Home ঈদ প্রবন্ধ রাতের ফুল -জুবায়ের হুসাইন

রাতের ফুল -জুবায়ের হুসাইন

এক.
নাহ্! কিছুতেই মনটা ভালো হচ্ছে না। এমন তো কখনো হয় না!
খুবই অস্থির অস্থির লাগছে মহিদুলের। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাঁদতেও পারছে না। কেন এমন হলো? এমন লাগছে কেন?
মহিদুল অনেক চেষ্টা করেও মন খারপের কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি। পুকুরপাড়ে বসে আছে, তাও তো অনেক সময় হয়ে গেছে। মনটা কেমন ছটফট ছটফট করছে। চিত হয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল ও। ভাবতে লাগল অনেক কিছু। কিন্তু বেশিক্ষণ ওভাবে থাকতে পারল না। ‘ধুস্’ করে আবার উঠে বসল।
মাঝে মাঝেই এমন হয় মহিদুলের। মনমরা হয়ে বসে থাকে পুকুর ধারটায়। এক সময় এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম। আজ কিছুতেই মন ভালো করতে পারছে না।
মহিদুল পঞ্চম শ্রেনি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। ছাত্র হিসেবে মোটামুটি ছিল। কিন্তু সংসারের অভাব-অনটন ওকে আর পড়ার সুযোগ দেয়নি। অবশ্য সিক্সে ভর্তিও হয়েছিল। মাসখানেক ক্লাস করার পর আর স্কুলমুখো হতে পারেনি।
আব্বার সাথে কাজে যেত মহিদুল। মহিদুলের আব্বা মতলেব ঘরের চালে ছনের ছাউনি দেওয়ার কাজ করতেন। অবশ্য এর আগে ছোটোখাটো একটা ব্যবসা করতেন তিনি। জায়গা-জমিও ছিল বেশ খানিকটা। বছরের চালটা ওখান থেকেই আসত। কিন্তু হঠাৎ একটা কারণে সব শেষ হয়ে যায়। সাগরপাড়ের সিডরের মতো নির্মম এক আঘাতে তার সোনার সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। আজ তিনি বড়োই অসহায়। ভিটে বাড়িটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। কাজেই মহিদুলকে নিয়ে অন্যের ঘরের ছাউনি দেওয়ার কাজ শুরু করেন তিনি। অধিকাংশ গ্রামেই আজকাল পাকা বাড়ি উঠা শুরু করেছে। তার থেকে দূরে নেই বাবলাতলা গ্রামটিও। কাজেই মতলেবের কাজও কমতে থাকে। মহিদুল আব্বার নিষেধ সত্ত্বেও রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজে যোগ দেয়।
মতলেব এখন আর কাজ করতে পারেন না। হাতে বল পান না। বাম পা-টাও কেমন অসাড় হয়ে আসে। আর সপ্তাহখানেক ধরে তো তিনি পুরোপুরি বিছানায়।
তখন পড়ন্ত বিকেল। মহিদুল হাতের নখ দিয়ে দুবলো (দূর্বা) ঘাসের একটা কচি ডগা ছিঁড়ে নখ দিয়েই টুকরো টুকরো করে কাটতে থাকে। গলা শুকিয়ে গেছে। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। তারপরও ইচ্ছে করছে না এখান থেকে উঠে গিয়ে পানি খেয়ে আসতে। ভারী আলসেমিতেও পেয়ে বসেছে ওকে।
পুকুরের ওপারে একটা ডুমুর গাছ। বেশ খানিকটা ঝুলে এসেছে পানির দিকে। হঠাৎ সেদিকে চোখ গেল মহিদুলের। কী যেন নড়ে উঠল পানির সামান্য উঁচুতে অবস্থিত ডালটায়। দৃষ্টি তীক্ষè করে ফেলল ও। ওখান থেকে ঝপ করে কী একটা পড়ল পানিতে। পানির উপরিভাগে একটা ঘূর্ণি সৃষ্টি করে আবার উঠে গেল।
মাছরাঙা! অসামান্য দক্ষতায় মাছ শিকার করল।
অন্য সময় হলে মনে খুবই আনন্দ পেত মহিদুল। কিন্তু আজকের মনটা বুঝি কেবল মন খারাপের জন্যই। তাই খুশি হতে পারল না। আবার একটা দুবলো ঘাস ছিঁড়ে নখ দিয়ে সেটা কুটকুট করে কাটতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
পুকুরপাড়ের এ জায়গাটা বেশ নীরব। এদিকে বিনা প্রয়োজনে সাধারণত কেউ আসে না। তাই বলে জায়গাটা একেবারে পরিত্যক্ত নয়। গ্রামের অনেকেরই ছাগল ও গরু বাঁধা আছে খুঁটোতে- ঘাস খাওয়ানোর জন্য। তাছাড়া খানিকটা পেছন দিয়ে পায়ে চলা একটা রাস্তাও আছে। এপাড়া ওপাড়া যাতায়াত মূলত ওই রাস্তাটা দিয়েই হয়। ওই রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে দু-একজন হেঁটে যাচ্ছে। তবে মহিদুলের সেদিকে খেয়াল নেই।
একটা ঢিল উঠিয়ে নিলো মহিদুল। ছুড়ে দিল পুকুরের মাঝখানে। লাফ দিয়ে কিছুটা পানি ওপরে উঠল। তারপর গোল একটা রিং তৈরি হলো। ক্রমে বড়ো হতে লাগল সেটা। এরপর পুকুরের চারপাড়ে বাধা পেয়ে ভেঙে গেল টেউয়ের রিংটা।
মহিদুলের হৃদয়টাও তেমনি গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। ওখানে একের পর এক ঢেউ উঠছে আর তীরে আছড়ে পড়ছে। ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে পুরো অন্তরটা।
চাপা একটা দম ছাড়ল মহিদুল। আর তখনি চমকে উঠল। কীসে যেন ওর চোখ দুটো চেপে ধরেছে।

দুই.
ভীষণ ভড়কে গেল মহিদুল। কিন্তু উত্তেজিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রাখল। নিজের দু’হাত উঠিয়ে চোখ চেপে ধরা বস্তুতে রাখল।
অপর দুটো হাত। আলগা হয়ে গেল।
বসা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল মহিদুল। এবং প্রবলভাবে চমকালো দ্বিতীয়বার। তবে চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠল। ঝট করে উঠে দাঁড়াল। খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সমস্ত চেহারা।
‘কাওসার!’ বলে আনন্দ প্রকাশ করল। বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়েও থমকে গেল।
কাওসারের মুখেও হাসি। তবে মহিদুল ওভাবে থেমে গেল দেখে কিছুটা দমে গেল। বলল, ‘কী রে, থেমে গেলি কেন? আয়, আমার বুকে আয়।’
তারপরও দ্বিধা করতে লাগল মহিদুল।
কাওসার তাড়া দিলো। বলল, ‘এ্যাই মহিদ, আমাকে তুই পর ভাবছিস?’ বলেই মহিদুলকে টেনে নিলো নিজের বুকে। দু’বন্ধুতে তখন মিলনমেলা চলল।
এক সময় পৃথক হলো ওরা। পাশাপাশি বসল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
মহিদুলের মনটা ভালো হয়ে গেছে। আর বিন্দুমাত্রও দুঃখ নেই সেখানে।
‘কেমন আছিস তুই?’ নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল কাওসার।
মহিদুল বলল, ‘এই একটু আগ পর্যন্তও ভালো ছিলাম না। খুবই কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু এখন ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ আমি। … হ্যাঁরে কাওসার, কখন এলি তুই?’
‘এসেই তোদের বাড়ি গেলাম। তোকে পেলাম না। চাচাজান বললেন তুই মন খারাপ করে কোথায় যেন গেছিস। আমার কি আর বুঝতে বাকি আছে যে তুই এই সময় কোথায় থাকবি, বিশেষ করে তোর যখন মন খারাপ!’
আবারও নীরবতা। এবারও নীরবতা ভাঙল কাওসার। জিজ্ঞেস করল, ‘তোর মন খারাপ ছিল কেনরে মহিদ?’
হেসে দিল মহিদুল। বলল, ‘কই, আমার মন তো খারাপ নেই।’
‘এখন নেই। কিন্তু আমি বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ আড়ালে থেকে লক্ষ করেছি তুই ভালো নেই। কী হয়েছে তোর?’
‘আরে বাদ দে ওসব।’ মহিদুল বলল।
‘না মহিদ, তোকে বলতেই হবে।’ কাওসার নাছোড়বান্দা। ‘হঠাৎ কী হয়েছে তোর?’
একটা দীর্ষশ্বাস ছাড়ল মহিদুল। কাওসারকে ওর চেয়ে ভালো করে আর কে চেনে? একবার যখন জানতে চেয়েছে তখন না জেনে আর থামবে না। কিন্তু কী জবাব দেবে ও? একটু আগেও যে মনটা ভীষণ খারাপ ছিল, নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছিল এটা ঠিক। কিন্তু কেন তা তো ও নিজেই জানে না।
মহিদুল জবাব দিতে দেরি করছে দেখে কাওসার আবার বলল, ‘এ্যাই মহিদ, কি রে? কথা বলছিস না কেন?’
‘আসলে,’ মুখ খুলল মহিদুল। ‘খুবই খারাপ লাগছিল আমার। কিন্তু কেন তা আমি নিজেই জানি না।’
‘সত্যি বলছিস?’ কাওসারের কণ্ঠে তবুও সন্দেহ।
‘তোকে যে মিথ্যা বলব সে সাহস কি আমার আছে?’
কাওসার তবুও আশ্বস্ত হতে পারে না। বলল, ‘কিন্তু…’
‘আরে এই কাওসার, দোস্ত, এখন তো আর আমার মন খারাপ নেই। দেখছিস না আমি আগের সব ভুলে গেছি। … এই, তাকা আমার চোখের দিকে।’
কাওসার ভয় পায় মহিদুলের চোখে চোখ রাখতে। ওর চোখের ওই করুণ চাহনি ও সহ্য করতে পারে না। আহ্! ওর প্রাণের দোস্ত না জানি এখন কত কষ্টের মধ্যে আছে!
‘কিরে, কী ভাবছিস তুই?’ মহিদুলের প্রশ্ন।
‘না কিছু না।’ জবাব দিলো কাওসার। ‘চল্ বাসায় যাই।’
ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল মহিদুল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘হ্যাঁ চল।’
উঠল কাওসারও।
তারপর ওরা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলল।
তখন সন্ধ্যার আঁধার নামতে শুরু করেছে।

