়। এ রাজপুত্তুরটির রাজমহল আমাদের দেশের এক গণ্ডগ্রামে। অতীতকালে তার এলাকা শাসন করেছে রাজা প্রতাপাদিত্য, রাজা বিক্রমাদিত্য, হযরত খান জাহান আলীর মতো রাজা-বাদশারা। হ্যাঁ! দেশটির নাম যশোরাদ্য দেশ। পরে এটা যশোর জেলা নামে পরিচিত হয়। এ জেলারই মাগুরা মহকুমার (বর্তমানে জেলা) আওতাধীন মাঝাইল গ্রামে সে রাজমহল। রাজপুত্তুরটির নাম ফররুখ। পুরো নাম সৈয়দ ফররুখ আহমদ।
১৯১৮ সালের ১০ জুন ফররুখ আহমদ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আব্বা খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী একজন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার ছিলেন। মায়ের নাম বেগম রওশন আখতার। মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান তিনি।
গ্রামের স্কুলেই তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি। এরপর কলকাতার তালতলা মডেল স্কুলে, বালিগঞ্জ হাইস্কুলে, খুলনা জেলা স্কুলে লেখাপড়া করেন। খুলনা জেলা স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। বালিগঞ্জ হাইস্কুলে পড়াকালে কবি গোলাম মোস্তফাকে শিক্ষক হিসেবে পান। আর খুলনা জেলা স্কুলে পান কবি আবুল হাশিম ও অধ্যাপক আবুল ফজলকে শিক্ষক হিসেবে। কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ পাস করেন। পরে দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ ভর্তি হন। আরো পরে ইংরেজিতে অনার্স নেন। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, যে কোনো কারণেই হোক তাঁর আর অনার্স পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
হ্যাঁ! যে কথা বলছিলাম, এই রাজপুত্তুরটি কিন্তু সত্যি সত্যিই রাজপুত্তুরের মতোই ছিলেন। তিনি যখন হাঁটতেন মনে হতো কেশর দুলিয়ে সিংহের বাচ্চা হেঁটে যাচ্ছে। তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে তরতরিয়ে বয়ে গেছে মধুমতী নদী। এই খরস্রোতা মধুমতী নদীতে তিনি নিত্য দিন ঝাঁপিয়ে পড়তেন তাঁর দলবল নিয়ে। আগেই বলেছি ভয় তাঁকে কখনো স্পর্শ করতো না। ফলে হাঙর কুমিরকে তিনি থোড়াই কেয়ার করতেন। বরং তিনি বলতেন, হাঙর কুমির যদি থাকে, তবে আমার ভয়েই তারা পালিয়ে যাবে। তিনি সারা জীবন এমনই সাহসের পরিচয় দিয়ে গেছেন। কারো কাছে কোনো দিন কোনো কারণে মাথা নত করেননি।
রাজপুত্তুরটি কিন্তু খুব ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন। সাতসকালে মাঠের দিকে বেরিয়ে পড়তেন। তন্ময় হয়ে ধান-পাট, গাছ-গাছালি দেখতেন। কখনো কখনো শুধু শুধু ঘুরে বেড়াতেন, আর কী যেন ভাবতেন। যখন রাতেরবেলা আকাশে চাঁদ হেসে উঠতো তখন তো কোনো কথাই নেই। বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন। পায়চারি করতেন গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে। এক পা দু’পা করে এগিয়ে যেতেন ডাহুক ডাকা বাঁশঝাড়ের কাছে। চুপচাপ শুনতেন ডাহুকের ডাক। পরবর্তীতে তিনি এসব কথা তাঁর কবিতায় লিখেছেন-
রাত্রি ভর ডাহুকের ডাক……
এখানে ঘুমের পাড়া, স্তব্ধ দীঘি অতল সুপ্তির
দীর্ঘ রাত্রি একা জেগে আছি।
ছলনার পাশাখেলা আজ পড়ে থাক
ঘুমাক বিশ্রান্ত শাখে দিনের মৌমাছি
কান পেতে শোনো আজ ডাহুকের ডাক
আবার-
তারার বন্দর ছেড়ে চাঁদ চলে রাত্রির সাগরে
ক্রমাগত ভেসে আসে পালক মেঘের অন্তরালে,
অশ্রান্ত ডুবুরি যেন ক্রমাগত ডুব দিয়ে তোলে
স্বপ্নের প্রবাল।
মাঝে মধ্যে তিনি বাড়ির পুঁচকে পুঁচকে পাইক বরকন্দাজ নিয়ে বেড়াতে বের হতেন। যেন রাজপুত্তুরের হরিণ শিকার। হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন মধুমতীর তীরে। পলকহীনভাবে দেখতেন নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার, জাহাজের আনাগোনা। শুনতেন মাঝিমাল্লার দাঁড় ফেলার শব্দ, হাঁক-ডাক। এসব দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যেতেন তিনি। চিন্তার রাজ্যে দাঁড় ফেলে ফেলে এগিয়ে যেতেন, নদী ছেড়ে সেই সমুদ্রে। এই সময় সাথী দলবলকে লক্ষ্য করে তাদেরকে ভূগোলের জ্ঞান দিতে চেষ্টা করতেন। বলতেন, ‘পাহাড় থেকে এসেছে এই নদী। তারপর চলে গেছে দক্ষিণে, সেখানে আছে বঙ্গোপসাগর, তারপর আরব সাগর। নৌকা চড়ে ভেসে যেতে কোনো বাধা নেই, কোনো মানা নেই। কিন্তু সাবধান, হুঁশিয়ার। আসবে ঝড়, উঠবে তুফান, বড়ো বড়ো কুমির আর হাঙর মাতামাতি করবে। আল্লাহ আল্লাহ বলে নৌকা ছাড়লে কোনো ভয় নেই।’
