Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস নীলকমলের মায়া -তারিকুল ইসলাম সুমন

নীলকমলের মায়া -তারিকুল ইসলাম সুমন

গত সংখ্যার পর

পাঁচ.
পরদিন দুপুরে তিনকোনা দ্বীপের মোহনায় নোঙর করেছে ওরা। চরে নেমেছে সবাই। শিবলু মাঝির হাতে খেপলা ঘুনি জাল। মাছ রাখার জন্য বালতি হাতে সমীর। দা হাতে সড়কি গরান গাছে একের পর এক কোপ চালিয়ে যাচ্ছে স্বপন। পাঁচটি তিন হাতের সমান লাঠি কেটে নিলো। তিন দিক ফিরে তাকিয়ে আছে মিতুল, বিপুল ও টিংকু। বলা তো যায় না, অচেনা চরে বাঘের আক্রমণ হতে কতক্ষণ! লাঠি কেটে ফাঁকা চরে যাওয়াই নিরাপদ। ওখানে গিয়েই দা দিয়ে লাঠির গা সমান করা যাবে।
লাল বালতিতে নড়তে থাকা মাছ দেখে অবাক হলো মিতুল। অবশ্য এসব মাছ বাজার থেকে কেনা হয় প্রায়ই, কিন্তু এভাবে মাছ ধরা দেখা হয় না কোথাও। জালের মাঝে মাছ নড়তে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল সে। হাত দিয়ে বড়ো বাগদা চিংড়িটা উঠালো। মাথাটা ধরতেই লেজের আঘাতে পিছের হুল ফুটিয়ে দিলো তার হাতে। সুঁই ফোটানোর মতো রক্ত বেরিয়ে এলো নিমেষেই। বেশ কিছু দাঁতনে, জাবা ও পারশে মাছ ধরা পড়েছে জালে। হরিণা, চালি ও বাগদা চিংড়ির পার্থক্য খুঁজছে বিপুল। এগুলো কোনটাই গলদা চিংড়ির সাথে চেহারায় মেলে না। শহরে খুব দাম এগুলোর। করমজল থেকে কেওড়ার ফল পেড়ে রেখেছিল শিবলু। ফলগুলো খুবই টক। চিংড়ি মাছের সাথে কেওড়ার টক খুবই সুস্বাদু ও ভালো খাবার। বটিয়াঘাটা ও দাকোপসহ উপকূলের জনপদের খুবই পরিচিত ওটা।

দাঁতনে মাছগুলো কুটছে শিবলু। চিংড়ি মাছের মাথা ও লেজ ছাড়াচ্ছে অন্যেরা। মাছ শিকারের প্রসঙ্গটা তুলল মিতুল। আজ কিছু অসাধু জেলের ছোবলে পড়েছে। সুন্দরবনেরর নদী ও খাল। ছোটো ছোটো খালে ঢুকে পড়ে ওরা। খালের মাথায় খাবারের সাথে রিপকর্ড নামক এক প্রকার বিষ ছেড়ে দেয় পানিতে। বিষ ছড়িয়ে পড়লে মাছ দুর্বল হয়ে পানিতে ভেসে সাঁতার কাটতে থাকে। তখনই মাছগুলোকে তুলে নেয় ওরা। কী ভয়াবহ নির্মম ওদের পদ্ধতি। না জানি ঐ বিষাক্ত পানি পান করে কোন বাঘ, হরিণ বা বানর মরেছে কি না। ভাবতেই বুকের ভেতর হু হু করে কেঁদে উঠলো মিতুলের। সুন্দরবনকে খুব ভালোবাসে মিতুল। বনের সাথে আরও ভালো বন্ধুত্ব করতে চায় সে। এজন্যই বন্ধুদের নিয়ে এসেছে সে।
ইচ্ছে করলে বাবার সাথে গিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করে আসতে পারতো অনায়াসেই। নিজের দেশের সুন্দরবনের এমন মোহনীয় রূপ দেখার তৃষ্ণা যেন দিনদিন বেড়েই চলছে মিতুলের। হাতের কাজ সেরে একে একে গোসল সেরে নিলো ওরা।

ছয়.
দুবলারচরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে ওরা, ঠিক তখনি ওদের ট্রলার ঘেঁষে থামলো একটি ইঞ্জিন চালিত বোট। প্রায় কম্বেট পোশাকের মতই রং করা বোটটি দূর থেকে সহজেই দেখা যায়নি। ইঞ্জিনের শব্দও কম ছিল। খুব দ্রুত এসে ওদের ট্রলারের পাশে ভেড়াতেই অবাক হয়ে গেল সবাই।
ওদের অনুমান ঠিক। ওরা সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর ডাকাত দল। ডাকাতের কবলে পড়েছে! ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল সবাই। বোটের ওপর ইজি চেয়ারে বসে আছে ডাকাত সর্দার। বাম পায়ের ওপর ডান পা ওঠানো তার। প্রত্যেকের হাতে চায়না এসএমজি। প্রত্যেকের কোমরে অতিরিক্ত ম্যাগাজিন ভর্তি গুলি। সর্দারের কোমরে লেদারের পোচে রাখা ছোট্ট একটি পিস্তল। পাকানো গোঁফ তার। দু’ হাত ভরা আংটি। গলায় মোটা স্বর্ণের চেইন, ওটার ওপর সূর্যের আলো পড়তেই চিকচিক করে উঠলো। বিপুলের দুটি ভয়ার্ত চোখ দেখে মিটিমিটি হাসলো ডাকাত সর্দার। দু’জন ডাকাত উঠে পড়লো ওদের ট্রলারে।
ওরা ছিচকে ডাকাত নয়। ডাকাতদের একজন ওদের মোবাইল ও ক্যামেরার দিকে হাত দিলো। সর্দার ইশারা করলো, ওগুলো নেওয়ার দরকার নেই। ছাত্র মানুষ, ওটাই ওদের সম্বল। তাছাড়া মোবাইল নিলে ওদের আস্তানা আর গোপন থাকবে না। ট্রাকিং হতে পারে। প্রত্যেকের ব্যাগ থেকে টাকা-পয়সা কুড়িয়ে নিলো। নিজেদের বোটে উঠতে পা রাখলো ডাকাত দু’জন। এরই মধ্যে স্বপন একটু নিচু স্বরে বলে উঠলো, বিনা পয়সায় দারুণ ইনকাম তো! ডাকাত সর্দারের কানে গেল কথাটি। চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো-
– এই পোলা কি নামরে তোর?