তিন.
প্রকৃতি এখন আর আগের মতো আচরণ করে না। কেমন জানি বদলে গেছে। এই যেমন ভরা আষাঢ় বা শ্রাবণ মাসেও বৃষ্টির দেখা নেই। আবার কার্তিক বা অগ্রহায়ণ মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত। অনেকে তাই বলেন, মানুষ যদি পালটে যেতে পারে তবে প্রকৃতির বদলে যেতে দোষ কোথায়? আসলেই তাই। ভীষণরকম বদলে গেছে মানুষ; মানুষের জীবনধারা।
কিন্তু কেন? কেন মানুষের এই পরিবর্তন! এর অনেকগুলি কারণ হতে পারে। কাওসারের ওসব কারণ অনুসন্ধান করতে একদম ভাল্লাগে না। ও ওর মতোই থাকতে চায়। বদলে যাক মানুষ; হারিয়ে যাক তার ভেতরের মনুষ্যত্ব। কাওসার ওর নিজের মনুষ্যত্বকে জলাঞ্জলি দিতে মোটেই রাজি নয়। তাইতো এখনও দিব্যি সহজ-সরল আছে ও।
তখন রাতের প্রথম প্রহর। মহিদুলকে নিয়ে খেতে বসেছে কাওসার। ওর আম্মা ভাত-তরকারি এগিয়ে দিচ্ছেন। ছোটো বোন সাবিনা পাশের ঘরে পড়ছে।
খেতে খেতেই গল্প চলল দু’বন্ধুতে।
‘কতদিন থাকবি তুই?’ প্রশ্ন করল মহিদুল।
‘যতদিন করোনায় স্কুল বন্ধ থাকবে, ততদিন। তবে প্রয়োজন পড়লে বেশিদিনও থাকতে পারি।’ জবাব দিল কাওসার।
‘ও।’ বলল মহিদুল। ‘… থাক থাক চাচী, আর দেবেন না। অত খেতে পারব না।’
‘খেতে পারবি না মানে?’ বলল কাওসার। ‘মা, মাছের ওই মাথাটা দাও তো ওকে। বলে কি, অত খেতে পারব না! হুহ!’
‘নারে কাওসার, আমি আর আগের মতো খেতে পারিনে।’ কেমন হতাশামিশ্রিত মহিদুলের কণ্ঠ।
কয়েক মিনিট নীরবে খাওয়া চলল। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা তোর পরীক্ষা কেমন হলোরে?’
কাওসার বলল, ‘তুমি তো জানো মা আমার পরীক্ষা কখনও খারাপ হয় না। তারপরও তুমি যখন জিজ্ঞেস করছ তখন বলছি- পরীক্ষা আমার ভালোই হয়েছে।’
‘তা কবে যাবি বলে ঠিক করলি?’
‘এখনও ঠিক করিনি। মহিদদের নিয়ে কিছু কাজ আছে। ওগুলো আগে সারি তো। তারপর দেখা যাবে।’
মুখ তুলে তাকাল মহিদুল। জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের নিয়ে আবার তোর কী কাজ?’
‘উহু,’ জবাব কাওসারের। ‘এখন বলব না। সময় হলেই সব জানতে পারবি। মা, আর এক চামচ ভাত দাও।’
বেগুন দিয়ে রুই মাছ রান্না করেছেন আম্মা। এটা কাওসারের প্রিয় তরকারি। অবশ্য অনেকেই এই বেগুন খেতে চায় না। বলে এলার্জিতে ধরবে। কাওসারের ওসব এলার্জি-টেলার্জি নেই। ও বেশ সুস্থই আছে।
‘পাঠাগার কেমন চলছে?’ আবার শুরু করল কাওসার।
কিছুক্ষণ এ কথার কোনো জবাব দিল না মহিদুল।
কাওসার আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, কিছু বলছিস না কেন? আমাদের পাঠাগারটা কেমন চলছে?’
মহিদুল এবার একটু ঘুরিয়ে জবাব দিল, ‘কেন, আনিস কিছু জানায়নি তোকে?’
‘আমি তোর কাছ থেকে জানতে চাইছি।’
‘তার আগে বল আনিস তোকে ঠিক কী কী জানিয়েছে।’
‘তেমন কিছু জানায়নি। শুধু বলেছে আলমরা বেশ সমস্যা করছে। কিন্তু কী সমস্যা করছে তা কিছুই বলেনি।’
‘তোর এবারে আসাটা কি এ কারণেই?’
‘অনেকটা তাই। এখন আমি যা জানতে চাইছি তার জবাব দে।’
ইতোমধ্যে খাওয়া শেষ হয়ে গেছে মহিদুলের। ‘বলছি।’ হাত ধুতে ধুতে বলল ও। ‘চল অন্য কোথাও নিরিবিলি বসি।’
কাওসারেরও খাওয়া শেষ। হাত ধুয়ে নিল।
তারপর দু’বন্ধু বসল গিয়ে রুমের ভেতরে।
‘নে,’ বলল কাওসার। ‘এবার শুরু কর।’
‘আসলে কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনে।’ বলল মহিদুল।
‘আচ্ছা আমিই তোকে সাহায্য করছি। আলমরা কী বলেছে তোদের?’ একটু নড়েচড়ে বসে বলল কাওসার।
‘আমি তো সময় বেশি দিতে পারিনে। নিজের পেটের ধান্দায় ব্যস্ত থাকতে হয়। মূলত আনিসরাই এখন সব দেখে। আর আমি মাঝে মাঝে দু’একটা বই ওখান থেকে নিয়ে পড়ি। এই যা।’
‘কেন, সাপ্তাহিক প্রোগ্রামে থাকিস না?’
আমতা আমতা করল মহিদুল, ‘না মানে সবগুলোতে থাকা হয় না। আসলে…’
‘থাকিস না নাকি তোকে থাকতে বলে না? সত্যি করে বল মহিদ।’ কাওসারের কণ্ঠে দৃঢ়তা।
‘আসলে হয়েছে কি…’
‘দেখ, আমি যে কোনো ভণিতা পছন্দ করিনে এটা তুই ভালোই জানিস।’
‘শোন্ কাওসার, ইদানীং আলমরা বেশ ডিস্টার্ব করছে। ওরা বলে পাঠাগারের কমিটিতে ওদেরকে রাখতে হবে। নইলে পাঠাগার ভেঙে দেবে বলেও হুমকি দিয়েছে।’
‘তোরা জবাবে কী বললি? চুপচাপ মেনে নিলি?’
‘আসলে পরিবেশটা এখন এমন হয়ে গেছে যে ওদেরকে বেশি না ঘাঁটানোই ভালো। কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই কি না!’
‘তার মানে তোরা ওদেরকে ভয় পাচ্ছিস?’
‘ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছেরে। ওরাই তো এখন সব! একটু তো ক্ষমতা দেখাবেই।’
‘হু।’ একটু যেন ভাবল কাওসার। ‘আশরাফ হুজুর কী বলেন?’
‘উনি আর কী বলবেন? বেশ চাপের মধ্যেই আছেন আশরাফ হুজুর।’
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। অবশেষে নীরবতা ভেঙে মহিদুলই বলল, ‘আশরাফ হুজুরকে সভাপতি থেকে সরিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলে হয় না?’
কাওসার বলল, ‘তাতে কি সমস্যা মিটে যাবে ভাবছিস? না, বরং আরও বাড়বে। আশরাফ হুজুর সম্মানিত ব্যক্তি। তাকেই আমাদের সভাপতি রাখতে হবে। আমি তো মনে করি উনি সভাপতি আছেন দেখেই আলমরা বেশি কিছু একটা করতে পারছে না। কেবল হুমকি-ধামকিই দিয়ে যাচ্ছে।’
‘যা করার তুই-ই কর। আমি কিছু পারব না।’ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল মহিদুল।
কাওসার বলল, ‘এটা তুই কেমন কথা বললি? কারোর হুমকির কারণে আমরা আমাদের মিশন থেকে সরে আসব, এমন তো কথা ছিল না!’
‘কিন্তু কাওসার, সময় যে পালটেছে। কী করবি তুই এখন?’ বলে ফ্যালফ্যাল করে কাওসারের দিকে তাকিয়ে রইল মহিদুল।
কাওসারও বুঝতে পারে না কী করবে। বেশ চিন্তিত দেখাল ওকে। শেষে বলল, ‘কিছু একটা করতেই হবে।’
কথা বলতে বলতে রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল।
মহিদুল বাড়ি যাওয়ার তাড়া অনুভব করল। আব্বা একা রয়েছেন বাড়িতে। রান্না করে রেখে এসেছিল মহিদুল। কিন্তু তিনি খেয়ে নিয়েছেন কি-না কে জানে। তাই বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল ও।

চার.
পথে যেতে একটা বিষয় নজরে পড়ল মহিদুলের। এবং বেশ অবাক হয়ে গেল। ও ভাবতেই পারেনি এমন একটা কিছু ঘটতে পারে।
কাওসারদের বাড়ি হতে মহিদুলদের বাসায় যেতে ওদের পাঠাগারটা পড়ে। বাঁশের চাঁচের বেড়া দিয়ে ঘেরা পাঠাগারটি। ওপরে টিনের ছাউনি। দরোজাও টিনের।
পাঠাগারের পাশ দিয়ে যেতেই ভেতর থেকে কারোর গলার আওয়াজ পেল মহিদুল। এত রাতে পাঠাগারে কারোর থাকার কথা নয়। তাই বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল ও। থমকে দাঁড়াল। দেখতে হয় বিষয়টা কী!
সাবধানে বাঁশের বেড়ায় কান পাতল মহিদুল।
ভেতরে একটা হারিকেন জ্বলছে। দু’জনের অস্পষ্ট চেহারা দেখা যাচ্ছে তাতে। কথা শুনে বুঝতে পারল একজন ওদের পাঠাগারের অর্থ সম্পাদক বোরহান। অন্যজন কে তা চিনতে পারল না। কথা শুনেও বুঝতে পারল না।
‘…তাহলে তোমাদের পাঠাগারের বেশির ভাগ অর্থই আসে তোলা চাল থেকে!’ বলল অন্যজন।
‘হ্যাঁ,’ বলল বোরহান। ‘তবে পাঠাগারের সদস্যরা নিয়মিত চাঁদাও দিয়ে থাকে।’
‘তুমি বলছ তোমাদের পাঠাগারের ফান্ডে এই মুহূর্তে…’
আর শুনতে পেল না মহিদুল। পাশেই একটা কুকুর ডেকে উঠল শব্দ করে, তাতে ঢাকা পড়ে গেল ভেতরের কণ্ঠ। তবে যা শুনল তাতেই অবাক হয়ে গেল মহিদুল। ওদের ভেতরের সব খবর বলে দিচ্ছে বোরহান। সর্বনাশ! এখন কী করবে ও? আর ওই দ্বিতীয় কণ্ঠটাই বা কার?
কিছুটা অসতর্ক হয়ে গিয়েছিল মহিদুল। সম্বিত ফিরল দরোজা খোলার শব্দে। দ্রুত মোটা একটা গাছের আড়ালে নিজেকে নিয়ে গেল ও।
হারিকেনটা নিভিয়ে দিয়েছে। তাই ওরা যখন বেরিয়ে গেল, তাদের কাউকেই চিনতে পারল না।
এরপর তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল মহিদুল। আব্বা হয়ত এখনও না খেয়ে আছেন। তাকে খাওয়াতে হবে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিমের দাঁতনটা নিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে চলল মহিদুল। কাল রাতের ব্যাপারটা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছে না। বোরহানের সাথে কে ছিল দ্বিতীয় মানুষটা? কেন ঢুকেছিল অত রাতে পাঠাগারে?
আরও কিসব ওর মাথার মধ্যে গিজগিজ করতে লাগল। মনটা কেমন তেঁতো হয়ে উঠল। থেকে থেকে ওর নিজেকে বেশ অসহায় মনে হয়। মনে হয় এই বিশাল পৃথিবীতে ও বড়োই একা। কেউ নেই ওর। বিশাল নীল আকাশের মাঝে একখণ্ড ছিটকে পড়া মেঘের মতো মনে হয়। অনবরত ভেসে চলেছে ও। কোথায় থামবে তা জানে না। কিংবা আদৌ থামবে কি-না তাও বলতে পারে না। শুধু জানে এভাবেই চলতে হবে। আর একসময় থমকে যাবে ওর চলা। নিভে যাবে জীবনপ্রদীপ। তখন পাড়ি জমাবে অন্য জায়গায়। যে জায়গা থেকে কেউ কখনও ফিরে আসে না। যেমন ফিরে আসেনি ওর মা।
হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়তে কেমন যেন হয়ে গেল ও। হৃদয়ের কোন্ গহিন কোণ্টায় চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করল। মায়ের মুখটা ভেসে উঠছে মনের পর্দায়।
মহিদুলের মা ছিল সেরা মা, অন্তত ওর তাই মনে হয়। মোটামুটি সুখের সংসার ছিল ওদের। বড়ো দুটো বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ওরা এখন শহরে থাকে। আয়েশা, ওর বড়ো বোন, ওকে শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ও যেতে রাজি হয়নি। ও শহরে চলে গেলে আব্বাকে কে দেখবে? তাই থেকে গেছে। আর মেজো বোন আমেনা স্বামী-সন্তান নিয়ে ময়মনসিংহ থাকে। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে ঠিকই। তবে তা কয়েক ঘণ্টার জন্য। দুলাভাই ব্যস্ত মানুষ। অত সময় কোথায় তার? অবশ্য মাঝে মাঝে কিছু টাকা-পয়সা পাঠায়। কিন্তু মহিদুল তার কিছুই নেয় না। ওই টাকা মূলত আব্বার চিকিৎসাতেই ব্যয় হয়ে যায়। আর বড়ো বোন আয়েশা কিছু পাঠাতে পারে না ঠিকই কিন্তু মাঝে মাঝে বাজার করে পাঠায়। এ কারণেই মহিদুলের সংসারটা এখনও টিকে আছে। কিছুটা স্বস্তিতেই থাকে ও।
দাঁত মাজতে মাজতে এইসব ভাবছিল মহিদুল। সুখের সংসার ছিল ওদের। কিন্তু তা বেশি দিন স্থায়ী হলো না। কঠিন অসুখে ধরল মায়ের। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখানো হলো। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয় না। আব্বা দিনরাত খেটেখুটে যা আয় করেছেন তা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়েছেন। মহিদুল তখন ছোটো। চতুর্থ শ্রেনিতে পড়ে। একদিন আব্বা ডেকে বললেন, ‘কাল থেকে তোকে আর স্কুলে যেতে হবে না। আমার সাথে কাজে যাবি।’
ব্যস, পড়ালেখার আশা শেষ করতে হয় ওকে। সকাল হলেই আব্বার সাথে কাজে যেতে হয়।
ততদিনে আব্বার দোকানটা বিক্রি করে দিয়েছেন। আরও কিছুদিন পর শুরু হলো মাঠের জমি বিক্রি। বড়ো দুই বোনও তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। একদিন সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আম্মা চলে গেলেন। আর কখনও ফিরে আসেননি। মহিদুলকে আর কখনও ‘বাবা মহিদ!’ বলে ডাকেননি। রোজ সকালে পান্তা ভাত বেড়ে ছেলেকে ডেকে বলেননি, ‘বাবা মহিদ, জলদি ওঠ। স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ তারপর ওর বই-খাতা গুছিয়ে দেননি। আবার স্কুল থেকে ফিরলে ভাত খাওয়ার জন্য সাধেননি। কিংবা রাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুম থেকে তুলে মুখে ভাত তুলে খাওয়াননি।
মা চলে যাওয়ার পর থেকে বড়োই একা হয়ে যায় মহিদুল। বলা যায় তখন থেকেই ও কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়। প্রথম প্রথম ভাবত মা আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু একসময় ও বুঝতে পারে মা আর ফিরে আসবেন না। শুধু ওর মা কেন, কারোর মা-ই ওখান থেকে আর ফিরে আসেন না যেখানে চলে যান তারা। ফলে প্রায়ই ওকে নিঃসঙ্গতা পেয়ে বসে। মন খারাপ হয়। যখনই মন খারাপ হয় তখনই গ্রামের পশ্চিম প্রান্তের ওই পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে। একসময় এমনিতেই মন ভালো হয়ে যায়। তখন ফিরে আসে বাড়িতে।
গতকালকের বিষয়টা আলাদা। গতকাল কেন মন খারাপ হয়েছিল তা ও জানে না। আর আজ হঠাৎ করে মায়ের কথাটা মনে পড়তে ভীষণ একা একা লাগছে ওকে। এত বড়ো পৃথিবীতে ওর নিজেকে খুবই তুচ্ছ মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে কেমন কান্না পাচ্ছে ওর। হয়তো কাঁদতোও, কিন্তু আনিসের ডাক শুনে আর কাঁদতে পারল না।
আনিস এদিকেই এগিয়ে আসছে।

