Home ঈদ প্রবন্ধ হাসুর হাসি -রফিক মুহাম্মদ

হাসুর হাসি -রফিক মুহাম্মদ

চাঁদ দেখা গেলেই কাল ঈদ। হাসুর মনের আনন্দ উপচে পড়ছে। এবার ঈদে বেগম সাব তাকে একটা লাল জামা দেবেন। লাল জামা পরার খুব শখ হাসুর। হত দরিদ্র বাবার কাছে ঈদে কোনোদিন নতুন জামা চাইতে পারেনি। ছোটো দুটি ভাইবোন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে। এ অবস্থায় ঈদে তাদের নতুন জামা কিনে দেবে কীভাবে? তাই হাসুর লাল জামা পরার শখ মনের মধ্যেই চাপা পড়ে থেকেছে।
তিন বছর হয় হাসু এ বাড়িতে এসেছে। এ বাড়ির দারোয়ান রজব আলী হাসুকে নিয়ে এসেছে। হাসুদের গ্রামে রজব আলীর বাড়ি। সম্পর্কে চাচা হয়। রজব আলী হাসুর বাবা-মাকে বুঝিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। হাসুর বাবা-মা সন্তানকে দূরে দিতে চায়নি। কিন্তু দারুণ অভাব তাদের মায়ার বন্ধনকে ছিন্ন করে দেয়। হাসু রজব আলীর হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে চলে আসে রাজধানী ঢাকায়।
এরই মধ্যে হাসুর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ওকে এখন চেনাই যায় না। কী সুন্দর নাদুস-নুদুস চেহারা। হাসুদের বাড়িতেও এখন টিনের ঘর হয়েছে। বাবাকে একটি গরু কিনে দিয়েছে। হাসু যেদিন গুলশানের এ বাড়িতে এসেছিল, পরনে ছিল ছেঁড়া ময়লা জামা কাপড়। বাড়ি বেগম সাহেব সায়মা এ অবস্থায় তাকে ঘরে ঢুকতে দেননি। নতুন জামা কাপড় আনিয়ে আয়া রহিমাকে বললেন, ওকে গোসল করিয়ে এ জামা কাপড় পরিয়ে আমার সামনে নিয়ে আয়। হাসুর কাছ থেকে সায়মা বেগম সেদিনই ওদের সম্পর্কে সব কিছু জেনে নেন।
সায়মার স্বামী মুনীর হোসেন ব্যবসায়ী। সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রিনি আর ঝিনি দুই মেয়ে। আর একমাত্র ছেলে শাওন। শাওন কানাডাতে পড়াশুনা করে। বছরে একবার ঢাকা আসে। তখন বাড়িটা মুখরিত হয়ে ওঠে। দিনগুলি হুড়মুড় করে কোনদিক দিয়ে চলে যায় কেউ বুঝতে পারে না। শাওন চলে গেলে রিনি ঝিনি দু’বোন পড়াশুনা আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হাসুর সময় তখন কাটতে চায় না।
তেরো চৌদ্দ বছর বয়সের হাসু একা একাই ভাবে কোথা থেকে সে কোথায় এসেছে। এখানে কাজ বলতে যা শুধু রিনি ঝিনি আপুদের ডাকাডাকি। সায়মার পা টিপে দেওয়া। ঘর গোছানো। এ ছাড়া কাকে কীভাবে খুশি করতে হয় তাও এখন সে সব বুঝে ফেলেছে। তাইতো তাকে সবাই ভালোবাসে। প্রথম প্রথম মা বাবা ভাই বোনের জন্য মন খারাপ হলেও এখন আর অতটা লাগে না। তবুও মনটা যেন গ্রামেই পড়ে আছে। সেই নদীর তীর, বন জঙ্গল, ধানের খেত, মাঠে ঘাটে ছুটে বেড়ানো, পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার কাটা। রিনি ঝিনি আপুরা যখন সুইমিংপুলে ট্রেনারের কাছে সাঁতার শেখে, হাসু তখন মনে মনে হাসে। হাসু ভেবেই পায় না সাঁতার শেখার জন্য আবার মাস্টারের দরকার। এক নিঃশ্বাসে ডুবসাঁতার দিয়ে নদী পার হতে পারে। হাসুর ইচ্ছে করে একবার সুইমিং পুলে নেমে দেখতে। কী আছে এর মধ্যে। কী সুন্দর টলমলে নীল পানি মাঝে মাঝে সবার অগোচরে পানিটায় হাত বুলায় এই যা। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় রিনি ঝিনি জগিং স্যুট পরে পার্কে দৌড়াতে যায়। প্রায়ই হাসু সাথে থাকে। পার্কের এক কোণে বসে হাসু ওদের জগিং দেখে আর ভাবে গ্রামে সেই সাথীদের সাথে খেতের আল ধরে দৌড়ে বিল থেকে পদ্ম আর শাপলা তুলে আনার দিনগুলির কথা। গ্রামের সেই দিনগুলির কী যে আনন্দ ছিল; সেই আনন্দ এখানে কোথায়? একমাত্র ছাদে একটু খোলামেলা। এখন পাশের বাড়ির কাজের মেয়ে সেতারার সাথে হাসুর ভাব হয়েছে। দু’জনে সুখ দুঃখের কথা বলে গল্প করে। দু’জনের মধ্যে অনেক মিল আছে, আবার অমিলও আছে। সেতারার গ্রাম ভালো লাগে না। সন্ধ্যার পর কেমন যেন অন্ধকার অন্ধকার। আর হাসুর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক জোনাকির আলো এসব এখানে এসেও ভুলতে পারেনি। গ্রামে হাসুর একজন সই ছিল। তার নাম কাজললতা। ওরা পরস্পরকে সাবান তোয়ালে দিয়ে সই হয়েছিল। একদিন কাজললতার বিয়ে হয়ে গেল দশ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে। বিয়ের পর কাজললতাকে অনেক সুখী সুখী মনে হয়েছিল। হাসুর মনেও বিয়ের রঙ ধরেছিল। কিন্তু একটানা ছয় মাস শ্বশুরবাড়ি থাকার পর কাজল যখন গ্রামে আসে চেনাই যায়নি। একেবারে জির জিরে চেহারা, স্বামী আর শাশুড়ির অত্যাচারের কথা বলতে বলতে সদা হাস্যময়ী চঞ্চল কাজললতা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়েছিল। শাশুড়ি সারদিন খাটিয়ে সহজে খাবার দিতে চাইত না, আর স্বামী যখন তখন টাকার জন্য মারধর করতো। এসব আর সহ্য হয় না। এবার মেরে ফেললেও কাজললতা আর শ্বশুরবাড়িতে যাবে না। কাজললতার এই পরিণতি দেখে বিয়ে নামের সুখ স্বপ্নটা হাসুর মন থেকে উবে গেছে। সায়মা বেগম বলেছেন আঠারো বছরের আগে বিয়ের কোনো কথাই ভাববি না। সময় হলে দেখে শুনে ভালো ছেলে দেখে আমিই বিয়ে দেব।
হাসু এখন আর এসব কথা ভাবে না। এখানে সে অনেক ভালো আছে। এখন শুধু মন জুড়ে বাবা মা ভাইবোন কীভাবে সুখে থাকবে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে হাসুর বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে। সবার দায়িত্ব যেন সে একাই বহন করবে। যদিও মাস শেষ হবার আগেই হাসুর মা বাবার কাছে টাকা পৌঁছে যায়। তবুও ইচ্ছে করে ছোটো ভাইটাকে পড়াশুনা করাতে। ভাই যদি পড়াশুনা শিখে একটা চাকরি করতে পারে তাহলে তাদের দুঃখ আর থাকবে না। এই সব নানা ভাবনা হাসুকে উদাস করে দেয়।
এই বাড়িতে এসে হাসু কতো কিছু দেখেছে শিখেছে, পেয়েছে। আজ আর গ্রামের সেই কষ্টভরা দিনগুলি মনে করতে চায় না। বরং অনেক সময় নিজকে রিনি ঝিনি আপুদের মতো ভাবতে ইচ্ছে করে। ওরা কী সুন্দর দেখতে। কতো ভালো। হাসুর কাছে দুবোনকে পরীর মতো মনে হয়। সেদিন ওদের বন্ধুরা আসে। হাসুকে ওদের সাথেই সারাক্ষণ থাকতে হয়। হাসুর মনে ক্ষণিক আশা যদি ওদের মতো হতে পারতো। ওরা কী সুন্দর চুমকির কাজ করা জামা পরে। হাসুর কতো দিনের ইচ্ছে এরকম একটা লাল জামা পরার। কিন্তু সাহস করে কারো কাছে চাইতে পারে না। এবার সাহস নিয়ে বেগম সাহেবকে বলেছে এরকম একটা জামা কিনে দিতে। আর তাইতো হাসুর শখটা, স্বপ্নটা আজ চোখের কোণে খেলা করছে।
গ্রামে তাদের জীবনে ঈদ বলতে কিছু ছিল না। নতুন জামা কাপড় তো দূরের কথা খাবারই জুটতো না। এখন তো মা বাবা ভাইবোন সবাই নতুন জামা কাপড় পরে। মা গুড় আর দুধ দিয়ে সেমাই রান্না করে। আজ রজব আলী চাচার উসিলায় আল্লাহ তাদের দিন ঘুরিয়ে দিয়েছেন। হাসুর চোখে পানি আসে। জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে মুখে বলে আল্লাহ হাজার শুকর।
বিকেলের দিকে ছাদে হাসুর দেখা হয়ে গেল সেতারার সাথে। হাসুকে দেখে সেতারা এগিয়ে আসে। বলে,
: কি হাসু কেমন আছ?