– স্বপন।
– বাবা কী করে?
– চাকুরি করে, র‌্যাবের অফিসার।
উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে মিথ্যে বলল স্বপন। ও ভেবেছিল হয়তো ভয় পেতে পারে ডাকাত সর্দার। হয়ে গেল উল্টো। সর্দারের মুখ লাল হয়ে উঠলো। চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, উঠা হালারে। কদিন আগেই বারিকরে ক্রসফায়ার দিছে। ওরে দিয়েই শোধ তুলুম। পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করমু এবার।
স্বপনকে ডাকাতদের বোটে তুলে নিয়ে চলে গেল। মিতুলদের ট্রলার জুড়ে যেন শোকের ছায়া নেমে এলো। কোন দিকে যাবে, কী করবে ওরা কিছুই স্থির করতে পারছে না। বিপাকে পড়ল যেন শিবলু মাঝিও। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো মিতুল। ডাকাত দল চলে যাওয়ার পর যেন বল ফিরে পেল বিপুল। স্টোভ জ্বালাতে থাকলো সে, আদা কুচি দিয়ে লাল চা খেতে ইচ্ছে করছে ওর। স্বপনের কথা ভাবছে বাকিরা।
টাকা নিয়ে মোটেই ভাবছে না মিতুল। সুন্দরবনে ডাকাতদের উৎপাত নতুন নয়। ওটা ওর জানাই ছিল। তাইতো করমজল পার হয়েই খুচরা কিছু টাকা রেখে সব টাকা লুকিয়ে ফেলেছিল। নৌকার একেবারে মাথায় পাটাতনের নিচে এক হাত একটি বাঁশের চোঙ। ওটার মাঝেই গোল করে পাকিয়ে রেখেছিলো টাকা। ওর টাকা খোয়া যায়নি। বাকিদের কাছেও খুব বেশি টাকা ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো স্বপনকে তুলে নিয়ে গেল ডাকাত দল। কী জন্য আগ বাড়িয়ে এমন মিথ্যে কথা বলার দরকার ছিল ওর। নিজেও বিপদে পড়েছে, বিপদে ফেলেছে অন্যদেরও। কোথাও ফোন করে জানানোর উপায়টিও নেই। এখানে কোথাও নেটওয়ার্ক থাকে না। কী দুর্ভাগ্য কারো কাছে টেলিটক সীমও নেই। চিন্তার ছাপ এসে পড়লো সবার চোখমুখে। একটু দূরে ঢোল কলমির ডালে বসে আছে এক বামুনি মাছরাঙা। ডালের সাথে এপাশ ওপাশ ঘষে ছাড়িয়ে নিলো ঠোঁটে লেগে থাকা কাদা। মাছরাঙাটি বসে আছে পরবর্তী ছোঁয়ে ডগরা মাছ শিকারের আশায়।
প্রায় আধঘণ্টা পর। একটি স্পিডবোট এসে স্বপনকে নামিয়ে দিয়ে গেল। দু’জন ডাকাত স্বপনকে ধরে ট্রলারে উঠিয়ে দিলো। স্বপনের চোখের নিচে আঘাতের লাল দাগ দেখা যাচ্ছে। স্পিডবোট আবার দ্রুত মিলিয়ে গেল দূরের জলরাশিতে। আপাতত স্বপনকে পেয়ে সবার মুখে হাসি ফিরে এলো। ডাকাতদের হাতে মার খেয়ে সত্যিটাই বলেছে সে। ওর বাবা র‌্যাবের অফিসার নয়। ভয়ে ও মিথ্যে বলেছিল তখন। এমনটি বলেছে ওদের।
তবুও ভালো। মুক্তিপণ চায়নি ওরা। এটাই যেন অনেক পাওয়া। দুবলারচরের উদ্দেশে আবার যাত্রা শুরু করলো ওরা।

সাত.