পাঁচ.
মহিদুলের পাশে এসে বসল আনিস। জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছিস?’
‘ভালো।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো মহিদুল। তারপর বলল, ‘তা এই সাতসকালে কী মনে করে?’ একবার ভাবল কাল রাতের ব্যাপারটা ওকে জানায়। ও হচ্ছে পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু কাওসার যেহেতু গ্রামে উপস্থিত, তাই আগে কাওসারকে জানানোই ঠিক মনে করল।
আনিস বলল, ‘একটা বিষয়ে তোর সাথে আলাপ করব বলে ভাবছি। কিন্তু সময় করে পারছিলাম না।’
‘কী বিষয়ে?’ অবাক প্রশ্ন মহিদুলের।
‘মাহিনকে তো তুই চিনিস?’ মহিদুলের সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বলল আনিস।
একটু যেন চমকালো মহিদুল। বলল, ‘ওই আলমের সাথে হ্যাংলা মতো যে ছেলেটা বেড়ায়?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিছু করেছে নাকি ও?’ এবার সত্যিই অবাক না হয়ে পারল না মহিদুল।
‘না করেনি। তবে কয়েকদিন ধরে বেশ জ্বালাচ্ছে। মানে.. আসলে তোকে কীভাবে বলি বিষয়টা তা বুঝতে পারছি না।’ আনিসকে বেশ উদ্বিগ্ন আবার ভাবান্বিতও দেখাচ্ছে।
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মহিদুলও। বলল, ‘কী করেছে ও?’
‘না তেমন কিছু না। আসলে…’ বলতে গিয়েও থেমে গেল আনিস।
‘আমাকে খোলাখুলি বল আনিস।’ আনিসকে চেপে ধরল মহিদুল।
‘না মানে…’
‘দেখ আনিস, তুই যদি না বলিস তাহলে আমি বুঝব কেমন করে ও কী করেছে না বলেছে? পাঠাগার নিয়ে কোনো সমস্যা থাকলে বল, কাওসার তো এখন গ্রামেই আছে। ওকে জানানো যাবে।’ অনেকটা অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল মহিদুল।
‘ওখানেই তো আমার ভয়। মাহিন কাল আবার এসেছিল।’
মহিদুল কিছু বলে না। আনিসের বলার অপেক্ষায় রইল।
আনিস আবার বলতে শুরু করল, ‘ওরা পাঠাগারের নির্বাচন চায়।’
‘সেটা তো আমরা প্রতি বছরই করি।’
‘হ্যাঁ করি। কিন্তু এবার ওরাও পাঠাগারের সদস্য হতে চায়।’
‘সে তো ভালো কথা। সদস্য হওয়ার নিয়ম মানলে যে কেউ আমাদের পাঠাগারের সদস্য হতে পারে।’
‘কিন্তু বিষয়টা তা না।’
‘মানে? তাহলে আর কী চায় ওরা?’
‘ওরা চায় আমরা যেন আশরাফ হুজুরকে পাঠাগারের সভাপতি না রাখি। সভাপতি বানাতে হবে আলমকে।’
মুহূর্তে উঠে দাঁড়াল মহিদুল। ‘বললেই হলো! আমাদের পাঠাগারের সভাপতি কাকে বানাবো না বানাবো তা কি ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে নাকি?’
‘অত উত্তেজিত হোস না। কথা আরও আছে।’
ভ্রƒ-জোড়া কুঁচকে ওঠে মহিদুলের। বলে, ‘আর কী কথা?’
একটু ইতস্তত করে আনিস। শেষে বলে, ‘কাওসারের আসার খবর আগেই জানতে পেরেছে ওরা। আর তাইতো কাল আবার এসেছিল। বলে গেছে পাঠাগারের এবারের কমিটি থেকে কাওসারকে বাদ দিতে হবে।’
‘কিন্তু তুই তো জানিস কাওসারই আমাদের পাঠাগারের প্রাণ। ওকে বাদ দিয়ে আমরা এক কদমও এগোতে পারব না।’
‘তা আমি ভালোই জানি। ও-ই তো আমাদের পাঠাগারটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নইলে কবেই মুখ থুবড়ে পড়তো!’
‘না আনিস, তুই যাই বলিস, কাওসারকে বাদ দেওয়া যাবে না।’
‘কিন্তু তাহলে এখন কী করবি? আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না।’
‘তুই কি ওদেরকে ভয় পাচ্ছিস?’
‘না মানে…’
‘এবার মাহিনরা এলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিস। দেখি সত্যি সত্যি কী চায় ওরা। যা, এখন বাড়ি যা।’
মহিদুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় আনিস।
আরও কিছুক্ষণ বসে থাকে মহিদুল। ভাবনায় নতুন বিষয় যুক্ত হলো এবার। বুঝতে পারে না আলমরা আসলে কী চায়। বোঝায় যায় ভালো কিছু চায় না ওরা। হঠাৎ করেই বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ওরা। কিন্তু এর একটা বিহিত করা দরকার।
উঠে বাড়ির পথ ধরল মহিদুল।

