Home ঈদ প্রবন্ধ রাফির ঈদ -ইভা জান্নাত শহিদা

রাফির ঈদ -ইভা জান্নাত শহিদা

পড়ন্ত বিকেলে স্তব্ধতার দেহে রাফি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঐ নীল আকাশে। মনে কতই না স্মৃতি খেলা করছে। প্রতিটা মুহূর্তে স্মৃতিরা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তখন কণ্ঠস্বর মনে হয় কেমন অদ্ভুত আর অর্ধমৃত প্রায়। স্মৃতির সাথে খেলা করতে গিয়ে কখনো ঠোঁটের কোণে একটুখানি সূর্য হেসে ওঠে আবার কখনো শব্দহীন বৃষ্টি। মাঝে মাঝেই ভয়ঙ্কর বজ্রপাতে বুকের পাঁজর ভেঙে আসে। দম বন্ধ হয়ে আসে তার।
দুই দিন পর পবিত্র ঈদুল ফিতর। খুশির বন্যা বইছে প্রতিটি মুসলিম পরিবারে। রোজা মুখে নিয়েও সব কাজ করে যাচ্ছে, যেন কোনো ক্লান্তি নেই কারো। বাড়িগুলোতে শত ব্যস্ততার মাঝেও হাজারো আনন্দ উল্লাসে মেতে আছে শিশু, কিশোরী আর গৃহবধূরা। ঈদ আনন্দ ঠিক কেমন হওয়া উচিত গ্রামের শিশুদের দেখলেই বোঝা যায়। বাড়িগুলোতে সবাই ব্যস্ত হরেক রকমের নাস্তা তৈরির কাজে। রাফি সব কাজ সেরে জানালার পর্দা সরিয়ে বারবার দেখছে ঐ মেঠোপথটার দিকে। যে পথে আসতো রাফির বাবা, ভাইয়া ঈদের দাওয়াত করতে। বারবার তাকাচ্ছে ফোনটার দিকেও। গুমরে গুমরে কাঁদছে আর মনে মনে বলছে ভাইয়া, একটা কল দেনা প্লিজ। ভাইয়া দিয়ে সেইফ করা নম্বরটা ভাসছে ডিসপ্লেতে। তবুও সে নিজে কল দিচ্ছে না। এত অভিমান ভাইয়ের প্রতি।

স্মৃতিগুলো মনে করছে বারবার, যেন কল্পনায় ফিরে পেলো সেই দিনগুলো, যে দিনগুলোতে ভাইবোনের খুনসুটিতে মা বাবাও হেসে দিতো, প্রতিবেশীরাও হিংসা করতো, অন্য ভাই বোনেরাও আফসোস করতো। রাতুল বাইরে থেকে কখনো খালি হাতে ফিরতো না। কিছু না কিছু নিয়েই আসত রাফির জন্য। রাতুল বাইরে থেকে এসে রাফিয়া না ডেকে ডাক দিতো রাফি নাম ধরে, এই নামটাই থেকে গেল। কেউ আর রাফিয়া বলে ডাকে না, ডাকে রাফি বলে।
ভাইবোনের খুনসুটি ছিল এমন,
রাতুল বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে রাফি নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতো।
– রাফি
– কিরে ভাইয়া তোকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করি লোডশেডিং চলছে?
– হ্যাঁ কর না মিষ্টি বোন আমার।
হাত পাখা এনে ঘুরাচ্ছে আর গুনছে।
– ১২৩৪৫
– এই কি গুনছিস রে?
– কয়বার বাতাস করি সেটা?
– মানে?
– আমার মিষ্টি ভাইয়া বুঝিস নি তো? কোনো ব্যাপার না আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।
তোকে যে বাতাস করছি দাঁড়িয়ে থেকে এটা কি এমনি এমনি?
– তাছাড়া কী?
– আমি গুনছি হাত পাখা দশবার ঘুরালে তুই আমাকে পাঁচ টাকা দিবি। যতবার ঘুরাবো তত টাকা।
রাতুল হাত পাখা কেড়ে নিয়ে পাঁচ টাকা দিয়ে বলতো থাক আর লাগবে না। ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে বোনু। তুই আমাকে ফকির করেই ছাড়বি।
তখন হাত পাখা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হতো দুজনের মধ্যে।
রাতুল মাঝে মাঝেই বলতো,
– রাফি, বোনু এদিকে আয় তো।
– হুম বল কী হয়েছে?
– তুই কী খেতে বেশি পছন্দ করিস?
– কেন রে ভাইয়া খাওয়াবি নাকি?
– হুম খাওয়াবোই তো। শুধু বলে দেখ একবার কী খাবি? চকোলেট, চিপস, ফুসকা, ঝালমুড়ি নাকি অন্য কিছু?
– হুম বুঝেছি কী করতে হবে সেটা আগে বল?
– এই কয়টা কাপড় ধুয়ে দে শুধু।
– ওমাগো এতগুলো কাপড়! এগুলো ধুয়ে দিতেই আমার সারাদিন চলে যাবে। মোটা মোটা প্যান্ট যেন পাটের বস্তা, পারবো না।
– তাহলে রিনাকে ডাকি। আজকে হালিম খাওয়াবো তাকে।
– থাক থাক আর ন্যাকামি করতে হবে না। ধুয়ে দিচ্ছি, দে।
রাতুল যখন গোসল করতে যায় পুকুরে, রাফি পাড়েই দাঁড়িয়ে থাকে। কাঁধে লুঙ্গি, গামছা, হাতে জুতো, সাবান ইত্যাদি নিয়ে।
রাতুল যখন খেতে বসে রাফি ভাত প্লেটে দিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। কেননা এক গ্লাস পানিও নিজে ঢেলে খাবে না। খাওয়া শেষে পানির গ্লাস দিতে দেরি হলেও প্লেট উপড় করে ঢোল বাজাবে। আজ এই দুষ্টু ভাইটাকে খুব মিস করছে রাফি। কেননা ভাইয়া আর আগের মতো নেই। যে ভাইয়ার এক গ্লাস পানি ঢেলে নিতে আপত্তি ছিল, আজ সেই ভাইয়া চুলোর পাশে বসে রান্না করতেও আপত্তি করে না। যে ভাইয়া গোসল করতে গেলে সাবান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, সেই ভাইয়া এখন ছেলেমেয়েকে গোসল করিয়ে দেয়, খাইয়ে দেয়, পোশাক পরিয়ে দেয়। যেন ভাইয়া নিজেই তার সন্তানের মা। যেই ভাইয়া রাফিকে এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করত না সেই ভাইয়া এক বছর হয়ে গেল রাফিকে দেখতে আসে না। একদিনের জন্য মামা বাড়ি গেলেও বারবার কল করে বলত, এই শাঁকচুন্নি বেশিদিন থাকিস না। তাড়াতাড়ি আসিস, বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আজ এক বছর হয়ে গেল ভাইয়ার নম্বর থেকে ঐ মিষ্টি কণ্ঠটা আর শোনা যায় না। হয়তো ভাবির অনুমতি পায়নি এখনো। ভাবি কি রাফিকে কল করার জন্য একটা অনুমতি দেবে না? রাফির দু’নয়নে অবাধ বৃষ্টি ভাষাহীন আর্তনাদ থেকে থেকে। সময়ের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে এত বড়ো পরিবর্তন? সত্যি মেনে নেওয়া যায় না।
রাফির বাবা মা গত বছরেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আর ভাবীর আঁচলের মায়াজালে বন্দী ভাইয়া। রাফি শ্বশুর বাড়ির সব কাজ সেরে এখনো ঐ মেঠোপথের পানে চেয়ে থাকে ভাইয়ার অপেক্ষায় আর কল্পনায় ফিরে পায় অতীতের দিনগুলো। কিন্তু কে জানে রাফি তার ভাইয়ার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছে। শ্বশুর বাড়ি থেকে রাফি- ভাইয়া এবং ভাইপোর জন্য পাঞ্জাবি, ভাবির জন্য শাড়ি, আর ভাইয়ের মেয়ের জন্য ঈদের জামা পাঠিয়েছে। পিচ্চি দুটোকে নতুন পোশাকে কেমন মিষ্টি দেখায় তা দেখার জন্য মনটা খুব অস্থির হয়ে উঠছে রাফির। কিন্তু ঈদের দাওয়াত আসেনি বলে রাফির বর ঈদে যেতে দেবে না।
ঈদের কয়েক দিন পরে সে যাবে। দূর থেকে তাদের দেখে চোখ জুড়াবে এই বলে মনকে সান্ত¡না দিয়ে রাফি আবারও ঘরের কাজে মনোনিবেশ করে।

SHARE

Leave a Reply