Home স্বপ্নমুখর জীবন মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো (চতুর্থ পার্ট) -আমিনুল ইসলাম ফারুক

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো (চতুর্থ পার্ট) -আমিনুল ইসলাম ফারুক

পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ তারাই পায় যারা স্বপ্ন দেখতে জানে, দেখাতে জানে। বিজ্ঞানের এত আবিষ্কার, মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি, জ্ঞানের এত বিস্তার- এসবের সূচনা কিন্তু হয় স্বপ্নদ্রষ্টার হাত ধরেই। আপনার স্বপ্ন যদি আপনাকে ভয় না দেখায়, সামনে এগিয়ে যেতে বাধার সৃষ্টি না করে, মানুষের মধ্যে সমালোচনার জন্ম না দেয় তাহলে সেটা কোনো বড়ো স্বপ্ন নয়। সেটা নেহাতই ছোটো স্বপ্ন। অল্প আগুন যেমন নদীর অজস্র পানিকে উত্তাপ দিতে পারে না তেমনি ছোটো স্বপ্ন তার বিশাল লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো হতে পারে যদি সে যা আশা করে, তা বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারে। শুধু তার কাজের ওপরে ফোকাস ধরে রাখতে পারে। মানুষ মনে প্রাণে যা চায় তাই সে পেতে পারে যদি সে অনুযায়ী কাজ করে। জীবন মানেই কাজ, কাজ মানেই জীবন এটা ভালো করে বোঝা চাই।
দেখুন আমাদের জীবন আল্লাহর অপার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতরাজিতে পৃথিবী ভরা। মৌমাছির দিকে তাকান, শিশুর হাসির মুখে তাকান, ফুলের ঘ্রাণ নিন, বাতাসের স্পর্শ নিন, পাতার মর্মর শব্দ, নদীর কলকল ধ্বনির দিকে মনোযোগ দিন। আর জীবনকে পূর্ণভাবে উপভোগ করুন। সাথে নিজের স্বপ্ন পূরণে আমৃত্যু লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি করুন। পরিশ্রম করুন। পৃথিবীতে একটা মাত্র জিনিসই আছে যা মানুষকে ধোঁকা দেয় না, মানুষের সাথে প্রতারণা করে না, সেটা হলো পরিশ্রম। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, স্বপ্ন কারো সাথে বেঈমানি করে না। বেঈমানি করে। স্বপ্ন দেখানো মানুষগুলো।
বাস্তব কখনও কখনও কল্পনার চেয়েও অবিশ্বাস্য হয়। কেউ যদি বলে আমি পঁচিশ বছর বয়সে অর্ধ পৃথিবীর সম্রাট হবো-কথাটা গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেবেন অনেকে, কিন্তু আলেকজান্ডার তা হয়েছিলেন। জীবনকে স্বপ্ন বানিয়ে ফেললে আর স্বপ্নকে জীবন বানিয়ে ফেললে মানুষ তখন স্বপ্নের চেয়েও বড়ো হতে পারে। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম।
মানুষ যে তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো হতে পারে তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। আমাদের সমাজে যে সকল সফল মানুষ আছেন তাদের কাছে জানতে চাইলেই আপনি জানতে পারবেন। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কেয়া কসমেটিকস-এর স্বত্বাধিকারী আব্দুল খালিক পাঠান ছোটো বেলায় স্বপ্ন দেখতেন ব্যবসা করে অনেক টাকার মালিক হবেন।
তিনি বলেন, ‘তৃতীয় শ্রেণি বা চতুর্থ শ্রেণিতে স্কুলে যাওয়ার সময় বাবা টিফিন বাবদ আট আনা বা বারো আনা দিতেন, সেখান থেকে টাকা জমিয়ে কিনতাম চকোলেট ও বিস্কুট, আর রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করতাম। কিছু লাভ হতো। এভাবেই লাভের লোভে পড়ে গেলাম। বন্ধুর সাথে শুরু করলাম মুরগির ব্যবসা। স্থানীয় বাজার থেকে কিনে দূরের বাজারে বিক্রি করতাম। লাভের টাকা খরচ করতাম না ফলে মূলধন বাড়তে লাগল। মুরগি ব্যবসায়ী হওয়াটা আমার পরিবারে কেউই পছন্দ করত না। তাই মুরগি কিনে রাখতাম বন্ধুর বাসায়। একদিন সে বলে মুরগিগুলো শেয়ালে নিয়ে গেছে। মুরগির কিছু পাখনা আর মায়াকান্না দিয়ে ভুলানোর চেষ্টা করলো কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম কোন শেয়াল ওগুলো খেয়েছে। বুক ফেটে কান্না আসছিল আমার সব পুঁজি শেষ, আর বুঝি ব্যবসায়ী হতে পারলাম না। কিছুদিন পর নানাবাড়ি গেলাম। বহু কষ্টে অল্প কিছু টাকা জোগাড় করলাম নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করলাম। এবার আর কোনো অংশীদার নয়। পাইকারি কিনে রাস্তার পাশে বসে খুচরা বিক্রি করি। স্বাধীনতার যুদ্ধের অটো-প্রমোশনটা বাদ সাধলো ব্যবসায়। এক লাফে ক্লাস ফোর থেকে সিক্সে। বাবার কড়া হুকুম অনেক হয়েছে আর নয়, পান-বিড়ি বিক্রি বাদ দিয়ে মন দিয়ে লেখাপড়া কর। সুতরাং ব্যবসার অদম্য ইচ্ছাটাকে মনের খাঁচায় পুষে রেখে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলাম।
পরিণামে ১৯৭৮ সালে মেট্রিক পাস। এর মাঝে আরেক ঘটনা বিয়ে। আমার স্ত্রী তার জমানো ৬০০ টাকা হাতে তুলে দিলো। এই টাকাই আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখালো। শুরু করলাম লাকড়ির ব্যবসা। এর মাঝে স্ত্রী তার পরিবার থেকে পাওয়া গয়নাটিও আমার হাতে তুলে দিলো, বিক্রি করে পেলাম হাজার পাঁচেক টাকা। পুকুর লিজ নিয়ে রুই মাছের পোনা ছাড়লাম। কিন্তু পোনা বড়ো হতে লাগবে তিন বছর। অতদিন ধৈর্য ধরার মতো সময় বা সামর্থ্য কোনোটাই আমার ছিল না। অতএব এক বছরের মাথায় বিক্রি করে আবার শুরু করলাম লাকড়ির ব্যবসা।
এতদিনের আপ্রাণ চেষ্টায় শ্বশুর মহাশয়ের দৃষ্টি কাড়লো, মন গললো তার, বাহ ছেলেটা তো বেশ পরিশ্রমী! তিনি তার ইটভাটায় চাকরি দিলেন। কেরানির চাকরি, বেতন ৬০০ টাকা। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন কাজ করা হলো না। মাথায় তো ব্যবসা, অনেক টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্ন। চাকরি ছেড়ে কিস্তিতে প্রগতি থেকে একটা ট্রাক কিনলাম। ৪০ হাজার টাকা নগদ, বাকিটা সুদে পরিশোধ করতে হবে। ট্রাক তো হলো।
এবার চালাতে হবে। ড্রাইভার রাখলাম, তার সাথে থেকে ট্রাক চালানোটাও শিখলাম মাত্র ১৫ দিনে। এবার পথে নামার পালা। দিনে ড্রাইভার আর রাতে আমি চালাই এতে ডাবল আয়। এভাবে ছয় মাসে বেশ কিছু পুঁজি হাতে এলো। টাকা জমিয়ে রাখতাম পূবালী ব্যাংকে। একদিন ব্যাংকের অফিসার বললেন, ইটের ভাটা বানান, প্রয়োজনে ঋণ নেন। আমরা সহায়তা করবো। প্রস্তাবটা মনে ধরলো। আমি জমি কিনে ফেললাম। এবার ব্যাংক বেঁকে বসলো, আমাকে ঋণ দেবে না। আমি পড়লাম মহাবিপদে, ঋণ দেবেন না তো আগে বড়ো বড়ো কথা বলেছিলেন কেন? বিষয়টি আমার শ্বশুরের কানে গেল। কী মনে করে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুই লাখ টাকা ঋণ দিলেন পরের বছর সোনালী ব্যাংক থেকে পেলাম তিন লাখ টাকা। একে একে পাঁচ পাঁচটা ইট ভাটা হলো। আমি বিশ্বাস করতাম, স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের অধিকার শুধু তাদেরই আছে যারা তাদের স্বপ্ন পূরণে সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে।