ছয়.
কাওসার ও মহিদুল বের হয়েছে গ্রামটা ঘুরে দেখতে। অনেকদিন পর দু’বন্ধু এভাবে বের হলো।
বেশ ফুরফুরে লাগছে ওদেরকে।
মুক্ত আকাশ। ঝিরিঝিরি করে বয়ে যাচ্ছে বাতাস। তাতে খুবই আরাম লাগছে ওদের। প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
কাওসার তো বলেই ফেলল, ‘আহ্! কতদিন এই মুক্ত বাতাস গায়ে মাখিনি! আসলে শহরের কোলাহলের মধ্যে এই আবহাওয়া পাওয়াই যায় না। ওখানে কেবল গ্যাঞ্জাম আর গ্যাঞ্জাম। এতটুকু অবসর নেই নিত্যদিনের কাজের বাইরে গিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার। ওখানে সবাই যান্ত্রিক। সবাই ব্যস্ত, ভীষণ ব্যস্ত!’
আর কাওসারও হয়ে যায় ব্যস্ত। স্কুল আর প্রাইভেট পড়া নিয়েই সময় পার হয়ে যায়। এর বাইরে আর কিছু করার সময়ই অবশিষ্ট থাকে না।
অনেকদিন পর গ্রামের এই খোলা প্রকৃতিতে আসতে পেরে তাই কাওসারের অন্তরটা হেসে উঠল। সকল সৌন্দর্য লুটে নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ল প্রাণটা।
দু’পাশে ধানক্ষেত, তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা। রাস্তার ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন গাছ। তবে বাবলা আর তাল-খেজুরের গাছই বেশি।
দূরে একটা তালগাছে বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে। দেখে পুলকিত হয়ে উঠল কাওসার। আর বাবলা গাছে চড়–ই পাখির ফুড়–ত ফুড়–ত ওড়াউড়ি দেখে তো রীতিমত হুল্লোড় করে উঠল। অথচ এক সময় এসব দেখে দেখে বিরক্ত হয়ে যেত ও। সারাদিন পাখিদের পিছে পিছে ছুটে হয়রান হয়ে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ত। খেজুর গাছ বেয়ে কাঠবিড়ালি উঠতে দেখে চনমনে হয়ে উঠত আবার হৃদয়। উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটত। সে একটা দিন ছিল তখন! আর ওর এ সকল কিছুর সাথী ছিল মহিদুল। অবশ্য খুব বেশিদিন আগের কথাও না এগুলো। ও না চাইলেও ওর একমাত্র ফুফুর অনুরোধে ওকে ঢাকায় গিয়ে স্কুলে ভর্তি হতে হয়। থাকতে হয় ফুফুর বাড়িতেই। আর সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনার কারণে তো বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকছে। এর মাঝেও দুয়েকবার এসে বেড়িয়ে গেছে কাওসার। কিন্তু বিষয়টা এখনকার মতো তখন অতটা খারাপ ছিল না। এইবার তৃতীয়বারের মতো স্কুল বন্ধ হওয়াতে ও বাড়িতে এসেছে। এর সাথে সমস্যাটারও একটা সমাধান করে যেতে চায়।
মাঠ পেরিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি করে কাটাল ওরা। মুড়ি-পাটালি আর মোয়া খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলল। অনেকদিন এসব খাওয়া হয় না।
মহিদুলও খায় না। কে করে দেবে ওকে এসব?
বিকেলে আনিসদের নিয়ে বসল কাওসার। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা সেরে নিতে চায়।
মহিদুল আগেই কাল রাতের ঘটনাটা জানিয়েছে কাওসারকে। কাওসার শুধু বলেছে, ‘এখানে কিছু একটা ঘটছে। সেটা আমাদের বের করতে হবে।’
মহিদুল আজ সকালে আনিসের সাথে হওয়া কথোপকথনগুলোও জানিয়েছে ওকে। বলেছে, ‘বিষয়টা কেমন ঘোলাটে বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। আসলে ওরা চায় কী?’
কাওসার বলেছে, ‘ওরা আসলে তোদের এই একতাকে ভয় পায়। তোদের এই একতাই হচ্ছে ওদের অত হুমকি-ধমকির কারণ। ওরা চায় পাঠাগারটার কর্তৃত্ব। যাতে কেউ ওদের ওপর কথা না বলতে পারে। রাতে আব্বা আমাকে বলেছে ওদের আরও অপকর্মের কথা। ইদানীং ওরা বাজারে গিয়ে চাঁদা তোলা ধরেছে। পরশু গিয়েছিল আব্বার দোকানে। বলে এসেছে এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে আসবে ওরা। চাঁদা দিতে এদিক ওদিক করলে দেখে নেবে। আর শুধু আব্বার দোকানেই না, বাজারের প্রত্যেকটা দোকানে গিয়ে ওরা হুমকি দিয়ে এসেছে। ফলে সবাই বেশ তটস্থ হয়ে আছে।’
মহিদুল জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এই অন্যায় ওরা কেন করছে?’
‘নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে। তাছাড়া আর কী?’
‘কীসের আধিপত্য?’
‘ওরা এই গ্রামটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ওরা চায় না ওদেরকে বাদ দিয়ে এখানে ভালো কিছু হোক। ভালো মানুষ গড়ে উঠুক। গ্রামটার নামডাক ছড়িয়ে পড়–ক আশপাশের আর দু’পাঁচটা গ্রামে।’
‘ভালো কাজ করতে চাইলে তো ওরা একসাথেই করতে পারে!’
‘তুই আসলে বুঝতে পারিসনি মহিদ,’ বলেছিল কাওসার। ‘তুই খুবই সরল মানুষ তো, তাই এসব ঘোরপ্যাঁচ বুঝিস না। ওরা আসলে ভালো কিছু হোক তা চায় না। তাই অন্য কেউ যেন ভালো কিছু করতে না পারে সেজন্যই যারা ভালো কিছু করতে চায় তাদেরকে থামিয়ে দিতে চায়। আর এর পশ্চাতে যত সব খারাপগুলো করতে থাকে।’
মহিদুল সত্যিই খুবই সহজ-সরল। কাওসারের অতসব কথা ও বোঝেনি।
পাঠাগারে বসেছে ওরা। সব সদস্য আসতে পারেনি। কেবল আনিস, বোরহান, লিয়াকত ও বাবর এসেছে।
সবার মুখেই মাস্ক পরা। এবং একে অন্য থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই বসেছে ওরা। ভূমিকা ছাড়াই শুরু করল কাওসার। বলল, ‘আমি তোমাদের একটা বিশেষ কারণে ডেকেছি। পাঠাগারের সবাইকে নিয়ে তো বসব, তার আগে এই বসার অর্থ হচ্ছে কিছু বিষয় তোমাদেরকে জানানো।’
আনিস বলল মাঝখান থেকে, ‘আমরা তাতে কিছু মনে করিনি। তুমি ডাকলে তো আমরা অবশ্যই আসব। তুমিই তো আমাদের এই পাঠাগারের প্রাণ। শহর থেকে যদি বই দিয়ে আর অন্যান্য বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা না করতে তাহলে পাঠাগারটা প্রতিষ্ঠিতই হতে পারতো না।’
লিয়াকত বলল, ‘আর এই পাঠাগারটার কারণেই তো আমাদের মধ্যে একটা একতা গড়ে উঠেছে। সেটা অনেকেই সহ্য করতে পারে না।’
‘হ্যাঁ,’ বলল কাওসার। ‘এ কারণেই তোমাদেরকে আমি ডেকেছি। শোনো, আমাদের এই একতাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখছে না। পাঠাগারের মাধ্যমে আমরা যে গ্রামের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছি, এটা একটি মহল সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু আমরা তো থেমে থাকতে পারি না। আমরা তো কারও হুমকি-ধমকিতে দমে যাওয়ার জন্য পাঠাগার তৈরি করিনি। সবাইকে এই পাঠাগার তৈরির উদ্দেশ্যটা মনে রাখতে হবে। তাছাড়া যারা আমাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করছেন তারাও চান যেন পাঠাগারটা তার কার্যক্রম চালিয়ে যায়।’
আনিস বলল, ‘কিন্তু এখন তো ছেলেমেয়েরা বই বেশি পড়ে না। মোবাইলে অনলাইনেই অনেক কিছু জানা যায়। আর ফেসবুক এবং অন্যান্য সোস্যাল মাধ্যমেই সময় কাটায় বেশি।’
কাওসার বলল, ‘তারপরও প্রিন্টেট বইয়ের গুরুত্ব কখনও ফুরাবে না। প্রিন্টেট বই পড়ে যে বাস্তবতা, আনন্দ বা মজা পাওয়া যায়, অনলাইনে পড়ে সেটা উপলব্ধি করা যায় না। তাইতো আমরা আরও নতুন কিছু বই কিনতে চাই। তোমরাও কিছু বইয়ের নাম সাজেস্ট করতে পারো। তবে আমি কিছু বইয়ের নাম ঠিক করে রেখেছি। এই যেমন ধরো- বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের বাতাসের নূপুর, আমাদের যশোরেরই গৌরব, এই যশোরেরই কৃতী সন্তান কবি মোশাররফ হোসেন খানের সাহসী মানুষের গল্প সিরিজ, বিপ্লবের ঘোড়া, বাঁকড়া বিলের বালিহাঁস, অবাক সেনাপতি, হাজী শরীয়তুল্লাহ, দেশের অন্যতম বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক আবুল আসাদের সাইমুম সিরিজ, কবি জয়নুল আবেদীনের ডুমুরের দিনগুলি, আসাদ বিন হাফিজের ক্রুসেড সিরিজ, নাসির হেলালের মোরগ রাজা, বেহেশতের সুসংবাদ পেলেন যারা, ফুলের মতো নবী, কবি জাকির আবু জাফরের এক রাখালের গল্প, ইচ্ছে রাজার ঘোড়া, শিশু-সাহিত্যিক জুবায়ের হুসাইনের ছোট্ট উপহার, হুমকি ইত্যাদি। আর আমি তো প্রতি মাসে কিশোরকণ্ঠ পত্রিকা পাঠিয়ে দিই। কিশোরকণ্ঠে তো আমাদের মহিদুলের লেখা মাঝে মাঝেই ছাপা হয়। বইগুলো আমাদের এলাকার প্রত্যেকটি শিশু-কিশোরকে পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এরকম বইগুলো পড়লে ওরা সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে অনলাইনে থেকে ব্যর্থ সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকবে। পাশাপাশি নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। ওদের মধ্য থেকেইে বের হয়ে আসবে আগামী দিনের দেশের একেক জন কর্ণধার।’ এতক্ষণ এতগুলো কথা বলে এবার থামল কাওসার। বেশ হাঁফিয়েও উঠেছে ও। পাশে রাখা বোতল থেকে এক ঢোক পানি খেয়ে নিলো।
মহিদুল বলল, ‘তোর চয়েস করা বইগুলো নিঃসন্দেহে ভালোই হবে। তবে আমারও কিছু বইয়ের রিকুইজিশন আছে।’
‘ওকে,’ বলল কাওসার। ‘এবার ঢাকা যাওয়ার আগে সবার কাছ থেকেই রিকুইজিশন নিয়ে যাব ইনশা-আল্লাহ।’
আসরের আজান হয়ে গিয়েছিল। পাঠাগারের মধ্যেই কাওসারের ইমামতিতে নামাজ সেরে নিলো ওরা।
নামাজ শেষে মহিদুল বলল, ‘এই একটা জিনিসে আমি এখন আর কোনো তৃপ্তি পাইনে। নামাজ পড়তে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। কিন্তু এ কেমন ব্যাধি এলো যে, দু’জনের মাঝে ফাঁকা রেখে নামাজে দাঁড়াতে হবে?’
‘বিষয়টা নিয়ে আমাদের বেশি মাথা না ঘামালেও চলবে।’ বলল কাওসার। ‘কারণ, এই সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটাও খুবই প্রয়োজন।’
বোরহান বলল, ‘এখন বোধ হয় আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যেতে পারি। এখন আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদেরকে এখানে ডাকার উদ্দেশ্য এখনও আমার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না।’
‘বলছি সে কথা।’ বলে একটু থামল কাওসার। তারপর আবার বলল, ‘আলমরা যে কাজগুলো করছে সেটা মোটেই ঠিক নয়। চাঁদাবাজি করা আর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বেড়ানো কখনও ভালো কাজ হতে পারে না। আমরা চাই সুন্দর একটি সমাজ। অন্তত আমাদের এই গ্রামটা যেন সুখে-শান্তিতে থাকে সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদেরই। সবার মনে থাকার কথা আমরা এই একটি উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়েই পাঠাগারটা স্থাপন করেছিলাম। সেদিন সবাই আমাদেরকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। আজ বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া। তারা ভেবেছিল হয়তো আমরা তাদের ইশারা-ইঙ্গিতেই চলব। কিন্তু যখন দেখল আমরা তাদের কথা না শুনে যেটা করলে গ্রামের তথা গ্রামের মানুষের ভালো হয় সে কাজ করছি তখন ওরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাই চেষ্টা করতে লাগল আমাদেরকে থামিয়ে দিতে। আর সেটা করতে হলে অবশ্যই আমাদের মাঝে ঢুকতে হবে। কিন্তু ওরা নিজেরাও জানে ওরা ইচ্ছা করলেই আমাদের পাঠাগারের সদস্য হতে পারবে না। পাঠাগারের নিয়ম-কানুন ওরা মেনে চলতে পারবে না। তাই প্রভাব খাটিয়ে এর প্রধান পদটা নিয়ে নিতে চায়। তাহলেই যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে।’ এতগুলো কথা একসাথে বলে আবারও থামল কাওসার কিছুটা দম নেওয়ার জন্য।
‘কিন্তু আমরা তো তা করতে দিতে পারি না।’ এতক্ষণ পর মুখ খুলল মহিদুল।
বোরহান বলল, ‘কী করবে তুমি শুনি? ওদের সাথে পারবে? পারবে না। কাজেই …’
‘কাজেই ওদের প্রস্তাবে আমাদের রাজি হয়ে যাওয়া উচিত।’ বোরহানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল মহিদুল। ‘তুমি তো এ কথা বলবেই, কারণ…’
পেটে কাওসারের কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে থেমে গেল মহিদুল।
কাওসার বলল, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে কোনো গ্যাঞ্জামে যেতে চাই না। তাই আমি ঠিক করেছি আগামী শুক্রবার সবাই আবার বসব। সেদিন সবাইকে থাকতে হবে। আমরা নতুন কমিটি গঠন করবো। নিয়ম অনুযায়ী আমাদের আগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।’
লিয়াকত বলল, ‘কিন্তু ওই দিন তো পুব পাড়ার সাথে আমাদের ফুটবল ম্যাচ!’
কাওসার তাকাল আনিসের দিকে। আনিস বলল, ‘হ্যাঁ কাওসার, তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। আগামী শুক্রবার পুব পাড়ার সাথে ফুটবল ম্যাচ।’
‘ঠিক আছে,’ বলল কাওসার। ‘তাহলে আমরা শনিবার বসব।’
কথা আর বেশি এগোল না। আনিস ও লিয়াকত চলে গেলে কাওসার বোরহানকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছো বোরহান?’
‘ভালো।’ জবাব দিল বোরহান। কিন্তু ওর চেহারাই বলে দিচ্ছে ও মোটেও ভালো নেই। ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত বলে মনে হচ্ছে।
কাওসার আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কাল রাতে পাঠাগারে কেউ এসেছিল নাকি?’
‘কই নাতো!’ জবাব দিতে গিয়ে গলাটা কেমন কেঁপে উঠল বোরহানের। মহিদুল কিছু বলতে গিয়েও বলল না।
‘ও আচ্ছা।’ বলল কাওসার। ‘ঠিক আছে তুমি এখন যাও।’
বিদায় নিয়ে চলে গেল বোরহান।
কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল কাওসার। শেষে বলল, ‘বোরহান কিছু একটা লুকিয়েছে। ওর চোখই বলে দিচ্ছিল ও মিথ্যা বলছে। কিন্তু কেন লুকাচ্ছে?’
মহিদুল এর জবাব জানে না। তাই কিছু বলতেও পারল না।
সবাই চলে গেলে কাওসার ও মহিদুল আবার দু’জনে একত্রে হাঁটতে লাগল।