অবশেষে দুবলারচরে আসা হলো মিতুলদের। দুবলারচর। কুঙ্গা ও মরা পশুরের মাঝের এই বিচ্ছিন্ন চর। একাশি বর্গমাইলের এই চর শুধুই চর নয়, একটি ঐতিহাসিক স্থানও বটে। কারো কারো মতে প্রায় দুইশত বছর যাবৎ প্রতি বছর এখানে বসছে রাসমেলা। কার্তিক মাস এলেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসে ভ্রমণ পিপাসুরা। আসে অনেক বিদেশি পর্যটকও।
ট্রলার থেকে লাফ দিয়ে নামলো টিংকু। পরপর বিপুল ও সমীর। স্বপনকে নিয়ে ধীরে ধীরে নামলো মিতুল। এক ডাকাতের দেওয়া আঘাতের পায়ের ব্যথাটা যায়নি এখনো।
একটি ডাকুর মাছ ধরার চেষ্টা করছে বিপুল। ওর সাথে যোগ দিয়েছে সমীর। জোয়ারের পানিতেই লাফাতে দেখা যায় ওদের। উভচর এই মাছগুলি বিশেষ পাখনার সাহায্যে লাফ দেয়। হেঁটে গিয়ে গর্তে ডিম পাড়ে। নদীর কূলে থাকা ছোটো ছোটো গাছ বেয়ে ওপরে উঠে যায় খানিকটা। গ্রামের নালুয়া নদীতে একসময় অনেক দেখা যেত, এখন তেমন দেখা যায় না। দিনে দিনে বিপন্ন হচ্ছে ওরাও। দু’জন হাঁফিয়ে উঠেও ধরতে পারেনি একটিও ডাকুর মাছ। ওরা চলে এলো জেলেদের মাছ ধরার নিকটে।
জেলেদের মাছ ধরা দেখা শেষ করে বড়ো একটা খালের পাশ ধরে বনের ভেতরে ঢুকলো সবাই। শিবলুও এসেছে সাথে। দুই ঘণ্টা বনে থেকে ট্রলারে ফিরবে ওরা। ফিরেই দুপুরের খাবার রান্না করবে। অন্যদের হাতে তিন কোনা দ্বীপ থেকে আনা লাঠিগুলি। শিবলুর হাতে দা। খালের ওপর নুয়ে নুয়ে পড়েছে গেওয়া গাছের ডাল। হরগোজার ঝোপ, হেতালের ঝাড় আর বনঝাউয়ের ঝোপ বাড়ছে তো বাড়ছেই কোথাও কোথাও। হঠাৎ লাফিয়ে উঠলো সমীর। পড়লো টিংকুর গায়ের ওপর। ততক্ষণে কাদার ওপর শুয়ে পড়েছে টিংকু। ইজি বাইকের ওপর ট্রাক পড়লে যা হয় আর কি। আঙুল দিয়ে দেখালো সমীর। একটা বিশাল আকৃতির হলুদ ধোড়াসাপ। মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে ওদের ভয়ে। কিন্তু ভয় তো পেয়েছে সমীর। হাসলো মিতুল। ধুর, এগুলোর তেমন বিষ থাকে না। মেটো সাপও তেমনি। ভয় আছে চন্দ্রবোড়া, সবুজ বোড়া, কেউটে, অজগর এগুলোর। শঙ্খচূড়, পাতি দুধরাজ, শাঁকিনী, পদ্মগোখরা এ ধরনের সাপ খুবই বিষাক্ত। এগুলোর ছোবল দিলেই বেঁচে থাকার উপায় থাকে না। বলল মিতুল।
বেশ ফাঁকা জায়গাটি। নিচে কাদামাটি। চারিদিকে শুধু গোল গাছের ঝাড়। এরই মধ্যে দুই কাঁদি গোলফল কেটে ফেলেছে শিবলু। একটাই দা দিয়ে কোপাকুপি চলছে। একটা ফলের মুখ কাটতে না কাটতেই তিনজন হাত বাড়াচ্ছে। ছোটো ছোটো ফলের ভেতর সুস্বাদু নরম শ্বাস। যেমনটা শহরে তালের শ্বাস খেয়ে থাকে ওরা। একটু দূরে গোলপাতার ওপর ডানা ঝাপটা দিলো একটি কানাকুয়ো পাখি। ছায়াঢাকা নিস্তব্ধ এই সুন্দরবনের নীরবতা ভেঙে গেল ওর ডানার শব্দে। সবাই ফিরে তাকালো সেদিকটায়।
বিপুলের চোখ যেন এবার হাঁ করে তাকালো মিতুলের দিকে। মুখ জুড়ে ভয়ের ছাপ। কী বলবে বুঝতে পারছে না সে। ছোটবেলায় শুনেছিলো সুন্দরবনে নামলে বাঘের নাম নিতে নেই। ওদের মামা নামেই ডাকতে হয়! মিতুলকে হাতের ইশারায় দেখালো সে। নিচে নরম মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ। হেঁটে হেঁটে ঢুকেছে উঁচু ওদিকটায়। ঐ তো দূরে হোগলার ঝোপবন। ওখানে উঁচু জায়গায় বিশ্রাম নিতে পারে বাঘটি। ভাবতেই গা শিউরে উঠলো মিতুলের। সত্যিই তো, এতদূর আসার পথে কোন হরিণের দেখা পায়নি ওরা। হরিণ না থাকা মানেই কি বাঘের উপস্থিতি সেখানে? সবাইকে দ্রুত ফিরে যেতে হবে ট্রলারের কাছে। ফেরার পথে দেখা মিলল একটি তেলনাগ ইগলের ছানার। উড়তে গিয়ে হয়তো নিচে পড়েছে। কাদায় ডানা ঝাপটাচ্ছে। সিঁদুর গাছের ওপরে ওর বাসা। ওটাকে পানিকে ধুয়ে গামছা দিয়ে ডানা মুছে বাসায় তুলে দিলো টিংকু। অবশ্য সেলফি তুলতে ভোলেনি সে। ওরা দ্রুত ফিরে এলো ট্রলারে। দুপুরের খাবার রান্না করল সকলে মিলে। এটাও দারুণ উপভোগ করছে মিতুল। লবণ কমবেশি দেখাটাই যেন সমীরের কাজ।
