Home ঈদ প্রবন্ধ বাদশা সোলায়মানের গুপ্তধন -হারুন ইবনে শাহাদাত

বাদশা সোলায়মানের গুপ্তধন -হারুন ইবনে শাহাদাত

লাল পাহাড়ের টিলায় ছোটো বাড়িতে বেশ বড়ো একটি ঘর। এই ঘরের মাঝে তালাইয়ের পারটিশনের এক পাশে হায়দারের রুম। ওর রুমে একটা ছোটো চৌকি আর পড়ার টেবিল। চেয়ার নেই। টেবিলটা এমনভাবে বসানো যেন চৌকিতে বসে দিব্যি বই রেখে পড়া যায়। পাশের রুমে দুটি চৌকি পাতা একটিতে মা-বাবা ঘুমান, অন্যটিকে ছোটো হাসনা, ওদের সবার আদরের হাসি। হাসনাকে আদর করে সবাই হাসি নামে ডাকে।
এখন রাত কয়টা বাজে, অন্ধকারে ঘড়ি দেখার উপায় নেই। তারপরও হায়দার ঠিক বুঝতে পারছে একটা বেজেছে অনেক আগেই। ওর মাথার ওপর তালাইয়ের সিলিং। সিলিংয়ের ওপর দুইটা তক্ষক থাকে। ওদের স্থানীয় ভাষায় ককক সাপ। সাপের মতো দেখতে হলেও তক্ষকের পা আছে। কয়েক প্রহর পর পর ককক করে ডাকে, তাই হয়তো স্থানীয় ভাষায় ওগুলোর নাম ককক। মানুষ দেখলে রঙ বদল করলেও ওরা হিং¯্র নয়। অনেক দিন ধরেই হায়দারদের সিলিংয়ে ওদের বসবাস। কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলে ওরা তক্ষকগুলো তাড়ায় না। ওদের ককক ডাক শুনেই হায়দার বুঝতে পারে এখন অনেক রাত। একটার ওপরে বাজে। কিন্তু হায়দারের চোখে ঘুম নেই। গতকাল দুপুরে গভীর জঙ্গলে সে যা দেখেছে তা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। ওর মনে হাজারটা প্রশ্ন জাগছে, বনের গভীরে ওরা কারা? এত গোপনে কী তালাশ করছে? যখনই একটু ঘুমের মতো আসছে, তন্দ্রায় চোখ বন্ধ হচ্ছে দুঃস্বপ্নের মতো ঐ ভয়ঙ্কর লোকগুলোর চেহারা ওর সামনে ভেসে উঠছে। ওদের ভাষাটাও যেন কেমন…? হায়দারের মাথায় কিছুই আসছে না। বাংলা, ইংরেজি, আরবি ভাষার কিছু কিছু শব্দ তো ওর জানা, অর্থ না বুঝলেও বুঝতে পারে কোনটা কোন ভাষা? কিন্তু ঐ লোকগুলো নিজেরা যখন কথা বলে তার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারে না হায়দার। শুধু একটা শব্দই বারবার ওর কানে বাজছে তা হলো, ‘ইসইলইমইন ইগু ইপ ইধ ইন। ভাবতে ভাবতে কখন হায়দার আলী ঘুমিয়ে পড়ে।
আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার আজানের সুমধুর আহবানে ঘুম ভাঙে হায়দারের। ঘুম থেকে ওঠে অজু করে মসজিদে যায়। নামাজ শেষে আবার ঐ দুঃচিন্তাটা দুঃস্বপ্নের মতো চেপে বসে। সে নিজে মনে মনে বলতে থাকে, ইসইলইমইন। তার ইচ্ছা না থাকলেও স্বগত শব্দগুলো মুখ ফসকে বের হয়ে পড়ে। হায়দারের বন্ধু ওসমান নামাজ পড়ে ওর সাথেই মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ওর শব্দগুলো শুনে, হাঁ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু হায়দারের সে দিকে কোনো খেয়াল নেই। সে আবার বিড় বিড় করতে থাকে। ওসমান ওর হাত ধরে টান দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী সব আবোল-তাবোল বক বক করছিস।’ হায়দার লজ্জা পায়।
সে বলে : ‘কই, কিছু না তো?’
ওসমান হাসতে হাসতে বলে : ‘তাহলে কি আমি ভুল শোনলাম?’
কপালে চোখ তুলে হায়দার জানতে চায় : ‘কী শুনলি’
ওসমান আবার হাসতে হাসতে বলে : ‘ঐ যে ইসইলইমাইন ইগু ইপ ইধ ইন কী সব…’
হায়দারের আর বুঝতে বাকি থাকে না, সে তার বন্ধুর কাছে ধরা পড়ে গেছে। অতএব লুকিয়ে আর লাভ নেই।
সে এবার স্পষ্ট করে উচ্চ শব্দে বলে : ‘ইসইলইমাইন ইগু ইপ ইধ ইন এর অর্থ জানিস।’
এবার ওসমানের হাসি মিলিয়ে যায়। ওর মুখে চিন্তার ছাপ।
সে বলে : ‘কেন? কেন? হঠাৎ এসব আজব শব্দের অর্থ জানার কী দরকার পড়লো, বন্ধু।’
ওসমান বলে : ‘চলো, বাড়ি গিয়ে দেখি কোনো ডিকশনারিতে অর্থ পাই কি না।’
হায়দার ওর কথা শুনে অবাক হয়ে জানতে চায় : ‘কোন ভাষার ডিকশনারি দেখবে, বুঝতেই তো পারছি না এটা কোন জাতের ভাষা’।
ওসমানদের বাড়িও লাল পাহাড়ে। তবে হায়দারদের মতো মাটির ঘর না। ওরা থাকে দালান বাড়িতে। ওসমানের বাবা বন বিভাগের বড়ো কর্মকর্তা। সরকারি তিন তলা বাড়ি ওদের। হায়দার আর ওসমান একই স্কুলে পড়ে। দু’জনের বাড়ি খুব কাছাকাছি না হলেও এই মসজিদ ওদের মধ্যে এক সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। স্কুলে তো কথা বলার খুব একটা সময় হয় না, পড়া লেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকে দুই বন্ধু। টিফিনের যে আধ ঘণ্টা সময় তাও শেষ হয়ে যায় নামাজ আর খাওয়ায়। তাই মসজিদে নামাজের পর মন খুলে কথা বলতে পারে। আজ শুক্রবার হওয়ায় দু’জনেরই তেমন তাড়া নেই। তাই হায়দার ইচ্ছে করলেই ওসমানদের বাসায় যেতে পারে। কিন্তু সে বলে : ‘এখন নয়, নামাজ শেষে বাড়ি না ফিরলে মা চিন্তা করবেন। মাকে বলে পরে আসবো।’ ওসমান আপত্তি করে না। দু’জন দু’টি পথ ধরে যার যার বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে।

দুই.
