Home গল্প শিশু সারার বয়স যখন দুই থেকে চার বছর -চেমন আরা

শিশু সারার বয়স যখন দুই থেকে চার বছর -চেমন আরা

সারার স্কুল জীবন শুরু হয়ে গেছে তিন বছর পার হওয়ার আগেই। ওর বাবা প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় সারাকে তার দাদা-দাদুর বিছানার কাছে নিয়ে আসে। বলে দাদা-দাদুকে আল্লাহ হাফেজ বলো। সঙ্গে সঙ্গে সে আল্লাহ হাফেজ বলে। তারপর খুব চটপট ভঙ্গিতে প্লাস্টিকের ব্যাগে টিফিনের খাবার নিয়ে ওর মার হাত ধরে গাড়িতে উঠে যায়। মাঝে মাঝে ওর খালামণিও ওকে নিয়ে যায় তার গাড়িতে।
আরেক জগতের সদস্য এখন সে। প্রথম কয়দিন স্কুল থেকে ফেরার পর তাকে খুব ক্লান্ত দেখাত, আস্তে আস্তে তার মধ্যে সজীবতা ফিরে এসেছে। সম্প্রতি স্কুল থেকে সে খুব ভারিক্কি চালে ফিরে, মুখটা খুব গম্ভীর করে, মনে হয় সে যেন বিরাট কিছু একটা জয় করে এসেছে।
শীতের মৌসুম যাচ্ছে, কোনো কোনো দিন সোয়েটারটা খুলে কোমরে পেঁচিয়ে ঘরে ফিরে সে। ঘরে ফিরলে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে সারা স্কুলে কী করেছ? সে বলে বেবিদের সঙ্গে খেলেছিলাম, ছবিও এঁকেছি। মিস আমাকে খুব আদর করেছে।
সারার বাবার চাকরি সাগরে। বিদেশী জাহাজের ক্যাপ্টেন। একদিন তার চলে যেতে হলো চাকরিতে। সারাকে সঙ্গে করে দাদা ও দাদু গেলেন এয়ারপোর্টে ওর বাবাকে বিদায় দিতে। ওর বাবা নেমে যাওয়ার পর সারার সে কী কান্না। তার হৃদয়বিদারক কান্নায় তার দাদাও কেঁদে ফেলেন। তার এক কথা আব্বু কোথায় যাচ্ছে, আমিও যাব। আমার আব্বুকে আমি চাই। আমি আমার আব্বুর কাছে যাব। তার কান্নাভরা এ সমস্ত কথার কোনো জবাব নেই। ফেরার পথে গাড়িতে তার দাদা বিব্রতবোধ করে তার অসহায় কান্নায়।
ওর আব্বা যাওয়ার পর থেকে সারা অন্যরকম হয়ে গেছে। হাসি খুশি কমে গেছে। কারণে অকারণে দীর্ঘ সময় কান্নাকাটি করে। প্রায়ই বলে আমার আব্বুকে এনে দাও, আমি আব্বুর কাছে যাব। কোনো সময় বলে, আমার আব্বু কেন আসে না। আব্বু জাহাজে উঠে চলে গেছে, আর আসবে না। ওর মা ওকে একা ফেলে কোথাও যেতে পারে না, গেলে সে বলে, আমার আব্বুও নাই, আম্মুও নাই।
তার বলার ভঙ্গিতে সবার চোখে পানি আসে। বাসায় বাবাই ছিল তার সঙ্গী, খেলার সাথী। খাওয়া-দাওয়া, গোসল, ঘুম, বাথরুম সব কিছুতেই তার আব্বুর প্রয়োজন। আব্বুকে পাওয়া না গেলে নেহাত দায়ে পড়ে আম্মুর কাছে যায়। এখন আব্বু চলে গেছে চাকরির প্রয়োজনে দূর বিদেশে। ছোটো সারাকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা কারো জানা নেই।
একদিন স্কুল থেকে এসে সে বলে, সব বেবির আব্বু কি প্লেনে করে বিদেশে চলে যায়, আমার আব্বুর মতন। ওরা আর আসবে না? ওকে ওর দাদু বলে কেন আসবে না দাদু, তোমার আব্বু গেছে তোমার জন্য খেলনা আনতে। খেলনা নিয়ে তোমার আব্বু ফিরে আসবে তোমার কাছে। তুমি মন খারাপ করো না দাদু। দাদুর কথায় কান্না থামলেও দিনের মধ্যে প্রায় সময়ই সে মন খারাপ করে থাকে। চোখে, মুখে বিষণœতার ছায়া, কী যেন চিন্তা করে। পরিচিত জনদের মধ্যে সারার বয়সী ছেলে-মেয়ে যাদের আছে সারার আম্মা সে সব বাড়িতে বেড়াতে যায় তাকে নিয়ে। ঐ সব বাড়িতে গেলে তার প্রথম প্রশ্ন ওদের আব্বু আছে। ওদের আমি দেখতে চাই।
ওদের আব্বুকে আমাকে দেখাও না। তার এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় তার জন্য সহানুভূতিতে আর্দ্র হয়ে উঠে বুকের ভেতরটা। যারা শুনে তাদেরও।
বয়স অনুপাতে কথাবার্তায় সে খুব পাকাপোক্ত। খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারে সে। আগামীকাল তার তিন বছর পার হয়ে চার বছরে পড়বে। তার জন্মদিনটিকে উৎসবমুখর করার জন্য বাড়ির সবাই আন্তরিক প্রয়াস চালাচ্ছে। সে যেন তার আব্বুর অভাববোধ না করে। এই চেষ্টা সবার মধ্যে। সারার মধ্যেও কিছুটা পরির্বতন লক্ষ করা যাচ্ছে। খুশিতে ডগমগ করছে সে। সবার কাছে গিয়ে বলছে জানো কাল আমার জন্মদিন। আমার হ্যাপি বার্থ ডে। আমার আব্বু আসবে। পরের দিন ১৫ মার্চ সারার জন্মদিন। সকাল বেলা চেয়ারম্যান বাড়ির এতিমখানা থেকে কয়েকজন এতিম ছেলে এনে পবিত্র কোরআন পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ওর চতুর্থ বছরের শুভযাত্রার প্রস্তুতি।