: বালাই আছি। তোমার হাতে এতো চুড়ি।
: হ্যাঁ ঈদের চুড়ি বড়ো আপা দিছে।
: বড়ো আপা তোমারে চুড়ি দিল কেন?
: আরে ঈদের আগে বড়ো আপা আর দুলাই বেড়াইতে আইছে। তাইতো আমারে ঈদের গিফট দিছে বুঝলা।
: হ বুঝছি
: সেতারা হাতের চুড়িগুলো বার বার নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখে আর মুচকি হাসে।
হাসু সেতারার চুড়িগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে এরকম চুড়ি যদি তার থাকতো। নিঃশ্বাস ফেলে হাসু। মনে মনে ভাবে বেগম সাহেবকে বলবে লাল জামার সাথে ওকে লাল চুড়ি আর ফিতা কিনে দিতে। চুড়ি ফিতার কথা ভেবেই এক অন্য রকম ভালোলাগায় ওর মন নেচে ওঠে। হাসু ড্রয়িং রুমে যায় দেখে সবাই বসে টিভি দেখছে। সায়মা হাসুকে বসতে বলেন। হাসু চুপ করে বসে থাকে। হঠাৎ বাইরে পটকার আওয়াজ আর সাথে সাথে টিভিতে ভেসে ওঠে সেই চির পরিচিত চির নতুন গান, ওমন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…। রিনি ঝিনি হৈ চৈ করে উঠে কাল ঈদ। চলো চাঁদ দেখতে ছাদে যাই। সবাই ছাদে চলে যায়। সায়মা বসেই থাকেন গানটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠবেন না। এই গান কোনদিন পুরনো হবার নয়। পৃথিবী যতদিন থাকবে ঈদে এই গান বাজবেই। গান শেষ হলে সায়মা হাঁটি হাঁটি পা ফেলে ছাদে আসেন। স্বচ্ছ নীল আকাশ। আকাশ জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা মেখ আর পশ্চিম গগনে ভেসে আছে মুসলিম জাহানের খুশির বার্তা নিয়ে এক ফালি শাওয়ালের চাঁদ। সায়মা হাত তোলে মোনাজাত করেন সবার জন্য।
ঝির ঝির করে ঝরে পড়ে চাপা গাছের পাতা। কোথা থেকে দুটো টিয়ে পাখি উড়ে এসে নারিকেল গাছের পাতার আড়ালে বসে। মৃদু হাওয়া গেটের পাশে লুটিয়ে পড়া মাধবী লতায় দোলা দেয়। সায়মা নিচে আসেন। রিনি ঝিনি তৈরি হচ্ছে বাইরে যাবার জন্য। সায়মা বলেন,
: তোমরা কি কোথাও বের হচ্ছো?
: হ্যাঁ আম্মু শেষবারের মতো মার্কেটিংটা করে আসি, হাসু যাবি।
: না না হাসু যেতে পারবে না। ওর অনেক কাজ।
: তাহলে হাসু তোর জন্য কী আনবোরে। হাসু বরাবরের মতোই চুপ করে থাকে। কিছু বলতে হবে না, আপুরা কিছু না কিছু আনবেই। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও চুরির কথাটা বলতে পারলো না।
ফজরের আজানের পর পরই সবাই গোসল করে তৈরি হয়ে যায়। সায়মা নামাজ পড়ে এসে কানাডায় ছেলে শাওনের সাথে কথা বলেন। ঈদের জামাত পড়ে এসে মুনীর সাহেব খেয়ে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখতে থাকেন। রিনি ঝিনি নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। সাজগুজ করে বেরিয়ে যাচ্ছে, আসছে। সাময়া টাঙ্গাইল শাড়ি পরে খুব সুন্দর করে সেজেছেন। হাসুও সেজেগুজে এসে সায়মার পায়ের কাছে বসে সালাম করে। সায়মা হাসুর হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলেন, যা এটা পরে আয়। হাসু ঘরে এসে প্যাকেটটা খুলে হতবাক হয়ে যায়। কী সুন্দর চুমকির কাজ করা লাল জামা। এত তাড়াতাড়ি তার ইচ্ছাটা পূরণ হবে ভাবতে পারেনি। হাসু নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। খুশিতে দু’চোখে পানি এসে যায়। জামাটা বুকে জড়িয়ে গন্ধ শুঁকে। বুকটা ওর ভরে ওঠে। কিছুক্ষণ বসে থেকে জামাটা পরে বেরিয়ে আসে।

SHARE

Leave a Reply