আকাশটা আজ একটু বেশি নীল। নরম মিষ্টি রোদ। লাল পাহাড়ের বুকে সবুজ পাতায় ভরা ঝাঁকরা চুলের মতো পাতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শাল গাছগুলো। হালকা বাতাস বইছে। সকালের বাতাস বড়ো মিষ্টি। হঠাৎ ওর নানার কথা মনে পড়ে যায়। তিনি প্রতিদিন খুব ভোরে ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করার পর ওকে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন। তিনি বলতেন, ‘সকাল বেলার হাওয়া, লাখ টাকার মেওয়া’। মেওয়া শব্দের অর্থ সে জানতো না, তার নানার কাছ থেকে শিখেছে, মেওয়া মানে হলো ফল। অর্থাৎ লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফল-মূল খেলে শরীর স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকে, সকাল বেলার মিষ্টি বাতাসে হাঁটাও তেমন ভালো।
বনের পাখিগুলো জেগে উঠেছে। সবাই যার যার ভাষায় ঐকতান তুলে কলবর করছে। খুশিতে হায়দারের মনটা ভরে ওঠে। সত্যি কত সুন্দর করে আল্লাহ এই পৃথিবীটা মানুষের জন্য সাজিয়েছেন।
মনের অজান্তেই কণ্ঠ ছেড়ে তেলাওয়াত করতে থাকে : ‘ফাবি আইয়্যি আ-লা-য়ি রব্বিকুমা- তুকায্যিবা-ন্।’ অর্থাৎ সুতরাং, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?
এই সূরা আর রহমানও নানার সাথে হাঁটতে হাঁটতে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে।
ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হয়ে হায়দারের নানা পবিত্র কোরআনের সূরা আর রহমান তেলাওয়াত করতেন এবং অর্থগুলো সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। হায়দারের মনে পড়ে ‘তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে’ এখানে উভয় শব্দ দিয়ে আল্লাহতায়ালা জিন ও মানুষের কথা বলেছেন।’ হায়দারের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। সে মনে মনে মরহুম নানার রূহের মাগফিরাত কামনা করে।
শা-শা-শা শব্দ করে তিনটা মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে চলে গেল। সবার মাথায় কালো হেলমেট। হেলমেটের সামনের গ্লাসটাও কালো। কাউকে চেনার উপায় নেই। এত সকালে বনের ভেতর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে ওরা কারা? গতকাল দুপুরে দেখা সেই লোকগুলো নয় তো? হায়দারের সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। ওরা কি কোনো চোরাকারবারি। বিষয়টিকে সে কি ওসমানের বাবাকে জানাবে? এমন সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে হায়দার। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ওর সন্দেহ যদি অমূলক হয়, শুধু শুধু আংকেল টেনশন করবেন। হয় তো এমন আয়োজন করবেন যে, ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। তখন আর ওদের হদিস পাওয়া যাবে না। আবার পরিস্থিতি শান্ত হলে গোপনে এসে অঘটন ঠিকই ঘটাবে। তাই এখনই নয়, আগে বিষয়টি নিয়ে খোঁজ-খবর নিতে হবে। তারপর আংকেলকে জানাতে হবে। কারণ বিষয়টি যদি সত্যি সত্যি গুরুতর কিছু না হয়, তখন ওকে সবাই বোকা ভাববে। তাই কাউকে কিছু এখনই বলা যাবে না। ওসমানকেও বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে হবে। বাক্যগুলোর অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে যেন বিষয়টি জানাজানি না করে বসে।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই হায়দার বুঝতে পারে। মা খেজুর রসের পায়েস রান্না করছেন। এত দূর থেকেও মৌ মৌ গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। হায়দারদের বাড়ির পাশের এক চিলতে জমিতে সবজি বাগান। লাল শাক, পালং শাক, ফুলকপি, বাঁধা কপিগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন পটে আঁকা কোনো ছবি। পুব আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। লাল- পালংয়ের শিশিরের ওপর সকালের সোনালি রোদের আলো পড়ায় ছবিটা আরো অপরূপ হয়ে উঠেছে। হায়দার বাড়ির বাইরে আঙিনায় এসে দাঁড়ায়। গাভী দুহানোর শব্দ শুনতে পায়। প্রতিদিন এই সময় বাবা নয় তো মা উঠানে গাভীটাকে বেঁধে দুহিয়ে দুধ সংগ্রহ করেন। নিজের গাছের খেজুরের রস আর গাভীর দুধ দিয়ে রান্না করা পায়েসের মজাদার স্বাদের কথা মনে পড়তেই, বন্ধু ওসমানের জন্য মনটা খারাপ হয়ে যায়। ওকে সাথে আনলে খারাপ হতো না, দুই বন্ধু মিলে পায়েস খাওয়ার মজাই আলাদা। সে আস্তে আস্তে ওর ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ওর ছোটো বোন হাসি ঘরের বারান্দায় পাটি বিছিয়ে আমপারায় কায়দা পড়ছে, ‘আলিফ জবর আ, বা জবর বা…’

তিন.