বিকালে কয়েকজনকে পাওয়া গেল। তাদের বয়স একটু বেশি তবে খুব আমুদে স্বভাবের। ওরা ছয়জনও দুই দলে ভাগ হয়ে গেল। জমে উঠলো হাডুডু খেলা। নরম কাদার ওপর কোট কেটে হাডুডু খেলা চলছে। কিছু জেলে ভিড় করেছে খেলা দেখতে। দারুণ ব্যাপার। ঐ তো দূরে একজন টোপ ফেলে শিলা কাঁকড়া ধরছে। কাঁকড়া শিকারের ফাঁকে ফাঁকে দেখছে এদিকে। কুচে কেটে টুকরো করে টোপ তৈরি করে ফেলে রাখে পানিতে। ওটা দিয়েই কাঁকড়া শিকার করে ওরা। শিলা কাঁকড়া, লাল কাঁকড়া ও পাতি কাঁকড়া। এই কাঁকড়াই এক সময় বিমানে উঠে বিদেশ চলে যায়। বিদেশে খুব চাহিদা এই লবণ পানির কাঁকড়ার। কিন্তু সত্যি এটাই, কাঁকড়া ধরা লোকগুলো কেবল থেকে যায় বিমান থেকে যোজন যোজন দূরে।
হাডুডু খেলায় সমীরকে কেউ ধরে রাখতে পারছিল না। ধরা লোকসহ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নিজেদের পাশে। প্রচণ্ড গায়ের শক্তি, তেমনি মোটা পায়ের গাছি। কোনভাবে বুদ্ধি করেও আটকে রাখা যাচ্ছিলো না। শেষে মিতুলের বুদ্ধিটাই কাজে লাগতে শুরু করলো। সমীরের ডান পায়ে প্রচুর শক্তি। ডান পা দু’জন ধরলেও অনায়াসে টেনে নিতে পারে। বাম পায়ের অতটা শক্তি নেই। দু’ দিক থেকে এক সাথে দুটো পা ধরলেই শুয়ে পড়ে সমীর। ধরা খেতে থাকল সমীর। একবার মানসিক শক্তি কমে গেলে শরীরটাও বুঝি দুর্বল হয়ে যায়। একটু পরই যেন সমীর তার খেলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। বিকেলটা লাল হয়ে এলো। ঐ ধুন্দল আর ঝামটি গরান গাছের ফাঁক দিয়ে অস্ত যেতে শুরু করলো লাল সূর্যটা।

আট.
পরদিন ভোরেই ওরা যাত্রা করলো সোজা পশ্চিমে। নীলকমল হিরণপয়েন্ট। হিরণপয়েন্ট আজ ইউনেস্কোর তালিকায় অন্যতম একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। হিরণপয়েন্ট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বেশ উঁচু এক পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এখান থেকে দারুণ উপভোগ করা যায় সুন্দরবনের সবুজ অরণ্য। হয়তো হরিণের আধিক্য আর অবাধ বিচরণের জন্যই কোন এক সময় এটির নাম হয়েছে হিরণপয়েন্ট। সে যাই হোক হিরণপয়েন্ট সত্যিই বাঘ হরিণের এক অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র।
হিরণপয়েন্টে কোনো যাত্রাবিরতি হলো না। ওরা চলতেই থাকলো নীলকমল নদীর কূল ঘেঁষে। শান্ত নদী নীলকমল। জোয়ারের পানি বাড়লে গাছগুলোকে অন্যরকম মনে হয়। গাছগুলি যেন পানির মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। কোথাও গোলপাতার ঝাড়। কোথাও কাঁকড়া, পশুর ও খলসি গাছের নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা। ফলন্ত কেওড়া গাছের ডালে বসে থাকে বামনি মাছরাঙা। ভেতরে উঁচুতে নলখাগড়ার ঝোপ। কোথাও পরশ গাছে ফুটে আছে হলুদ রাঙানো ফুল। পরশ পাতার ভাঁজে সামান্য বাতাসে দুলছে টুনাটুনির বাসা। কোথাও মাথা মরা রোগে ধরা সিঁদুর গাছ। ওখানে বসে আছে প্রকাণ্ড এক পাখি মদনটাক। নিচের ডালে ডানা ঝাড়ছে লালবুক মাছরাঙা। নীলকমলের বুক যেন এক স্বপ্নের লীলাভূমি। এক সুখের আবাস।
ওরা মাঝারি একটা খালের ভেতর চলতে শুরু করলো। সতর্ক চোখ সবার। খালের গভীরতা জানা নেই, জানা নেই এর শেষ কোথায়। তবু ওরা চলতেই আছে অজানাকে দেখার নেশায়। ঐ তো দেখা যায়, কেওড়া গাছে বানরের দল মেতেছে উৎসবে। নিচে ক্ষুধার্ত হরিণ। কেওড়া গাছগুলো বানর ও হরিণের পরম বন্ধু, প্রিয় খাবার। কেওড়া ওড়ার পাতা খুব পছন্দ হরিণের।
চলতে চলতে ওরা এসে পড়েছে বনের গহিন থেকে গহিনে। এত গভীরে হয়তো কোনো বনরক্ষীরা সচরাচর আসতে সাহস করে না। আসা ঠিকও নয়। ধীরগতিতে ট্রলার চলছে। সবার চোখ থির হয়ে আছে কখন হয়তো বাঘের দেখা মিলবে অথবা বুনোশূকরের। হঠাৎ কেয়াবনের ঝোপ থেকে ঝপাৎ করে লাফিয়ে পড়লো এক সোনাগুই। গুইসাপটি হয়তো মাছ শিকারে বেরিয়েছে।
মিতুলের মনে ভর করলো অন্যরকম এক ভয়ের চিত্র।
সারাদিন ঘুরে ঘুরে আবার সেই মৃত বাইন গাছটির দেখা মিলল! ওটা দেখেই বুঝলো মিতুল, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। সূর্যটাও পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। এরই মধ্যে নীলকমল নদীর দেখা পেতেই হবে। অমাবস্যার এই অন্ধকার রাতে সুন্দরবনের এতটা গভীরে থাকাটা মোটেই নিরাপদ নয়, ভাবতেই গা ছমছম করে উঠলো মিতুলের। মিতুলের কাঁধে হাত রাখে স্বপন। চিৎকার দিয়ে উঠল, আরে দেখ দেখ উদ্বিড়ালে দেখছে আমাদের। ক্রমশ বেলা ডুবে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলো নীলকমলের সবুজ বুকে।

নয়.