দুপুরে এতিমদের সঙ্গে আরও কয়েকজন দুস্থ মিসকিনকে খাওয়ানো হলো। সারা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সে শুধু বলছে, আমার জন্মদিন কই? আমার হ্যাপি বার্থ ডে কই? তার ছোটো ফুপি কাগজ কেটে আর্ট করে দেয়ালে তিনটি পুতুল সেঁটে দিয়েছে, ভেতরে লেখা হ্যাপি বার্থ ডে টু সারা। তার দাদা বলে ঐ যে দেয়ালে দেখছো না তোমার ছবি আঁকা হয়েছে। কোরআন পড়ান হচ্ছে, গরিবদের খাওয়ানো হচ্ছে, সব তো তোমার হায়াত দারাজের জন্য। আল্লাহ যেন তোমাকে অনেক অনেক বছর সুস্থ শরীরে বাঁচিয়ে রাখেন। মানুষের জন্য, দেশের জন্য, আল্লাহর জন্য কাজ করার সুযোগ দেন। সারা এ সমস্ত তাত্ত্বিক কথার কী বুঝলো কে জানে। তবে চুপ হয়ে সারা ঘরময় ঘুরে বেড়ায়। তার আম্মা সকালবেলা তাকে গোসল করিয়ে তার খালামণির তৈরি সালোয়ার কামিজ পরিয়ে দিয়েছে। আজমির শরিফ থেকে আনা জয়পুরী ওড়নাও দিয়েছে গলার সঙ্গে জড়িয়ে। সে নতুন পোশাক পরে সবাইকে সালাম করছে। আনন্দে উল্লসিত এখন সারা।
সকালে একবার আব্বুর কথা বললেও সারাদিন আর বলেনি। সন্ধ্যায় এলেন তার নানীর বাড়ির লোকজন। তার বয়সী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কেক কাটার উৎসব হচ্ছে। ছোটো লাল রঙের তিনটি মোমবাতি কেকের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনটি মোমবাতি মানে তিনটি বছর পার হওয়ার সঙ্কেত। সারাকে বলা হলো মোমবাতি তিনটিকে ফুঁ দিয়ে নেভাতে। সে নিভিয়ে দিল। শেষ হয়ে গেল তার তিন বছর। তারপর কেক কাটার পালা। তার জন্মদিনের জন্য বিশেষ যত্ন নিয়ে কেক তৈরি করেছে তার খালামণি। কেকটি একটি ছোটো পুতুল আকারে তৈরি। সারার হাতে একটি ছুরি ধরিয়ে দিয়ে ওর আম্মা বলে সারা কেক কাটো। সারা বলে কেমন করে কাটব। বেবি কষ্ট পাবে না? উপস্থিত সবাই সারার কথায় হেসে উঠে। এইভাবে হৈ-হল্লা, আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে সারার চতুর্থ বছরে পা দেওয়ার প্রথম দিনটি শেষ হয়। পরের দিন থেকে যেন সারার বয়স একধাপ এগিয়ে গেছে। কথাবার্তায়, চাল-চলনে যেন পাকা-পাকা ভাব। সুযোগ পেলে বলে আমার জন্মদিন চলে গেছে, আমি বড়ো হয়ে গেছি। এর পর বেশ কয়েক দিন হাসি খুশিতে কাটায় সে। ঘরের লম্বা বারান্দায় দাদা-দাদুর সঙ্গে বল নিয়ে খেলে। কোনো সময় দাদার সঙ্গে আবদার ধরে তার সাইকেলের সিটের পেছনে বসার জন্য। বলে দাদা আমি তোমাকে চালাব।
আমি বড়ো হয়েছি না? মাঝে মাঝে কোনো কোনো ব্যাপারে খুব জিদ করে। এর মধ্যে একটা জিদ হলো তার দাদাকে গোসল করানো। তার দাদা অসুস্থ। তাকে কেউ একজন সঙ্গে থেকে পানির মগ এগিয়ে দিতে হয়, মাথায় পানি ঢেলে দিতে হয়। তার দাদা গোসলে যাচ্ছে শুনলে সে দৌড়ে এসে গোসলখানার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যায়। দাদাকে বলে আজ তোমাকে আমি গোসল করাব। সত্যি বলছি দাদা। আমি তোমাকে খুবই ভালো করে গোসল করিয়ে দেবো। গোসল করাবার জন্য এমন জেদাজেদি করে সে, অনেক সময় গোসলখানার দরজা থেকে নাড়ানোও যায় না। শেষ পর্যন্ত তাকে গোসলখানায় যেতে দিতে হয়। বালতিতে পানি ভরা থাকলে সে মগে পানি নিয়ে তার দাদার গায়ে, হাতে, মাথায় পানি ঢেলে দেয় আর মুচকি মুচকি হাসে। শেষে বলে গোসল শেষ না দাদা? আস তোমার গা মুছে দেব। কিন্তু কী দিয়ে মুছাবে তোয়ালে তো ওপরে র‌্যাকে। ওপর দিক তাকিয়ে বলে আমাকে কোলে নাও। আমি তোয়ালে নেব। তাকে তোয়ালে দিলে সে বলে এবার বস, দাদা একটা প্লাস্টিকের টুলে বসলে সে তখন গা, হাত, মুছে দেয়, মাথা মুছে দেয়। এমন করে হাজার রকম কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সারার বাসার মধ্যে তার অস্তিত্বের মধুর স্পর্শ বুলিয়ে দিয়ে যায়।