মাটির ঘরের বারান্দায় বেতের বানানো শীতল পাটি। শীতকালের সকাল তাই পাটির ওপর কম্বল বিছিয়ে দিয়েছেন হায়দারের মা। ওখানে বসে ছোটো বোন হাসি আমপারার কায়দা পড়ছে। একটু দূরে রান্নাঘরের পাশে বাড়ির উঠানের চুলায় মা পায়েস রান্না করছেন। সাথে সাথে হাসির পড়ার দিকে খেয়াল করছেন। কোথাও ভুল করলে এখান থেকেই শুদ্ধ করে দিচ্ছেন। বোনের পাশে হায়দার বসে। তার আগে ঘর থেকে পবিত্র কোরআন হাদিস আর ইসলামী সাহিত্য নিয়ে আসে। আজ শুক্রবার তাই কম পক্ষে একঘণ্টা সে কোরআন হাদিস আর ইসলামী সাহিত্য পড়বে। এটা তার প্রতি শুক্রবারের রুটিন। সংসারের জরুরি কোনো কাজ না থাকলে প্রতি শুক্রবার সে পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোরআন হাদিস আর ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করে। অন্যদিন স্কুলের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু সময় পায় ততটুকুই পড়ে।
মায়ের রান্না শেষ। হায়দারের আরো বেশি বেশি ওসমানের কথা মনে পড়ছে। সে ভাবছে, মাকে কী বলবে? অধ্যয়ন শেষ করে সে ওসমানদের বাসায় যাবে, ওর জন্য আলাদা করে পায়েস রাখবে। এমন সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যেই সে বাড়ির বাহির আঙিনা থেকে ডাক শুনতে পায়? হায়দার চমকে উঠে। এতো ওসমানের গলা।
সে দ্রুত বাইরে আসে। আরে এতো ওসমানই। একটা ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায়দার আশ্চার্য হয়। ব্যাপার কী? ব্যাকপ্যাক পিঠে, তার মানে সে কি তবে দূরে কোথাও যাচ্ছে? আজ স্কুলও নেই। আর দূরে কোথায় যাবে? সে তো একা একা বনের বাইরে কোথাও যায় না। এমন কি স্কুলেও না। ওর বাবা নয় তো ড্রাইভার গাড়িতে করে নামিয়ে দিয়ে আসে। ফেরার সময় অবশ্য মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে একাই আসে। তাহলে আজ কোথায় যাচ্ছে? হায়দারের মন আর বাধ মানলো না, সে বলেই ফেললো : ‘কোথায় যচ্ছো?’
ওসমান ওর প্রশ্ন শুনে অবাক : ‘হঠাৎ, এই প্রশ্ন, আমি তো তোমার কাছেই এসেছি।’
হাদয়দার জানতে চায় : ‘তা ব্যাগ কেন, ব্যাগে কী?’
হায়দায়ের প্রশ্ন শুনে ওসমান হাসতে হাসতে বলে : ‘এই কথা, এখন বুঝতে পারলাম, এই ব্যাগ দেখে এত প্রশ্ন। এখানে তোমার জন্য বাদশাহ সোলামানের গুপ্তধন নিয়ে এসেছি। তা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবো?’
হায়দার বলল, ‘অবশ্যই না। আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম। মা আজ খেজুর গুড়ের পায়েস রান্না করেছেন। তোমাকে ছাড়া খেলে অর্ধেক মজাই কম পেতাম। আমার তো আবার মোবাইল নেই যে তোমাকে ডাকবো? এসে খুব ভালো করেছো।
ওসমান হাসতে হাসতে বলে : আরে বন্ধুর প্রতি বন্ধুর মনের টান আছে না। সেই টানেই চলে এসেছি। মনের ডাক মন ঠিকই শুনে। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন, টেলিপ্যাথি। আমি তো তোমাকে বাসায় আসতে বলেছিলাম, তোমার ঐ রহস্যময় শব্দের অর্থ উদ্ধার করতে। পরে ভাবলাম ল্যাপটপটা নিয়ে নিজেই চলে যাই।
হায়দার এবার বুঝতে পারলো কেন ওসমানের পিঠে ব্যাকপ্যাক। দুই বন্ধু এক সাথে সোজা চলে গেল হায়দারের পড়ার ঘর কাম বেডরুমে। ওসমানকে বসিয়ে রেখে হায়দার রান্নাঘরে এসে মাকে বলল : ‘মা ওসমান এসেছে।’
শুনে মা খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন, ‘খুব ভালো হয়েছে। ছুটির দিন দুই বন্ধু মিলে পড়া-লেখা করতে পারবে। ওকে দুপুরে খেয়ে যেতে চলবে। গত রাতে নালা থেকে তোমার বাবা অনেকগুলো কই, মাগুর, শিং আর একটা বড়ো মহাশোল মাছ ধরেছেন। আজ দুপুরে রান্না করব।’ কথা শেষ করে হায়দারের মা ওর হাতে পায়েস আর মুড়ির বাটি দিয়ে বলল তোমরা নাস্তা করে নাও।
নাস্তা নিয়ে ঘরে গিয়ে হায়দার দেখে ওসমান গুগল সার্চ দিয়ে ঐ রহস্যময় শব্দগুলোর অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। কিন্তু গুগল সাড়া দিচ্ছে না। তবে ওসমানের মুখে বাদশাহ সোলায়মানের গুপ্তধন শব্দ শোনার পর থেকেই ওর মনে হচ্ছে। লোকগুলো কোনো গুপ্তধন খুঁজছে না তো। কর-করকক শব্দে ওর ভাবনায় ছেদ পড়ে। এই শব্দের সাথে ওসমানও পরিচিত। তাই কেউ ভয় পেলো না।
ওসমান হাসতে হাসতে বললো : ‘কোটি টাকার সম্পদগুলো এখনো তোমার সিলিংয়ে বসবস করছে। বিক্রি করোনি।’
ওসমানের রসিকতার জবাবে হায়দারও রসিকতা করে বলে : ‘ওহে বনরাজার পুত্র, হেন অপকর্ম করিলে তো আমার বাস হতো তোমার বাবার কারাগারে।’
ওসমান জানতে চায় : ‘শুধু কি কারাগারের ভয়েই তক্ষকগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছো।’
হায়দার বলে : ‘আরে না। বাবা-মা বলে ওরা এই বনের সম্পদ। আমাদের বন্ধু, বনের পরিবেশ ঠিক রাখতে হলে ওদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কোটি টাকার লোভ শুধুই প্রতারণা। ও সব থাক। এবার কাজের কথায় আসা যাক।’
ওসমান বল, ‘তার আগে, বলো এই শব্দগুলো তুমি কোথায় কার মুখে শুনেছো। আমি তো গুগলে কিছুই পাচ্ছি না।’
হায়দার গতকালের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার গল্প শুরু করে।

চার.
