Home খেলার চমক পিতা-পুত্রের জুটি -আবু আবদুল্লাহ

পিতা-পুত্রের জুটি -আবু আবদুল্লাহ

চলতি বছর জানুয়ারির কথা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এক সাথে খেলতে দেখা যায় আফগানিস্তানের তারকা অলরাউন্ডার মোহাম্মাদ নবি ও তার ছেলে হাসান খানকে। ম্যাচের এক পর্যায়ে জুটি বেঁধে ব্যাটিংও করেছেন বাবা-ছেলে। ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা হাতেগোনা কয়েকটি।
আফগানিস্তানের রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে মোহাম্মাদ নবির পরিবার কয়েক বছর ধরে বসবাস করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। নবির ছেলে ১৬ বছর বয়সী হাসান শারজাহ ক্রিকেট একাডেমির ছাত্র। স্থানীয় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে তার দলেই খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় মোহাম্মাদ নবিকে। পাকিস্তান ক্রিকেট লিগের প্রস্তুতি হিসেবে ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলার আমন্ত্রণ পেয়ে আর ফিরিয়ে দেননি নবি। যে কারণেই ক্রিকেট মাঠে দেখা গেছে পিতা-পুত্রের এই ব্যাটিং জুটি। এই ম্যাচটি কোন অফিসিয়াল ম্যাচ না হলেও মোহাম্মাদ নবি আশা করছেন একদিন ছেলের সাথে আফগানিস্তানের হয়ে একই ম্যাচে মাঠে নামবেন।
অবশ্য ক্রিকেট বিশ্বে পিতা-পুত্রের জুটি বেঁধে ব্যাটিং করার ঘটনা এটি নতুন নয়। তেমনই কয়েকটি জুটির কথা জানাচ্ছি তোমাদের।

শিবনারায়ণ ও ত্যাগনারায়ণ চন্দরপল
ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ব্যাটিং জিনিয়াস শিবনারায়ণ চন্দরপল। টেস্টে ৩০টি সেঞ্চুরিতে তার রান প্রায় ১২ হাজার। ওয়ানডেতে প্রায় ৯ হাজার রানের মাঝে সেঞ্চুরি ১১টি। তাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন মনে করা হতো। চন্দরপল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন ২০১৫ সালে। তার দুই বছর আগেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট (ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচ) অভিষেক হয়েছে তার ছেলে ত্যাগনারায়ণের। তারা দুজনেই ক্রিকেট খেলেছেন গায়ানার হয়ে। মোট পাঁচটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে এক সাথে খেলেছেন বাবা-ছেলে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের মার্চে জ্যামাইকার বিপক্ষে এক ইনিংসে উভয়ই হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। ছেলে ত্যাগনারায়ণ ৫৮ রান করে আউট হন। আর বাবা শিবনারায়ণ করেন ৫৭ রান। দলকে একটি ভালো পার্টনারশিপও দিয়েছেন তারা। আবার ঘরোয়া একটি ৪০ ওভারের টুর্নামেন্টের এক ম্যাচে এই বাবা-ছেলের জুটিতে তাদের দল তুলেছিল ২৫৬ রান। ওই ম্যাচে দু’জনেই পেয়েছিলেন সেঞ্চুরি।

উইলি ও বার্নার্ড কোয়াইফ
ইংল্যান্ডের হয়ে ৭টি টেস্ট খেলেছেন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান উইলি কোয়াইফ (অভিষেক ১৮৯৯ সালে)। অনেক প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান মনে করা হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি উইলি। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে করেছেন ৩৬ হাজারের বেশি রান। উইলি অবসর নেওয়ার আগেই তার ছেলে বার্নার্ড কোয়াইফির প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়। বার্নার্ড ছিলেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। কাউন্টি দল ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে বাবা-ছেলে এক সাথে ২০টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। বার্নার্ড ৩১৯টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেললেও ইংল্যান্ড জাতীয় দলে সুযোগ পাননি।