সাত.
পথের ধারে একটা পেয়ারা গাছে পেয়ারা ঝুলে থাকতে দেখে খাওয়ার লোভ সামলাতে পারল না ছেলেরা। ডাসা পেয়ারা ঝুলছে। তবে মাটি থেকে কিছুটা ওপরে হওয়ায় কয়েকবার লাফ দিয়ে হাতের নাগালে পেল না। বশিরউদ্দিনের বাগান এটা। মহিদুলের জন্য ফ্রি। মহিদুল একবার একটা উপকার করেছিল বশিরউদ্দিনের। সেই থেকে এই বাগানের ফলফলাদি ওর জন্য ফ্রি। ও যদি বাগানের সব ফলও খেয়ে ফেলে, তারপরও বশিরউদ্দিন কিছুই মনে করবে না।
আপাতত দুটো পেয়ারা হলেই চলবে। তরতর করে গাছে চড়ে বসল মহিদুল। ডাসা দেখে দুটো পেয়ারা পাড়ার জন্য সরু একটা ডালে গেল। ডালটার গোড়া আগেই একটু খয়ে গিয়েছিল। তাই মহিদুল ওটাতে পৌঁছাতেই মট করে ভেঙে পড়ল। ভাগ্যিস ডালটা মাটি হতে বেশি ওপরে ছিল না। তাই খুব বেশি আঘাত পেল না।
মহিদুল পড়ে যেতেই হায় হায় করে উঠল কাওসার। দ্রুত ওকে মাটি থেকে টেনে তুলল। দেখতে লাগল কোথায় লেগেছে। মহিদুল যতই বলছে ওর লাগেনি, কিন্তু কে শোনে কার কথা!
‘আমি কি তোর কাছে পেয়ারা খেতে চেয়েছি!’ বলল কাওসার। ‘যদি হাত-পা কিছু একটা ভেঙে যেত?’
‘ভেঙে গেলে যেত।’ বলল মহিদুল। ‘কী এমন ক্ষতি হতো তাতে? এমনিতেই তো ভেঙে আছি!’ শেষের কথাটা কেমন বেদনাহতের মতো শোনালো।
‘কী বলছিস তুই!’ আঁতকে ওঠে কাওসার। ‘কী এমন ক্ষতি হতো মানে? আমি কি নিজেকে বুঝ দিতে পারতাম? কী জবাব দিতাম আমি আমার নিজের কাছে?’
‘তুই খামোখা ভাবছিস কাওসার। আরে আমি ওরকম গাছ থেকে হাজারবার পড়লেও আমার কিচ্ছু হবে না। তোর মতো দোস্ত আছে না আমার সাথে!’
‘তোকে বলেছে! শোন, আর কখ্খনো অমন পাগলামো করবিনে। তোর কাছে তোর মূল্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর কিছু হয়ে গেলে আমি বেঁচে থাকার দিশাই হারিয়ে ফেলব!’ কাওসার যেন কেঁদে দেবে।
মহিদুল বলল, ‘এ্যাই কাওসার, কী পাগলামো করছিস? আরে বাবা, আমার তো কিছু হয়নি!’
‘তোর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো নারে মহিদ!’ কান্নাজড়িত কণ্ঠ কাওসারের।
‘কিন্তু কতক্ষণ আমাকে চোখে চোখে রাখবি তুই? একদিন তো মরবোই নাকি।’
‘না,’ জোর দিয়ে বলল কাওসার। ‘আমার আগে তুই মরতে পারবি না। কিছুতেই না। আমি তোকে মরতে দিলে তো!’
‘কিন্তু তুই তো শহরে থাকিস। ওখান থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবি কেমন করে? দেখিস, একদিন আমি হুট করেই মরে যাব। তুই কিছুই করতে পারবি না।’ মিটিমিটি হাসছে মহিদুল। অনেকটা কাওসারের প্রতিক্রিয়া জানার জন্যই কথাটা বলল ও।
মহিদুলের দিকে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কাওসার। চোখে একরাশ বেদনা।
মহিদুল বলল আবার, ‘এই কাওসার, ওভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?’
একটু পর বলল কাওসার, ‘তুই কি সত্যিই মরে যেতে চাস?’
হেসে দিল মহিদুল। বলল, ‘আরে না। তোর সাথে একটু মজা করছিলাম। আমি মরতে চাইলেই তো হবে না। আল্লাহ যে পর্যন্ত হায়াত লিখে রেখেছেন সে পর্যন্ত আমি তো বাঁচবোই। আর তাছাড়া তোকে কাঁদিয়ে আমি মরতে চাইনেরে!’
চোখ মুছে বলল কাওসার, ‘তাহলে কথা দে আর কখনো অমন অলক্ষুনে কথা বলবিনে!’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। এখন পেয়ারা খাওয়ার কী করা যায় বলতো?’
‘তুই নিচে দাঁড়া, আমিই পাড়ছি।’ বলে চোখের পলকে গাছে উঠে পড়ল কাওসার। অতি দক্ষতায় দুটো পেয়ারা ছিঁড়ে আনল বোঁটা থেকে।
সেই শিশুকালের কথা মনে পড়ে গেল মহিদুলের। এভাবেই দু’জন একসাথে চলত। সব কাজেই আগে চাঞ্চ নিতো মহিদুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফেল করত। আর তা সমাধা করতো কাওসার। আজও এই কৈশোর পেরনো সময়টাতে ঠিক সেটিই হলো আবার। ওর খুব ভালো লাগছে। আবার খারাপও লাগছে এই ভেবে যে, ও কোনোদিনই সফল হতে পারল না। কাওসার কাওসারই থেকে গেছে। ও পারল না কাওসার হতে।
দু’জন দুটো ডাসা পেয়ারাতে কামড় বসালো। কাওসার বলে উঠল, ‘আহ্, দারুণ! অনেকদিন এমন ডাসা পেয়ারা খাই না। শহরে যেগুলো খাই সেগুলোতে এতো টেস্ট নেই।’
‘শহরের সবকিছুতেই তো খালি কেমিক্যাল দেওয়া থাকে। পেয়ারাতেও দেয় নাকি?’ জিজ্ঞেস করল মহিদুল।
‘পেয়ারায় বোধ হয় ওটা দিতে পারে না। নাকি দেয় তা বলতে পারব না।’
পেয়ারা খেতে খেতে হাঁটছিল ওরা। হঠাৎ একটা লোকের ওপর নজর পড়ল কাওসারের। ছেঁড়া-ময়লা একটা গেঞ্জি গায়ে, পরনে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত উঠানো একটা লুঙ্গি। কোমরে একটা গামছা পেঁচিয়ে বাঁধা। তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে লাফিয়ে একটু দূর দিয়ে যাচ্ছে।
‘এ্যাই মহিদ,’ ডাকল ও। ‘কে রে লোকটা?’
কাওসারের দৃষ্টি বরাবর তাকাল মহিদুল। বলল, ‘ও, রঞ্জু দাদার কথা বলছিস?’
‘রঞ্জু দাদা!’ অবাক হয়ে যায় কাওসার। ‘তার এ অবস্থা হলো কীভাবে?’
‘সে অনেক লম্বা কাহিনি।’ বলল মহিদুল। ‘তবে সংক্ষেপে বললে রঞ্জু দাদার আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে এই পাগলামো ভাবটা চলে আসে।’
‘কী বললি, রঞ্জু দাদা পাগল?’ বিশ্বাস করতে পারে না কাওসার।
‘হ্যাঁ, রঞ্জু দাদা এখন পাগল।’
‘কিন্তু আমাকে তো কখনও বলিসনি তুই।’
‘আসলে বলার মতো পরিবেশ পাইনি তো তাই বলা হয়নি।’ কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল মহিদুল।
‘ডাক না রঞ্জু দাদাকে, একটু কথা বলি।’
গলা চড়িয়ে ডাকল মহিদুল, ‘রঞ্জু দাদা…, ও.. রঞ্জু দাদা…..’
থমকে দাঁড়াল ছুটন্ত লোকটা। কে ডাকে অমন করে? ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল এদিকে। তারপর হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। ওদের সামনে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বলল, ‘আমাকে কিছু বলতিছাও?’
‘হ্যাঁ মানে রঞ্জু দাদা,’ আমতা আমতা করল মহিদুল। ‘এই যে আমাদের কাওসার, কালাম বেপারির ছেলে। তোমার সাথে একটু কথা বলতে চায়।’
ময়লা দাঁত বের করে একটু হাসল রঞ্জু। বলল, ‘আমার সাথে কথা বলবে? তা কী কথা বলুক না। তবে আমি কলাম আমার দাওয়াতে তোমাদের আসতিই হবে।’
মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল কাওসার ও মহিদুল। কাওসার জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের দাওয়াত রঞ্জু দাদা?’
‘আ মলো যা, আমার বিয়ে না!’ বলতে যেন খুবই লজ্জা পাচ্ছে রঞ্জু।
‘তোমার বিয়ে! কবে? কার সাথে?’ একসাথে প্রশ্ন করল দু’জন।
‘আজ রাতেই বিয়ে।’ নির্বিকার কণ্ঠে বলল রঞ্জু।
একটু অবাক হলো ওরা। রঞ্জুর বিয়ে আগেই হয়েছে। একটা ছেলেও আছে তার। ওদের থেকে একটু ছোটোই হবে। সে-ই কি না আবার বিয়ে করবে!
কাওসার বলল, ‘তা কনেটা কে শুনি?’
রঞ্জু এ কথায় আরও লজ্জা পেল। মুখটা রাঙিয়ে বলল, ‘কেন আমার বউ শেফালি!’
‘তোমার বউ শেফালির সাথে তোমার বিয়ে?’ ফিক করে হেসে উঠল ছেলেরা।
‘হ্যাঁ!’ কেমন পাংশু হয়ে গেল রঞ্জুর কণ্ঠ। ‘তা তোমরা হাসছ কেন? বউয়ের সাথে বুঝি বিয়ে হয় না!’
এবার শব্দ করেই হেসে ফেলল ওরা।
হঠাৎ আবার আনন্দে লাফিয়ে উঠল রঞ্জু। তড়াং করে লাফিয়ে উঠল। আগের মতো ছুটতে ছুটতে বলল, ‘তোমরা অবশ্যই আসবে কিন্তু আমার বিয়েতে। না এলে খুবই কষ্ট পাবো। আসবে তোমরা…’
মাঠের ওপাশে হারিয়ে গেল রঞ্জু।
কাওসারের খুব কষ্ট লাগল। রঞ্জু দাদা ছিল ওদের প্রিয় মানুষগুলোর একজন। তার এই অবস্থা দেখে কান্নাই চলে আসে বুঝি চোখে।