লাল পাহাড়ের সবচেয়ে পূর্ব দিকের ঐ যে কালো চূড়াটা দেখা যায়। অনেক ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ভরা। দিনের বেলাতেও যেখানে সূর্যের আলোর দেখা মিলে না। সাপ, বিচ্ছু, শেয়াল আর বাঘের ভয়ে যেখানে দিনের বেলাও কেউ যায় না। গতকাল আমি হাঁটতে হাঁটতে ওর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম। মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ওদের হাবভাব সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম ওরা কারা? কী চায়? কেন এসেছে? কিন্তু ওদের কোনো কথাই আমি বুঝতে পারছিলাম না। তবে বাববার যে কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করছিল। তা আমি মুখস্থ করে ফেলি। আমার মুখস্থ করা বাক্যগুলোই হলো, ‘ইসইলইমাইন ইগু ইপ ইধ ইন’।
ওসমান বলে : ‘তুমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তোমার মুখস্থ করার ক্ষমতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ওরা কি মানুষ না জিন তাই নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। কারণ মানুষের কোনো ভাষার সাথে তো মিলছে না। এক কাজ করলে কেমন হয়, চল না আমরা দু’জন গিয়ে জায়গাটা দেখি আসি।’
হায়দার কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে : ‘দু’জন যাওয়া ঠিক হবে না। বিপদ হতে পারে। ওদের যে রূপ দেখছি। খুুবই ভয়ঙ্কর। আজ সকালেও তিনটা মোটরবাইক এদিকে যেতে দেখছি…’
ওসমান ওর কথা কেড়ে নিয়ে বলল : ‘তাহলে কি আব্বুকে বলল।’
হায়দার বলল : ‘না, ভালো করে কিছু না জেনে আংকেলকে বলা ঠিক হবে না। তবে আমাদের সাথে আরো কাউকে রাখা যায় কি না, বিপদ-আপদ হলে দ্রুত খবর দিতে পারবে।’
ওসমান ওর কথায় সায় দিয়ে বলে : ‘ঠিক বলেছিসগো। তা কাকে কাকে রাখা যায়।’
হায়দার বলল : ‘সুলতান, মামুন, সোহেল আর খলিলকে রাখলে কেমন হয়।’
ওসমান একটু চিন্তা করে বলে : ‘কাজটি করতে হবে খুব গোপনে। যদি কোনভাবে কেউ জেনে যায়, তাহলে রহস্যের কিনারা করা কঠিন হবে। তাই কথা গোপন রাখতে পারবে এবং সাহসী এমন বন্ধুদেরকেই আগে জানাতে হবে।’
হায়দার বলল : ‘তাহলে আর দেরি নয়। প্রথমে সুলতান আর মামুনকে ডাকো, ওদের মোবাইল আছে সুবিধা হবে।’
সাথে সাথে ওসমান মোবাইলে সুলতান আর মামুনের সাথে যোগাযোগ করলো। আলাপের পর ঠিক করলো আজ যোহরের নামাজের পর মসজিদে ওরা একত্রিত হবে। তারপর ঠিক করবে কীভাবে ওরা ওখানে যাবে।
আবার ওরা ‘ইসইলইমইন ইগু ইপ ইধ ইন’ লিখে গুগলে সার্চ দিলো লেখার সময় ওসমান একটি বিষয় খেয়াল করলো ‘ই’ শব্দটি কেন এতবার ব্যবহার করা হয়েছে। তার মনে হলো রহস্যটা হয় তো বা এই ‘ই’র মাঝেই লুকিয়ে আছে। বিষয়টি সে হায়দারকে জানাতেই হায়দার ওর খাতায় শব্দটি লিখে ফেললো। তারপর চিৎকার করে উঠলো, ‘পেয়েছি ! পেয়েছি!’
ওসমান বললো : ‘কী পেয়েছিস’
হায়দার : ‘সোলায়মানের গুপ্তধন।’
ওসমানের আর তর সইছে না সে বললো : ‘ভালো হবে না, কিন্তু। তাড়াতাড়ি বল কী পেয়েছিস?’
হায়দার : ‘সোলায়মানের গুপ্তধন।’
ওসমান, ‘আবারও…’
হায়দার এবার বুঝতে পারলো ওসমানের মাথায় সত্যি সত্যি বিষয়টি ঢুকেনি।
সে এবার শান্ত হয়ে বলল, ‘আমি বুঝিয়ে বলছি শোন। এই যে দেখো প্রতিটি অক্ষরের আগে ‘ই’ বসানো।’
ওসমান : ‘তাতে কি?’
হায়দার : ‘রহস্যটা এখানেই। ওরা অন্য কোনো অচিন ভাষায় কথা বলেনি। কথা বলেছে, বাংলা ভাষায়। তবে মানুষকে বোকা বানাতে প্রতিটি অক্ষরের আগে ‘ই’ বসিয়ে দিয়েছে।’
এবার ওসমান বাক্যটির দিকে ভালো করে খেয়াল করে বলে উঠলো : ‘সত্যি তো সলমন গুপ্তধন’ তার মানে ‘সোলায়মানের গুপ্তধন’। কিন্তু এখানে সোলায়মানের গুপ্তধন আসবে কোথা থেকে।
হায়দার : সোলায়মানের গুপ্তধন লিখে গুগলে সার্চ দাও তো দেখি কী আসে।
ওসমান সার্চ দেওয়ার পর ফলাফল দেখে বলল, ‘এতো বিশাল ব্যাপার অনেক কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি। তবে সবি গল্প-কাহিনি বলে মনে হচ্ছে। আসল সোলায়মান কোথায়, এই যেমন একটা গল্প দেখ, ‘কিং সলোমন’স মাইনস।
এইচ, রাইডার হ্যাগার্ড এর লেখা একটি ফিকশন। এখানে লেখা লেখকের জন্ম ১৮৫৬ সালে ইংল্যান্ডে। বড়ো আরও পাঁচ ভাই ও বোন ছিল তার। তার বাবা, একজন ভদ্রলোক, সন্তানদের কঠোর শাসনের মধ্যে রেখে বড়ো করেছেন। ছোটোবেলায় খুব শান্তশিষ্ট ছিলেন রাইডার। স্কুলে যেতে একদমই পছন্দ করতেন না। পরীক্ষায় তাকে কখনো ভালো ফল করতে দেখা যায়নি। তবে বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। তার সবচেয়ে প্রিয় বই ছিল রবিনসন ক্রুসো। ভালো লাগত থ্রি মাস্কেটিয়ার্স আর ডিকেন্সের এ টেল অব টু সিটিজ।
অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় কোয়ার্টারমেইন রোমাঞ্চকর এক অভিযানে বেরিয়েছিলেন, সঙ্গে আছেন দুই ভদ্রলোক, উদ্দেশ্য হারানো অভিযাত্রী নেভিলকে খুঁজে বের করা। রাজা সোলায়মানের গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে আফ্রিকার দুর্গম দক্ষিণে হারিয়ে গেছেন নেভিল। পথে প্রচুর বাধা-বিঘœ দেখা দিল, খেপা হাতির খপ্পরে পড়তে হলো, পাড়ি দিতে হলো ঊষর মরু, দলের অনেকে মারাও গেল। তবে অবশেষে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেন তারা। ওই এলাকা শাসন করছেন উন্মাদপ্রায় অত্যাচারী তওয়ালা। তাকে কুমন্ত্রণা দেয় গাগুল নামে এক অশুভ নারী। প্রজাদের ধারণা আসল সম্রাট ইগনোসি ছোটোবেলায় মারা গেছেন, অর্থাৎ তওয়ালা বৈধ সম্রাট নন। এরপর বৈধ সম্রাটকে ক্ষমতায় বসানোর পালা এবং খনির ভেতর ঢুকে হীরের সন্ধান করা, দুটোই সম্ভব করে দেখালেন তারা। তবে তা করতে গিয়ে আকাশের সূর্যকে পর্যন্ত একবার নিভিয়ে দিতে হলো।’
হায়দার চিন্তায় পড়ে গেল। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘এই গল্পের সোলায়মান সে তো সেই আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গলে। তার সাথে এই লাল পাহাড়ের জঙ্গলের কী সম্পর্ক, কিছু তো মাথায় আসছে না।’
আল্লাহু-আকবার আল্লাহু আকবার, যোহরের নামাজের আযান হচ্ছে। ওসমান ল্যাপটপ বন্ধ করে বললো : ‘যাক আজ অনেক দূর এগিয়েছি। আশা করি এর একটা কিনারা আমরা করতে পারবো। এবার নামাজে যেতে হবে।’
হায়দার : ‘নামাজে যেতে হবে। সুলতান আর মামুনের সাথে বসতে হবে। সবই ঠিক। মা কিন্তু তোমাকে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছেন।’
ওসমান : ‘খালা আম্মাকে বলো নামাজ শেষে সুলতান আর মামুনও আমাদের সাথে আসবে।’
হায়দার : ‘মা, খুশিই হবেন, সমস্যা নেই।’

পাঁচ.
শীতের দুপুর। সূর্যটা মধ্য আকাশে জ্বলছে। কিন্তু রোদের তেজ তেমনটা নেই। ঠান্ডা বাতাস বইছে। পথের পাশে গজারি গাছের নিচের আপনা-আপনি বেড়ে ওঠা সেই গাছগুলোর পাতা হলুদ হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে নিচের সেগুলো সংগ্রহ করলে এখন বার্লি করা যাবে। কিন্তু বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া এ কাজ করা যাবে না। এর অবশ্য কারণও আছে। অবুঝ মানুষগুলো তা সংগ্রহ করতে এসে বনের ছোটো ছোটো গাছ কেটে নষ্ট করে। গজারির পাতা ঝরার সময় এখন। ঝরা পাতাগুলো শুকিয়ে গাছের নিচে জমে আছে। সংগ্রহ করলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এখানেও আছে বিপত্তি। পাতা সংগ্রহের ছলে কাঠচোররা শুকনো পাতায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বড়ো বড়ো গজারি গাছগুলো আগুনের উত্তাপে মরে যায়। কাঠচোররা শুকনো মরা গাছ এই অজুহাতে তা প্রকাশ্যে নিয়ে যায়। ঝরা পাতার ফাঁকে সাপ-বিচ্ছু থাকতে পারে তাই হায়দার ও ওসমান জঙ্গল এড়িয়ে বন বিভাগের পথ ধরে হেঁটে মসজিদে যায়। দুই বন্ধু গিয়ে দেখে সুলতান ও মামুন সুন্নত নামাজ পড়ছে। ওরাও অজু করে মসজিদে ঢুকে প্রথমে দুখুলুল জুমার দুই রাকাত এবং পরে জোহরের চার রাকাত সুন্নত পড়ে ফরজের জন্য অপেক্ষা করে। ওরা সব সময় চেষ্টা করে দুখুলুল জুমার নামাজ আদায় করতে। জুমার দিন ছাড়াও সুযোগ পেলেই এই সুন্নত আমলটি মিস করে না। সুন্নত শেষের পাঁচ মিনিট পড়েই ফরজ নামাজ শুরু হয়।
নামাজ শেষে চার বন্ধু গোল হয়ে মসজিদের বারান্দায় বসে। ওদের দেখে ইমাম সাহেব এগিয়ে এসে বলেন, ‘কী ব্যাপার, মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু।’
হায়দার হাসতে হাসতে বলে, ‘তেমন কিছু না হুজুর বাদশাহ সোলায়মানের গুপ্তধন।’ ওসমান ইশারা দেয়। সে ইশার অর্থ বুঝতে পারে। সাবধান হয়। হুজুরকে এসব আগেই বলা ঠিক হবে না। কিন্তু সোলায়মান নামটি শোনার পর হুজুরের আগ্রহ বেড়ে যায়।
তিনি বলেন : ‘তোমরা কোন সোলায়মানের কথা বলছো। আল্লাহর নবী সোলায়মান আ.’-এর কথা। তিনি তো বাদশাও ছিলেন।’
ইমাম সাহেবের কথায় ওসমানের আগ্রহ বেড়ে যায়। ওঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘সোলায়মান আ. নবী ও বাদশা ছিলেন। তিনি কি অনেক ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন।’
ইমাম সাহেব : ‘অবশ্যই। আল্লাহতায়ালা তাঁকে দুনিয়ায় এমন বাদশাহি দিয়েছেন যে, তার মতো আর কোনো বাদশা এই দুনিয়ায় আর কোনদিন আসবে না। তিনি শুধু মানুষ নয়, জিনদেরও শাসন করতেন। সব জীব-জন্তুর ভাষা বুঝতে পারতেন। বাতাসকে তার নিয়ন্ত্রাধীন করে দিয়েছিলেন। এই যুগের মতো তখন বিমান ছিল না, কিন্তু তার জাহাজ নিয়ে তিনি বাতাসে উড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে পারতেন। জিনরা সাগরের নিচ থেকে মনি মুক্তাসহ বিভিন্ন মূল্যবান রত্ন তাকে সংগ্রহ করে দিতো।’
