Home প্রচ্ছদ রচনা স্বাধীনতা আমাদের অঙ্গীকার -মাশুক চৌধুরী

স্বাধীনতা আমাদের অঙ্গীকার -মাশুক চৌধুরী

স্বাধীনতা শব্দটির মাঝেই এমন এক আকর্ষণ, এমন এক অনুভূতি জড়িয়ে আছে যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ছোটোদের হৃদয়ের কোণে স্বাধীনতা শব্দটাই যেন সব থেকে প্রিয়, সব থেকে বেশি আরাধ্য ও প্রধান লক্ষ্য।
আমরা ছোটোবেলায় সব থেকে বেশি ভাবি আমরা কবে বড়ো হবো, কবে স্বাধীন হবো। তবে সেই স্বাধীনতা ছিল বাবা-মার শাসন থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা। চলতে ফিরতে, কথা বলতে, কোনও কাজ করতে কারও কোনও বাধা আসবে না, ডাক আসবে না সেই স্বাধীনতা প্রাপ্তির আকাক্সক্ষাই আমাদের মনের চারপাশে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াতো।

যদিও বাবা-মার শাসন, তদারকি আমাদের কল্যাণেরই জন্য। তবু আমরা ছোটোবেলায় সেই শাসনবেড়ি খুলবার প্রাণান্ত চেষ্টা করি। এটিই মানুষের সহজাত চেতনা। স্বাধীনতার চেতনা। মানুষ কিছুতেই অন্যের অধীনতা পছন্দ করে না। তা কল্যাণের জন্যই হোক আর ক্ষতিকরই হোক। মহান আল্লাহই মানুষকে এমন মনোবৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন তোমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবলমাত্র এক আল্লাহর দাসত্ব মেনে চলার জন্য। অন্য কারও দাসত্ব মানা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য বা ফিতরাত নয়। এমনকি জিন জাতিকেও আল্লাহ কেবলমাত্র তাঁরই দাসত্বের কথা বলেছেন। আর স্রষ্টার দেওয়া সেই গুণবৈশিষ্ট্য মানুষকে স্বাধীনচেতা করে।

মানুষ কতটা স্বাধীনচেতা? আল্লাহ মানুষকে কতটা স্বাধীনতা ও এখতিয়ার দিয়েছেন? তার একটি সীমারেখা আল্লাহ নির্ণয় করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য জীবনব্যবস্থা তালাশ করছে? নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তার অনুগত হবে। সবাই তার কাছে ফিরে যাবে।’ -সূরা আলে ইমরান : ৮৩

অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না সৃষ্ট বস্তুর প্রতি, যার ছায়া আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয়ে ডানে ও বাঁয়ে ঢলে পড়ে। যা কিছু আকাশমণ্ডলীতে আছে, আল্লাহকেই সিজদা করে। পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে এবং সব ফেরেশতাও (আল্লাহকে সিজদা করে)। তারা অহঙ্কার করে না।’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ৪৮-৪৯)
যে মানুষকে মহান আল্লাহ অনেক স্বাধীনতা দিয়েছেন সেই মানুষকে অন্য কোনও মানুষ কীভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে? বা শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার কথা চিন্তা করে? অদ্ভুত হলেও এটাই সত্যি। মানুষই মানুষকে পরাধীন করে রাখে, গোলামিতে বাধ্য করে, মানুষ মানুষের সহজাত ইচ্ছার ওপর বা এখতিয়ারের ওপর হস্তক্ষেপ করে এবং ইচ্ছাশক্তির ওপর বুলডোজার চালিয়ে দেয়।

ঠিক তেমনি বাংলার মানুষকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকশ্রেণি তাদের গোলামির জিঞ্জিরে, তাদের অন্যায় আনুগত্যে বাধ্য করেছে। যে মানুষ শিশু বয়সে বাবা-মার আন্তরিক সেবামূলক শাসন, তদারকিই মানতে দ্বিধাবোধ করে, সেই মানুষ পরিণত বয়সে অন্য মানুষের দাস-চাকর গোলামে পরিণত হচ্ছে? হ্যাঁ আশ্চর্যের হলেও এটাই সত্যি। যে আমরা ভাবি বড়ো হলে স্বাধীন হবো, সেই আমরাই বড়ো হয়ে এতটাই পরাধীন এবং অন্যের ইচ্ছার অধীনস্থ হয়ে পড়ি যে আবার ভাবি ছোটোবেলাতেই ভালো ছিলাম। বাংলাদেশের এক শিল্পী হয়তো সেই ভাবনা থেকেই গেয়েছেন ‘ল্যাংটা ছিলাম ভালো ছিলাম, ভালো ছিল শিশুকাল, মায়ের সাদা দুধের মতো জীবন ছিল নির্ভেজাল।’ এই ল্যাংটা ছিলাম মানে উলঙ্গ নয় বরং শৈশবকাল। শৈশবকালটাই ভালো ছিল, বড়ো হয়ে আমরা সেই ভাবনাটাই ভাবি।

