Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস নীলকমলের মায়া -তারিকুল ইসলাম সুমন

নীলকমলের মায়া -তারিকুল ইসলাম সুমন

ইচ্ছে করলে বন বিভাগের ট্যুরিস্ট বোটে যাওয়া সম্ভব ছিল। মিতুলের বাবা যেহেতু বিভাগীয় বন কর্মকর্তা। খুলনা ফরেস্টঘাটের পন্টুনে প্রতিদিন স্ন্দুর সুন্দর বোট বাঁধা থাকে। বনরাণী, বনকন্যা, সুন্দরী আরও এমন নামের। বোটগুলির আকৃতিও বেশ চমৎকার। বাবা মায়ের সাথে অনেকবার সুন্দরবনে যাওয়া হয়েছে মিতুলের, তবু যেন ইচ্ছে পূরণ হয়নি এখনো। করমজল থেকে দুবলার চর পর্যন্ত সব স্পটে গেলেও সবখানেই থাকতে হয়েছে বাবা-মায়ের নজরে নজরে। একটু দূরে গেলেই বাবা বলে উঠতো, আর যেও না ওদিকে,কী করছো ওখানে? থেমে যেত মিতুলের দুটো পা। সময় নিয়ে চরের বুকে ডাকুর মাছের চলাচল দেখতে খুব ভালো লাগে মিতুলের। ও হ্যাঁ, মিতুল এবার দশম শ্রেণিতে পড়ছে।
খুলনা জিলা স্কুলের প্রাত শাখার সেরা ছাত্র মিতুল। সার্কিট হাউজের বড়ো মাঠে নিয়মিত ক্রিকেট খেলে সে। সুঠাম দেহ আর লম্বা গড়নের ছেলেকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন সামরিক অফিসার হবে। মিতুলের ইচ্ছে ভালো ক্রিকেটার হওয়া। বাবা এখন গবেষণার কাজে বিদেশে আছেন, এই সুযোগটা কাজে লেগেছে খুব। মাকে বোঝানো সহজ। মা কখনো মিতুলের ইচ্ছের দ্বিমত করেন না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছোটোখাটো একটি ট্রলার ভাড়া করতে হবে। মিতুলের সাথে যোগ দিয়েছে স্বপন, সমীর, টিংকু ও বিপুল।

সমীর ও স্বপন জিলা স্কুলে একই শ্রেণিতে পড়ে। টিংকু ও বিপুল সেন্ট জোসেফ হাই স্কুলের ছাত্র। ওরাও দশম শ্রেণিতে পড়ছে। ক্রিকেট মাঠের নেট প্র্যাকটিস থেকেই সবার মাঝে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। খেলা শেষে বিশ্রামের সময় এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা। সুন্দরবনে যেতে হবে। ভালোভাবে ঘুরে দেখতে হবে প্রিয় এই বন। প্রিয় সুন্দরবন। এবার ছোটো বড়ো সব নদীগুলো দেখতে হবে। বাদ যাবে না খালের শেষ মাথাটাও। কালীর চরে নেমে রাগবি খেলতে হবে। সরো কাদা গায়ে মেখে রাগবি খেলা! অনেক মজা হবে নিশ্চয়ই।
স্বপনের বাবা একজন ব্যাংকার। শ্যামলা গায়ের রং। মধ্যম গড়নের হলেও খুব সাহসী। একবার ক্লাস থেকে এক বিষধর সাপ বের হয়েছিল। সবার মাঝে সেকি হৈ হুল্লোড়। সবাই যখন ভয়ে দৌড়াচ্ছিল, স্বপন গিয়ে লেজ ধরে মাথার ওপর ঘোরাতে থাকে। শেষমেশ নিয়ে লোহার খাম্বার সাথে এক আঘাত করে মেরেছিল সাপটিকে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখে খুব, কিন্তু কখনো সুন্দরবনে যাওয়া হয়নি তার। সুন্দরবনে যাওয়ার কথা শুনে রাজি হয়ে গেল স্বপন। দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার আগেই সারভাইবাল নিয়ে ভাবতে শুরু করলো সে। ওর একটাই সমস্যা, রাগ হলে কথা বের হতে চায় না। তোতলামি শুরু হয়ে যায়।