ওসমানের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। সে আরো জানতে চায়, ‘তার কোনো ধন সম্পদ কি এখনো কোথাও জমানো আছে।’
ইমাম সাহেব বলেন, ‘কেন, তুমি কি তার সন্ধান করবে। তার গুপ্তধন দিয়ে অনেক গল্প-কাহিনি আছে। কিন্তু আসল সত্য তো আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারো জানার কথা নয়।’
ওরা এক সাথে বলে, ‘ঠিক। ঠিক। আল্লাহ ছাড়া আর করো তো জানার কথা নয়। সেই কত শত হাজার বছর আগের কথা।’
হায়দার সবাইকে তাগিদ দেয়, ‘চলো, মা চিন্তা করবেন। উনি রান্না করে বসে আছেন।’
কিন্তু বাদশাহ সোলায়মানের গুপ্তধনের সন্ধান কীভাবে পাবে সেই চিন্তায় খাওয়ার কথা ওরা ভুলে গেছে। ইমাম সাহেব বলেন, ‘এখন তাহলে থাক। আসরের নামাজের পর তোমাদেরকে সেই কাহিনি বলব।’
মামুন বলে, ‘ঠিক আছে। আজ আসরের পর আমরা ক্রিকেট খেলবো না। হুজুরের কাছে নবী সোলায়মান আ.-এর গুপ্তধনের কাহিনি শুনব।’
হুজুর বলেন, ‘কিন্তু শরীরের জন্য তো খেলাধুলারও দরকার আছে।’
হায়দার বলে, ‘একদিন বাদ দিলে কিছু হবে না।’
হুজুর বলেন, ‘সব কাজই নিয়মিত করার অভ্যাস করবে। সপ্তাহে কমপক্ষে ৫-৬ দিন অবশ্যই।
সবাই একসাথে বলল, ‘ঠিক আছে। আপনার কথা মনে রাখবো।’
হায়দার আবারও তাগাদা দেয়, ‘চলো, ক্ষুধায় পেট চুঁচুঁ করছে।’ ইমাম সাহেবের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে ওরা হায়দারদের বাড়ির দিকে রওনা হয়।

ছয়.
সুলতান আর মামুন অবাক। কেন ওদের এভাবে ডাকা হলো ওরা কিছু বুঝতে পারছে না। প্রথমে মুখ খোলে মামুন, ‘হায়দারদের বাসায় খাওয়ার দাওয়াত খেতে আমাদের ডেকে এনেছো?’
ওসমান হাসতে হাসতে বলে : ‘অবশ্যই। তবে আরো জরুরি বিষয় আছে, রাস্তায় তা আলোচনা না করাই ভালো।’
এতক্ষণ চুপচাপ সব পর্যবেক্ষণ করছিল সুলতান। ওর স্বভাবই এমন। কথা বলে খুব কম শোনে বেশি। এবার সে আর চুপ থাকতে পারছে না। তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় বলল : ‘তাহলে আর কথা নয়। হায়দারদের বাড়ি গিয়ে হবে আমাদের মিটিং।’
মিটিং শব্দটি শুনে ওরা খুব মজা পায়। অন্যরকম একটা অনুভূতি ওদের ওপর ভর করে। মিটিং, সভা এসব তো বড়োদের বড়ো বড়ো ব্যাপার। ওরা এখন সেই বড়ো কাজটাই করতে যাচ্ছে। কিন্তু আর তেমন কথা বলে না। একটা খরগোশ ওদের সামনে দিয়ে লাফ দিয়ে চলে যায়। বনের পাশের পথটা এই দুপুরেও কেমন শান্ত ছায়া নিবিড়। সবুজ পাতার আলতো বাতাস ওদের ক্লান্ত হতে দেয় না। প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাসের এটাই মজা। হাঁটতে হাঁটতে ওরা হায়দারদের বাড়ি চলে এসেছে। ওদের বাইরে দাঁড় করিয়ে হায়দার বাড়ির ভেতরের যায়। সবকিছু ঠিক আছে কি না দেখতে। কিছুক্ষণ পর হায়দারের বাবা বের হয়ে আসেন। তিনি বলেন : ‘তোমরা বাইরে দাঁড়িয়ে কেন ভেতরে আসো।’ ওনার পিছনে পিছনে তিনজন ভেতরে যায়। বাড়ির বারান্দায় শীতল পাটি বিছিয়ে খাওয়ার আয়োজন করে বসে আছে হায়দার। ওরা এক সাথে খেতে বসে। হায়দারের বাবা খাবার পরিবেশন করেন। কৈ মাছ ভাজি, মহাশোল মাছ রান্না, হাঁসের গোশত আর সবশেষে খেজুর গুড়ের পায়েস ওরা মজা করে খায়। হায়দারের বাবা-মা ছেলের বন্ধুদের আপ্যায়ন করতে পেরে খুব খুশি হন। সব নিজের চাষ করা জিনিস। নালা থেকে ধরা মাছ। হায়দাররা খুব ধনী না হলেও গরিব নয়। মনের দিক দিয়ে অনেক অনেক ধনী ওর বাবা-মা।

সাত.
বিশ্রামের একটুও সময় নেই।
খাওয়ার পরই ওরা মিটিংয়ে বসে। ওসমান ওদের তার প্রাথমিক অনুসন্ধানের কথা সবার সামনে তুলে ধরে।
ওরা সবাই নিশ্চিত হয়, ওই লোকগুলো কোনো গুপ্তধনের তালাশেই এখানে গোপন মিশন নিয়ে এসেছে। তাই তারা স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে পাহাড় খনন করছে। ঐ এলাকাটা নির্জন হলেও দিনের বেলা চলাচল করলে যে কেউ সন্দেহ করতে পারে, তাই তারা খুব গোপনে বনের পাহারাদারদের ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতকে বেছে নিয়েছে। এখন ওরা কী করবে, ভাবনায় পড়ে যায়। বড়োদের জানাবে, নাকি আরো অনুসন্ধানের পর বিষয়টি ভালোভাবে জেনে নিশ্চিত হয়ে তবেই জানাবে। হায়দার সবাইকে উদ্দেশ করে বলে : ‘আমি বাবার কাছে শুনেছি এই এলাকা অতি প্রাচীন কালে একজন বাদশা শাসন করতেন। তাদের অনেক ধন দৌলত ছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই ধন-দৌলতসহ রাজপ্রাসাদ মাটির নিচের হারিয়ে গেছে।’
হায়দারের কথা শেষ হতেই খলিল বলল : ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’
মামুন বলল : ‘কি ইউরেকা বলে চিৎকার করছো কেন?’