আট.
মনতাজের চায়ের দোকানে বসে শিঙাড়া ও চা খেল ওরা।
শিঙাড়া শেষ করে কেবল চায়ে চুমুক দেবে, এই সময় হাজির হলো মাহিন ও মন্টু। কিছু না বলেই ওদের সামনের বেঞ্চটাতে বসল। যেন ওদেরকে দেখতেই পায়নি। চায়ের অর্ডার দিলো। তবে ওদের কারোর মুখেই মাস্ক পরা নেই।
মনতাজ বলল, ‘তোমাদের আর চা দিতে পারব না। আগের চারশো বাইশ টাকা পাওনা আছে।’
মাহিন বলল, ‘আরে তাতে কী হয়েছে মনতাজ চাচা। তোমার টাকা কি আমরা দেবো না? এখন দাও তো দু’কাপ লাল চা।’ বলে দু’হাঁটুর ওপর দু’হাত রেখে তবলা বাজাতে লাগল।
অন্য দিকে কাউকে কিছু না বলে মন্টু দোকানে ঝুলিয়ে রাখা একটা বনরুটি ধরে টেনে নিল। মনতাজ বলে উঠল, ‘এই মন্টু, তুমি ওটা নেবে না। আগে বাকি টাকা শোধ করো, তারপর নেবে।’
‘কিন্তু মনতাজ চাচা,’ বলল মন্টু। ‘আমি তো একবার কিছু নিলে তা আর ফেরত দিই না।’
‘এটা ভারি অন্যায়। মাহিন তুমি ওকে ওটা রাখতে বলো।’
মাহিন নির্বিকারভাবে হাঁটুতে তবলা বাজিয়ে চলল।
মনতাজ মিয়া এবার কাওসারদের উদ্দেশে বলল, ‘দেখলে বাবা কাওসার ওদের কাণ্ড! ওরা প্রায়ই অমন করে। বাকি হতে হতে অনেক টাকা হয়ে গেলেও তা শোধ না করে প্রতিদিনই কোনো না কোনো জিনিস নেবে। না দিতে চাইলে জোর করে নেবে।’
এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল ও শুনছিল কাওসাররা। এবার কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল কাওসার, তার আগেই বলে উঠল মাহিন, ‘আরে কাওসার যে! তা কখন এলে? ভালো ছিলে তো?’
উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো হ্যান্ডশেকের জন্য। কাওসার তার হাত ফিরিয়ে দিল। বলল, মনতাজ চাচাকে উদ্দেশ করে, ‘চাচা, ওদের কত বাকি হয়েছে যেন?’
মনতাজ বলল, ‘চারশো বাইশ টাকা।’
‘হ্যাঁ মাহিন, টাকাটা দিয়ে দাও।’ বলল কাওসার।
কিছুক্ষণ কাওসারের চোখে চোখে তাকিয়ে রইল মাহিন। বুঝতে চেষ্টা করল কিছু যেন। শেষে বলল, ‘দেরে মন্টু, মনতাজ চাচাকে টাকাটা দিয়ে দে।’
মন্টু পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে দিলো।
মাহিন বলল, ‘আরে মনতাজ চাচা আজকে তোমার টাকা দেব বলেই তো এসেছি। আমরা কি অত খারাপ বলো!’ ঘুরে দাঁড়াল কাওসারদের দিকে। বলল, ‘আসলে হয়েছে কি, কয়েকদিন হাতটা বেশ খালি যাচ্ছিল। তাই কিছু বাকি পড়ে গিয়েছিল। আরে ও কয়টা টাকা কোনো ব্যাপার নাকি! তা কয়দিন থাকবে গ্রামে?’
কাওসার বলল, ‘থাকতে তো চেয়েছিলাম অল্প কয়েকদিন। কিন্তু এখন দেখছি আরও কয়েকদিন বেশি থাকতে হবে।’
‘তা বেশ বেশ। তুমি তো খুবই কম আসো গ্রামে। এবার একটু বেশিই বেড়িয়ে যাও। গ্রামটা একটু ভালো করে দেখো, আবার কবে আসবে আর তখন এসে এমনভাবে দেখতে পাবে কি না…’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল মাহিন।
‘কী বলতে চাও তুমি?’ জিজ্ঞেস করল কাওসার।
‘না কিছু না। বলছিলাম তখন এলে তো অনেক কিছু নাও দেখতে পারো। সব কিছুই তো বদলে যাচ্ছে, তাই… চল মন্টু।’
বলে যেমন এসেছিল তেমন চলে গেল ওরা।
ওরা চলে যেতেই মনতাজ বলল, ‘ইদানীং ওরা বেশ জ্বালাচ্ছে। যখন তখন এসে এটা ওটা নিয়ে যায়। আমরা দোকানদাররা তো অতিষ্ঠ হয়ে গেছি!’
‘সব ঠিক হয়ে যাবে চাচা।’ বলে বিল মিটিয়ে চলে এলো ওরা।
কাওসারের মনটা মরে গেল। গ্রামটা তো এমন ছিল না। গতবার যখন এসেছিল তখন বেশ ভালো ছিল। অথচ এই কয়টা মাসে টোটাল চেহারাটাই পালটে গেছে গ্রামের। নাহ, কিছুই ভালো লাগছে না ওর।
কাওসার বলল, ‘তোর আব্বা এখন কেমন আছে রে?’
‘ওই আছে আগের মতোই। পাশের বাড়ির ছমিরন বু ছিল বলেই রক্ষে। নইলে আমি পারতাম না সব কিছু সামাল দিতে। ছমিরন বুই তো আব্বার দেখাশোনা করে। মাঝে মাঝে ভাতও রান্না করে দেয়।’ বলল মহিদুল।
‘তোর বোনরা আসে না?’
‘আসে মাঝে মাঝে।’
‘ও।’
এরপর চুপচাপ কিছুক্ষণ হাঁটল ওরা। হাঁটতে হাঁটতে পশ্চিম প্রান্তের সেই পুকুরপাড়টার কাছে চলে এলো। ঘাসের ওপর হাঁটু মুড়ে বসল ওরা।
‘সব কিছুই কেমন বদলে গেছে রে মহিদ।’ বলল কাওসার।
‘হ্যাঁ, শুধু তুই ছাড়া।’ জবাব দিল মহিদুল। মুখে মুচকি হাসির চিলতে।
‘তুইও কিন্তু বদলাসনি।’
‘আমি আর কী বদলাবো বল। কী আছে আমার?’
‘মানে? হঠাৎ এ কথা বলছিস কেনরে?’
‘মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কে? কেন এসেছি এই গ্যাঞ্জামের দুনিয়ায়? কী আমার উদ্দেশ্য? তখন খুব খারাপ লাগেরে কাওসার!’
‘খবরদার! আর একদম ভাববি না ওসব। সব সময় মন ভালো রাখবি।’
‘চেষ্টা তো করি রে। কিন্তু পারি কই?’
‘না তোকে পারতেই হবে।’
‘বাদ দে ওসব। এখন কী করবি তাই বল।’
‘ভাবছি। তবে আমি দমবার পাত্র না। জীবনে কোনোদিন হার মানিনি, আজকেও মানব না।’
‘কী করতে চাস তাহলে তুই?’
‘এখনও জানি না। তবে কিছু একটা করতে হবে।’
কিছুক্ষণ নীরবে কাটল।
নাম না জানা একঝাঁক পাখি উড়ে গেল পুকুরের পানিতে কাঁপা কাঁপা ছায়া ফেলে।
একসময় বলল কাওসার, ‘মহিদ, তুই বরং আমার সাথে শহরে চল। তোকে স্কুলে ভর্তি করে দেব। তুই আর আমি একসাথে স্কুলে যাব।’
‘পাগল হয়েছিস? কোনো স্কুলই আমাকে ভর্তি নেবে না। আমি তো ক্লাস ফোরই শেষ করতে পারিনি। তাছাড়া আমি চলে গেলে আব্বার কী হবে ভেবেছিস?’ জবাব দিল মহিদুল।
না, এ কথা ভাবেনি কাওসার। বলল, ‘গ্রামটা কেমন বদলে গেছেরে। মানুষগুলোও। দেখনা বোরহান কেমনভাবে জলজ্যান্ত মিথ্যাটা বলে দিল।’
‘তুই কি তবে হার মেনে নিবি?’
‘মানে? কী বলছিস তুই?’
‘না, তোর কথার মধ্যে কেমন হার মানার সুর তো, তাই।’
‘বাদ দে ওসব। হারু চাচা কেমন আছে বল।’
হারু চাচা হচ্ছে ওদের প্রাইমারি স্কুলের দফতরি। ওদেরকে খুব ভালোবাসত। থাকে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে।
‘বেশ কিছুদিন তার খোঁজ নেওয়া হয়নি।’ বলল মহিদুল।
‘কাল একবার গেলে কেমন হয়?’
‘তা মন্দ হয় না। … কিন্তু আমার তো একটু কাজে যাওয়া দরকার।’
‘আরে বাদ দে তো কাজের কথা। আমি যে কয়দিন আছি সে কয়দিন তোর কাজে যাওয়া বাদ।’
‘তাহলে খাব কী? আব্বাকে কী খাওয়াবো?’
‘সে চিন্তা তোমাকে করতে হবে না চান্দু। ও দায়িত্বটা আপাতত আমার ওপর।’