জীবনের অনেক ধূলিমলিন আবর্জনার মধ্যে সারার প্রাণময় উপস্থিতি আনন্দময় সুবাস ছড়ায়। উচ্চকণ্ঠে রাগী গলায় কেউ কথা বললে সে ভীষণ উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি দাদুর কাছে এসে বলে, ওরা ঝগড়া করছে কেন? বড়ো করে কথা বলছে কেন? আমার আম্মু বলেছে বড়ো করে কথা বললে আল্লাহ রাগ করেন। ওদের ওপর আল্লাহ রাগ করবে না? মিষ্টি মেয়ে সারা। সহজে কাঁদে না। তার বয়সী বাচ্চাদের মতো দুষ্টুমিও করে না। অত্যন্ত নিয়ামানুগ চলাফেরা তার। স্কুলে যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো পড়ার সময় পড়া। দাদা দাদুর সঙ্গে ফাঁকে ফাঁকে এক আধটু দুষ্টুমি করা। বাড়ির সবার সাথে তার সম্পর্ক মধুর। মাঝে মাঝে সময় পেলে সে রান্নাঘরে গিয়ে কাজের বুয়াকে বলে বুয়া তুমি কী করছ? বুয়া যদি তরকারি কুটে সে বলে দাওনা আমাকে আমি কুটি। কোনো সময় ছোটো কাজের মেয়েটিকে বলে আস আমরা ঘোড়া, ঘোড়া খেলি। কার সঙ্গে কী ধরনের কথা বলতে হয় সহজে সে সব আয়ত্ত করে নিয়েছে।
দাদা-দাদুকে শোয়া দেখলেই সে গল্প শোনার বায়না ধরে। একটা গল্প বলো না দাদা। তার দাদা লেখক মানুষ। বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে পারে। দাদু ঠিক উল্টো। একদম গল্প বানাতে পারে না। সে দাদুকে বলে তুমি গল্প বলতে পারো না। আমার বইতে কত সুন্দর সুন্দর গল্প আছে। ভূত, পরী, রাক্ষস, ডাইনি বুড়ি আরও কত কিছুর গল্প। ঐ যে রাক্ষস আছে না? ছোটো বাচ্চারা দুষ্টুমি করলে ধরে নিয়ে যায়। আমি তো দুষ্ট না তাই আমাকে নেবে না। তাই না দাদু। সে-ই প্রশ্ন করে সে-ই উত্তর দেয়। তার দাদা-দাদু মুচকি হাসে।
কিছুদিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে সারা আগের মতো খুশি মনে স্কুলে যেতে চায় না। সকাল বেলা স্কুলে যাওয়ার আগে নানান টালবাহানা করে। নাস্তার টেবিলে নাস্তা না খাওয়ার জন্য নানান অজুহাত দেখায়। কোনো সময় বলে পেট ব্যথা করছে। কোনো সময় নাস্তার প্লেট সামনে দিলে বমি করে, ওয়াক ওয়াক করে। আবার স্কুলে গেলে সব ঠিক হয়ে যায়। খেলাধুলায়, কথাবার্তায় সে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখে।
সামনে ঈদ সারার আম্মা তার আব্বার কাছে ঈদকার্ড পাঠাচ্ছে। সারাও দেখা গেল পুরনো একটা চায়ের কাপ পানিতে ব্রাশ ভিজিয়ে রং দিয়ে ছবি আঁকছে। ভীষণ আত্মমগ্ন নিবিষ্ট সে। কেউ এসে জিজ্ঞাসা করলে বলে আমি আব্বুর কাছে ছবি পাঠাচ্ছি।
সারার দাদা লেখক মানুষ। সময় পেলে লেখেন। তাই তার টেবিলে সব সময় নানান ধরনের কলম, বলপেন মজুদ থাকে। ঈদ, পহেলা বৈশাখ, রমজান নানান তাৎপর্যপূর্ণ দিনে পত্রিকা সম্পাদকের কাছ থেকে লেখার তাগিদ আসে। এবার জোর তাগিদ এসেছে ঈদুল-ফিতরের ওপর লেখার জন্য। তিনি অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ব্যস্ত সমস্তÍ হয়ে লিখে যাচ্ছেন। এক সময় কলম রেখে তাকে চলে যেতে হলো এক সভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দিতে, রাতে এসে লেখার টেবিলে যেতে দেখা গেল তার সবচেয়ে ভালো ও দামি কলমটি ভাঙা। সারারাত মন খারাপ করে থাকলেন তিনি। এমন কাজটি কে করতে পারে, চিন্তা ভাবনা করেও সমাধান করা গেল না। সকাল বেলা সারাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তার আম্মা গোছ গাছ করে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে বলতো, সারা তোমার দাদার কলম কে ভেঙেছে? প্রশ্ন করার সাথে সাথে সারার সুন্দর মুখখানায় একটা অস্পষ্ট অপরাধের ছায়া যেন খেলে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুব আস্তে করে বললো আমি ভেঙেছি। মা বললেন কেমন করে? সে সঙে সঙে ভাঙা কলমটি হাতে নিয়ে দেখিয়ে দেয়, এমন করে ভেঙেছি। তার দাদার প্রিয় কলমটির জন্য দুঃখবোধ থাকলেও তার সত্যবাদিতায় খুশি হন, তিনি তাকে আদর করে বলেন, এমন কাজ আর করো না। সে সঙে সঙে উত্তর দেয় না না আর করবো না আম্মু।