সোহেল : ‘ইউরেকা অর্থ পেয়েছি, তাও জানো না?’
মামুন বলল : তাতো বুঝলাম, কিন্তু পেলেটা কী?’
সবাইকে থামিয়ে শান্ত গলায় ওসমান বলল, ‘শোন হায়দারের কথা আমরা বুঝতে পারলাম ধন দৌলতসহ রাজপ্রাসাদ মাটির নিচে হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি জেনেই ঐ লোকগুলো এসেছে। তারা কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সঠিক স্থানও নির্ণয় করেছে। কিন্তু সরকারকে না জানিয়ে দেশের এই সম্পদ লুটের জন্য অতি গোপনে এই পাহাড়ের টিলা খোঁড়াখুঁড়ি করছে।’
মামুন ওসমানকে উদ্দেশ করে বলল : ‘তাহলো তো কেল্লা ফতেহ, তোমার বাবাকে বলো, তিনিই ব্যবস্থা নিবেন।’
ওসমান বলল : ‘তুমি ঠিক বলছো। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে তো বাবাকে জানানো কি ঠিক হবে?’
সবাই এক সাথে বলে ওঠে : ‘তা ঠিক। তাহলে…’
হায়দার বলল : ‘আগে আমরা গিয়ে নিশ্চিত হই। তারপর…’
হায়দারের কথায় সবাই একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলো, আজ আসরের নামাজের পর সবাই এই এলাকাটা খুব গোপনে আগে পর্যবেক্ষণ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে কী করা যায়।

আট.
পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। ওরা সবাই মসজিদে আসরের নামাজের পর বের হয়ে যায়। ইমাম সাহেবকে ওদের অভিযানের কথা কিছু না বলে, শুধু জানিয়ে যায়, আজ নয় অন্য কোনো দিন তার কাছ থেকে নবী সোলায়মান আ.-এর কাহিনি শুনবে। আজ তারা সবাই একটা জরুরি কাজে বের হবে। যেই কথা সেই কাজ।
ওরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গহিন বনের সেই লাল পাহাড়ের চূড়ার দিকে অগ্রসর হয়। হায়দারের সাথে সোহেল পশ্চিম দিক থেকে ওসমানের সাথে মামুন পূর্ব দিক এবং আর খলিল আর সুলতান দক্ষিণ দিক থেকে পাহাড়ের দিকে খুব সাবধানে হাঁটতে থাকে। উত্তর দিকটায় একটি বড়ো খাল তাই ওদিকে এই সময় যাওয়া খুব সহজ ও নিরাপদ নয়।
কিছু দূর যাওয়ার পরেই প্রথমে বাধার মুখে পড়ে খলিল আর সুলতান। বিশাল দেহী দু’জন লোক ওদের দিকে বন্দুক তাক করে থামতে বলে। তারপর জানতে চায়, ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছো?’
ভয়ে ওদের গলা শুকিয়ে যায়।
খলিল আমতা আমতা করে বলল : ‘না আমরা বেড়াতে বের হয়েছি।’
ওদের কথা শেষ হতেই ওকিটকিতে কথা বলা শুরু করে। খলিল ও সুলতান এই ফাঁকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
লোকটি কথা শেষ করেই বলে, ‘চলো তোমাদের বেড়ানোর ব্যবস্থা করছি। তোমার আরো বন্ধু আছে তাই না, তাদের সাথেও তোমাদের দেখা হবে, খুব ভালো লাগবে। গোয়েন্দাগিরির মজা বুঝবে।’ খলিল এবার সুলতানদের বুঝতে অসুবিধা হয় না বাকিরাও ধরা পড়ে গেছে। এখন উপায়?
ওরা যা ভেবেছিল তাই সত্যি হলো। এই লোকগুলো আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সদস্য। বিভিন্ন দেশ থেকে মহা মূল্যবান পুরো স্মৃতিচিহ্ন, পুরাকীর্তি ও সোনা, মণি, মুক্তা বিভিন্নভাবে অবৈধ পন্থায় সংগ্রহ করে। তারপর তা বিদেশে পাচার করে। কোটি কোটি টাকায় বিক্রি করে।
খলিল আর সুলতানের দুই হাত ওরা বেঁধে ফেলে, মোবাইল ফোন টর্চ লাইটসহ সবকিছু কেড়ে নিয়ে একটি গর্তে নিয়ে আটকে রাখে। অন্ধকারে ওরা কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তবে বুঝতে পারে এর আগে আরো কাউকে ধরে এনে এখানে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু ওরা কারা হায়দার, সোহেল, ওসমান, মামুন না অন্য কেউ। প্রথমে খলিল ফিস ফিস করে বলে : ‘আমি খলিল, এখানে আর কেউ আছো?’ তারপরও একে একে সবাই মুখ খুলে। ওরা সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। ওরা ভাবতেই পারেনি। এভাবে আটকা পড়বে। তাহলে বড়োদেরকে বিষয়টি জানিয়ে পরে আসতো। আবার এ কথাও ভাবছে, ‘তাহলে হয় তো ওরা বিশ্বাস করতো না। বিশ্বাস না করলে ঘটতো আরেক বিপদ। ওদেরকে এই অভিযানের আয়োজনই করতে দিতো না।
ওসমান ভাবছে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। এখন যে অবস্থায় পড়েছে তা থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজে বের করতেই হবে। তা না হলে ওদেরকেও বিক্রি করে দেবে এই ক্রিমিনালরা, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

নয়.