এবার স্বপ্ন দেখলাম, নিটিং অ্যান্ড ডাইং গার্মেন্টস করবো। ব্যাংক ঋণ দেবে না। একজন কর্মকর্তা বললেন তুমি মাত্র মেট্রিক পাস। ইটের ব্যবসা করছো, তাই করো। নিটিং অ্যান্ড ডাইং ১০০ ভাগ রফতানিমুখী ব্যবসা। বিদেশী ক্রেতা আসবে তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে। এটা তোমার কর্ম নয়।
আমি বুঝাতে চাইলাম, বিদেশ থেকে ক্রেতা এসে আমার মালের কোয়ালিটি দেখবে। আমি ইংরেজি জানি কি না সেটা দেখবে না। তাদের বুঝানোর জন্য ইংরেজি জানা লোক তো থাকবেই। কিন্তু ব্যাংকারগণ সদয় হলেন না।
আমারও গেল জেদ চেপে। ভারত থেকে ১৮টি নিটিং মেশিন কিনে নিয়ে এলাম। কাজ শুরু হলো পুরোদমে। এক পর্যায়ে ব্যাংকের লোকজন বুঝলো, ইংরেজি না জেনেও এই লাইনে ব্যবসা করা যায়, সফল হওয়া যায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সবকিছু দেখে গিয়ে ঋণ বরাদ্দ করলেন এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমি বিশ্বাস করতাম, বড়ো অর্জনের জন্য শুধু কাজ করলেই হবে না, সাথে বড়ো স্বপ্নও দেখতে হয়। পরিকল্পনার সাথে দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হয়।