দিন যাচ্ছে, সারা বড়ো হচ্ছে। সমাজ, পরিবার, পরিবেশ থেকে, স্কুল থেকে সে নতুন নতুন বোধে সমৃদ্ধ হচ্ছে। দুই বছর বয়স থেকে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে প্রায় সব কথাই সে বলতে পারে। কথা তার শ্রুতিমধুর। আস্তে আস্তে কথা বলার ঢং তার বদলে যাচ্ছে এখন।
আগে স্কুলে না যাওয়ার জন্য নানান ধরনের বায়না ধরতো। ইদানীং সে সব আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। খালামণির গাড়ি এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ালেই সে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে তার মাকে বলে ঐ যে গাড়ি এসে গেছে, চল আমরা যাই। দাদা, দাদু সামনে থাকলে বলে আমি স্কুলে যাচ্ছি, আল্লাহ হাফেজ বলতে বলতে মার হাত ধরে খুব সুন্দর ভঙ্গিতে হেঁটে গাড়িতে উঠে যায়।
নতুন একটা রাইম শিখেছে স্কুলে-
ভ্যা ভ্যা ব্ল্যাক শিপ
হ্যাভ ইউ এনিউল
ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার
ত্রি ব্যাগ ফুল।
মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে এই রাইমটা সে খুব সুন্দর আবৃত্তি করে। ইয়েস স্যার কথাটি এমন সুন্দর করে বলে যে, শুনতে খুব ভালো লাগে।
দুপুর বেলা দাদা, দাদু শুয়ে বিশ্রাম করছেন। তার দাদার হাতে একটা বই। এমন সময় সারা দৌড়ে আসে তার মার ঘর থেকে। হাত দুটো পিছন দিকে লুকানো। দাদাকে বলে দাদা, দাদা, খবর আছে। দাদা বই থেকে মুখটা সরাতেই সেই মুখের ওপর খেলনার পানি ছিটানোর কল দিয়ে দাদার গায়ে, মুখে পানি ছিটিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
স্কুলের প্লে গ্রুপে পড়ে। নানান ধরনের খেলা-ধুলা করাই তার স্কুল রুটিন। স্কুল থেকে সদ্য শিখে এসেছে পানি মারার খেলাটা। সেটা বাস্তবায়ন করলো, দাদার গায়ে, মুখে পানি ছিটিয়ে। দাদার মুখে কোনো কথা নেই।
বৈশাখ মাস গরম পড়েছে প্রচণ্ড। গায়ে তার সাদা গেঞ্জি ও জিন্সের হাফ প্যান্ট। দাদা বারান্দায় বসে বই পড়ছিলেন। সে বারান্দায় এসে দাদার কাছে গিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার গা থেকে মিষ্টি মোলায়েম একটা সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। দাদাকে বলে তুমি কী পড়ছ? দাদা বলেন বই পড়ছি। কেন পড়ো? তার প্রশ্ন? প্রশ্নের শেষ নেই। এত বড়ো বড়ো খাতায় তুমি কী লিখ? সব ফেলে দিব আমি। বলতে বলতে সত্যি সে হেঁচকা টান মেরে টেবিলের ওপর থেকে তার দাদার লেখার খাতাগুলি মাটিতে ফেলে দিয়ে, মিটি মিটি হাসে। দাদা খুব গম্ভীর হয়ে উচ্চকণ্ঠে রাগ দেখিয়ে বলে না সারা তোমাকে আমি আর আদর করবো না। তুমি ভালো মেয়ে না। তুমি বেশি দুষ্ট হয়ে গেছ। দুষ্ট মেয়েদের সংগে আমি কথা বলি না। সে কিছুক্ষণ দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারে দাদা তার সত্যি সত্যি রাগ করেছেন। সে মুখটি বিষণœ করে মার কাছে চলে যায়। কতক্ষণ পর আবার আসে অপরাধীর কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে। বলে দাদা, তুমি রাগ করো না। আমি আর দুষ্টুমি করবো না। দাদা হেসে তাকে কাছে টেনে নেয়।
এমন করে সারা বড়ো হয়। সংগে বাড়ির লোকজনদের দিনগুলিও আনন্দ বৈচিত্র্যের মধ্যে নতুন স্বাদে ভরপুর হয়ে থাকে।
একদিন স্কুল থেকে এসে সারার আম্মা তার দাদুর কাছে নালিশ জানায় সারার বিরুদ্ধে। বলে আম্মা সারাকে নিয়ে আর পারলাম না আজকে স্কুলে ওর কেয়ার-টেকার বলেছে আপনার মেয়েকে কয়েক দিনের মধ্যে খাঁচায় ভরে রাখতে হবে। বার করতে পারবেন না। প্লে গ্রুপে যতগুলি ছেলেমেয়ে আছে সবাই তাকে নিয়ে টানাটানি করে। তাদের সংগে রাখতে চায়। ওর মার কথায় বাড়িতে হাসির রোল ওঠে। দাদু সারাকে জিজ্ঞেস করে, কি সারা আজকে স্কুলে কী হয়েছে? সারা বলে আজ ফাহিম আর সায়েম আমাকে ডেকেছে, বলেছে ওদের কাছে বসতে। দাদু বলেন তুমি কী বলেছ? আমি জোরে জোরে ধমক দিয়েছি, বলেছি চুপ। ওরা ভয় পেয়ে গেছে। চুপ শব্দটি সে এত জোরে উচ্চারণ করে যে বলার ঢং এ সবাই আবার হেসে উঠে।