জর্জ গান ও ভারনন গান
১৯০৭ সালে অভিষেকের পর ইংল্যান্ডের হয়ে ১৫টি টেস্ট খেলেছেন টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান জর্জ গান। আছে দুটি সেঞ্চুরিও। তিনি অবসরে যাওয়ার আগেই তার ছেলে জর্জ ভারনন গানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়। ভারনন ছিলেন অলরাউন্ডার। ১৯৩১ সালে এজবাস্টনে এক ম্যাচে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে দু’জনেই সেঞ্চুরি করেছিলেন। ৭ উইকেটে ৫২১ রানের ইনিংস গড়তে গিয়ে বাবা জর্জ গান করেছিলেন ১৮৩ রান। ম্যাচের সময় তার বয়স ছিল ৫৩ বছর। আর ছেলে ২৬ বছর বয়সী ভারনন খেলেন ১০০ রানের ইনিংস। অফিসিয়াল ক্রিকেটে একই ম্যাচে বাবা-ছেলের সেঞ্চুরি করার ঘটনা সেটিই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র। জর্জ ও ভারনন কাউন্টি ক্রিকেটে ৩৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন এক সাথে। ভারনন ২৬৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেললেও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি।

ডেনিস ও হিথ স্ট্রিক
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পিতা-পুত্রের একসাথে খেলার নজির স্থাপন করেছে জিম্বাবুয়ের অলরাউন্ডার হিথ স্ট্রিক ও তার বাবা ডেনিস স্ট্রিক। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের ইতিহাসে হিথ স্ট্রিক একজন কিংবদন্তী। জিম্বাবুয়ের হয়ে ৬৫টি টেস্ট ও ১৮৯টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন হিথ স্ট্রিক (১৯৯৩-২০০৫)।
অনেক দিন বিরতির পর ১৯৯৬ সালে একটি ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন বাবা ডেনিস স্ট্রিক (বয়স তখন ৪৭)। তার ছেলে হিথ তখন উঠতি তারকা। বাবা-ছেলে এক সাথে খেলেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটের মাতাবেলেল্যান্ড দলের হয়ে। বাবা-ছেলের দলটিই সে বছর ঘরোয়া লোগান কাপ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

গ্রেস এন্ড সন
ক্রিকেটের জনক হিসেবে পরিচিত ডব্লিউ জি গ্রেস ও তার ছেলে ডব্লিউ জে গ্রেস জুনিয়র এক সাথে ৪৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন। ডব্লিউ জি গ্রেস তার আরেক পুত্র সিবি গ্রেসের সাথেও খেলেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সিবি গ্রেস মাত্র চারটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন এবং চারটি ম্যাচই খেলেছে বাবার সাথে একই দলে। ১৮৮০ সালে ইংল্যান্ড দলে অভিষেক হয়েছিল ডব্লিউ জি গ্রেসের। সেটি ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের চতুর্থ টেস্ট ম্যাচ। মোট ২২টি টেস্ট খেলেছিলেন তিনি।

আরো কিছু তথ্য
– ১৯৬৩ সালে যুদ্ধের জন্য তহবিল যোগাড় করতে ভারত বেশ কয়েকটি প্রীতিম্যাচ আয়োজন করেছিল সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটারদের নিয়ে। তারই একটি ম্যাচে খেলেছেন ৫২ বছর বয়সী লালা অমরনাথ ও তার ছেলে ১৫ বছর বয়সী সুরিন্দর অমরনাথ। তবে দু’জনে ছিলেন দুই দলে। ম্যাচটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মর্যাদা পেয়েছে। বাবা লালা অমরনাথ ভারতের হয়ে ২৪টি টেস্ট খেলেছেন (১৯৩৩-১৯৫২), আর ছেলে সুরিন্দর খেলেছেন ১০টি (১৯৭৬-১৯৭৮)।
– ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে সফরকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড একাদশের হয়ে জুটি বেঁধে বোলিং করেছেন কিংবদন্তি ডেনিস লিলি ও তার ছেলে অ্যাডাম লিলি। পিতা-পুত্র দুজনেই তিনটি করে উইকেট নিয়েছেন ওই ম্যাচে। ১৯৮৮ সালে ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ডেনিস অবশ্য ম্যাচটি খেলেছিলেন শখের বসে। পুত্র অ্যাডাম ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন টুকটাক।
– ২০০৬ সালে নাইরোবিতে কেনিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে মাশরাফি বিন মোর্তজার একটি বল ব্যাটসম্যান হিতেশ মোদির পায়ে লাগে। মাশরাফি জোরালো আবেদন করলে আম্পায়ার সুবাশ মোদি আঙ্গুল তুলে আউট দেন। ব্যাটসম্যান হিতেশ ছিলেন আম্পায়ার সুবাশের ছেলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পিতা আম্পায়ার ও পুত্র খেলোয়াড় হওয়ার এটিই একমাত্র ঘটনা।

SHARE

Leave a Reply