Home বিশেষ রচনা বাঙালির নববর্ষ বাংলা নববর্ষ -কিশোর কমল

বাঙালির নববর্ষ বাংলা নববর্ষ -কিশোর কমল

বাংলা সনের সৃষ্টি হয় ফসল তোলার সময়কে সামনে রেখে। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সৌর বছর অবলম্বনে এই নতুন সন গণনা শুরু হয়। তাই, প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিত হয়।

কিশোর বন্ধুরা তোমরা কেমন আছ, তোমাদের সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, বাংলা নতুন বছর শুরু বৈশাখ মাস দিয়ে। আর বৈশাখের প্রথম দিনটি বাঙালিরা নববর্ষ হিসেবে উদযাপন করে। বাংলা নববর্ষ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। কিন্তু, এটাও মনে রাখতে হবে বাংলা নববর্ষের সঙ্গে কিছু অপসংস্কৃতি ঢুকে গেছে, যা কখনোই বাঙালির সংস্কৃতির অংশ ছিল না। এজন্য খুব সাবধান থাকবে, যেন এসব অপসংস্কৃতি তোমাদের কোমল মনে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে।

তোমাদের একটি মজার তথ্য জানিয়ে রাখি বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিষ্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য আছে। আর তা হলো হিজরি সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিষ্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরি সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। কিন্তু, পহেলা বৈশাখ রাত ১২টা থেকে শুরু না সূর্যোদয় থেকে শুরু এটা নিয়ে অনেকের দ্বিধা আছে, ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে, যা এখনো চলমান।

তোমরা কি জানো বাংলা নববর্ষের এবং বাংলা সনের প্রচলন কীভাবে হলো? মুঘল বাদশাহ আকবরের সময় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালন হতো। মুসলমানরা নববর্ষের দিন ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষ মুনাজাত ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করতেন।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে ৯৯৮ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। বাদশাহ আকবর ৯৬৩ হিজরিতে অথাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে (১৪ ফেব্রুয়ারি) দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা চিরন্তনীয় করে রাখার জন্য ৯৬৩ হিজরি অবলম্বন করেই বাংলা সন চালু করা হয়। অর্থাৎ ১, ২, ৩- এভাবে হিসাব না করে মূল হিজরি সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ফলে জন্ম বছরেই বাংলা সন ৯৬৩ বৎসর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু করে।

বাংলা সনের সৃষ্টি হয় ফসল তোলার সময়কে সামনে রেখে। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সৌর বছর অবলম্বনে এই নতুন সন গণনা শুরু হয়। তাই, প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিত হয়।

আচ্ছা তোমরা হালখাতার কথা শুনেছ? হালখাতা পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ ও নতুন হিসাবের খাতা খোলার আনন্দ- আয়োজন, সঙ্গে আপ্যায়ন ও আনুষ্ঠানিকতা। আগে তো বাংলা বছরের প্রথম দিন মানেই হালখাতা। সাধারণত প্রত্যেক চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাসুল বা কর পরিশোধ করতে হতো। এর পরের দিন পয়লা বৈশাখে জমির মালিকেরা নিজেদের অঞ্চলের বাসিন্দাদের মিষ্টি, মিষ্টান্ন, পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এটা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে এসেছে। আগে আমরা দেখতাম হালখাতার দিনে দোকাটপাট পরিপাটি করে সাজানো হতো। মানুষের বাড়িতে নিমন্ত্রণ কার্ড পাঠিয়ে দাওয়াত করা হতো। তবে, পৃথিবী পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সবকিছুর ডিজিটালাইজেশন হচ্ছে। আর কথিত আধুনিতকার স্রােতে আমাদের সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।

তবে কোথাও কোথাও এখনো বাঙালির চিরচেনা ঐতিহ্য হালখাতা টিকে আছে স্বমহিমায়। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মহলেও আছে হালখাতার রীতি রেওয়াজ। বছরের প্রথম দিনে ক্রেতাদের আপ্যায়নের মাধ্যমে তারা খাতা হালনাগাদ করে বকেয়া আদায়ের এই প্রথাটি ধরে রেখেছেন। বাংলা সন চালু হওয়ার পর নববর্ষ উদযাপনে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে হালখাতা দ্বিতীয় বৃহৎ অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেনাদার ও পাওনাদারের মধ্যে বিশ্বাস, আস্থা ও গভীর সম্পর্কের প্রকাশ ঘটতো হালখাতার মাধ্যমে। এটা ছিল সৌজন্য প্রকাশের এক ঐতিহ্য।

বাংলাদেশে নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এদিন গ্রামের মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোনো খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানা রকম পিঠা পুলির আয়োজন। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড়ো আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম-এর লালদীঘি ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

একটা সময় বাংলা নববর্ষ বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত বৈশাখী মেলা। বড়ো বট-পাকুড়ের গাছকে কেন্দ্র করে আশপাশে সারি-সারি এলোমেলো অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসত সেসব মেলা। যেখানে থরে থরে সাজানো থাকত মাটি-বাঁশ-বেত-কাঠ-পাটসহ দেশি কাঁচামালে তৈরি নিত্য ব্যবহার্য, খেলনা, কৃষিজ নানা লোকজ খেলা, মুড়ি-মুড়কি-খৈ-জিলাপির পসরা। মেলার মাঠে কী থাকত জানো তো? মেলায় থাকত নাগরদোলা। আমরা বড়োদের সঙ্গে নাগরদোলায় চড়তাম। নাগরদোলায় সবাই আবার উঠতে পারত না। কারণ এটা অনেক সময় ধরে ঘুরত। তাই অনেকেই চড়তে ভয় পেত।

বর্তমানে বৈশাখের সঙ্গে যেসব অপসংস্কৃতি জড়িয়েছে তার অন্যতম হলো পান্তা-ইলিশ। তোমাদের মনে রাখতে হবে, এটার সঙ্গে কিন্তু বাংলা নববর্ষের সম্পর্ক নেই। এটা হলো অপসংস্কৃতি। যা কৌশলে এক শ্রেণির মানুষ আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাই এসব থেকে নিজে যেমন দূরে থাকবে এবং অন্যদেরও সাবধান করবে।
তোমাদের মনে রাখতে হবে আমরা মুসলিম। তাই নববর্ষ উদযাপন করতে হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ এবং দেশীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে। অন্যদের সংস্কার, বিশ্বাস, জীবনযাত্রা যেন আমাদের ছুঁতে না পারে।

SHARE

Leave a Reply