ইদানীং সে একটা কথা শিখেছে। যখনই রিকশায় উঠে, সে বলে রিকশাওয়ালা ভাই বামে, ডানে রিকশা চালাও। নতুন শব্দ সম্ভারে শব্দের মালা গেঁথে গেঁথে সে অহরহ এগুচ্ছে সামনের রাস্তায়। তিন বছর তিন মাসে সে যেভাবে তার কথার ঝুলি ভরাট করেছে, যেভাবে পরিচিত পরিবেশ থেকে, পরিচিত জনদের কাছ থেকে তাদের আচরণ নকল করছে এমন করে বুড়োরা যদি পারতো নতুন নতুন জ্ঞান ভাণ্ডারে তাদের উপলব্ধির জগৎকে সমৃদ্ধ করতে কী ভালোই না হতো। সারার আব্বা ফিরেছে কর্মস্থল থেকে। সারার আনন্দের সীমা নাই। এখন দাদা, দাদু পরিবারের অন্যজনরা তার কাছে নেই। আব্বুই সারাক্ষণের সঙ্গী। গোসল, খাওয়া-দাওয়া ঘুম সব কিছুতেই তার আব্বুর উপস্থিতি চায় সে।
স্কুল এক মাসের জন্য সামারের ছুটি। এই সময়টা সে খুব মজা করে বেড়াচ্ছে। তার আব্বু তার জন্য একটা খেলনার মেডিক্যাল বক্স এনেছে। এই বাক্সের যন্ত্রপাতি দিয়ে সে প্রথম পরীক্ষা চালায় তার দাদার ওপর। খেলনার বাক্সটা নিয়ে তার দাদাকে বলে, দাদা, দাদা দেখ না আমি ডাক্টার হয়েছি। তোমার না অসুখ? তুমি শোও। আমি তোমাকে দেখবো। তার দাদাকে শোইয়ে দিয়ে সে নানা রকম যন্ত্রপাতি বের করে পরীক্ষা করতে থাকে। পেন্সিলের মতো প্লাস্টিকের কী একটা আঙুলের ডগায় পরিয়ে দিয়ে সে যেন কী দেখে। কানের মধ্যে খেলনার স্টেথেসকোপ লাগিয়ে পেট, বুক পরীক্ষা করে। তার চোখে মুখে সত্যিকারের ডাক্টারের গাম্ভীর্য। তার দাদা দুষ্টুমি করে বলে, আহ ডাক্টার সাহেব দুঃখ পাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে সে উত্তর দেয় কেন দুঃখ পাও? ডাক্টাররা দুঃখ দেয় না। তার কথা তার কাজ কর্ম সব কিছুর মধ্যে এমন এক আনন্দের স্পর্শ আছে যা বাড়ির সবাইকে আনন্দ দেয়।
রান্নাঘরে কাজের বুয়া বেগমের মা কাজ করছে। সে রান্নাঘরে ঢুকে তাকে জিজ্ঞেস করে, বুয়া তুমি কী করছ? সারাদিন রান্নাঘরে থাকো কেন? আস তোমাকে পরীক্ষা করে দেখি। তোমার সব অসুখ ভালো করে দেবো। একদিন সারা তার বাবার সঙ্গে বেড়াতে বের হয়। বাড়ি ফিরে তার আব্বা জানালো, সারা নাকি বলছে, এই বাড়িতে সে আর থাকবে না। কর্ডিক চলে যাবে। কারণ তার ছোটো ফুফু তাকে আদর করে না, খালি খালি বকে। সারাকে দাদু জিজ্ঞেস করে তোমার ছোটো ফুপি তোমাকে শুধু বকে? সে চুপ হয়ে থাকে। ছোটো ফুপি যখন জানতে চায় সত্যি কি আমি তোমাকে বকি? কোনো আদর করি না? এমন একটা কথা তুমি আমার বিরুদ্ধে বলতে পারলে? সে অপরাধীর কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে তার ফুপির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে আর বলবো না ফুপি।
এমন করে সারা একটু একটু করে জীবনের পথে এগুচ্ছে। অজস্র হাসি আনন্দের স্মৃতিসম্ভার উপহার দিয়ে দিয়ে। সামারের ছুটিতে সারা তার আব্বু আম্মুর সঙ্গে দার্জেলিং বেড়িয়ে এলো। এসেই গাড়ি থেকে নেমে তার দাদুর কাছে গিয়ে কানে কানে বলে তোমার জন্য শাড়ি এনেছি। হঠাৎ করে যেন সারা একটু বড়ো হয়ে গেছে। দার্জেলিং তার কেমন লেগেছে দাদু জানতে চায়। সে বলে খুব ভালো। আমি ঘোড়ায় উঠেছি। তোমাকে দেখাবার জন্য আব্বু ভিডিও করে এনেছে।
দার্জেলিং থেকে আসার পর সারা বেশ হাসি খুশিতে কাটায়। কিন্তু ওখানকার কথা খুব বেশি কিছু বলে না। স্কুল খোলার পরও সে তিন চার দিন স্কুলে গেল না। যেদিন তাকে প্রথম স্কুলে যেতে হলো সে বেঁকে বসলো। না, না আমি কিছুতেই যাবো না। অনেক কষ্ট করে বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে স্কুলে পাঠানো হলো।
