Home ঈদ স্মৃতি কৈশোরে আমার ঈদ -জাফর তালুকদার

কৈশোরে আমার ঈদ -জাফর তালুকদার

আমাদের বাড়ি ছিল অজপাড়াগাঁয়। না ছিল তেমন রাস্তাঘাট, না ছিল যাতায়াতের উত্তম ব্যবস্থা। নৌকা আর লঞ্চ ছিল একমাত্র ভরসা। কাছের বাগেরহাট ছিল স্বপ্নের শহর। সচরাচর সেখানে যাবার সুযোগ ঘটত না। কালেভদ্রে হয়তো গিয়েছি দু-একবার। তাও সেই জামাজুতোর ছুতোয়। কিন্তু এটা কোনো উপলক্ষ্যে নয়। আমরা অল্পতেই তুষ্ট ছিলাম। গাঁয়ের হাটবাজার থেকেই বেলুন-পটকার চাহিদা মিটত। যে কারণে ঈদ নিয়ে আলাদা কোনো ভাবনায় উত্তেজিত হবার সুযোগ ছিল না। অনেকটা নি®প্রাণ একটা দিন শুয়ে-বসে পুরনো খাতার মতো উল্টে যেতাম ক্লান্ত আঙুলে।
তবুও চিরাচরিত নিয়মে ঈদ এসে উঁকি দিতো আমাদের মলিন গাঁয়ে। সবাই একটু নড়েচড়ে বসত তখন। মা ফজর নামাজ পড়েই সেমাইয়ের নাস্তা বানাতে বসতেন। শীতের মৌসুম হলে সঙ্গে থাকত খেজুর রসের আলাদা ব্যবস্থা। তবে কমবেশি ‘মলিদার’ চাহিদা ছিল একটু বেশি। চালের গুড়ো, তালের আঁটির ফোঁপর, নারকেল কোরা, গুড়, আদা আর মুড়ি মিশিয়ে চমৎকার তৈরি হতো এক ধরনের শরবত গোলা। ওদিকে শীতের ভোরে আব্বা তাগাদা দিয়ে আমাদের পুকুরে নিয়ে যেতেন গোসল করতে। হাড়-কাঁপানো সেই হিহি ঠান্ডা পানিতে গোসল করা ছিল রীতিমত একটা অগ্নিপরীক্ষা। কিন্তু এই পরীক্ষায় আমরা কমবেশি শামিল হতাম হেসেখেলে। তারপর হাতে কাঁচা কাপড়ে সেজেগুঁজে টুপি মাথায় রওয়ানা হতাম ঈদের মাঠে। যাবার আগে একটু সেমাই মুখে দিতাম চামচে কেটে। মলিদার ঘ্রাণটা কেমন যেন অসহ্য ঠেকত। তবুও ঈদ বলে কথা। একটু মিষ্টিমুখ দিয়ে শুরু না হলে আনন্দটাই মাটি হয়ে যায় যে!
সেই সময় ঈদের একটাই মাঠ ছিল গাঁয়ের শেষ প্রান্তে। অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হতো সেখানে। আব্বা সামনে থেকে দ্রুত হাঁটার তাড়া দিতেন। মাইলটাক হাঁটার পর দূর থেকে ভেসে উঠত মাঠখানা। মাঠের পাশেই পায়েলহারা নদী। অদূরে ঘষিয়াখালী খালের খেয়াঘাট। খালের মুখে ছিল বেনিয়া-রামদোর মুচির বাসা। ওরা কাঁচা লালচে চামড়া ট্যান করে ঝুলিয়ে রাখত মাটির চাড়ির ওপর। ভোটকা গন্ধে সারাক্ষণ ভুর ভুর করত জায়গাটা। ওখানে দুটো কুকুর গম্ভীর মুখে বসে থাকত রাগী রাগী চোখে। কাকের দল তার স্বরে সভা ডাকত পচা চামড়ার গন্ধে।
যাই হোক না কেন, পাশের খোলামেলা মাঠটি দেখতে মন্দ ছিল না। হাঁটাহাঁটির উত্তেজনায় কখন যে চোরকাঁটায় পাজামা সয়লাব হয়ে যেত টের পেতাম না। শাগরা শাকে ভরে ছিল মাঠখানা। এই শাক দিয়ে শোল মাছের ঝোলের বিশেষ কদর ছিল অনেকের কাছে।
ঈদের মাঠে লোকসমাগম ভালোই হতো। নামাজ শেষে বড়ো মোনাজাত হতো হাত তুলে। এরপর অনেকটা সময় কেটে যেত কোলাকুলি করে। বড়োরা নুয়ে বসে বুক মেলাতেন ছোটদের সঙ্গে। কিছু আলগা দোকানপাট বসত মাঠের কোণের দিকে। মোয়ামুড়ি, চকোলেট, বেলুন, বাদাম, হাওয়াইমিঠা, জিলাপি, ভাজাভুজি এইসব আর কি! আব্বা ফেরার পথে কিছু একটা ধরিয়ে দিতেন হাতে। ঠোঙাটা হাতে নিয়ে নাচতে নাচতে রওয়ানা দিতাম বাড়ির পথে। কিছু খুচরো পয়সা ঠুন ঠুন করত পকেটে। ওগুলো হাতে নিয়ে হাতেম তাইয়ের মতো দান করতাম ভিখেরিদের। যেতে যেতে কেউ হয়তো ডেকে নিয়ে যেতেন বাড়িতে। নাস্তা সেমাই একটু হলেও চেখে দেখতে হতো। কোলাকুলি তো ছিলই। আত্মীয়দের বাড়িতে ঢু মারা ছিল অবধারিত। কিন্তু সেলামির রেওয়াজ ছিল না তেমন একটা। হাতে তুলে কেউ কিছু দিয়েছে বলে মনে পড়ে না। সারাদিন আনাগোনা ছিল ভিখেরিদের। পাশের একটি বাড়ি থেকে বিলানো হতো জাকাতের শাড়ি-লুঙি। এ নিয়ে দিন দুই ধরে চলত বেসামাল উত্তেজনা। এদিন ভালো-মন্দ রান্না হতো সবার বাড়িতে। আমাদেরও হতো। মনে হয় এইতো সেদিন ঈদের দিনে বাড়ির বড়ো রাওয়াটা মা রান্না করেছিলেন মানকচু দিয়ে। পোলাউ কোরমা যে কখনও পাতে পড়ত না তা নয়। সেই অমৃত স্বাদ এখনো লেগে আছে জিভে।
ঈদ আসে, ঈদ যায়। কিন্তু ছেলেবেলার সেই সরল মধুর আনন্দ আর ফিরে আসবে না কখনো।
বেড়াতে আসা লোকজনে গম গম করত গ্রামখানা। বিকেলে সবাই মিলে হাওয়া খেতে বেড়াতাম নদীর কাছে। কখনো ফুটবল, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু নিয়ে চলতো দুর্দান্ত উত্তেজনা। ততদিনে ঈদের নামাজের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন ময়দান। মাদরাসা মাঠখানা ছিল সবদিক থেকে উপযুক্ত। শামিয়ানা, লালসালু, কাগজের পতাকা, মাইক- সব মিলিয়ে তৈরি হতো উৎসবমুখর পরিবেশ। ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার জন্য আমরা জড়ো হতাম সবাই। আকাশে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে ধন্দ লেগে যেত। কেউ আগে দেখতে পেলেতো কথাই নেই। সবাই তখন এমন হুল্লোড় জুুড়ে দিত যেন চাঁদ পেয়েছে হাতে।
ঈদের দিন সামান্য পথ হেঁটে আমরা পৌঁছে যেতাম মাঠে। সবার গা থেকে ভেসে আসত আতরের বিচিত্র খুশবু। মুসল্লিদের দীর্ঘ কাতার পড়ত কয়েক সারিতে। সামনের সারিতে আব্বার পাশে বসে একটু গম্ভীর ভাব ফুটে উঠত চোখেমুখে। নামাজ শেষ হওয়ার পর আব্বার সঙ্গে প্রথম কোলাকুলি করতাম লজ্জিত মুখে। আব্বা ছিলেন শুকনো পাতলা মানুষ। একটু যেন কোলকুঁজো হয়ে গিয়েছিল দেহখানা। কিন্তু আশ্চর্য এক শক্তিতে বুকে জড়িয়ে ধরতেন পুত্রকে।
গভীর মমতা মাখানো উষ্ণতায় বিমোহিতের মতো মাথাটা চেপে থাকত জনকের বুকে। বাবা আজ বেঁচে নেই বটে, কিন্তু উষ্ণতার অনুভূতিটুকু ঠিকই জড়িয়ে আছে বুকজুড়ে।
সময় গড়িয়ে গেছে অনেকটা। শিশু-কিশোর বেলার স্বপ্নের গ্রামখানা হারিয়ে গেছে বহু আগে। রাজধানীর ভিন্ন এক রঙিন আয়োজনে এখন ঈদ আসে। সেই শিশু-কিশোর বেলার উত্তেজনা আর নেই। তবে ঘরে-বাইরে চারপাশে আজ যে আনন্দ উৎসব ছড়িয়ে আছে তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কোথায়? এখন ঈদ মানে মোটা বাজেট। দীর্ঘ পরিকল্পনা।
নতুন পোশাক-আশাকের সঙ্গে যুক্ত হয় আরো দশ রকম বায়না। ঈদের ছুটিতে সপরিবারে দেশ-বিদেশ বেড়ানোর পরিকল্পনা সাজায় কেউ কেউ। ওদিকে ঈদের সালামিটা স্থায়ী হয়ে গেছে। দু’চার টাকায় এখন আর মন ভরে না কারো। গান-বাজনা, হইচই, হুল্লোড়, খেলাধুলা, খানাপিনা, নেমতন্ন – সব মিলিয়ে ঈদ আর স্রেফ ধর্মীয় আচার নয় কেবল। এ এখন পরিণত হয়েছে রীতিমতো এক বিপুল আনন্দ উৎসবে।

SHARE

Leave a Reply