সুন্দরবনে যাওয়ার কথা ভাবতেই হলুদের ওপর ডোরাকাটা বাঘ এসে হাজির হলো বিপুলের চোখে। একটু বেঁটে বিপুল। ভালো ক্রিকেটার হলেও আছে কবি স্বভাব। সুযোগ পেলেই অন্ত্যমিল দিয়ে কবিতা লিখে ফেলে। শহরের কয়েকটি সাহিত্য আসরে যোগ দেয় মাঝে মধ্যে। ব্যাগে থাকে ছোট্ট একটা ডায়েরি। অনেক অজানা গাছের নাম জানলেই টুকে রাখে সে। কবিতার ভাষায় অনেক কিছুর প্রতিবাদ করে যায় অনায়াসে। এইতো, বাদ যায়নি সুন্দরবনের এত কাছে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারটাও। এটার ঘোর বিরোধী সে। কিন্তু মানববন্ধনের দিনে শিববাড়ি মোড়ে যাওয়া হয়নি তার। পুলিশের হাতে লাঠিপেটা খাওয়ার ভয়ের কাছে পরাজিত হয়েছিল সে। খুব ভীতু স্বভাবের বিপুল। অনেক পশু-পাখির নাম সহজেই বলে দিতে পারে সে।
টিং টিংয়ে টিংকু। কোঁকড়ানো মাথার চুল। সামনের কয়েকটা চুল রং করে রাখে প্রায়ই। মোবাইলে গেম খেলে সময় কাটায় খুব। কয়েকদিন হলো নেশাটা একটু কমেছে। বাবা-মা অনেক বুঝিয়েছে। এইতো সেদিন মারা গেল এক কিশোর। পাবজি খেলার জন্য নেট কিনতে পঞ্চাশ টাকা চেয়েছিল মায়ের কাছে। মা দেয়নি, তাই অভিমানে আত্মহত্যা করেছে! ওটাই দাগ কেটেছে টিংকুর মনে। মোবাইল চালনায় এক্সপার্ট টিংকু কম্পিউটারেও সমান পারদর্শী। খুব বুদ্ধিমান। খাওয়ায় তেমন আগ্রহ না থাকলেও কোমল পানীয় খুব পছন্দ তার।

সমীর কুমার চ্যাটার্জী। বাবা গত হয়েছেন দু’বছর হলো। ভাই শহরে ভালো ব্যবসা করছেন। ভোজনপ্রিয় সমীর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে জিলা স্কুলে চান্স পেয়েছে। গ্রামে থাকতে মায়ের শাসনে থাকলেও শহরে তেমন হয়ে ওঠে না। দ্রুত হাঁটলে শরীরটা নড়তে থাকে সমীরের। পা ঘষে ঘষে হাঁটার দরুন প্রায়ই স্যান্ডেলের তলা ক্ষয় হয়ে যায় তার। বারবার চশমাটা নেমে আসে নাকের ওপর, তখন ওটা ওপরে তুলে দেয়। সমীরও কয়েকবার গিয়েছে সুন্দরবনে, অমত করেনি সেও। এবার যেতে হবে সুন্দরবনে।

দুই.