নীলকমলের গভীর থেকে বের হতে পারেনি ওরা। ওদের ট্রলার থেমে আছে তিনটি খালের মুখে এসে। ওদের খালটি এসে আবার দুই দিকে ভাগ হয়ে চলে গিয়েছে এঁকেবেঁকে। গহিন বন, অন্ধকার রাত। নলখাগড়ার ঝাড়ে ঝিঁঝি পোকা একনাগাড়ে ডেকে যাচ্ছে। নিশাচর পাখিরা আহার খোঁজায় ব্যস্ত। হুতুম পেঁচা কো-কো করে ডেকে উঠছে মাঝে মধ্যে। ট্রলার থেকে খালের পাড় মাত্র কয়েক হাত। বাঘ, কুমির যে কোন মুহূর্তেই ট্রলারের ভেতরে আসতে পারবে অনায়াসে। ভয়টা বেড়ে গেল ওদের। ওরা ছয়জন সবাই ট্রলারের ছৈয়ের ভেতরে চলে গেল। রাতটা থাকতে হবে ওখানে। ওটাকে ইঞ্জিনঘর বললেও ভুল হবে না। তবুও কিছুটা নিরাপদ ওটা। শক্ত কাঠের বেড়া ভেঙে সহজে আক্রমণ করতে পারবে না কোন বাঘ ভল্লুক। লাঠি ও দা-টা কাছে রেখেছে ওরা। ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল বিপুল।
অনেক রাতে শোঁ শোঁ শব্দে ঘুম ভাঙলো বিপুলের। শব্দ পেয়ে কান খাড়া করলো সে। আওয়াজটি কোন দিক থেকে আসছে! একটু বুঝে নিল সে। সামান্য কাঠের ফাঁক দিয়ে মোবাইল থেকে আলো ফেলল বাইরে। গা শিউরে উঠল তার। এই মুহূর্তে কাউকে ডাকা মোটেও ঠিক হবে না। ভয়ঙ্কর শঙ্খচূড়া শাপ ওটা। ওটারই ফোঁস ফোঁস আওয়াজ হচ্ছে ওখানে। দেখতে লাগলো কোন দিকে যায় ওটা। ভয় ভয়ে মিতুলের পা ধরে নাড়া দিল সে, উঠে বসলো মিতুল। আবার আলো ফেলে দেখালো সাপটিকে। জিহবা বের করে নৌকার মাথার দিকে চলে যাচ্ছে সাপটি। ভাগ্য ভালো এদিকটায় আসেনি শঙ্খচূড়া সাপটি।
ট্রলারের মাথায় লেগে থাকা ধুন্দলগাছের ডাল বেয়ে গাছে উঠে গেল সাপটি। মিলিয়ে গেল অন্ধকার বনে। ভয়টা আপাতত নেই বলে মনে হলো। ধীরে ধীরে ট্রলারটি খালের তীরের সাথে মিলে আছে। গাছ ঘেঁষে থাকায় সাপটি সহজেই উঠে আসতে পেরেছে নৌকায়। ওরা আবার ঘুমাতে চেষ্টা করলো। ঘুমের মাঝে ছেদ পড়ায় সহজে ঘুম আসছে না মিতুলের। বিপুল ঘুমিয়ে পড়ল কয়েক মিনিটের মধ্যে। দরজাটি মেলে একটু বাইরে তাকাতে চেষ্টা করল মিতুল। নিগূঢ় অন্ধকার, আলো দিয়ে যাচ্ছে জোনাকি পোকায়। আবার দরজা বন্ধ করে দিল সে।
তখনও ঘুম আসেনি মিতুলের। চোখ বুজে শুয়ে আছে। পাশে ঘুমাচ্ছে অন্যেরা। একটা মশার কয়েল পুড়ে পুড়ে ধোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে ওদের। মোবাইলটা চেপে সময় দেখে নিল সে। রাত তিনটা বাজতে দশ মিনিট বাকি এখনো। ঠিক এমন সময় একটি স্পিডবোট মাঝারি গতি নিয়ে চলে গেল ডান দিকের খালটায়। ভাগ্যিস, ওদের খালটায় আসেনি ওরা। বনের সাথে লেগে থাকায় ওদের ট্রলারটিও হয়ত দৃষ্টতে আসেনি। কপাট খুলে দেখল মিতুল। স্পিডবোটের সামনের ব্যক্তি টর্চের আলো ফেলে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ মিনিট পর আর একটি স্পিডবোট গেল পুনরায়। চিন্তার ব্যাপার, এই স্পিডবোটের আওয়াজ খুব কম। একটু দূরে থাকা কারও কানে পৌঁছাবে না সহজেই। এমনকি ঘুম ভাঙেনি অন্যদেরও। সামান্য ঢেউয়ে দুলে উঠলো ওদের ট্রলার। ওরা প্রায় আধঘণ্টা পর আবার ফিরে গেল একই পথে। নতুন করে ভাবনা শুরু হলো মিতুলের। ওরা কারা হতে পারে!
