শিশুদের পাশে রোনালদো -আবু আবদুল্লাহ

২০১১ সালের কথা। সে বছর ইউরোপিয়ান ফুটবলের গোল্ডেন বুট জেতেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, কোন টুর্নামেন্ট বা মৌসুমের সেরা গোলদাতাকে দেওয়া হয় সোনার বুট। সে বছর পুরো ইউরোপ মহাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪০ গোল করেছিলেন সিআর সেভেন।
পুরস্কার হিসেবে পাওয়া গোল্ডেন বুটটি নিলামে তোলেন এই পর্তুগিজ সুপারস্টার। নিলামে সেটি বিক্রি হয়েছিল ১২ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ডে। বাংলাদেশি টাকায় যা ১৪ কোটিরও বেশি। এই অর্থ পুরোটাই রোনালদো দান করেছিলেন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার মানুষের জন্য। এই অর্থ দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটির শিশুদের জন্য নির্মাণ করা হয় কয়েকটি স্কুল। ইসরাইলি নিপীড়নে জর্জরিত গাজা উপত্যকার শিশুদের শিক্ষার জন্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনালাদো নিয়েছিলেন এই মহান উদ্যোগ।
২০১৪ সালে অপরিণত কোষ নিয়ে জন্ম নেওয়া ১০ মাস বয়সী একটি শিশুর মা রোনালদোর প্রতি আহ্বান জানান শিশুটির জন্য একটি জার্সি উপহার দিতে। মায়ের ইচ্ছে ছিল সেটি নিলামে তুলে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা; কিন্তু রোনালদো চেয়েছিলেন নিষ্পাপ শিশুটির জন্য আরো কিছু করতে। তিনি শিশুটির অপারেশনের জন্য ৫৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড সহায়তা পাঠান। এছাড়া নিজের অটোগ্রাফযুক্ত একটি ক্রীড়াসামগ্রী নিলামে তোলেন শিশুটির সহায়তার জন্য।

মানবসেবার অনেক উদাহরণ আছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জীবনে। ফুটবলার হিসেবে তিনি যেমন চ্যাম্পিয়ন, তেমনি মাঠের বাইরেও অনন্য এক মানুষ। মাঠে যেমন গতিময় রোনালদো সবাইকে টেক্কা দিয়ে বল নিয়ে ছুটে যান গোল পোস্টের দিকে, মাঠের বাইরে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে রোনালদো অন্য অনেকের আগে।
২০১৩ সালে তিনি তার ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি নিলামে তোলেন। সেটি ছিল তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর পুরস্কার। মোট ৫ বার এই পুরস্কার জিতেছেন রোনালদো। ওই বছর নিলাম থেকে আসে ৫ লাখ ৩০ হাজার ইউরো। বাংলাদেশী টাকায় যা প্রায় ৫২ কোটির সমান। পুরো টাকাটাই রোনালদো দান করেন মেইক-এ উইশ ফাউন্ডেশন নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে মানবসেবায় কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। একই বছর উয়েফার বর্ষসেরা একাদশের ফুটবলার নির্বাচিত হওয়ার পর পাওয়া ৮৯ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড দান করেন আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেড ক্রসে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের লা ডেসিমা অর্থাৎ দশম ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের উৎসবে ক্লাব থেকে পান সাড়ে ৪ লাখ পাউন্ড বোনাস। এই বোনাসের পুরো অর্থ দান করে দেন সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ ও ওয়ার্ল্ড ভিশনকে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই শিশুদের জন্য কাজ করা এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন সিআরসেভেন। সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের শুভেচ্ছাদূত তিনি। এ ছাড়া একবার সেভ দ্য চিলড্রেনে একটি বড়ো অংকের অনুদান দিয়েছেন এবং সংস্থাটিকে অনুরোধ করেছেন এই দানের পরিমাণ কখনোই প্রকাশ না করতে। ধারণা করা হচ্ছে অঙ্কটা কয়েক লাখ মার্কিন ডলার ছিল।

২০১৫ সালে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সেখানকার মানুষের পাশে দাঁড়ান এই পর্তুগিজ উইঙ্গার। তবে এবারও দানের কথা গোপন রাখেন তিনি। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে অনুমান করে বলা হয়, নেপালের শিশুদের জন্য ৫০ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড অনুদান দেন রোনালদো।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ২০১৫ সালের নভেম্বরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বাবা-মা উভয়কে হারায় হায়দার নামের এক রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থক শিশু। অনলাইনে রিয়াল সমর্থকদের প্রচারণার কারণে বিষয়টি নজরে আসে রোনালদোসহ রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব কর্তৃপক্ষের। তারা হায়দারকে মাদ্রিদে আমন্ত্রণ জানান। পিতা-মাতা হারানো শিশু ভক্তের সাথে রোনালদোর আলিঙ্গনের সেই দৃশ্য চোখে পানি এনে দিয়েছে সারা বিশে^র ফুটবলপ্রেমীদের।
শিশু ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নজির স্থাপন করেছেন এই মহাতারকা। ২০০৭ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন রোনালদোর মা ডোলোরেস আভেইরো। পর্তুগালের যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন, পরবর্তীতে সেখানে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য এক লাখ ২০ হাজার পাউন্ড দান করেন রোনালদো।

২০০৯ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত এক ভক্তের খবর পৌঁছে যায় রোনালদোর কাছে। নিজের গাড়ি পাঠিয়ে নুহুজেত গুলিয়েন নামের ওই ভক্তকে ডেকে আনান। এরপর স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে বসিয়ে রিয়ালের ম্যাচ দেখার ব্যবস্থা করে দেন। ওই ম্যাচে রোনালদো তার একটি গোল উৎসর্গ করেন গুলিয়েনকে, ম্যাচ শেষে জার্সিটিও উপহার দেন তাকে। এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ওই ভক্তের যাবতীয় চিকিৎসারও দায়িত্ব নেন।
করোনাভাইরাসের সময় খেলা বন্ধ
থাকায় ক্লাব লোকসানে পড়েছিল। সেই সময় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জুভেন্টাসে তার সতীর্থদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন বেতন কম নিতে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন এই চার মাসে শুধু রোনালদো একাই ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বেতন কম নিয়েছিলেন। এছাড়া এই মহামারীর সময়ে তিনি ও তার এজেন্ট জর্জ মেন্ডেস মিলে পর্তুগালের একটি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় দান করেছেন এক মিলিয়ন পাউন্ড। ২০২০ সালের ইউরোতে সুযোগ পাওয়ার কারণে পর্তুগাল জাতীয় দল থেকে যে বোনাস দেওয়া হয়, তার অর্ধেকও রোনালদো দিয়েছিলেন সরকারের করোনা তহবিলে।
মানবসেবার অংশ হিসেবে মাঝে মধ্যেই রক্ত দান করেন এই পর্তুগিজ উইঙ্গার। অন্যদেরও উৎসাহিত করেন রক্ত দান করতে। এছাড়া সাবেক টিমমেট কার্লোস মার্টিনেসের ছেলের চিকিৎসার জন্য একবার বোন ম্যারো দান করেছিলেন তিনি।
এই না হলে সুপারস্টার!

SHARE

Leave a Reply