Home গল্প ক্রান্তিকাল -ছন্দা দাশ

ক্রান্তিকাল -ছন্দা দাশ

অমল মায়ের বাধ্য ছেলে। মা যখন তাকে যা বলবে সে তা মেনে চলবার চেষ্টা করে। এই যেমন ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, পড়তে বসা, বড়োদের সম্মান করা, কারো সাথে ঝগড়া, মারামারি না করা অর্থাৎ ভালো ভালো সব গুণগুলো। সবাই বলে অমলের মতো ভালো ছেলে দ্বিতীয় আর নেই। স্কুলেও সে শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র। ফি বছর সে ক্লাসে প্রথম হয়। ২০১৯ এ ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে প্রথম হয়ে উঠেছিল। দু-তিন মাস ক্লাস করেই শুরু হয় করোনা ভাইরাসের ভয়ঙ্কর মহামারী। ঘরে বাইরে সবাই এর আক্রমণে আতঙ্কিত। কেউ ঘর থেকে বের হয় না। চোখের সমনে অমলের চেনা পৃথিবীটা যেন বদলে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম কিছুদিন স্কুলে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর যখন স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে, শুরু হয় অমলের মন খারাপের সময়। তাও কি একদিন দুদিন! মাসের পর মাস। বছরও গড়িয়ে তিন। স্কুল অমলের খুব প্রিয় জায়গা। শিক্ষক, তার সহপাঠীদের জন্য খুব মন খারাপ হয়। কী সুন্দর সময় কাটতো তার স্কুলে। শুধু কি লেখাপড়া শিখতে যায় স্কুলে? খেলাধুলা, আচার-আচরণ, সহবত শিক্ষা, সাংস্কৃতিক দিকগুলো তো এখান থেকেই চর্চা হয়। ঘরে বসে কি আর এসব হয়? তা ছাড়া দশজন মানুষের সাথে না মিশলে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃতি পায় না। ঐ যে মায়মুন যে খুব গরিব পরিবারের ছেলে। কিন্তু মুখে মুখে অঙ্কের কঠিন সমাধান সহজেই করে ফেলে তা তো ওর কাছ থেকেই শিখেছে অমল। যদি মায়মুনের সাথে পরিচয় না হতো অমল কি তা শিখতে পারতো। এমন আরও কত! শিখা ভীষণ পড়ুয়া। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও সে কতো বই যে পড়ে। অমল ওর কাছ থেকে জেনেছে ভালো ভালো বইয়ের খবর। এখন আর এসব কিছু হয় না। সারাদিন রাত ঘরের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ো। আনন্দ না থাকলে কি কিছু শিখতে পারে?
এই ভাইরাস এসে মানুষের জীবন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। এখন অমলরা যেমন কারো বাড়িতে যায় না তেমনি ওদের বাড়িতেও কেউ আসে না। এমনকি পাশের বাসার লোকজনও না। অমলের আর কোনো ভাইবোনও নেই যে তার সাথে খেলবে বা কথা বলে সময় কাটাবে। মাঝে মাঝে তার পাগল পাগল লাগে।
মা তাকে কোথাও বের হতে দেয় না। ওদের বাজার এখন সব অনলাইনে আসে। তার বাবা অফিসে যায় সপ্তাহে তিন/চার দিন। মুখে মাস্ক, পিপি পরে। বাইরে থেকে এসেই সোজা বাথরুমে। গরম পানিতে ভালো করে স্নান করে তারপর ঘরে ঢুকে। কতবার যে হাত ধোবেন তার ঠিক ঠিকানা নেই।
কিছুদিন পরেই অনলাইনে ওদের ক্লাস শুরু হলে অমল খুব খুশি হয়ে লেখাপড়ায় মন দিলো। কিন্তু এ কেমন যেন আনন্দহীন, নীরস। স্যার গরগর করে কোনো টপিক নিয়ে যন্ত্রের মতো বলে যান। তাই শুধু শুনে থাকা। কোনো প্রশ্ন নেই, এর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা নেই। পরীক্ষাও নেয় তেমনি। প্রশ্ন দিয়ে দিলে তাই দেখে উত্তর লিখে ছবি তুলে সেন্ড করে দেওয়া। এ যেন লেখাপড়া লেখাপড়া খেলা। কতজন যে দেখে দেখে উত্তর লিখে পাঠায়। কেউ আবার পাঠায়ও না। শিক্ষকেরও কোনো দায় নেই। কিন্তু ক্লাসে তো সে উপায় ছিল না। তবুও মন্দের ভালো।
একটা সময় অমলরা স্মার্টফোন ব্যবহার করবে সে ছিল অভাবনীয় ব্যাপার। বাচ্চার হাতে মোবাইল! যেন হাতে বিষ তুলে দেওয়া!