এখন আমার শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর ৪০ কোটি টাকার কাপড় রফতানি করছি। সেখানে প্রায় চার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সবশেষে হাত দিয়েছি কসমেটিক তৈরিতে। শুরু করেছি কেয়া নারকেল তেল, পাউডার আর সাবান দিয়ে।
শিল্পপতি আব্দুল খালেক পাঠান বলেন, “আমি মনে করি সততা ও পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এর সাথে মেধা ও স্বপ্ন যোগ হলে সফলতা আসবেই। কখনো অন্যকে ঠকিয়ে বড়ো হওয়া যায় না। আমার সেই মুরগি ব্যবসার অংশীদার বন্ধুটি কিন্তু এখনো একটি কারখানার কর্মচারীই আছে। আমি কিছুটা হলেও বড়ো হতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি।
আপনার চোখে কোনো স্বপ্ন আছে কি? বন্ধু বর্তমান যান্ত্রিক জীবন মানুষকে এতই ব্যস্ত করে তুলেছে যে আমাদের কাছে স্বপ্ন দেখার মতও সময় নেই। রাত দিন কীভাবে কেটে যায়, এক মাস পর আরেক মাস চলে আসে, কেউ কিছুই জানতেই পারে না। বন্ধু! স্বপ্নই মানুষকে জীবনযুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা প্রদান করে। স্বপ্ন না থাকলে আজ পৃথিবীতে কোনো আবিষ্কার হতো না। ঘুমের মধ্যে সবাই স্বপ্ন দেখে কিন্তু আমি খালি চোখে স্বপ্ন দেখার কথা বলছি, এ স্বপ্ন ঘুমের স্বপ্ন নয়-তা হলো আপনি কী পেতে চান, কোথায় যেতে চান, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির স্বপ্ন।
যে স্বপ্নের জন্য আপনি মরতেও রাজি এমন স্বপ্ন। যদি স্বপ্ন থাকে তবে আপনি তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবেন, নাকি তা কখনো পূরণ হবে না ভেবে নিয়েছেন। বন্ধু! নিজের স্বপ্নকে কখনও আড়ল করবেন না। স্বপ্ন না থাকলে আপনি কখনও উন্নতি করতে পারবেন না, কারণ স্বপ্নই জীবনের জ্বালানি। তাই নিজের চোখ বন্ধ করে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখে নিন। তারপর তা পূরণের প্রতিজ্ঞা করুন এবং কাজে লেগে পড়ুন। শুধু স্বপ্নটাকেই ফোকাস করুন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য দৃষ্টিপাত করুন, সমস্ত ঝুঁকি গ্রহণ করুন সাহসের সাথে। এই স্বপ্নটাকে লিখে ফেলুন এবং সেটাকে লাগিয়ে দিন বাসায় যেখানে আপনি বেশি সময় অতিবাহিত করেন সেখানে যাতে যতক্ষণ না আপনি তা পূরণ করতে পারছেন ততক্ষণ যেনও তা আপনাকে ধরে নাড়াতে পারে।
আপনি কোথায় আছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসলে আপনি কোথায় যেতে চান সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের প্রতিটি অগ্রগতির বাস্তব হওয়ার পূর্বে তা কল্পনায় গড়ে উঠেছিল- ছোটো-বড়ো আবিষ্কার, চিকিৎসার নতুন খোঁজ, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিজয়, ব্যবসায় সাফল্য সবই সত্যি হয়ে ওঠার পূর্বে তা ছিল স্বপ্ন মাত্র। মানুষ স্বপ্ন দেখতে না পারলে কিছু তৈরি করতে পারত না।
তাই বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, “জ্ঞানের চেয়েও কল্পনা (স্বপ্ন) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
লক্ষ্য অর্থাৎ (স্বপ্ন) অভীষ্ট উদ্দেশ্য। লক্ষ্য শুধুই অলীক স্বপ্ন নয়-এটা তেমন স্বপ্ন যা বাস্তবায়িত করা হয়। লক্ষ্য “যদি আমি পারতাম”এর আবছা অস্পষ্ট ধারণার চেয়ে অনেক বড়ো। লক্ষ্য অর্থাৎ “যার জন্য আমি তৎপর হয়ে কাজ করি।” লক্ষ্য স্থির না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করা সম্ভব নয়, প্রথম পদক্ষেপটি পর্যন্ত নেওয়া অসম্ভব। #

SHARE

Leave a Reply