সুলুস ক্যালিগ্রাফিতে আলিফ লেখার কৌশল -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

রায়হানের বন্ধুরা এসেছে ক্যালিগ্রাফি শিখতে। ড্রইং রুমে তাদেরকে বসিয়ে রায়হান খাতা, কলম ও কালির দোয়াত আনল ভেতর থেকে। বন্ধু জারিফ জিজ্ঞেস করল, ক্যালিগ্রাফি শিখতে কী কী জিনিস লাগে? রায়হান হাতে থাকা কলম, কালির দোয়াত আর খাতা দেখিয়ে বলল, আপাতত এগুলো হলেই চলবে। তবে যেহেতু আমরা সুলুস ক্যালিগ্রাফি শিখবো তাই এ শৈলীর একটা হাতে-কলমে শেখার বই কাছে থাকলে সুবিধা হয়। আর আমি তো হাতে কলমে তোমাদের শেখাবো ফলে অসুবিধা হবে না। তোমরা পরে বই জোগাড় করে নিও। রুম্মান জানতে চাইল বইয়ের নাম এবং কোথায় সেটা পাওয়া যাবে। রায়হান বলল, বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি ইনস্টিটিউট ক্যালিগ্রাফি শেখার কয়েকটি বই বের করেছে। সেখানে ‘সুলুস লিপিশৈলী’ (ব্যবহারিক) নামে বইটি তোমাদের জন্য ভালো হবে। আচ্ছা, আসো আমরা আজকে সুলুস শৈলীর আলিফ কীভাবে লিখতে হয় সেটা শিখি। রায়হান খাতা খুলে কালির দোয়াতে একটু কালি দিলো। দোয়াতটার ভেতরটা সবাইকে দেখিয়ে বলল, দেখো এর ভেতর রেশম সুতা দেওয়া আছে, ক্যালিগ্রাফি যারা করেন, তারা এ ধরনের বড়োমুখের দোয়াত ব্যবহার করেন আর আরবি ক্যালিগ্রাফি শিখতে হলে এর পরিভাষাগুলো আমাদের জানতে হবে। এই রেশম সুতাকে বলে ‘খইত হারির’ কিন্তু দোয়াতে এটা দেওয়ার পর একে বলা হয় ‘লিকা’।

মাবরুর বলল, এটা কেন দেওয়া হয়। রায়হান বলল, ক্যালিগ্রাফির কলম বা ‘কলামুল খত’ যদি সরাসরি কালিতে চুবিয়ে উঠাও তাহলে অতিরিক্ত কালি উঠে আসবে এবং লিখতে গেলে ঝপ করে সেটা পড়ে খাতা নষ্ট করে ফেলবে, লিকা থাকলে সেটা হবে না। কালি যতটুকু দরকার ততটুকু উঠবে এবং সুষম লেখা হবে। এছাড়া কখনও হাতের ধাক্কায় দোয়াত উল্টে গেলেও কালি পড়ে কাগজ নষ্ট হবে না। এই দেখো দোয়াত উল্টে দিলাম, কিন্তু কালি পড়ল না। আরও সুবিধা আছে, লিকা থাকলে কলমের মাথা সহজে নষ্ট হয় না, বিশেষ করে নল খাগড়ার ‘কলম কসব’ বেশ নরম হয়, সেটা দিয়ে লেখা ভালো হয় কিন্তু একটু চাপ পড়লে ভেঙে যায়। এবার তোমাদেরকে আলিফ লেখার কায়দা কানুন বলি। প্রথমে খাতার ওপর কলমের নিবকে ৬০ ডিগ্রি কোণে রাখো, তারপর নিচের দিকে সামান্য ডানদিকে ১০ ডিগ্রি কোণে নামিয়ে আনো। এটা ২ কত্ বা নোকতা বরাবর হবে। একে আমরা আলিফের মাথা বা র’স বলি। এই র’সকে ৩ ভাগ করে ওপরের ভাগ থেকে কলম সোজা নিচে সাড়ে পাঁচ কত্ বরাবর নামাতে হবে, এরপর দেড় কত্ বরাবর ছুরির মাথার মত করতে হবে। তোমরা ভালো করে এটা দেখো তারপর লেখো। (ছবি-১) এরপর নিবের কোনা দিয়ে মাথার নিচে জুলফ দেও।

এবার তোমাদেরকে সুলুস শৈলীর কয়েক প্রকার আলিফ লিখে দেখাচ্ছি। প্রথম আলিফটার নাম- ‘আলিফ আদি’ বা সুলুসের মূল আলিফ। একে আলিফ মুতলাক বা সাধারণ আলিফও বলা হয়। দ্বিতীয় আলিফের নাম- আলিফ মুশায়ার। এটার নিচে বামদিকে একটু বাড়তি অংশের জন্য একে আলিফ মুশায়ার বলে। তৃতীয় আলিফের নাম হলো- আলিফ দিওয়ানি। এটা লফজে জালালাহ (আল্লাহ শব্দ) লিখতে ব্যবহার করা হয়। এরপর চতুর্থ আলিফ হলো- আলিফ মুকাওয়াস বা ধনুকের মত বাঁকা আলিফ। এটা দিওয়ানি আলিফের মতো দেখতে। অনেক সময় আমাদের লম্বা আলিফ লেখার প্রয়োজন হয়, তখন একে আমরা মুরসাল আলিফ বলি। এছাড়া অন্য হরফের সাথে আলিফ আসে। যেমন- তোয়া, যোয়া, লাম-আলিফ। তোয়া যোয়াতে আলিফ আদি ব্যবহার করা হয়। তবে জায়গা কম থাকলে আলিফকে ধনুকের মতো করে লেখা যায়। উচ্চতায় এটা কমবেশি হতে পারে। লাম-আলিফের আলিফকে ‘আলিফ মায়েলাহ’ বা হেলানো আলিফ বলে। মিলিত কাফ বা ‘কাফ মাজমু’তে আলিফ মায়েলাহ ব্যবহার হয়। সাধারণত লাম-আলিফে জুলফটি একটু লম্বা করা হয়। আর পাশে জায়গা কম থাকলে এটা ‘নিসফ মায়েল’ বা আধা হেলানো হয়। এ ছাড়া মায়েলাহ আলিফকে পাকানো রশির মতো ‘আলিফে যাতে ঝাফিরাহ’ লেখা যায়। এতে প্যাঁচ দুই বা তিনটি হতে পারে। আবার একটি প্যাঁচও দেওয়া যায়। আজকে এতটুকু দরস বা পাঠ দেওয়া হলো। আগামী ক্লাসে তোমরা বাড়ির কাজ হিসেবে এগুলো অন্তত পাঁচ পাতা লিখে আনবে। সবাই সালাম দিয়ে বিদায় নিলো।

SHARE

Leave a Reply