কিন্তু অনলাইনে ক্লাস করতে হলে তো মোবাইল লাগবেই। অমলের হাতে মোবাইল তুলে দেবার সময় মা বলে দিয়েছে। বাবা দেখ এখনও মোবাইল ব্যবহার করার বয়স তোমার হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়েছে মোবাইল দিতেই হচ্ছে। এর ভালো, খারাপ দুটো দিকই রয়েছে। আমরা সবসময় তোমার দিকে নজর দিতে পারবো না। অনেকেই ভিডিও গেমস, খারাপ ছবি দেখে নিজেদের সর্বনাশ করছে। তুমি তোমার ভালোটা বেছে নেবে আশা করি। অমল মনে মনে বলে আমি কখনও তা করবো না। কিন্তু এভাবে লেখাপড়া করতে তার একটুও মন চায় না। তাই ইদানীং সে খুব মনমরা হয়ে থাকে। তার মা তা লক্ষ করে তার সাথে অনেক গল্প করে। অমল বোঝে সব। সেতো ইচ্ছে করে মন খারাপ করে না। এদিক বছরও শেষ হয়ে আসে। পরীক্ষা ছাড়াই ওদের প্রমোশন দিয়ে দেয়। অমলের এতে আরও মন খারাপ হয়। এসব কী হচ্ছে। ক্লাস নেই, পড়া নেই, পরীক্ষা নেই। এমনি এমনি পাস করে যাচ্ছে সবাই।
যার যেমন রোল নম্বর একই আছে। অমল এভাবে প্রথম হতে চায় না। এতে তার মন আরও খারাপ হয়। শেষ পর্যন্ত এমন হয় ডাক্তার দেখাতে হয় তাকে। ডাক্তার তাকে ওষুধ খেতে দেয় এক মাসের জন্য। মা খুব চিন্তিত তাকে নিয়ে।
ওদিকে ছোটো মাসির ছেলে অর্ণব। কতো হাসি খুশি ছিল। এখন ঘরে থাকতে থাকতে নাকি কেমন মারমুখী আচরণ করছে।
তার মা তো এখন ঘর থেকে বের হতে পারে না। আত্মীয় স্বজনের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে, খবর নেয় সবার।
সবার কথা শুনে অমল বোঝে কেউ যেন ভালো নেই। পুরো পৃথিবী অসুস্থ। কত মানুষের চাকরি নেই। তারা ঘর ভাড়া দিতে পারছে না, খেতে পারছে না। এখন মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দরকার। অথচ রোগটা বড্ড ছোঁয়াচে। কেউ কারো বিপদে, অসুস্থতায়, মৃত্যুতে ছুটে যায় না। এ কেমন জীবন? কেমন সময়?
সেদিন মা তার বাবাকে বলতে শুনেছে সোহেলের মা নাকি মায়ের কাছে বলেছে, কী মহা কষ্টে আছি ছেলেকে নিয়ে। অনলাইন ক্লাসের নামে ছেলে দরজা বন্ধ করে কী সব আজেবাজে ছবি দেখে যা ছোটোদের দেখা আদৌ উচিত না। এদিকে কোচিংয়ের নামে একগাদা টাকা খরচ করেও লেখাপড়ার কোনো উন্নতি নেই। এ নিয়ে ছেলেকে বকেছিল বলে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে সোহেল। সোহেলের মা না পারছে মোবাইল নিয়ে নিতে না পারছে মেনে নিতে। এসব দেখে শুনে অমলের মনে একটুও শান্তি নেই। তার মনে পড়ে ক্লাসে তার স্যারদের কথা। বিশেষত বাংলা স্যার সবসময় পাঠ্য বইয়ের বাইরেও কত বিষয় নিয়ে আলাপ করতেন। স্যার বলতেন তোরাই জাতির ভবিষ্যৎ। সবসময় এমন কাজ করবি যাতে দেশকে, জাতিকে উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারিস। তোদের মুখের দিকে পুরো পৃথিবী তাকিয়ে আছে। মনে রাখবি তোদের একটা ভুলের জন্য পুরো পরিবার তথা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সে মন খারাপ হলেও তার থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা চালিয়ে যায়। মাঝে মাঝে তার বাবার সাথে এ নিয়ে আলাপ করে। বাবা তাকে খুব সুন্দর করে বন্ধুর মতো বুঝিয়ে দেয়। বাবা বলে সব কাজে বাধা আসবেই। সহজে কিছুই পাওয়া যায় না। আর পেলেও তার আনন্দ কষ্টে পাওয়া কিছুর মতো হয় না। রাত আছে বলেই তো দিনের উজ্জ্বলতা, দুঃখ আছে বলেই সুখের কদর। অমল বাবার কথাগুলো মন দিয়ে শোনে, ভাবে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে কিছুতেই সে ভেঙে পড়বে না। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে আবার সুস্থ, সুন্দর দিন ফিরিয়ে আনবেই। অনাগত শিশুদের জন্য এটাই তার অঙ্গীকার।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। অমলের জীবনেও এই সত্যটা মিলে গেল। সেদিন অফিস থেকে ফিরে ওর বাবা বললো আমার জ্বর এসেছে। আমি আলাদা রুমে আইসোলেশনে থাকবো চৌদ্দ দিন। মায়ের কপালের রেখা গাঢ় হচ্ছে। অমল যেন আর শিশু রইলো না। এক মুহূর্তে সে নিজেকে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি করে নিয়েছে। মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো মায়ের ডান হাত হয়ে। মাকে সে যতদূর সম্ভব সাহায্য করতে একটুও ভয় পেল না। কাজ করতে গিয়ে সে দেখলো ছোটো হলেই যে পারে না এটা ভুল। ইচ্ছে আর বিশ্বাস থাকলে ছোটোরাও বড়োদের কাজ করতে পারে। মায়ের সাথে সাথে থেকে কিছু কিছু রান্নাও এখন করতে পারে। এতে মায়ের অনেক সুবিধা হলো। বাবাকে পরিচর্যা করা, সংসারের অন্য কাজগুলো সহজ হয়ে গেল। এখন তো কাজের বুয়াও নেই। সব কাজ নিজেদেরই করতে হয়। অমল ভাবে- এক করোনা মানুষকে কত পরিবর্তন করে দিলো।
ধীরে ধীরে ওর বাবা সুস্থ হয়ে উঠেছে। অমল আবার তার লেখাপড়ায় মন দিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। স্কুলের অভাবটা তাকে বিদ্ধ করছে। করোনার প্রভাব কমে এলে সে একদিন স্কুলে যায়। গিয়ে তার কান্না পায়। ছাত্র, শিক্ষকহীন স্কুলটা কেমন পোড়া বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাগানে মালী নেই, সমস্ত স্কুল প্রাঙ্গণ বুনো ঘাস আর আগাছায় ভর্তি। অমল একা একা কিছুক্ষণ ঘুরলো। স্কুল যেন ওকে পেয়ে খুশি হয়েছে। তারপর একসময় বাড়ি ফিরতে গিয়ে বড়ো ক্লাসের ওসমান ভাইয়ের সাথে দেখা। ওসমান ভাই এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। অমলকে দেখে বললো কোথায় এসেছিলে? অমল স্কুলের কথা বলতেই ম্লান হাসলো। বললো তোমরা তবুও ছোটো ক্লাসে আছো। আমাদের অবস্থা দেখো। পরীক্ষার তারিখ দিয়েছে। তিনটে বিষয়ের পরীক্ষা হবে। সত্যিই কি এভাবে মেধার মূল্যায়ন হয়? আমি নিজেই চাই না। বইয়ের সাথে সম্পর্ক নেই। অনলাইন ক্লাসের নামে সব প্রহসন হচ্ছে। কী পরিমাণ কিশোর মোবাইল এডিক্টেড তার পরিমাণ জানলে শিহরিত হতে হয়। এ যেন মাদক সেবনের চাইতেও ভয়ঙ্কর। এদের ভবিষ্যৎ কী?
এরা কি আর স্বাভাবিক পথে ফিরবে? ফজলুকে তো চেনো।
তাকে ত্রিশ হাজার টাকা দামের মোবাইল সেট কিনে দেয়নি বলে আত্মহত্যা করেছে। কেন এমন হলো আমাদের? তাহলে কি প্রকৃত শিক্ষায় আমরা শিক্ষিত হতে পারিনি?
অমলের চোখে পানি চলে আসে। সে বলে- না ওসমান ভাই আমরা কখনও বিপথগামী হবো না। শিক্ষার মশাল আমরা জ্বালিয়ে রাখবোই। ওসমান সব ভুলে অমলকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছে।

SHARE

Leave a Reply