সকালে ঘুম ভাঙলো শিবলু মাঝির। তারপর একে একে অন্যদের। মিতুল তখনো ঘুমাচ্ছে। রাতে জ্বালানো মশার কয়েলটা পুড়ে ছাই হয়ে শেষ, কী সুন্দর গোল হয়ে পড়ে আছে ছাইগুলো! খেপলা জাল ফেলে কিছু মাছ ধরল শিবলু। প্রচুর মাছ এই খালটায়। নীলকমলে মাছ শিকার নিষেধ, এটাও কারণ হতে পারে। অনেকগুলো পারশে ও টেংরা মাছ, আছে কিছু চিংড়ি ও তপিস্যা মাছও। বড়ো একটা বেলে মাছ হাঁ করে চোয়াল ফুলাচ্ছে। মাছগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো টিংকু।
সকালের খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে। চা চুমুক দিতে দিতেই কথাটি তুলল মিতুল। সাপের কথাটি তুলতেই ওদের অনুশোচনা হলো, সাথে কার্বোলিক এসিড রাখার প্রয়োজন ছিল। সাপ তাড়াতে কার্বলিক এসিড ভীষণ কাজের। রাতে স্পিডবোটে কারা এল? কোথায় গেল, আবার ফিরেও গেল কোথায়? এত গভীরে ওভাবে আসা নিশ্চই বন বিভাগের লোক নয়, তাহলে আরও আলোর ছড়াছড়ি দেখা যেত। কারা ওরা? ভাবতে থাকল সবাই। শিবলু মাঝির হয়তো ধারণা থাকতে পারে ওদের বিষয়ে।
ওদের গন্তব্য বেশি দূরে ছিল না, কারণ ওরা আবার ফিরে এসেছে। ডিঙি নৌকা নিয়ে খাল ধরে এগিয়ে চলল মিতুল ও স্বপন। ওদের উদ্দেশ্য কিছু খুঁজে বের করা। নিশ্চয়ই কোন রহস্য উঁকি দিচ্ছে ওদের সামনে। স্রোতহীন খাল, চারিদিকে নীরবতা। বৈঠা ফেলার শব্দ ছাড়া কোথাও কোন আওয়াজ নেই। হঠাৎ মিতুলের চোখ গিয়ে পড়ল ঝামটি গরান গাছের গোড়ায়। পানি থেকে ঠিক এক হাত ওপরে ফেলা চকচকে একটি প্যাকেট। বেনসন সিগারেটের খালি প্যাকেট। ডিঙি নৌকা থামলো ওখানে। চারিদিকটা ভালোভাবে খেয়াল করলো। হ্যাঁ। রাতে স্পিডবোট বোটটি এখানেই লাগানো হয়েছিল। বাইনোকুলার দিয়ে ভালোভাবে দেখতে লাগলো স্বপন। কিছুই পাওয়া গেল না।
কয়েকটি পায়ের ছাপ ধরে একটু এগিয়ে গেল ওরা। একটু এগোতেই সামনে ছোট্ট একটি খাল। দশ ফুট হবে হয়তো। ডাল কেটে সাঁকো তৈরি করা ওটায়। সাঁকো পেরিয়ে ওপারে গেল দু’জন। এবার বাইনোকুলার ধরতেই দেখা গেল অনেক কিছুই। বাইনোকুলারের লেন্স ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল মিতুল। স্বপনের হাতে দিল ওটা। দু’জনেই অবাক! বনের এত গভীরে গাছের ওপরে ছোট্ট একটা চালাঘর করা। এখানে এখনি যাওয়া ঠিক হবে না, ওরা ফিরে গেল নিজেদের ট্রলারে।
রাতে ডিঙি নৌকায় মিতুলকে নামিয়ে দিল ঐ স্থানে, যেখানে দিনের বেলা সিগারেটের প্যাকেট দেখেছিল ওরা। ওখানে উঁচু ঝুপড়ি বাইন গাছটির ওপরে উঠে বসলো মিতুল। পিঠে ঝোলা ব্যাগে আছে লেজার লাইট, খাবার, পানি ও একটি চাকু। তন্দ্রা ঘুমে পড়ে যেতে পারে, এজন্যই গামছা দিয়ে নিজেকে বেঁধে নিল মিতুল। নিচে সিঁদুর গাছের শক্ত শ্বাসমূলে ভরা, পড়লে বিপদ হতে পারে খুব। অপেক্ষা করতে থাকল সে। পর্যবেক্ষণ শেষ করে আবার ডিঙি নৌকায় ফিরে যেতে প্রায় ভোর হয়ে গেল ওদের।
রাতে অনেক কিছুই জানতে পেরেছে মিতুল। আজ রাতেও এসেছিল ওরা। ওরা মূলত বন্য পশু-পাখি পাচারের একটি ভয়ঙ্কর চক্র। গহিন অরণ্য থেকে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে থাকে ওরা। সুযোগ পেলে বাদ যায় না বাঘের বাচ্চাকাচ্চা পর্যন্ত। সীমান্তের ওপারেও ওদের যোগাযোগ আছে। কয়েকটি বাক্সে ধরে রাখা আছে বিষাক্ত কিছু সাপও। ওগুলোর বিষ বের করে নেয় ওরা। বয়স্ক একটি লোক ছেলেসহ থাকে ওখানে। ওদের বাড়ি হয়ত উপকূলের কোথাও হবে। লিকলিকে গঠনের এমন একটি লোক গহিন অরণ্যে থেকে এমন কাজে লেগে থাকা! সাহস আছে লোকটির। কথাগুলো বলছিল মিতুল।

দশ.