বছরের শুরু। লেখাপড়ার চাপ নেই। ক্রমশ নদীগুলোর পানি কমছে। ঢেউ নেই, গর্জন নেই। ঝড় তুফানেরও আভাস নেই। ওপারের দেয়াড়া গ্রাম থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করেছে ওরা। দশ দিনের জন্য সুন্দরবনে সফরে যাবে। ট্রলার মালিক, সেও যাবে সাথে। লোকটির নাম শিবলু। শিবলু মাঝি। ট্রলারের পেছনে একটি ডিঙি নৌকাও বাঁধা থাকবে ওদের সাথে।
বাজার থেকে একে একে সব কেনাকাটা শেষ করলো ওরা। বাদ যায়নি চাল থেকে চা পর্যন্ত। বিকাল বেলা চা না পেলে মাথাটাই ঝিমঝিম করে ওঠে বিপুলের। নেওয়া হয়েছে ব্যারেল ভর্তি ইঞ্জিনের তেল। খাবারের সাথে মিশতে পারে ডিজেল তাই খুব সাবধানে পলিথিন দিয়ে আটকে রেখেছে। পর্যাপ্ত শুকনো খাবার নিয়েছে সমীর। বিস্কুট, চিঁড়া, গুড় আর খেজুর থাকলে ভালোভাবে কেটে যাবে ওর। বিশুদ্ধ পানি আর প্রাথমিক চিকিৎসার কিছু ঔষুধ নিয়েছে টিংকু। দা নিতে ভোলেনি শিবলু মাঝি। অনেকবার সুন্দরবনে গিয়েছে সে। বাড়লিয়া থেকে বেষেখালি নদী ওদিকে শিবসা, পশুর ও কালিন্দী সব নদী চেনা তার। এটাই ওদের জন্য বাড়তি পাওয়া। একটা খেপলা জালও নিয়েছে শিবলু মাঝি।
কথামতো ফজরের আজানের পূর্বেই থাকতে হবে। সবাই হাজির হয়েছে, শুধু রিংকু ছাড়া। রেগে উঠলো স্বপন। আটকে গেল তার কথা। তোতলাতে গিয়ে বলল, বা-আ-আ-দদে ওকে, নে-নে নেওয়ার দরকার নেই।
ফোন বের করল মিতুল। রিং দিতে যাবে এরই মধ্যে পন্টুনের মাথায় চিৎকার দিয়ে উঠল রিংকু।
– এসে গেছি আমি।
– এই রিংকু, এত দেরি করলি কেন? বলল স্বপন।
– আমার পাওয়ার ব্যাংক ফেলে এসেছিলাম। আবার আনতে গিয়ে দেরি হলো, স্যরি দোস্ত।
– হেই রাখ তোর পাওয়ার ব্যাংক। আমরা……
– আরে বোকা এইটাই কাজের। হাসতে থাকে রিংকু।
ট্রলারের মাথায় ধাক্কা দিয়ে একলাফে উঠে পড়ে শিবলু। ভেতরে গিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে দিলো। হাল ধরে বসল ছৈয়ের ওপরে। বাকিরা তখন মালামাল গোছাতে ব্যস্ত। এরই মধ্যে ভৈরবের ওপার থেকে আজান ভেসে আসে, ‘আসসালাতু খাইরুমমিনান নাওম।’ শান্ত নদীর বুক চিরে, ট্রলার চলতে থাকল ভটভট ভট শব্দ করে।

তর্ক তখনো চলছিল দু’জনের মাঝে। মিতুল এসে থামায়। ভৈরবের বুক থেকে পূবের সুবহে সাদেকের আকাশ দেখে শিহরিত হয় বিপুল। আঙুল দিয়ে দেখায়। দেখেছিস সমীর, ভোরের আলো-ছায়ায় আকাশটা কী অপরূপ লাগছে! মনের অজান্তেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের এক কলি গেয়ে ওঠে বিপুল, ‘এমন দেশটি কোথাও পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার মাতৃভূমি।’
সমীরের পেটটা সিগন্যাল দিয়ে উঠলো। মিতুলকে ডেকে বলল,
– মিতুল আজ সকালে খাওয়া-দাওয়ার কী ব্যবস্থা?
– দেখা যাক কী করা যায়। বলল মিতুল।
অনিশ্চিত প্রতীক্ষায় থাকা যায় না। নিজের ব্যাগটার দিকে হাত বাড়াল সমীর।
অস্পষ্ট আলোয় দেখা যাচ্ছে রূপসা ঘাট। কী নীরব-নিথর। এই রূপসা ঘাট কিছুক্ষণের মধ্যে হয়ে উঠবে ব্যস্ত। ব্যস্ত হয়ে উঠবে যাত্রীরা। কে কার আগে যেতে পারে, এটাই যেন প্রতিযোগিতা। পূবপাশে ঘাটের বটগাছটা আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে। এই রূপসা নদী হয়তো বলতে পারে, সেদিন কী ঘটেছিল রূপসার বুকে।