নয়.
সকাল হতেই একটা কথা সবার মাঝে প্রচার হয়ে গেল- মনতাজ মিয়ার দোকানে চুরি হয়েছে। ক্যাশ টাকা নিয়েছে, আর বাকি জিনিসপত্র সব ভাঙচুর করে রেখে গেছে।
ছুটে গেল কাওসার। মহিদুল আগেই ওখানে পৌঁছেছে।
মনতাজ মিয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে। সব শেষ হয়ে গেছে তার। একটু আগে যে হায়-হুতাসটুকু করছিল, এখন তাও করছে না। কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে সে।
বিভিন্ন জন এসে বিভিন্নভাবে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছে। অবশ্য এখন আর সান্ত¡না লাগছে না। সে এমনিতেই শান্ত হয়ে গেছে।
ওখান থেকে সরে এলো কাওসার ও মহিদুল। পথে দেখা হলো প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যারের সাথে। ওরা সালাম দিলো। স্যার সালামের জবাব দিয়ে বলল, ‘কেমন আছ কাওসার? কবে এলে?’
কাওসার বলল, ‘গত পরশু দিন এসেছি স্যার। আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?’
স্যার বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। তা পড়াশোনা কেমন চলছে তোমার?’
‘আপনাদের দোয়ায় ভালোই চলছে স্যার। দোয়া করবেন যেন আরও ভালো করতে পারি।’
‘আমার দোয়া সবসময় তোমাদের সাথেই আছে। বাড়িতে এসো।’ বলে বিদায় নিলেন হেডস্যার।
আবারও হাঁটতে লাগল ওরা। খিলখিল হাসির শব্দে থমকে দাঁড়াল।
গ্রামের কয়েকটা মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। ওরাই হাসছে। নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে আলোচনা করছে আর খলখল করে হেসে উঠছে।
দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল ওরা। মনে পড়ল মসজিদের মক্তবে যখন আলিফ-বা-তা পড়ত, তখন একদিন হুজুর বলেছিলেন, ‘সাবধান! কোনো মেয়ের দিকে যদি একবার চোখ পড়ে যায় তবে তক্ষুনি চোখ সরিয়ে নেবে। দ্বিতীয়বার আর সেদিকে তাকাবে না।’ কুরআনের আয়াতটাও বলেছিলেন হুজুর। এখন আর মনে নেই।
আবার চলা শুরু করল।
মাঠে কাজ করছিল হাসুনির বাবা। সবাই তাকে হাসুনির বাবা বলেই জানে। আসল নাম কি তা কেউ বলতে পারবে না। ওদের দেখে কাজ থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শুনলাম মনতাজের দোকানে ডাকাতি হয়েছে। তোমরা কিছু শুনেছ নাকি?’
‘হ্যাঁ চাচা,’ বলল মহিদুল। ‘ওখান থেকেই তো এলাম।’
‘বেচারা! ওই দোকানটাই ছিল তার সব। এখন কী হবে বলত? আচ্ছা কারা করল কাজটা?’ কাজ থামিয়ে শোনার আশায় ছেলেদের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘সেটা এখনও জানা যায়নি। পুলিশ এসে দেখে গেছে।’ জবাব দিলো মহিদুল।
‘তোমার সাথে ওটা কে?’ এতক্ষণে যেন কাওসারকে দেখল সে। ‘কালাম বেপারির ছেলে কাওসার না?’
‘হ্যাঁ চাচা আমি।’ জবাব দিল কাওসার। ‘আপনি ভালো আছেন?’
‘গরিবের আর ভালো-মন্দ! এই আছি আর কি!’
কথা আর এগোল না। হাসুনির বাবা আবার কাজে মন দিলো।
মাঠে আরও কয়েকজনের সাথে কথা হলো। সবাই ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করল। তারপর গিয়ে হাজির হলো হারু চাচার বাড়িতে।
হারু চাচা বাড়িতেই ছিলেন। ওদেরকে বসতে দিলেন। হারু চাচার মেয়ে সাবেরা খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে দিল বসতে। বসল ওরা।
সাবেরা বয়সে ওদের চেয়ে একটু বড়োই হবে।
‘কেমন আছো হারু চাচা?’ জিজ্ঞেস করল কাওসার।
হারু চাচা বলল, ‘এই আল্লাহ রেখেছে কোনরকম। তা তোমরা কেমন আছো?’
‘আমরা ভালো আছি চাচা।’ এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার বলল, ‘চাচা, হান্নানকে দেখছি না যে?’
‘ছিল তো বাড়িতেই। কি রে মা সাবেরা, তোর ভাইজান গেল কই?’
‘কই জানি গেছে। কিছু বলেনি।’ বলল সাবেরা।
‘ঘরে মোয়া আছে না? দে তো মা দুটো বের করে।’
‘আপনি ব্যস্ত হবেন না চাচা।’ বলল কাওসার।
একটু পর হারু চাচা যা জানাল তা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না ওরা। কয়েকদিন ধরে নাকি সাবেরাকে ডিস্টার্ব করছে দুটো ছেলে। সাবেরা মোটে বাড়ি থেকে বের হতে পারে না।
ভাবনার বিষয়ই বটে। তবে একটু সাবধান থাকার পরামর্শ দিল কাওসার।
তারপর বিদায় নিল।

দশ.
শুক্রবার। পুবপাড়ার সাথে ফুটবল ম্যাচ আজ। বাবলাতলার টিমই জিতবে সবার বিশ্বাস। কারণ এর আগে কোনো টিমই এই দলটার সাথে খেলে জিততে পারেনি। আর দলের মূল শক্তি কাওসার তো খেলছেই, কাজেই এটা ধরেই নেওয়া যায় যে বাবলাতলার জিত নিশ্চিত।
দু’দিন ধরে মোটামুটি প্র্যাকটিস করেছে সবাই। আজ তার পরীক্ষা হয়ে যাবে।
বিকালে খেলা শুরু হলো। প্রথমে একটা গোল খেল বাবলাতলা। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সেটা শোধও দিয়ে দিল। হাফ টাইমের আগেই আরও দুটো বল ঠেলে দিল বিপক্ষ দলের গোলপোস্টের মধ্যে। ফলে ৩-১এ এগিয়ে রইল তারা।
প্রচুর দর্শক হয়েছে খেলা দেখার জন্য। বাবলাতলার জন্য একটা গরু বরাদ্দ করে ফেলেছেন ইতোমধ্যে গ্রামের মুরুব্বিরা।
হাফ টাইমের পর আবার খেলা শুরু হলো। বেশ মারমুখী মনে হলো পুবপাড়ার খেলোয়াড়দের। ঘনঘন ফাউল করতে লাগল। ডান পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পেল কাওসার। মাঠের বাইরে গিয়ে পাঁচ মিনিট রেস্ট নিতেও হলো। আবার মাঠে প্রবেশ করল ও।
পর পর দুটো গোল খেয়ে গেল এবার বাবলাতলা। এটা ঘটল বিপক্ষ দলের মারের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে।
দারুণ উত্তেজনা বিরাজ করছে সবার মাঝে। ঘন ঘন আক্রমণ করছে পুবপাড়া। বাবলাতলা টিকতেই পারছে না ওদের সামনে। হেরেই গেল বুঝি!
এই মুহূর্তে কাওসারের পায়ে বল। ছুটছে ও। একে একে কাটিয়ে গেল কয়েকজনকে। সামনে আর মাত্র একজন। তাকে কাটালেই কেবল গোলকিপার সামনে। আর তাকে ডস দিয়ে বলটা গোলপোস্টে ঢোকাতে পারলেই….
টান টান উত্তেজনা। হ্যাঁ, এই তো শেষজনকেও কাটিয়ে ফেলেছে কাওসার। বল নিয়ে একটু দাঁড়াল ও। চোখ তুলে দেখে নিল সামনেটা। তারপর ডান পায়ের হালকা কিক। গোলকিপার ডস খেয়ে বিপরীত দিকে পড়ল। বলটা গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকে পড়ল গোলপোস্টের মধ্যে। মুহূর্তে চিল্লানি আর তুমুল করতালি। এগিয়ে গেল বাবলাতলা।
খেলা প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুবপাড়ার মারমুখী মনোভাব এবার আরও তীব্র হলো। লিয়াকতকে অবৈধভাবে আঘাত করে ফাউল করায় পুবপাড়ার এক খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখালেন রেফারি। সঙ্গে সঙ্গে হুলস্থূল শুরু হয়ে গেল। হই হই করে ছুটে এলো তাদের সমর্থক কিছু দর্শক। পেছনে আলম ও মাহিনদেরকে দেখা গেল।
বেধে গেল মারামারি। বাবলাতলার অনেকেই আহত হলো। বেশি আহত হলো লিয়াকত। মাথায় আঘাত পেয়েছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। দ্রুত ধরাধরি করে কাছের এক ডিসপেনসারিতে নেওয়া হলো। ব্যান্ডেজ বেঁধে ছেড়ে দিলেন। বললেন, ‘কিছুদিন রেস্ট নিলে এমনিতেই সেরে যাবে।’
পুলিশ এলো। তবে দু’পক্ষের মুরুব্বিদের হস্তক্ষেপে কেসকাসের মধ্যে গেল না।
দু’দিন এসব নিয়েই কেটে গেল। কাজেই শনিবারের নির্ধারিত প্রোগ্রাম হলো না। পাঠাগারের কমিটি গঠন পিছিয়ে গেল।
অবশেষে কমিটি গঠন করা হলো। সকলের সর্বসম্মতিক্রমে মসজিদের ইমাম সাহেব আশরাফ হুজুরকেই সভাপতি পুনঃনির্বাচন করা হলো। তবে সাধারণ সম্পাদক করা হলো মহিদুলকে। আনিসকে সহ-সভাপতি করা হলো। আর বোরহানকে অর্থ সম্পাদক থেকে অব্যাহতি দিয়ে সাধারণ সদস্য হিসেবে রাখা হলো।
সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো মনতাজ মিয়াকে নতুন একটা মুদি দোকান দাঁড় করাতে যা যা লাগে তাই দিয়ে ওরা সহযোগিতা করবে।
প্রোগ্রাম শেষ হলো। সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেল। তবে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঠাগারের দুটো চাবির একটা সভাপতি আশরাফ হুজুরের কাছে এবং অপরটি সাধারণ সম্পাদক মহিদুলের কাছে রইল।
বোরহান যাওয়ার আগে মহিদুলদের দিকে কেমন করে যেন তাকাতে লাগল। অনেকটা ‘দেখে নেব’ টাইপের।
‘যাক,’ বলল কাওসার। ‘ভালোই ভালোই কমিটি পুনঃগঠনটা শেষ হলো।’
মহিদুল বলল, ‘আমার তো মনে হচ্ছে ঝামেলা আরও বাড়ল।’
‘কেন মনে হচ্ছে এই কথা? আলমদের কাউকে রাখিনি কমিটিতে তাই?’
‘হ্যাঁ!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মহিদুল।