স্কুলের বর্ষপূর্তি হবে। সারার স্কুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। ছোটো ছোটো বাচ্চাদের নিয়েই অনুষ্ঠান। সারাও অংশ নিয়েছে। প্রে গ্রুপের ছাত্রী সে। তাদের দিয়ে বাঁদর নাচ নাচিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিতে চেষ্টা করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। সারার দাদু ও আব্বু গেল অনুষ্ঠান দেখতে। সারার ক্লাসের ছেলেরা মেয়েরা সবাই তার থেকে বয়সে বড়ো। জীবনে প্রথম স্টেজে উঠেছে সারা। ওদের সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না কিছুতেই। তবুও কোনো রকম অনুষ্ঠানের মান রক্ষা হয়। একদিন বাড়িতে মেহমান এসেছে। দাদু বসে গল্প করছেন মেহমানদের সঙ্গে। হঠাৎ করে সারা দৌড়ে এলো ভেতর ঘর থেকে। দাদুকে হাতে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল ওর মা বাবার ঘরে। বললো দেখ আমি কাজ করছি। দাদু জানতে চান কী কাজ করেছ। তার আব্বা আম্মার বিছানার চাদরটা টান টান করে বিছিয়ে, বালিশগুলো সুন্দর করে রেখেছে। দাদুকে বলে, আমি সুন্দর কাজ করছি না? খুব সুন্দর কাজ করেছ। দাদু হাসতে হাসতে মেহমানদের কাছে চলে যান।
টেলিভিশনে বহুদিন ধরে আরব্য উপন্যাসের আলিফ লায়লা ও ইতিহাসের আকবর দি গ্রেট দেখান হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। সারা এই সিরিজ দুটো দেখতে খুব পছন্দ করে। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সে এই সিরিজ দুটি দেখে। আলিফ লায়লার সিন্দাবাদ, শয়তানের মেয়ে, দৈত্য, জাহাজ ঝড়ের দৃশ্য তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। সে জানে তার আব্বা জাহাজের ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন সম্বন্ধে তার কোনো ধারণা না থাকলেও সিন্দবাদের মধ্যে সে তার আব্বার সামঞ্জস্য খুঁজে পায়। তাই দেখা যায় সিন্দাবাদ যখন নানান বিপদের সম্মুখীন হয় সারা গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে এই দৃশ্যগুলি দেখে। মাঝে মাঝে ভয়ে, উদ্বেগে অধীর হয়ে দাদা, দাদু, চাচু, আম্মু যাকে পায় তাকে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকায়। আবার সিন্দাবাদের কৃতিত্বে খুশিতে উদ্বেল হয়ে ওঠে।
আকবর দ্য গ্রেট সিরিজের বৈরাম খাঁ, রাজপুত্র আকবরও তার খুব পছন্দ। টিভির পর্দায় বৈরাম খাঁ ও আকবরকে দেখলে সে খুব ঔৎসুক্য নিয়ে তাদের কথা বার্তা কর্মকাণ্ড খেয়াল করে। যুদ্ধ ক্ষেত্রের ভয়াবহতার দৃশ্যে সে বিচলিত হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে সে নিজেও অভিনয়ে মেতে ওঠে। কার্পেটের ওপর একা একা বসে ওপর দিকে হাত, পা ছুড়তে থাকে। হাত দিয়ে ডুসুং ডুসুং করে এক অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠে। কেউ যদি এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করে সে বলে আমি আকবরের মতো যুদ্ধ করছি। কোনো সময় বলে আমি সিন্দাবাদ হতে চাই। আমি সিন্দাবাদকে পছন্দ করি। সারা প্রতিদিন এমন ধরনের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বড়ো হতে থাকে। বাড়ির সবার আদরও কেড়ে নেয়। কান্নাকাটি জেদা-জেদি বয়স আন্দাজে তার বেশি নাই।
তিন বছর নয় মাস বয়সে সারা পাড়ি দিল কোরিয়া তার আম্মুর সঙ্গে। ওখানে তার আব্বু তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কোরিয়ান জাহাজের ক্যাপ্টেন তার আব্বা। যে দিন থেকে সে বুঝতে পেরেছে সে চলে যাবে তার আব্বার কাছে, তার কী আনন্দ, কী খুশি। ফুপিরা জিজ্ঞেস করে তুমি ওখানে গেলে আমাদের জন্য কাঁদবে না? সে বলে কাঁদতে পারি আবার নাও পারি। তাদের যাওয়ার সময় তার নানা-নানু খালা, মামারা এসেছে বিদায় জানাবার জন্য। নানা বলেন সারা আমাদের মনে থাকবে তোমার। সারার উত্তর আগের মতো। থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে। মাত্র তিন বছর নয় মাস বয়স তার। এরই মধ্যে তার কথাবার্তায়, চাল চলনে এত পাকামি দেখে বুড়োরা হতবাক হয়ে যান। ঘর থেকে বেরুবার আগে তার আম্মা বলে সবাইকে সলাম করো। সে সালাম করা বুঝে না। সে হাত তুলে বাই বাই দেয়। ওর আম্মা ধমকায় ছি, সারা অমন করে মুরব্বিদের হাত তুলে বাই বাই করতে হয় না। পা ধরে সালাম করতে হয়। সালাম না করলে মুরব্বিদের দোয়া আসে না।