ঠিক এখানে। যেখান দিয়ে ট্রলারটি যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। এই রূপসার বুকে ডুবেছিল মিত্র বাহিনীর দুটি যুদ্ধযান। বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখানে ডুবেছিল। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীরবিক্রম মহিবুল্লাহ, ঐ তো রূপসার পূব পাড়ে ঘুমাচ্ছেন। কী শান্তির ঘুম। বিপুল হাত দিয়ে দেখায় ওখানটা।
খানজাহান আলী সেতুর নিচ দিয়ে রূপসা পার হয়ে কাজীবাছা নদী। কাজীবাছা নদী পার হতে না হতেই ভোরের সূর্য চিকচিক করে হেসে ওঠে। চালনা বন্দরের কাছে আসতেই শিবলু মাঝি জিজ্ঞাসা করে, কোন দিক দিয়ে যেতে হবে। শিবসা দিয়ে, নাকি পশুর দিয়ে? ঐ তো পশুর নদী দেখা যায়।
মোংলায় যেতে হবে। ওখান থেকে সকালের নাস্তা সেরে আরও কিছু পানি নিতে হবে। তারপর সোজা করমজলে গিয়ে থামতে হবে। করমজলটা আবারো দেখবো সবাই। বলল মিতুল।

মোংলা বন্দরের কাজ শেষ হলো। মোংলা বন্দরের কাজ শেষে সোজা করমজলে এসে থামল ট্রলারটি। মোংলা বন্দর থেকে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে এখানে আসতে। ডান পাশের খালে ঢুকে করমজল পর্যটন কেন্দ্রের ঘাট। নামতে থাকলো সবাই। ট্রলারে থাকবে শিবলু মাঝি।
করমজলে নেমেই যেন সুন্দরবন দেখার প্রথম পাঠ শুরু হলো বিপুলদের। মিতুলের যদিও এখানটা আগেই দেখা আছে। বাকিদের জন্যই মূলত করমজলে নেমেছে সে। আবার নতুন করে দেখা হোক সবকিছু। এর মধ্যে বদলে যেতে পারে অনেক কিছু। বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রায় বিশ হেক্টর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই পর্যটন কেন্দ্র। অবশ্য খুলনা থেকে একদিনেই এখানে এসে ভালোভাবে সবকিছু দেখে আবার ফেরত যাওয়া যায়। মিতুল পাঁচটি টিকিট কেটে নিয়ে এলো। বাবার পরিচয় দিলে টিকিটের প্রয়োজন হতো না। সামান্য কিছু টাকার জন্য বাবাকে টেনে আনা ঠিক মনে হয়নি মিতুলের।
ভূমিতে তৈরি সুন্দর একটি মানচিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিল সবাই। ছবি তুলে নিল টিংকু। কাঠের তৈরি মানকি ট্রেইল নামের ব্রিজটার ওপর হাঁটা শুরু করলো সবাই। কী যে এক আনন্দের ঢেউ খেলে যেতে শুরু করলো বিপুলের মনে। পায়ের চাপে কাঠগুলো সরে যেতেই শব্দ হতে থাকলো ঘটাংঘট ঘটাংঘট। দু’পাশ থেকে কেওড়া গাছের নরম শাখা নুয়ে পড়েছে। নিচে নরম কাদার মাঝ থেকে ফুঁড়ে উঠেছে সুন্দরী ও কেওড়া গাছের শ্বাসমূল। অনেকটা পথ গল্প-কথায় হাঁটলো সবাই।

তিন.

পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে হাঁফিয়ে উঠলো সমীর। পিঠের ছোট্ট ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেট আর পানি বের করল সে। ঘামে ভিজে জবুথবু করছে গায়ের টি শার্ট। সমীরের অবস্থা দেখে রিংকু বলে উঠলো,
– কিরে দাদা গোছল করছিস নাকি?
– তোর গায়ে কি রক্ত আছে যে ঘামবি? বলল সমীর।
হো হো করে হেসে উঠলো সবাই।
হরিণের জোড়াচোখ যেন মায়া ছড়ায়। খুব কাছে আসে পোষা এই হরিণগুলি। হাত থেকে বাদাম নিয়ে যায়। পাশেই কয়েকটি কুমিরের খামার। ওখানেই নানান প্রজাতির কুমির রাখা। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র কুমির প্রজনন কেন্দ্র।
আনন্দের মাঝে থেকে থেকে অনেকটা পরিশ্রম করা হয়েছে সবার। দুপুর গড়িয়েছে অনেকক্ষণ হলো। ট্রলারে ফিরে যেতে চাইল সবাই। এরই মাঝে ঘটে গেল এক অঘটন। করমজলের বানরগুলো মানুষের খুব কাছে আসে। এতক্ষণে হাতের খাবার দেওয়ার লোভ দেখাচ্ছিল টিংকু। এক ফাঁকে ছোঁ মেরে মোবাইলটি নিয়ে গেল হাত থেকে! তারপর গাছে উঠে বসেছে বানরটি। গাছের ওপর থেকে দাঁত বের করে ভেংচি দিচ্ছে। মহা বিপদে পড়েছে টিংকু। মোবাইলের ব্যাক কভার দাঁত দিয়ে ছিঁড়ছে। নিচে কোঁকড়া চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে চুল টানছে টিংকু।

অন্যেরা তখনও হাসছে। প্রায় আধঘণ্টা পার হলো। মোবাইল ফেরত পাওয়ার নাম নেই। সবাই মিলে পিছু নিলো বানরটির। সবাই বেশ ক্লান্ত। শেষমেশ ফেলে দিল ওটা। নিচের মাটি নরম থাকায় ভাঙেনি মোবাইল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল টিংকু। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছতে লাগলো প্রিয় মোবাইলটি। ট্রলারে উঠে পড়লো সবাই। খেয়েদেয়ে ততক্ষণে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল শিবলু মাঝি। সবাই ঘুরতে গেলে স্টোভ জ্বালিয়ে খাবার রান্না করেছে সে। সহজ মেন্যু। ভাত, ডাল আর আলুভর্তা। সবাই চেটেপুটে খেয়ে নিল খাবার। পেট না থাকা টিংকুও আজ অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলেছে। এ দৃশ্য মা দেখলে নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যেত।
ট্রলার পুনরায় চলতে শুরু করেছে। ট্রলার ঘুরতেই দেখা মিলল গোল ঝাড়ের পাশে চোখ বুজে পড়ে আছে একটি কুমির। হাই হুই করতে থাকলো কেউ কেউ। ভ্রƒক্ষেপ করার ইচ্ছে নেই কুমিরটির। সামান্য বাতাস পেয়ে কাঁপছে গোলপাতার চেরা পাতা। গ্রামের গোলঝাড়ে পাতার এমন কাঁপনি দেখেছে মিতুল। খুব ছোটোবেলায় ওরা বলত, জিকির করছে গোলপাতায়। কিন্তু এখন! না, মানুষ বড়ো হওয়ার পাশাপাশি ভাবনারও অনেক পরিবর্তন হয়ে যায়। পরিবর্তন হয়েছে সে নিজেও।

চার.

