Home গল্প ফাহিমের দু’টি কলম -আহসান হাবিব বুলবুল

ফাহিমের দু’টি কলম -আহসান হাবিব বুলবুল

বড়ো মানুষের ছোটবেলার স্কুল পালানোর গল্পও অনেক সময় মহান হয়ে ওঠে। এখন আর স্কুল পালানোর সুযোগ নেই। বাচ্চাদের ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে মায়েরা বাইরে বসে থাকেন।
ফাহিম অনেক দিনই চেয়েছে স্কুল পালাতে। প্রথম প্রথম স্কুলে যাওয়ার প্রচুর উৎসাহ ছিল তার। সে উৎসাহে ভাটা পড়েছে অনেকটা। এর কারণ হলো, ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা বড্ড বিরক্ত করে তাকে। ফাহিম খুব শান্তশিষ্ট প্রকৃতির ছেলে। তার এই ভদ্রতার সুযোগ নেয় ওরা।
যেদিন ফাহিম বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে সেদিন দুষ্টুরা ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কখনো ওর খাবার পানি এঁটো করে দেয়, কলম লুকিয়ে রাখে। ফাহিম ভাবে ক্লাসে স্যার আসলে অভিযোগ দিবে, পরে আর দেয় না। আসলে ও কোনো ঝামেলা পছন্দ করে না। বাড়ি গিয়ে মাকে বলে এসব কথা। মা বলেন, ফাহিম সোনা! শোন, ক্লাসে দুষ্ট ছেলের সংখ্যা হাতেগোনা ক’জন। অন্যরা কিন্তু সবাই ভালো। তুমি ভালো ছেলেদের সঙ্গে ভাব করবে। ভালো ছেলেরা তোমার বন্ধু হয়ে গেলে দুষ্টুরা আর সাহস করবে না তোমাকে জ্বালাতে। মায়ের কথা ওর খুব মনে ধরে।
– ‘মা ঠিকই বলেছেন। ভালো ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। কিন্তু কীভাবে। ওরাও তো দুষ্টুদের ভয় করে।’
ফাহিম ভাবে, ভয় করলে চলবে না। ও ভালো ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে ওদের বুঝাবে দুষ্টামি করতে নেই। আমরা সবাই তো বন্ধু সহপাঠী।
ফাহিম এখন আর স্কুল পালানোর কথা ভাবে না। ওর ভাবনা- কীভাবে সবার সাথে বন্ধুত্ব সদ্ভাব গড়ে তোলা যায়। ‘হ্যাঁ ভালো রেজাল্ট করে শিক্ষকের প্রশংসা কুড়াতে হবে। তাহলে সবার দৃষ্টি পড়বে তার ওপর। সবাই তাকে গুনবে।’
ফাহিমের আব্বু সরকারি চাকরি করেন। বদলির কারণে নতুন উপজেলায় আসতে হয়েছে তাদের। ফাহিম স্কুল বদল করে ভর্তি হয়েছে এই স্কুলে। তাই তার রোল নম্বরটা অনেক পিছনে। ক্লাসে ফার্স্ট, সেকেন্ড ও থার্ড বয় রয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষায় ওদের টপকানো কি সম্ভব হবে! এমনি ভাবান্তর ওকে আচ্ছন্ন করে। কোনো কিছুই অসম্ভব নয় বলে ও পড়াশোনায় মন দেয়।
প্রতিদিন ক্লাসে মন খারাপের মতো দু’একটি ঘটনা ঘটেই। কিন্তু ফাহিম কিছু মনে করে না। বরং সহপাঠীদের একটা খারাপের জবাব একটা ভালো দিয়ে দেয়। এটা ওকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। ও নিজে থেকেই এমনটা করে। এতে দুষ্টু ছেলেরা লজ্জা পেয়ে আর ওর সাথে দুষ্টামি করে না। যারা আগে ওকে উত্ত্যক্ত করতো তারা এখন ওর কাছের মানুষ হয়ে উঠছে।
সেদিন ক্লাস পরীক্ষা ছিল। সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখছে। ফাহিমও লিখছে। লিখতে লিখতে মাঝপথে ওর কলমের কালি ফুরিয়ে যায়। এখন কী করবে! ও ঘামছে। কাউকে কিছু বলছে না। শিক্ষককে বলবে! তবে যে সহপাঠীরা হাসাহাসি করবে। টিপ্পনী কাটবে! ফাহিম তাই নিশ্চুপ। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
পাশের সারিতে বসা মৌমিতা। একটুখানি একটা মেয়ে। ওর দৃষ্টিতে পড়ে ফাহিম।
: কী হয়েছে, লিখছো না কেন?
: কলমে কালি নেই।
: একটু সবুর করো। আমার লেখা প্রায় শেষ। আমার কলম দিয়ে লিখবে।
ফাহিম লেখা শেষ করে। মৌমিতাকে কলম ফিরিয়ে দিতে গিয়ে ধন্যবাদ জানায়। মৌমিতাও ভদ্রতার সুরে বলে ওয়েলকাম।
বাসায় গিয়ে ফাহিম মাকে সব বলে। মা বলেন, “মৌমিতা অনেক ভালো কাজ করেছে। ওকে ধন্যবাদ দিয়ে তুমিও ভালো করেছো। এখন থেকে তুমি ব্যাগে দুটো কলম রাখবে। ক্লাসে কেউ যদি তোমার মতো সমস্যায় পড়ে, তবে তুমি তাকে একটি কলম দিয়ে সাহায্য করতে পারবে।”
মায়ের পরামর্শটা ফাহিমের খুব পছন্দ হয়।
-“গুড আইডিয়া আম্মু!”
সেই থেকে ফাহিম দুটো কলম রাখে। ক্লাসে কেউ কলম হারিয়ে ফেললে বা লিখতে গিয়ে কালি শেষ হয়ে গেলে ও কলম দিয়ে তাকে সাহায্য করে। আর এ রকম প্রায়ই ঘটে। অল্প দিনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে যায় যে, ফাহিমের কাছে দুটো কলম আছে। তাই কেউ বিপদে পড়লে ফাহিমের কাছে আসে কলমের জন্য। ফাহিমও তাকে কলম দিয়ে সহযোগিতা করতে পেরে আনন্দ বোধ করে। একদিন শিক্ষকও ফাহিমের কাছে কলম চেয়ে বসেন। এভাবেই ফাহিম কলমের জন্য সবার কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে।
ফাহিম এখন অনেক বড়ো হয়েছে। নামকরা একটি উচ্চবিদ্যালয়ে মাধ্যমিকে পড়ছে। সেদিন ছিল স্কুলে বার্ষিক সাহিত্য সংস্কৃতি ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত বক্তৃতা পর্বে সবাইকে জীবনের স্মরণীয় ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হবে। এক এক করে বন্ধুরা বক্তৃতা করছে। এবার ফাহিমের পালা। ফাহিম ছোটবেলায় স্কুল জীবনে মৌমিতার কলম দিয়ে সহযোগিতার গল্প করলো। আরো বললো, তার পকেটে দুটো কলম রাখার গল্প। ফাহিমের বক্তৃতায় প্রচুর করতালি পড়লো।
শিক্ষকরাও উচ্ছ্বসিত হলেন।

SHARE

Leave a Reply