এগারো.
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে মহিদুল। পেছনে তাড়া করে আসছে কয়েকটা লোক। সবার হাতে ধারাল অস্ত্র। আজ শেষ করেই দেবে মহিদুলকে। একদম রক্ষা নেই। জান বাঁচাতে ছুটছে তাই ও।
না, মহিদুল বাঁচতে চায়। এত তাড়াতাড়ি মরতে চায় না ও। তাইতো ছুটছে প্রাণপণে।
হাঁফিয়ে উঠেছে মহিদুল। প্রায় ঘণ্টাখানেক হলো ও ছুটছে। আর কতক্ষণ এভাবে ছুটতে পারবে তা জানে না। কিন্তু কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না লোকগুলো।
ছুটতে ছুটতেই একবার পিছু ফিরে তাকাল মহিদুল। আরে! মানুষ কোথায়? তেড়ে আসছে তো একদল হায়ে না! ধক করে উঠল বুকের মধ্যখানটায়। পরপর দুটো হার্টবিট মিস করল ও।
তবে ছোটার গতি কমালো না। অক্সিজেনের অভাব অনুভব করছে ও। হৃৎপিণ্ডটা হাঁসফাঁস করছে একটু অক্সিজেনের জন্য। হাঁ করে হাঁফাচ্ছে। ঘন ঘন বাতাস টেনে নিচ্ছে। ফুসফুসকে তো বাতাস সাপ্লাই দিতেই হবে। নইলে…
আর ভাবতে চাইল না ও। এখন একটাই চিন্তা, পেছনের ওই হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচা।
আবার পেছনটা দেখে নিলো। আরেকবার চমকালো। ছুটে আসছে বাঘ, হ্যাঁ, জ্বলন্ত চোখের ক্ষুধার্ত বাঘ। মাংসের গন্ধে উন্মাতাল তারা। ছোটার তালে তালে ‘হাঁ হাঁ’ শব্দ করছে আর জিবগুলো বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কেমন লকলক করছে। প্রচুর লালা ঝরছে।
আর বুঝি রক্ষা নেই। বাঁচতে পারবে না মহিদুল। প্রচণ্ড কান্না পেল। মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ইচ্ছা করছে মায়ের আঁচলের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিতে। ‘মা! তুমি কোথায়? আমাকে তোমার বুকে একটু আশ্রয় দেবে মা? আমার যে খুব বিপদ!’
ছুটছে মহিদুল।
এগিয়ে আসছে ক্ষুধার্ত বাঘ। ওর নাড়িভুঁড়ি আজ বের করেই ছাড়বে!
আর পারছে না মহিদুল। ধরা এবার পড়তেই হবে।
পায়ে আর জোর নেই। আর মাত্র কয়েক হাত পেছনে হিংস্র জন্তুগুলো। ওদের গরম নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছে মহিদুল। ঘাড়ে পড়ছে নিঃশ্বাস।
হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে পড়ল ও। ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে একটা বাঘ!
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল মহিদুল। হাঁফাচ্ছে। বুকটা ধুকপুক করছে। ঘামে ভিজে গেছে সমস্ত শরীর।
প্রচণ্ড পানি পিপাসা পেয়েছে। এদিক ওদিক তাকাল ও। আব্বার কাশির শব্দ শুনল। পাশে একটু তফাতে শুয়ে আছেন চিত হয়ে।
নড়বড়ে খাটটা থেকে নামল মহিদুল। ঘরের কোনায় রাখা মাটির কলস থেকে গেলাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল।
তারপর আবার বিছানায় গিয়ে বসল। হালকা চাঁদের আলো আসছে ঘরটাতে। তাতে আব্বার দিকে আরেকবার তাকাল। দেহটা কেমন কঙ্কালসার হয়ে গেছে। খুবই মায়া লাগল ওর আব্বার জন্য।
‘ঘুম আসছে না বাবা?’ বলে উঠলেন মতলেব।
‘না আব্বা, একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলাম।’ জবাব দিল মহিদুল। ‘আপনি এখনও ঘুমাননি?’
‘ঘুম তো আসে নারে বাবা!’ বলে আবার কাশতে থাকেন মতলেব।
মহিদুল ভাবে, এবার আব্বাকে ভালো একটা ডাক্তার দেখাতেই হবে। কাওসার শহরে গেলে ওকে বলবে একটা ব্যবস্থা করতে।
মহিদুল আবার শুয়ে পড়ে। রাত এখনও বাকি আছে অনেকটা।
তবে সে রাতে আর ঘুমাতে পারল না মহিদুল। চোখ বুজলেই মনে হয় ওকে তাড়া করে আসছে একদল হিংস্র মানুষ। কখনও সেটা হয়ে যায় হায়েনা আবার ক্ষুধার্ত নেকড়ে কিংবা বাঘ।
আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে মহিদুল। অধিকাংশ ভাবনাই ওর প্রিয় এই গ্রামটাকে নিয়ে। ইদানীং এমন কিছু ঘটছে যা ওকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলছে। ও গ্রামটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। তেমনি ভালোবাসে গ্রামের প্রত্যেকটি মানুষকে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি, গাছ, ঘাস, ধূলিকণা ওর প্রাণ। তাই গ্রামের খারাপ কিছু হলে ও-ও বাঁচবে না।
‘আল্লাহ! তুমি এই গ্রামটাকে রক্ষা করো!’ মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে ও।
রাত যেন আজ শেষ হতেই চায় না। খুবই দীর্ঘ মনে হয়। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকে মহিদুল।
একসময় শেষ হয় এই বিভীষিকাময় রাত। ফজরের আজান শুনে উঠে পড়ে মহিদুল। একটা গামছা কাঁধে ফেলে নিমের দাঁতনটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ঘোর ঘোর থাকতেই পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে।
অনেক কাজ বাকি মহিদুলের সামনে। এক এক করে সে সব সারতে হবে।
কিন্তু ও চাইলেই তো হবে না। ও তো ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি আজ রাতে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যদি জানত তবে এতো কাজের বিষয় মাথায় আনত না।

বারো.
সন্ধ্যা উতরে গেছে অনেকক্ষণ। এখনও মহিদুল বাড়ি ফেরেনি।
মতলেব আজ বড়োই উতলা হয়ে গেছেন। অন্যদিন তার এমন হয় না। কিন্তু আজ ছেলেটার জন্য বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ছেলেটা ওর বড়োই অসহায়। কিছুই করতে পারেননি ওর জন্য। কিন্তু মহিদ বড্ড ভালো। কখনও এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। বরং দিব্যি তার দেখভাল করে যাচ্ছে। সেজন্যেই ছেলেটার জন্য কিছু একটা করে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তিনি তো নিরুপায়। কী করতে পারেন তিনি? কিছুই না।
এজন্য বাকি জীবনটা কেবল আফসোস করেই কাটাতে হবে।
ছমিরন ভাত রেঁধে দিয়ে গেছে সেই সন্ধ্যার সময়। মতলেব এখনও খায়নি। ছেলে বাড়ি ফিরলে তবেই দু’জন একসাথে খাবেন। অনেক দিন বাপ-বেটা একসাথে খাননি। আজ খাবেন।
কিন্তু এখনও আসছে না কেন ও? ছটফট করতে থাকেন মতলেব। মনের মধ্যে কেমন দুশ্চিন্তা হচ্ছে। খুকখুক করে কাশলেন তিনি। কয়দিন ধরে কাশিটাও বেশ জ্বালাচ্ছে।
রাত আরও বাড়ল। গতকাল আকাশে চাঁদ থাকলেও আজ পুরোপুরি অন্ধকার। অমাবস্যা-পূর্ণিমার খবর এখন আর তিনি রাখেন না। ইচ্ছে করে না ওসব খবর রাখতে।
মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছেন মতলেব। গলা চড়িয়ে ছমিরনকে ডাকলেন, ‘ছমিরন? ওই ছমির…ন….’
ছুটে এলো ছমিরন। জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বলবেন খালুজান?’
এ তল্লাটে এক বৃদ্ধা মা ছাড়া ছমিরনের আর কেউ নেই। মাকে নিয়ে পাশেই একটা কুঁড়েতে থাকে।
ছমিরনের বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামের কেসমতের সাথে। বিয়ের আড়াই মাসের মাথায় কী এক অসুখে কেসমত মারা যায়। তারপর বৃদ্ধা মায়ের সংসারেই তার স্থান হয়।
‘মহিদ তো এখনও এলো নারে। ওর কিছু হলো নাতো!’ আশঙ্কার কথা প্রকাশ করলেন মতলেব।
‘ও তো খালুজান এখন একটু দেরি করেই বাড়ি ফেরে। ওর দোস্ত কাওসার এসেছে না!’ অনেকটা সান্ত¡না দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল ছমিরন।
‘কাওসার তো আজ চলে গেছে। বিকালে এসেছিল বিদায় নিতে। ওর সঙ্গে অনেকেই এসেছিল। যাবার সময় ওর মোবাইল নম্বরও দিয়ে গেল। ইমাম সাহেব রেখে দিয়েছেন ওর নম্বর।’
‘তাই তো!’ বলে চুপ হয়ে গেল ছমিরন।
‘আমার খুবই খারাপ লাগছে রে ছমিরন। কেবলই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।’
‘আপনি চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েন। আমি তো আছিই। মহিদ এলে আমি আপনাকে ডেকে দেব।’
‘আর ঘুমানো!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মতলেব।
‘আমি তাহলে যাই।’ উঠে দাঁড়াল ছমিরন।
এইসময় ছমিরনের মা চিল্লিয়ে উঠল, ‘ওরে আল্লারে….. আমাদের মহিদ আর নেই…’
ছ্যাঁৎ করে উঠল মতলেবের বুকের মধ্যে।
সারা গ্রামে হুলস্থূল পড়ে গেল। মহিদুলকে কারা জানি ছুরি মেরেছে।
পশ্চিম প্রান্তের পুকুরপাড়ে পড়ে আছে তার লাশ। বুকের বাম পাশটাতে ছুরির ধারালো ফলাটা তখনও ঢুকে আছে। প্রচুর রক্তক্ষরণে সেখানেই মারা গেছে।

তেরো.
ফেরিঘাটে জ্যাম না থাকলে এতক্ষণে ঢাকা পৌঁছে যেত কাওসার। রাত প্রায় এগারোটা বাজে। কেবলমাত্র ফেরি পার হলো ওদের গাড়িটা।
মনে মনে দারুণ পুলকিত হচ্ছিল ও। ওর প্রাণের দোস্ত মহিদ লেখালেখি করে এ কথা ও জানে। কিন্তু ও যে এত সুন্দর কবিতা লিখতে পারে তা ওর জানা ছিল না। আজ যখন বিদায় নিতে ওদের বাড়ি যায়, তখনই বিষয়টা আবিষ্কার করে। মহিদুল মোটামুটি জোর করেই ওর লেখা একটা কবিতার খাতা কাওসারের হাতে ধরিয়ে দেয়। আর বলে দেয় পারলে কোনো পত্রিকায় যেন ছাপানোর ব্যবস্থা করে। ইচ্ছে করলে বইও বের করতে পারে একটা।
ওই খাতাটার মধ্যে প্রায় বাইশটার মতো কবিতা লেখা আছে। সবগুলোই বেশ চমৎকার। এই অল্প সময়ে সব পড়তেও পারেনি। তবে দিনের আলো থাকতে থাকতে যে কয়টা কবিতা পড়েছে তার মধ্যে একটা কবিতা বেশ ভালো লেগেছে ওর কাছে। ও তো রীতিমতো সেটা মুখস্থও করে ফেলেছে। এক্ষণে কবিতাটা আবার মনে পড়ে গেল। কাওসার মনে মনে মুখস্থ পড়ে চলল-
আমি এক অর্ধ ফুটন্ত ফুল
ঠিকভাবে পাপড়ি মেলার আগেই
আমার বৃদ্ধিটা থমকে গেছে।
আমি তাই পশ্চিমের ওই পুকুরটার দিকে দৃষ্টি ফেরাই
পুকুরটা যেন এখনও একই রকম আছে
ঠিক যেমনটি দেখে আসছি আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে;
অথচ ওটার আরও একটু গভীর হওয়ার কথা ছিল
আমার বাবার কাছ থেকেও আমি সেটাই শুনেছি-
পুকুরটা যখন অর্ধেক কাটা হয়
তখন প্রচণ্ড গণ্ডগোল বাধে
ফলে কিছুতেই আর সম্পূর্ণটা কাটা হয়নি ওটার।
তাই বলছিলাম,
আমিও ওই পুকুরটার মতোই।
পৃথিবীতে প্রতিদিনই বেসুমার ফুল ফোটে
কিন্তু কতক্ষণই বা তাদের স্থায়িত্ব থাকে?
আমিও তেমনি এক ঝরে পড়া ফুল!
ফুটেছিলাম হয়তো অনেক আশা নিয়ে
কিন্তু পূর্ণতাপ্রাপ্তির পূর্বেই
সে আশা নিরাশায় পরিণত হলো।
তবে আমার কোনো দুঃখ নেই
কেনই বা থাকবে?
রাতের আঁধারে যে ফুল ফোটে
দিনের আলো দেখার সৌভাগ্য
তাদের ক’জনারই বা হয়!

মনে মনে একটু হাসল কাওসার। কিন্তু বুঝতে পারল না শেষের তিনটি লাইন কেন লিখল? তবে ওই তিনটি লাইনের কারণেই কবিতাটা সার্থক হয়ে উঠেছে। বন্ধুর অনেক প্রশংসা করল ও, মনে মনে।
সিটে হেলান দিল কাওসার। বাসের মধ্যে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছে কেবল ও আর দু’একজন যাত্রী।
ওরও ঘুম ঘুম পাচ্ছে। চোখ দুটো বন্ধ করল। ঠিক এই সময় ওর প্যান্টের পকেটে মোবাইল সেটে রিংটোন বেজে উঠল। একটু চমকে উঠে সেটটা বের করল। মোবাইলের আলোয় দেখল নাম্বারটা, আশরাফ হুজুরের নাম্বার।
একটু অবাক হলো, আজই তো এলো, হঠাৎ কেন এই মোবাইল কল? নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
ইয়েস বাটনে চাপ দিয়ে কানে মোবাইল ধরল কাওসার।

SHARE

Leave a Reply