সারা তার আম্মুর কথায় হতবাক হয়ে যায়। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, দোয়া কী আম্মু? দৈত্য এসে আমাকে খেয়ে ফেলবে? বিদায়ক্ষণের বিষণœতার মধ্যেও সবার মুখে একঝলক হাসি খেলা করে। সবাইকে বিষণœ হাসিতে উজ্জীবিত করে সারা চলে যায় তার আব্বুর কর্মস্থলে।
বাংলাদেশ বিমানে রাত আটটায় সারা ফিরে এসেছে কয়েক মাস পরে। এখনও তাদের নতুন পরিকল্পনা জানা যায়নি। সারা গা গতরে বেশ বড়ো সড় হয়ে এসেছে। কথাবার্তায় ও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত। আসার আগে তার বাবা হংকং থেকে ফোন করে জানিয়েছিল, তারা পরের দিন আসবে। সারা ফোন ধরে বলেছিল, এইতো আমরা কাল আসছি। মাল পত্তর বাঁধাছাঁদা চলছে। ঠিক বুড়ো মানুষের মতো কথা। আসার পর সে খুব হাসি খুশিতে আছে। নানার বাড়ি, খালার বাড়ি, অমুক আংকেলের বাড়ি, তমুক আংকেলের বাড়ি ঘুরে ফিরে তার দিন পার হচ্ছে। আসার সপ্তাহখানিক পর সে একদিন আবদার ধরে দাদা, দাদু চল আমরা পার্কে বেড়াতে যাই। ভীষণ বাজে গরম পড়েছে। গরমে সিদ্ধ হওয়ার উপক্রম।
তার দাদার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। তবু তার দাদা, দাদুকে তার কথা রাখতে হলো। সে সঙ্গে সাইকেল নিয়ে পার্কে গেল। পার্কের ভেতর ভ্রমণবিলাসীদের জন্য লাল ইটের বিছানো সুন্দর রাস্তা। অনেকে সন্ধ্যা ভ্রমণে এসেছে এখানে। সারা সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তা দিয়ে। তার দাদা, দাদু সতর্ক করে দিচ্ছে বারবার, সাবধানে সাইকেল চালানোর জন্য। কিছু লুঙ্গি পরা যুবা বয়সী ছেলেরা হাঁটাহাঁটি করছে রাস্তা দিয়ে। সারা প্রশ্ন করে ওরা কারা? ওরা কি দুষ্ট লোক? দাদু উত্তর দেয় না, ওরা বাংলাদেশের পোশাক পরেছে তাই ওরা লুঙ্গি পরে বেড়াতে এসেছে। সারার আবার প্রশ্ন তা’হলে দাদা কেন লুঙ্গি পরেনি? আরও অনেকে কেন লুঙ্গি পরেনি? দাদার মুখে এর কোনো জবাব নেই।
রাস্তায় সাইকেল চালাতে গিয়ে সে বুঝতে পারে, রাস্তার ইটগুলি সমান নয়। মাঝে মাঝে এবড়ো থেবড়ো হয়ে আছে। সারা বলে অনেক দিন আগে এসেছিলাম তো বুঝতে পারিনি, দাদা কেন বারণ করেছিল সাইকেল আনতে। সাইকেল চালানোর সময় সারার বয়সী দুটো অভাবী ছেলে সাইকেলের পিছনে পিছনে তার সঙ্গী হয়। দাদু বলেন দেখ সারা এই ছেলেগুলি তোমার সাইকেল দেখে একটু চড়তে চায়। চড়াবে ওদের? সঙ্গে সঙ্গে সে বলে কাল ওদের জন্য সুন্দর সুন্দর খেলনা আনবো। বাসায় ফেরার সময় বলে এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি? দাদু বলেন বাসায় যাচ্ছি। এখন নামাজের সময় হবে। সে বলে, না বাসায় যাবো না। যেখানে অনেক বেবি আছে ওখানে আমাকে নিয়ে যাও। তোমাদের ওখানে কারো বাড়িতে বেবি নাই। সবাই দাদা-দাদু, নানা-নানু, ফুপি, খালা, আব্বা, মামা। সারার দাদা বলে তোমাদের ওখানে কারা ছিল। সে বলে ওখানে আন্টি আছে, আংকেল আছে, কাজিন আছে, বেবি আছে। দাদু বলেন আমাদের দেশেও তো ওরা আছে। ওদের তুমি বাংলা নামে ডাক। সে কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে বলে হ্যাঁ আছে, তবে খুব কম। আর আমাকে আদর করতে কেউ আমাদের বাসায় আসে না। হঠাৎ করে বলে বসে দাদা, দাদু আজ বাসায় গিয়ে আব্বু আম্মুর সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবো। দাদা-দাদুর চোখে, মুখে ঔৎস্যুক! সে বলে আমি বলবো কর্ডিক, লন্ডন, সলোমন, আইল্যান্ড, ফিলিপাইন, সাংহাই বেড়িয়ে এসেছি। দাদা-দাদু ওর কথায় ঢংয়ে হাসে।