একটি সিদ্ধান্তে আসতেই হবে। একটা কিছু করতে হবে। কী করা যায়? ভাবতে থাকে সবাই। এখান থেকে ফিরে বন বিভাগে বলা? জায়গাটি নাও চিনতে পারে ওরা। ওরা তো ভুল করে এসেছে এখানে। কোস্টগার্ড বা বনরক্ষী, কারো সাথেই যোগাযোগ করা সম্ভব নয় এই মুহূর্তে। আলোচনা চলতেই থাকল অনেকক্ষণ।
এতগুলো মেধাবী মুখ। সামান্য এই কয়েকজন লোকের এমন ঘৃণ্য অপকর্ম দেখেও এমন নীরবে চলে যাওয়া যায় না। হয়ত একটা অপরাধবোধ বয়ে বেড়াতে হতে পারে আজীবন। আজ রাতেই এদের বিরুদ্ধে কিছু করতে হবে। শুধু ওরা পাঁচজন নয়, যোগ হয়েছে শিবলু মাঝিও। সেও থাকবে এমন কাজে। টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে টিংকুর মনের রাজ্যে। ওরাইতো দিনে দিনে সুন্দরবনকে ধ্বংস করছে। ওদের কারণেই আজ প্রিয় সুন্দরবন থেকে বিলুপ্ত হয়েছে বহু প্রজাতির পশুপাখি। ওরা কি শুধু সুন্দরবনের শত্রু! ওরা দেশেরও শত্রু। আজ রাতে এক অপারেশন পরিচালনা করতে হবে। অপারেশনের নাম দিয়েছে বিপুল, ‘অপারেশন নীলকমল’। মিতুল নিজেই নেতৃত্বে থাকবে অপারেশন নীলকমলের।
ব্যাগ থেকে চারটি সাদা কাগজ বের করে জোড়া লাগিয়েছে মিতুল। কাগজের ওপর মাপবিহীন চাক্ষুষ নকশা এঁকে নিলো দ্রুত। কোথায় থাকবে ওদের স্পিডবোট, কোন দিকটায় খাল, কোথায় ওদের উঁচু টঙঘর। কীভাবে যেতে হবে ওখানে, কে কোথায় থাকবে। অবশ্য প্রথমে গিয়েই লিকলিকে লোকটাকে ছেলেসহ ধরতে হবে, তারপর রাতের মূল দলকে ধরার পালা। রাতে খাওয়া শেষে সবাইকে হারিকেনের মিটিমিটি আলোয় একটা প্রস্তুতি পর্ব সেরে নিল মিতুল। একটা ছোটোখাটো অপারেশন আদেশ বুঝিয়ে দিল। কিছু দিকনির্দেশনা দিতে ভোলেনি সে। অপারেশন শেষ হওয়ার আগে আলো জ্বালানো যাবে না। জোরে কথা বলা যাবে না, ভয় পাওয়া একদম চলবে না। কেউ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল ওপাশের মোটা কেওড়া গাছে উঠে অপেক্ষা করতে হবে। এমন অনেক কিছুই বলে দিল মিতুল। হারিকেন নিভিয়ে ওরা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। ডিঙি নৌকায় এক সাথে ছয়জন যাওয়া সম্ভব নয়। প্রথমে তিনজন উঠল, দ্বিতীয়বার বাকিরা যাবে। একটি কুরুয়া পাখি হঠাৎ ডেকে উঠল পাশের বাইন গাছের ওপর থেকে, নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল যেন সমগ্র বনের। ওরা বেরিয়ে পড়লো।
শিকারি লোকটি ভয় পেল, ভয় পেল সাথের ছেলেটিও। হঠাৎ করে তাদের সামনে এতগুলো লোক হাজির হয়েছে! কী ব্যাপার, কিছুই বুঝতে পারছে না ওরা। আচমকা ওদের দুজনকে টঙঘরের সাথে বেঁধে ফেলল ওরা। হাত-পা বাঁধল ছেলেটিরও। ওদেরকে বিশ্বাস করে বসিয়ে রাখা ঠিক হবে না। দৌড়ে পালিয়ে গেলে ভেস্তে যাবে সব পরিকল্পনা। ওরা ভালোভাবে দেখে নিল সবকিছু। দুটি টর্চ, একটি লেজার লাইট, একটি কুড়াল, দা ও ছুরি দেখতে পেল। নিচে একটি লোহার খাঁচায় দুটি জীবন্ত হরিণ পিউ পিউ করে ডাকছে। গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত ধরা পড়েছে হরিণ দু’টি। সবুজ ড্রামটি খুলতে যাচ্ছিল টিংকু। ওটার মুখ জাল দিয়ে বাঁধা। চিৎকার দিল লিকলিকে লোকটি। বলে উঠল, ধরবেন না বাবু। ওটার ভেতরে সাপ। থমকে গেল টিংকু।
রাত এগারোটা বাজে। স্পিডবোটে আসা লোকগুলোর এখানে আসতে এখনো অনেক বাকি। ওদের কাজের ফিরিস্তি বলতে শুরু করল শিকারি লোকটি। প্রথমে মুখ বুজে ছিল। মুখের ওপর জোরে একটা চড় কষে দিল সমীর। চড় দিতেই যেন মুখের তালা খুলে গেল। পটপট করে বলতে শুরু করল সব। কেওড়ার পাতা বিছিয়ে ফাঁদ পেতে ওরা হরিণ শিকার করে। সাপের বিষ পাচারের সাথেও কাজ করে ওরা। রাতে আগত লোকগুলোই ওদের খাবার-পানি দিয়ে যায়। শিকার করা কোনো পশুপাখি থাকলে নিয়ে যায় ওরা। এইতো কয়েকদিন আগে বিরল প্রজাতির দুটি কচ্ছপ তুলে দিয়েছে ওদের হাতে। এই এলাকায় হরিণ বেশি থাকায় বাঘ সহজেই খাবার পেয়ে যায়, তাইতো ওদের হাতে আক্রমণের ভয় কম। এখানে কোন বিপদের গন্ধ থাকলে লাল লেজার লাইটটি জ্বালানোর কথা। সবুজ আলোর সঙ্কেত পেলে ওরা চলে আসে নির্বিঘেœ। ওদের দু’জনের কাছে থাকে দুটি অস্ত্র, চালকসহ চারজন আসে ওরা। একজন স্পিডবোটে থেকে যায়। ওদের আরও এমন কয়েকটি পয়েন্ট আছে বলে জানালো লোকটি।