সে যাই হোক, মানুষ আশৈশব স্বাধীনতালিপ্সু হলেও ধাপে ধাপে তাকে পরাধীনতার গলিপথ মাড়িয়ে বড়ো হতে হয়। এটি শুধু মানুষের মনস্তত্ত্বে নয়, বরং সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবেও মেনে নিতে হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদেরকেও মেনে নিতে হয়েছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল। আমরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে করে, অনেক রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতার একেকটি ধাপ অতিক্রম করে আজ এখানে এসে পৌঁছেছি।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। তারপর একের পর এক মেনে নিতে হয় বিভিন্ন রাজগোষ্ঠীর, বাণিজ্যগোষ্ঠীর, ভিনদেশির অপশাসন, মেনে নিতে হয় অন্যের অধীনতা, দাসত্ব। ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন স্বাধীনতার যে সূর্যটি অস্তগামী হয় তা মেঘের আড়াল ভেদ করে সামান্যে এক ঝলক উদিত হতে চেষ্টা করে ১৮৫৭ সালের দিকে। কিন্তু অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ সেই সূর্যকে উদিত হতে দেয়নি। বরং স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্তে রঞ্জিত করে বিদায় জানায় উদীয়মান সূর্যকে। সেই সামান্য ঝলক নিয়ে উদ্ভাসিত হওয়া স্বাধীনতার প্রচেষ্টাকে ইতিহাসে বলা হয় সিপাহি বিদ্রোহ বা সৈনিক বিদ্রোহ বা মহা বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট শহরে শুরু হয় সেই বিদ্রোহ। ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ছিল এটি। এই বিদ্রোহ গোটা উত্তর ভারতে, মধ্য ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ১৮৫৮ সালের ২০ জুন গোয়ালিয়রে বিদ্রোহীদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহের অবসান হয়। এই বিদ্রোহ দমন করা হয় অত্যন্ত নির্মমভাবে। বহু নিরপরাধ নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধকে নির্বিচারে হত্যা করার মাধ্যমে।

এরপরও লড়াই, স্বাধীনতা চেতনা, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার সহজাত প্রেরণা কিন্তু থেমে থাকেনি। মোটামুটি আরও ১০০ বছর নানান রকম বাদ প্রতিবাদ, লড়াই সংগ্রাম শেষে ১৯৪৭ সালে এসে স্বাধীনতার একটি মাইলফলক অর্জিত হয়। ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে দুইটি পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা হয়- ভারত এবং পাকিস্তান।
পাকিস্তান হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বাধীন সার্বভৌম ভূমি, আর ভারত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের স্বাধীন সার্বভৌম ভূমি। যদিও এই বিভাজনে স্বাধীনতা অর্জিত হয় কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হওয়ায় একই ভাষার, একই সংস্কৃতির একই চিন্তা-চেতনার মানুষ কেউ এপাড়ে কেউ ওপাড়ে ছিটকে পড়ে। তারপরও মানুষ ধর্মকে আঁকড়ে ধরে স্বাধীনতার সুখ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু সেই সুখও আবার কেড়ে নিলো ভৌগোলিকভাবে বিভাজিত স্বধর্মীরা। ধর্মের ভিত্তিতে এক হলেও ভৌগোলিকভাবে, ভাষা ও সাংস্কৃতিকভাবে ‍পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান আলাদা দু’টি জাতি, আলাদা দু’টি সত্তাই রয়ে গেল। এর চেয়েও দুঃখের কথা হলো পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নানান ধরনের বৈষম্য চাপিয়ে দিলো। বিশেষ করে উন্নয়ন বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জীবন-মানের বৈষম্যও দিন দিন প্রকট হয়ে উঠলো। সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের ঠাঁই হতো খুবই সামান্য সংখ্যক, রাজনীতিতে, সংসদেও পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের অবস্থান ছিল সামান্য। অর্থাৎ আধিপত্য ও শাসন প্রক্রিয়ায় একচ্ছত্র প্রভাব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। ফলে পূর্ব পাকিস্তান ধর্মের ঐক্যে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছেড়ে নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার তাগাদা অনুভব করতে থাকে। আর সেই তাগাদা, সেই চেতনা, সেই নিবর্তনমূলক শাসনের প্রতি মর্মপীড়ন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ যুদ্ধের জন্য বা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু আন্দোলনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে করতে একটা মানসিক প্রস্তুতি তাদের ছিল। ফলে অল্প সময়েই আমাদের পূর্বপুরুষ বীর জনতা রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। অনতিবিলম্বে এতে অংশ নেয় কৃষক-শ্রমিক, মুটে-মজুর, ছাত্র-শিক্ষক-আনসার-পুলিশসহ সামরিক বাহিনীর সেনারাও।
১১টি সেক্টরে বিভাজিত হয়ে সারাদেশে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের নয় মাস পর আসে কাক্সিক্ষত বিজয়। পরাজয় বরণ করে আত্মসমর্পণ করে পূর্ব-পাকিস্তান ছেড়ে চলে যায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী।
সেই থেকে আমরা স্বাধীন, আমাদের দেশ স্বাধীন। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মানচিত্রে ঠাঁই পায় আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু এর জন্য যে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্ত দিতে হয়েছে, পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে, স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে কত মানুষ সেটা তো ভুলবার নয়।
স্বাধীনতার ধারাবাহিক ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারলাম, যে আমাদের এই স্বাধীনতার জন্য শত শত বছর ধরে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে, অসংখ্য মানুষের প্রাণ দিতে হয়েছে। ভয়াবহ নিষ্ঠুর এক দীর্ঘ সফর শেষে আজ আমরা এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছি। আমাদের একটি স্বাধীন অস্তিত্ব, সার্বভৌম রাষ্ট্রও গঠিত হয়েছে, তারও পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু যে জুলুম শোষণের বিরুদ্ধে ছিল আমাদের লড়াই সংগ্রাম বিদ্রোহ সেই শোষণের দিন কি শেষ হয়েছে?