মসজিদে মাগরিবের আজান হচ্ছে। আজানের সুর কানে আসার সাথে সাথে নামাজে যাওয়ার জন্য সবার মন আনচান করছে। কিন্তু উপায় নেই। গুহার মুখ বন্ধ। সামনে আছে অস্ত্র হাতে পাহারাদার।
হায়দার সবাইকে বলল : ‘ভয়ের কিছু নেই। আল্লাহতায়ালার দয়া হলে তিনি এর চেয়ে বড়ো বিপদ থেকেও তার বান্দাদের বাঁচাতে পারেন। এসো আমরা সবাই সালাতুল মাগরিব পড়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করি।’
ওরা যার যার অবস্থান থেকে নামাজ পড়া শুরু করলো।

দশ.
মসজিদে নামাজে নিয়মিত কিশোর মুসল্লি ওসমান আর হায়দার নেই। বিষয়টি ইমাম সাহেবকে ভাবনায় ফেললো। ওরা কোথায় গেল। আসরের পর খেলা বাদ দিয়ে নবী সোলায়মান আ.-এর কাহিনি শোনতে চেয়েছিল। কিন্তু জরুরি কাজ আছে বলে, চলে গেল। তাহলে ওরা গেল কোথায়?
মাগরিবের পর বাড়ি না ফেরায় সবার বাড়ি থেকেও খোঁজ-খবর শুরু হলো। ওদের মোবাইল ফোন বন্ধ।
সবার একই প্রশ্ন এতগুলো ছেলে এক সাথে কোথায় হারিয়ে গেল? ওরা তো বখাটে কিংবা বাবা-মার অবাধ্য সন্তান নয়। সবাই মেধাবী ছাত্র এবং ভালো ছেলে। তাহলে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু কী সেই রহস্য।
রাত বাড়ছে। ওসমানের বাবা থানায় ফোন করেন। সাথে সাথে ওনার মনে পড়ে গত কয়েক দিন ধরে ওসমান ল্যাপটপে কী যেন খোঁজাখুঁজি করছিল। তিনি ল্যাপটপ খুলতেই জিপিএস সিস্টেম চালু হয়ে যায়। তিনি এখন অস্পষ্ট কথাবার্তা শোনতে পাচ্ছেন। তিনি ওসমানের কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন। ওসমান ওর বন্ধুরা ফিসফিস করে কী যেন বলছে। কিন্তু কিছু দেখা যাচ্ছে না। গুগল ম্যাপের মাধ্যমে লোকেশন শনাক্ত করার পর ভয়ে ওনার মুখ শুকিয়ে যায়। বনের এত গভীরে এত রাতে ওরা কী করছে। তিনি মোবাইল রিং করছেন কিন্তু সংযোগ পাচ্ছেন না। ল্যাপটপে সংযুক্ত জিপিআরএসের সাথে মোবাইল সংযোগ নেই। অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করেছে। ইতোমধ্যে পুলিশ ফোর্স হাজির হয়ে গেছে। ওসি সাহেবকে ওসমানের বাবা সব কিছু বুঝিয়ে বলেন। তিনি তাকে অভয় দিয়ে বলেন : ‘চিন্তা করবেন না। লোকেশন যেহেতু পাওয়া গেছে আমরা এখনই অভিযান শুরু করব। যত দুর্গম পাহাড়ই হোক না কেন, আমরা কোনো অঘটনের আগেই পৌঁছে যাব ইনশাআল্লাহ।’
অভিযান শুরু হয়ে যায়। ওসি সাহেব ঘটনার বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারেন ওরা কোনো ক্রিমিনাল চক্রের হাতে আটক হয়েছে। খুব সাবধানে অগ্রসর না হলে বড়ো ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটা অসম্ভব নয়।

এগারো.
ওরাও বসে নেই। নামাজের পর দোয়া করে যে যার মতো করে যার যার বাঁধন খোলার চেষ্টা করে। প্রথমেই মামুন সফল হয়। এখন আর ওদের পায় কে? মামুন একে একে সবার বাঁধন খুলে দেয়। এরপর খুব সাবধানে গুহার মুখের ঢাকনা খুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু কাজটি খুব সহজ নয়। ঢাকনা হেলান দিয়ে বসে আছে তিনজন ক্রিমিনাল, পাহারা দিচ্ছে সবার হাতে বন্দুক। তাহলে উপায়। ওরা সিদ্ধান্ত নেয়। ভেতর থেকে ঢাকনা খুলতে গেলে ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। এমন কিছু করতে হবে যাতে ওরা নিজেরাই ঢাকনা খুলে দেয়, নয় তো দূরে চলে যায়। বুদ্ধিটা আসে খলিলের মাথায়। সে সাপ সাপ বলে চিৎকার শুরু করে। ওর সাথে সবাই তাল মিলায়। ওদের চিৎকারে ক্রিমিনালরা নিজেই ঢাকনা খুলে দেয়, ওরা আরো জোরে সাপ সাপ বলে চিৎকার করতে থাকে। ক্রিমিনালরা ভয়ে গুহা থেকে বের হয়ে দৌড় দেয়। হায়দার, ওসমান, সুলতান, মামুন, সোহেল, খলিলরাও আর বসে থাকবে কেন? ওরাও একে একে বের হয়ে আসে। ওসমান ক্রিমিনালদের ফেলে যাওয়া বন্দুক হাতে তুলে নিয়ে ওদের দিকে তাক করে।
ক্রিমিনালদের একজন চিৎকার করে বলে : ‘তোমরা বোকামি করো না তাহলে মারা পড়বে। বুদ্ধিমান ছেলের মতো বন্দুক ফেলে দাও, আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না। গুপ্তধন নিয়ে চলে যাওয়ার সময় তোমাদেরকে ছেড়ে দেবো।’
‘কে কাদের ছাড়বে।’ ওসি সাহেবের হুঙ্কার শুনে ক্রিমিনালরা পালানোর পথ খুঁজতে থাকে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, পুলিশ সারা এলাকা ঘিরে ফেলেছে। বনের বাইরেও অপেক্ষা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক ট্রাক সদস্য। কোন উপায় না দেখে ক্রিমিনালরা আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত তুলে দাঁড়িয়ে যায়।’
পরের দিনের প্রত্যেকটি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে ছাপা হয় ছবিসহ দুঃসাহসী অভিযানের কাহিনি। বিশাল লিড হেডিং
‘ছয় কিশোরের দুঃসাহসিক অভিযানে আন্তর্জাতিক পাচারকারী দল গ্রেফতার। লাল পাহাড়ের চূড়া খনন করে কয়েক হাজার বছর আগের গুপ্তধন উদ্ধার!’

SHARE

Leave a Reply