ওরা অপেক্ষা করতে থাকলো। খালের মুখে একজন থেকে বাকিরা পজিশন নিয়ে নিয়েছে। রাত একটার পর দুটি স্পিডবোট এসে হাজির হলো ওদের ওখানে। বোট থেকে নেমে সামনে এসে সিগন্যাল লাইট জ্বাললো এরা। ওপাশ থেকে মিতুল জ্বাললো সবুজ আলো। সঙ্কেত পেয়ে কাছে যেতে থাকল বনখেকোরা।

চারিদিকে থমথমে নীরবতা। নরম কাদা ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে তিনজন বনের শত্রু। প্রতিনিয়ত ওদের হাতে খুন হয়ে যাচ্ছে বন, পশু ও প্রকৃতি। অন্ধ বিবেক নিয়ে জাগতিক সুখের আশায় মোহাচ্ছন্ন ওরা। অপেক্ষায় আছে কয়েকজন মেধাবী তরুণ, যাদের চোখজুড়ে স্বপ্ন এই প্রকৃতিকে বাঁচানোর। ওরা ভালোবাসতে শিখেছে প্রকৃতিকে। যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় থেকেও ওরা বুকে ধারণ করে চলে এক টুকরো সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন।
ওপর থেকে টর্চের আলো ফেলল টিংকু। ওরা ভেবেছিল ওখানকার লিকলিকে লোকটি। ঠিক তখনই মিতুল লাঠি দিয়ে আঘাত করল ওদের ঘাড়ে। অস্ত্র তাক করার সময় পায়নি ওরা। অস্ত্র কেড়ে নিল শিবলু মাঝি। তিনহাত সমান লাঠি দিয়ে আঘাত করলো শপাং শপাং করে। পাল্টা আঘাতের সুযোগ পায়নি ওরা। ওদিকে ধরাশায়ী হয়েছে বোটের কাছে থাকা লোকটি। অন্যায় চিরকালই দুর্বল, ন্যায়ের আওয়াজ চিরকাল জোরালো। ওদেরকে বেঁধে ফেলল মাচার ওপর। বাকি রাতটুকু ওখানেই কাটালো ওরা।

এগারো.
ভোরের আলো ফুটতেই স্পিডবোট নিয়ে ছুটল দু’জন। বাকিরা আছে ওদের পাহারায়। বন অফিসে গিয়ে জানাল সবকিছু। বন প্রহরীসহ বন কর্মকর্তা দ্রুত ছুটল ঘটনাস্থলে। খবর পেয়ে ছুটে এসেছে কোস্টগার্ডের কিছু চৌকস সদস্য। স্পিডবোট আর কোস্টগার্ডের বোটের শব্দে যেন নীরবতা ভাঙল ঘুমন্ত নীলকমলের। পানির ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল নদীর কূলে। চরের ওপর একটি মৃত পশু নিয়ে টানাটানি করছে কয়েকটি শকুন। একটু দূরে কা কা করে ডাকছে কয়েকটি কালো কাক। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা ঢুকে গেল খালের ভেতরে।
ঘটনাস্থলে এসে অবাক হলো সবাই। বনের এত গভীরে কীভাবে শিকারিগুলো আসতে সাহস পেলো। কীভাবে এসেছে এই নবীন ছেলেগুলো। হরিণ ও সাপগুলোকে অবমুক্ত করা হলো ওখানেই। নীলকমলের খালে ছেড়ে দেওয়া হল কচ্ছপগুলোকে। বিরল প্রজাতির একটি ‘বাটাগুর বাসকা’ কচ্ছপ নিয়ে নিল বন বিভাগের লোকেরা। অবমুক্ত করা প্রাণীগুলির ছবি তুলল টিংকু। ছবি তুলল সবাই।
বিপদে পড়ল মিতুলেরাও। নীলকমলের এত গভীরে পর্যটকদেরও আসার অনুমতি মেলে না। কীভাবে ওরা এলো! শেষে বাবার পরিচয় দিতেই মনে হয় একটু সদয় হলো কর্তৃপক্ষ। তবে শর্ত একটাই, দ্রুত ফিরে যেতে হবে ওখান থেকে। ঝুঁকি নিয়ে এমন জঘন্য মানুষগুলোকে ধরিয়ে দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানালো কোস্টগার্ড অফিসারটি।
নীলকমল থেকে ওরা বাড়ি ফেরার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এবার শিবসা নদী হয়ে চালনা বন্দরে ফিরবে। ওদের ট্রলার চলছে তো চলছেই। নদী পাড়ের গাছগুলো ক্রমশ দূরে হারিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে আসছে নতুন গাছ। হঠাৎ মিতুলের চোখ গিয়ে পড়ল ট্রলারের মেঝের ওপর। বেশ কিছু সুন্দরী গাছের পাকা ফল পড়ে রয়েছে ওখানে। ফলগুলো কীভাবে এলো ওখানে? ভাবলো মিতুল। নিশ্চয়ই ছোটো খালে থাকার সময় ঝরে পড়েছে ওখানে। একটু চলতেই জেগে ওঠা নতুন চরের দেখা মিলল। শিবলু মাঝিকে বলল ট্রলার থামাতে। লাফ দিয়ে চরে নামল মিতুল, হাতে সুন্দরী ফলের বীজগুলো। ট্রলার থেকে চিৎকার দিলো বাকিরা আমিও আসছি। আমিও…
একে একে সবাই নেমে পড়লো শিবসার চরে। নৌকায় বসে হাসছে শিবলু মাঝি। নিস্তব্ধতা ভেঙে কিছু সময়ের জন্য হেসে উঠলো শিবসার লবণের চর। [সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply