Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব পাখিদের গ্রাম -আতাউর রহমান

পাখিদের গ্রাম -আতাউর রহমান

পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ করে তাদের ভাবের আদান প্রদান করে। মানুষও যদি পাখিদের ভাষা ব্যবহার করে তবে কেমন হবে! নিজস্ব ভাষা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু এলাকার মানুষ পাখির মতো শিসের ব্যবহার করে।
তুরস্কের কানাকচি প্রদেশের ব্ল্যাক সি অঞ্চলের কয়সয় গ্রাম। উত্তর-পূর্ব তুরস্কের এই পাহাড়ি গ্রামের মানুষেরা কথা বলতে পারেন পাখির ভাষায়।
এখানে ক্ষণে ক্ষণে পাখির গান শোনা যায়। তবে সেটা পাখির গান নয়, কয়সয়ের একটি আঞ্চলিক ভাষা।
এই ভাষাটি বার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বা পাখির ভাষা নামে পরিচিত। স্থানীয় নাম কুস ডিলি। যার আক্ষরিক অর্থ পাখির ভাষা।
জানা যায়, এই ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় দুই থেকে আড়াইশ বছর আগে। মূলত ভাষাটি ব্যবহৃত হতো এই উপত্যকার রাখাল এবং কৃষিজীবী মানুষদের মধ্যে।
তুরস্কের এই গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং গঠনের ভিন্নতার জন্য তৈরি হয়েছিল এই ভাষা। পার্বত্য উপত্যকায় অবস্থিত এই গ্রামে প্রতিটি বাড়ির মধ্যে দূরত্ব কমপক্ষে কয়েকশো মিটার।
দুর্গম পথ হওয়ায় তখন যোগাযোগের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না তাই যে কোনো সাহায্য কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হতো গ্রামবাসীদের। সেই সমস্যার সমাধান করতেই বেছে নেওয়া এমন অদ্ভুত ভাষা।
এখানকার মানুষরা সামনা-সামনি শিস দিয়ে যেমন আলাপচারিতা করেন তেমনই এক টিলার ওপরের বাড়ি থেকে পাশের ক্ষেত ছাড়িয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে খবরাখবর পৌঁছে দেবার জন্য এই শিসের ব্যবহার করেন।
আমরা সাধারণত যে ভাষায় কথা বলি তার কম্পাঙ্কের তুলনায় শিসের কমাঙ্ক কয়েকগুণ বেশি। কাজেই বহুদূর থেকেই কথোপকথন সম্ভব এই ভাষায়। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে এই পদ্ধতিতেই প্রয়োজনীয় কথোপকথন করেন কয়সয়ের গ্রামবাসীরা।
শিসভাষা যে কেবলমাত্র কিছু আওয়াজ, তা নয় বরং কাঠামোবদ্ধ ও ব্যাকরণসম্মত। প্রায় ২০০টি আলাদা আলাদা শব্দের শিসের প্রচলন রয়েছে এই অঞ্চলে। বিশেষ কায়দায় ঠোঁটে আঙুল ঢুকিয়ে, জিভ ও দাঁতের ব্যবহারে শিসের সেই তারতম্য তৈরি করেন এই ভাষার বক্তারা। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০টি স্বীকৃত শিসভাষা আছে।
এই শিস ভাষাভাষীদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সম্প্রতি এক অজানা তথ্য জেনেছেন বিজ্ঞানীরা। এতদিন আমরা জানতাম মানুষের মস্তিষ্কের বাম দিকে রয়েছে ভাষা শোনা, বোঝা ও শেখার কেন্দ্র। ডান কানে শোনা শব্দ পৌঁছে যায় বাম দিকের মস্তিষ্কে আর বাম কানে শোনা শব্দ যায় ডান দিকে। এদিকে শব্দ শুনে ভাষাকে ডিকোড করে অর্থ বোঝার কেন্দ্রটি রয়েছে বাম দিকেই, তাই বাম কানে শোনা শব্দ যখন পথ ঘুরে গিয়ে সেখানে পৌঁছায় তখন ডান কানের শোনা কথার কম্প্রিহেনশন অর্থাৎ, অর্থবোধ হয়ে গিয়েছে। একে বলা যেতে পারে, ভাষার ‘লেফট হেমিস্ফিয়ার সুপ্রিমেসি
জার্মানির ব্রেহমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ওনূর গুন্ত্তর্কুন জানিয়েছেন, শিসের মাধ্যমে উৎপন্ন আওয়াজ দুই কানেই একই সাথে শোনা যায়। অর্থাৎ, লেফট হেমিস্ফিয়ার সুপ্রিমেসি শিসের ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং, শিসের ভাষা দুই গোলার্ধকেই সমানভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম।
কয়কসে স্কুলের বাচ্চাদের পাখির ভাষা শেখানো হয়। এমনকি কলেজে পাখির ভাষার ওপর ডিগ্রি অর্জন করার জন্য রয়েছে পুরো একটি বিভাগ।
২০১৪ সাল থেকে গ্রামটির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভাষাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেখানো শুরু হয়। এর আগে ১৯৬৪ সালে টাইমসের একটি প্রতিবেদনে গ্রামটির কথা বলা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদন মতে, গ্রামটির শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাবার আগেই শিখে নিত এ ভাষা।
শুধু কয়সয় নয়, পৃথিবীতে প্রায় ৫৭টি এই ধরনের স্বীকৃত ভাষা রয়েছে। যা কথিত হয় শিসের মাধ্যমেই। শুধু তুরস্ক নয় মরক্কোর অ্যাটলাস, লাওসের মালভূমি, পশ্চিম আফ্রিকা, সাউথ আমেরিকা, নেপালসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ শিসের সাহায্যে যোগাযোগ করে।
তবে প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্তির পথে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা এই ভাষা। মোবাইল এসে যাওয়ায় এই ভাষার গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে কয়সয়ে।
পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেকেই চাকরির সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বর্তমানে এই ভাষার বক্তার সংখ্যা মাত্র ১০ হাজার জন।
তবে এখনও কিছু মানুষ ব্যবহার করেন এই ভাষা। আগ্রহী পর্যটকদের শেখানোর জন্যও এগিয়ে আসেন অনেকে।
এই ভাষার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে তুর্কির পনটিক পাহাড়ে প্রতি বছর আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক মেলার। ১৯৯৭ সালে প্রথম এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১৭ সালে ইউনেস্কো থেকে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির আখ্যাও দেওয়া হয়েছে এই ভাষাকে। এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচিও।

SHARE

Leave a Reply