বাল্যকালের সাথী ‘মধুমতী’কে নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন। যেমন-
জনতার কোলাহল নাই প্রশান্তির / স্বপ্ন মধুমতী /
দুই পাশে ধানক্ষেত রেখে অবিশ্রান্ত / চলে সেই নদী /
সূর্যাস্তের তোরণে যেখানে জ্বলে সন্ধ্যা / তারকার দ্বীপ
কর্কশ দিনের দাঁড়কাক যেথা হলো স্তব্ধ / বাঁক।
(মধুমতী তীরে: হে বন্য স্বপ্নেরা)
তোমরা তো পড়েছ রাজপুত্তুররা টগবগিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে অথবা পঙ্খীরাজে চড়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, সাত সমুদ্রের ঘাট পেরিয়ে চলে যায় সেই পরীর দেশে অথবা রাক্ষস-খোক্কসদের রাজ্যে। তারপর সেখান থেকে উদ্ধার করে আনে রাজকন্যা অথবা কোনো অলৌকিক সম্পদ। কিন্তু আমাদের আজকের আলোচিত রাজপুত্তুর চেয়েছিলেন অন্য কিছু। তিনি চেয়েছিলেন, আমাদের এই ঘুণে ধরা সমাজটাকে ভেঙে একটা সুন্দর নতুন সমাজ গড়তে। তাঁর কথায়-
আল্লাহর দেওয়া বিশ্ব বিধান / ইসলামী শরিয়ত
সে বিধানে মোরা গড়িয়া তুলিব / এই পাক হুকুমত॥
তৌহিদে রাখি দৃঢ় বিশ্বাস / আমরা সৃজিব নয়া ইতিহাস
দেবো আশ্বাস দুনিয়ার বুকে / দেখাব নতুন পথ॥
সারা মুসলিম দুনিয়াকে বেঁধে / একতার জিনজিরে
ফিরায়ে আনিব হারানো সুদিন / নয়া জামানার তীরে॥
আলী, উসমান, উমরের দান / নেব তুলে মোরা জেহাদী নিশান
নেব মোরা ফের আবু বকরের / সত্য সে খেলাফত॥
কবি রাজপুত্তুরটির বিশ্বাস, আমাদের পূর্বপুরুষদের অর্থাৎ আগের দিনে যাঁরা জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের ত্রুটির কারণেই আজ মুসলিম জাতি এই খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। যেমন-
শুধু গাফলাতে, শুধু খেয়ালের ভুলে
দরিয়া অথই ভ্রান্তি নিয়াছি তুলে,
আমাদেরই ভুলে পানির কিনারে
মুসাফির দল বসি,
দেখেছে সভয়ে অস্ত গিয়াছে তাদের
সেতারা শশী,
মোদের খেলায় ধুলায় লুটায়ে পড়ি
কেঁদেছে তাদের দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ র্শব্বরী।
(পাঞ্জেরী)
সারা দুনিয়ার নতুন করে আবার মুসলিম জাগরণ শুরু হয়েছে। আবার যেন নতুন সূর্য ওঠার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি লিখেছেন-
কেটেছে রঙিন মখমল দিন,
নতুন সফর আজ,
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক,
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ
পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ বয়ে আনে
নোনা দরিয়ার ডাক,
নতুন পানিতে সফর এবার
এ মাঝি সিন্দবাদ।
(সিন্দবাদ)
কিন্তু আমাদের জাতির নেতা যখন হতাশ, সাহসহারা তখনো রাজপুত্তুর তাঁর সাহসে ভর দিয়ে বলেছেন-
আজকে তোমায় পাল ওঠাতেই হবে, / ছেঁড়া পালে আজ জুড়তেই হবে তালি,
ভাঙ্গা মাস্তুল দেখে দিক করতালি, / তবুও জাহাজ আজ ওঠাতেই হবে।
(সাত সাগরের মাঝি)
কবি রাজপুত্তুরটি তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। এই দৃঢ় প্রত্যয়ী রাজপুত্তুরটি তাঁর জীবনেও ইসলামি অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। কোনো ঝড়, কোনো বিপদ তাঁকে তাঁর পথ থেকে চুল পরিমাণও সরাতে পারেনি।
তোমাদের মতো ছোটোদেরকে তিনি সাচ্চা মুসলমান হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য বলেছেন এবং পাহাড়ের মতো অটল থেকে সকল বিপদ মুসিবতের মোকাবিলা করতে বলেছেন। যেমন-
আমরা বাচ্চা তবুও সাচ্চা মুসলমান
পাহাড় যদিও টলে যায় তবু টলে না প্রাণ।
তিনি বিপদ মুসিবতের সময় ভেঙে পড়াকে ঘৃণা করতেন। এই সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়াটাও মোটেই পছন্দ করতেন না। আজকে যারা ছোটো, কাল তো তারাই বড়ো হবে, দেশ চালাবে। তাই তিনি তাদেরকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন-
তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে / খোদার মদদ ছাড়া
পরের ওপর ভরসা ছেড়ে / নিজের পায়ে দাঁড়া।
এমনিভাবে তিনি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে দেশ-জাতির মঙ্গল কামনা করেছেন।
তিনি তোমাদের জন্য অনেক ভালো ভালো বই লিখেছেন। যেমন- পাখির বাসা, হরফের ছড়া, নতুন লেখা, ছড়ার আসর, নয়া জামাত, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি। পাখির বাসা বইটির জন্য তিনি ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়াও কবি পেয়েছেন- বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার প্রভৃতি।

SHARE

Leave a Reply