পশুরের কূল বেয়ে ট্রলার চলছে তো চলছেই। শুধু সবুজ আর সবুজ। একঝাঁক সুন্দরী হাঁস ভাসছে একটু দূরে। কোনটা ডুব দিয়ে একটু দূরে আবার ভেসে উঠছে। টিংকু ছবি তুলতে তুলতে বলে উঠলো, কীরে এখানে আবার হাঁস পুষেছে কে? হো হো করে হেসে উঠলো সবাই। দূর বোকা, ওটা হাঁস পাখি। অনেকটা পানকৌড়ির মতো মনে হলেও ওটার নাম কালোমুখ প্যারাপাখি। ওটা সুন্দরবন ছাড়া তেমন কোথাও দেখা যায় না, বলল মিতুল। এটা তার বাবাই তাকে একদিন চিনিয়েছে।

একটা বিষয় খেয়াল করেছে বিপুল। সুন্দরবনের অসংখ্য পাখির মধ্যে মৎস্যভোজী পাখিগুলি নদীর কূলঘেঁষা গাছে দেখতে পাওয়া যায়। মদনটাক, বক ও সারস পাখিগুলি হয়তো মাছ ধরার জন্যই ওভাবে বসে আছে। নদীর কূলঘেঁষা গাছের ডালে ডালে। ঐ তো সুন্দরী গাছটার ওপর গলা গুঁজে বসে আছে একটা সারসপাখি। ওকি ঘুমাচ্ছে! স্বপনকে দেখালো বিপুল।
বন বিভাগের একটি বোট এসে থামিয়ে দিলো মিতুলদের ট্রলার। ওদের ট্রলারে উঠে পড়লো দুজন বনরক্ষী। সশস্ত্র বনপ্রহরীদের দেখে একটু ভয় পেল বিপুল। ওরা কয়েকটি ব্যাগ চেক করলো। এগিয়ে এলো মিতুল।
– কোথায় যাবেন আপনারা?
– নীলকমল- হিরণপয়েন্ট।
– পাস আছে কি?
– হ্যাঁ।
ব্যাগের মুখ খুলে কাগজটা এনে দেখাল মিতুল। ও আগেই জানতো এটা। তাইতো বন অফিস থেকে একটা অনুমতিপত্র সাথে রেখেছে সে। বিভাগীয় প্রধানের ছেলে। এক নামেই চেনে সকলে।
সবাই অবাক। মিতুল এ কাজ কখন করেছে? ওদেরকে বলেনি! বনের গভীরে ঢুকতে হলে কর্তৃপক্ষর অনুমতি নিতে হয়, এ কথা জানে শিবলু মাঝিও।
ট্রলার আবার চলতে শুরু করলো। বেশ রাত হয়েছে। নিরাপদ দেখে থামতে হবে কোথাও। রাতের খাবার খেয়ে একটু অপেক্ষা করে আবার যাওয়া যাবে। এর মধ্যে জোয়ারটাও শেষ হয়ে যাবে। উজানে চলতে যেন ইঞ্জিনের দম বের হয়ে আসে। মাঝে মাঝে কালো ধোঁয়া ছাড়ে। নোঙর ফেলল শিবলু। রান্নার কাজে হাত দেয় সবাই।

এখানে আবার বাঘ আসবে নাতো? বলল মিতুল। সাঁতার কেটে ট্রলারের কাছে আসলেও আসতে পারে। কী বলেন শিবলু ভাই। হেসে ওঠে শিবলু। ছোটো খালের মাঝে হলে রাতে থাকা নিরাপদ নয়। এত বড়ো নদীতে এসে আক্রমণ করা! শুনিনি কখনো। ভয় নেই। আমরা চর থেকে বেশ দূরে আছি। ভয় তো ওদেরও আছে। মানুষইতো বাঘ মারছে নানান জায়গায়। ভুল করে লোকালয়ে ঢুকে পড়লেই হলো, আর রক্ষা নেই ওদের। গতবারও কালাবগীতে একটি বাঘ মারা পড়েছে। ঠিক না এভাবে ওদের হত্যা করা। ওদের বনে ফিরতে দেওয়া উচিত।
চলার পথে হারবারিয়া থামতে চেয়েছিল কেউ কেউ। হারবারিয়া ইকো পার্কটি দেখলে কেমন হয়? মত দিল না মিতুল। ফেরার পথে দেখা যাবে ওটা। কাঠের তৈরি ঘর, গোলঘরসহ বেশকিছু দেখার থাকলেও দুবলার চরে যেতে হবে। তারপর নীলকমলে। [চলবে]

SHARE

Leave a Reply