সারা আজ কান ফুটো করে এসেছে। দাদা দাদুর মন খারাপ। এই কান ফুটোর ব্যাপারটা ওরা কেউ জানে না। সারার মা আর খালা দু’জনে মিলে কারো সঙ্গে পরামর্শ না করে এই কাজটি করেছে। বেলা চারটায় ঘরে ফিরার পর ওর কানে দুটো সোনার মাকড়ি দেখে সবাই জানতে পারছে ওর কান ফুটোর কথা। ওর দাদু বিশ্রী রকমের কষ্টে ভুগছে। বাড়ির মুরব্বি হিসেবে এমন একটি ব্যাপার তাকে জানানো হলো না এটা মনে করে তিনি মনে মনে ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন। বাড়িতে মা বাবা থাকলে ছোটোদের ন্যূনতম সম্মান দেখাতে হয় সেটাও যেন তিনি পেলেন না। সারা কান ফুটো করে এসে সাইকেলে করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাতে একটা আংটিও পরেছে। দেখতে ভালোই লাগছে। সারা বাড়ির প্রাণকেন্দ্র। তার সঙ্গে সহজ হতে না পেরে দাদুর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। সারার দাদা-দাদু কয়েক দিনের জন্য কক্সবাজার গেয়েছিলেন বেড়াতে তার ফুফুর বাসায়। প্রায় মাসখানেক ওখানে বেড়িয়ে বাসায় ফিরে এসেছে।
কমলাপুর স্টেশনে আসতেই দেখা গেল কারে একটা উজ্জ্বল গোলগাল মুখ দুষ্টু হাসিতে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে যেন। গাড়িতে উঠতে সে কোনো কথা বললো না। অথচ তার সমস্ত অবয়বজুড়ে এক মাস না থাকার জন্য অভিমান যেন ঝরে পড়েছে। গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পর সে অনেকটা স্বাভাবিক হয়। উজ্জ্বল খুশিতে বলে আমার দু পাশে এরা কারা? দুটো বড়ো ভূত দেখছি। আমি আর আম্মু হচ্ছি ছোটো ভূত। তার পর শুরু হয় তার কথার ফুলঝুরি। কেন তোমরা চলে গেলে আমাকে না নিয়ে? বাড়িতে একা থাকতে আমার একটুও ভালো লাগে না। তার দাদার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলে, বলো দাদা আমাকে ফেলে আর কোথাও যাবে না। চার বৎসর পার হতে এখন চার মাস বাকি। কিন্তু বুদ্ধিমত্তায় সে বড়োদেরকেও হার মানায়। ইদানীং সে একটা আবদার ধরেছে। রাতে আব্বু আম্মুর সঙ্গে ঘুমাতে চায় না। ফুপিরা বাসায় থাকলে ওদের সঙ্গে ঘুমায়। ওরা না থাকলে দাদুর সঙ্গে ঘুমায়।
সারাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করলেও রাতে ঘুমের ব্যাঘাত সহ্য করতে পারে না দাদু। কিন্তু তার আবদার না শুনলেই নয়। রাত দশটার দিকে দাদু যখন এশার নামাজ পড়ে, বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেন সারা তখন খুব সুন্দর করে গায়ে গতরে এক ধরনের লোশন মেখে নাইটি পরে চলে আসে দাদুর কাছে। বলে দাদু আমি তোমার সঙ্গে ঘুমাবো। মনে মনে দাদু ভয় পায়। সে থাকা মানেই রাত একটা পর্যন্ত গল্প বলা। তার মা, বাবা, ফুপিরা কত গল্প যে তাকে বলে তার কোনো শেষ নেই। মাঝে মাঝে তার দাদু বলে তোর জন্য আরব্য রজনীর মতো প্রতিদিন একটা গল্প বানাতে হবে দেখছি। সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর বানাও না। তাহলে আবার আমি আলিফ লায়লার গল্প শুনবো। মহা মুশকিলে পড়লেন দাদু।
একদিন সারাকে নিয়ে সারার মা, বাবা, দাদা, দাদু এক জন্মদিনের দাওয়াতে গেলেন। যার জন্মদিন সে সম্পর্কে দাদা দাদুর নাতনী। তার জন্য একটা সোনার চেইন আনা হয়েছে। দেখে সারার কী কান্না। সে কিছুতেই এই চেইন দিতে দেবে না। অঝোরে চোখের পানি ফেলছে। কিছুতেই সে সোনার চেইনটা দিতে দেবে না। তাকে বুঝাচ্ছে তার মা, বাবা কিন্তু তার এক কথা এটা আমার পছন্দের জিনিস। আমাকে না দিয়ে অন্যকে দেবে কেন? শেষ পর্যন্ত চেইনটি দেওয়া গেল না। অন্য জিনিস কিনে জন্ম দিনে যেতে হলো। সারার আব্বা আবার চলে যাচ্ছে এক বৎসরের ট্রেনিংয়ে। এবার সারা ও তার আম্মু সঙ্গে যাচ্ছে। সারার পাঁচ বৎসর পূর্ণ হওয়ার মাত্র এক মাস বাকি। দাদা দাদু এক করুণ বিষণœ আর্তনাদকে বুকে ধরে সারার আগাম জন্মদিনকে স্বাগত জানিয়ে সারাকে বিদায় দিল নতুন যাত্রায়।

SHARE

Leave a Reply