না শেষ হয়নি। রাজনৈতিকভাবে, ভৌগোলিকভাবে আমরা স্বাধীন হলেও নিজ দেশেও আমরা বারংবার লড়াই সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছি। এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মাঝেও জুলুম শোষণ অপশাসন স্বৈরশাসন বারবার চেপে বসেছে, বারবার তার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে জীবন দিতে হয়েছে। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টের নির্মম ঘটনা, তারপর সিপাহি জনতার বিদ্রোহ, বিপ্লব-সংহতি, নব্বইয়ের গণ আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে আন্দোলনসহ অনেক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ৫০টি বছর পার করেছে বাংলাদেশ।
তবুও আশার কথা হচ্ছে কখনও থেমে যায়নি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। সকল প্রকার প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দুর্বলতা মাড়িয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। উন্নত হয়েছে মানুষের জীবনমান, নিম্নগামী হয়েছে দারিদ্র্যের হার, উচ্চকিত হয়েছে শিক্ষিতের হার এবং উত্থিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমর্যাদা। কিন্তু যদি বড়ো বড়ো হোঁচট খাওয়ার ঘটনাগুলো না ঘটতো, যদি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতার লোভে অন্ধ না হয়ে জনসেবায়, দেশগঠনে শতভাগ আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান হতো, যদি বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কাছে নতিস্বীকার না করতো, যদি ভিনদেশিদের পাতা ফাঁদে না পড়তো, তাহলে এই পঞ্চাশ বছরে এই দেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে যেত। মানুষ স্বাধীনতার সত্যিকারের সুফল পেত। দারিদ্র্যবিমোচনের পাশাপাশি কমে যেত আয়-বৈষম্য। বাংলাদেশ এখন অন্যতম আয়-বৈষম্যের দেশ। এর প্রধান কারণ দুর্নীতি। আর দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতিতে দেশপ্রেম চর্চার ঘাটতি থাকায় দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ সুযোগ পাচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা অনিশ্চয়তার কারণেও মানুষ ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে দুর্নীতির দিকে, জিঘাংসার দিকে, নৃশংসতার দিকে, নিষ্ঠুরতার দিকে। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচক যেমন চোখে পড়ার মতো, তেমনি অবনমনও চোখ এড়ায় না। বিশেষ করে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বাংলাদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ, সম্প্রীতি চেতনার অধোগতি ভীষণভাবে চোখে পড়ার মতো।
স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে ত্যাগ, যে আগ্রহ, অনুপ্রেরণা, তাগাদা, স্পৃহা আমাদেরকে যুগ যুগ ধরে আত্মত্যাগে বলীয়ান করেছে সেই একই আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত এখন দেশগঠনে, দেশের মানুষের মানসিক গঠনে, মানবিক বোধের উন্নয়নে, সম্প্রীতি সহানুভূতিপূর্ণ সমাজগঠনে প্রয়োগ করতে হবে। এখন প্রতিটি মানুষের অন্তরে অনুরণিত হতে হবে একটি প্রতিপাদ্য এবারের সংগ্রাম আত্মগঠনের সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম দেশগঠনের সংগ্রাম।

নয়তো একদিকে আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক দেশকে ছাড়িয়ে যাবো, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়বো মানবিকতায়, পিছিয়ে পড়বো সুখি-সমৃদ্ধ-নিরাপদ বিশ্বের তালিকায়।
এখন বাংলাদেশে এমন কিছু অপ্রীতিকর অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে যা বিশ্বাস করাও কঠিন। বিশেষ করে মেয়ের হাতে বাবা-মায়ের খুন হওয়া, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন, শিশুসন্তানকে বাবা-মায়ের গলাটিপে হত্যা, এ ধরনের আরও অনেক অপরাধমূলক ঘটনা এতটাই বেড়ে গেছে যে বাংলাদেশের অনেক গর্বের অর্জনকেও অনেকাংশে ম্লান করে দেয়। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলোর প্রচার প্রসার রোধ করতে আজকের কিশোর-তরুণ যুবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে ইতিবাচক মনমানসিকতার বীজ। নেতিবাচক চিন্তা, মনোভাব পরিহার করে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। সব সম্পদ, সব সুখ একা লুটে নেওয়ার মানসিকতা দূর করে নিজেকে শেখাতে হবে কবির সেই আহ্বান;
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
… … …
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী ’পরে
সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
হ্যাঁ, এখানেই রয়েছে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার পরম শান্তি ও সুখ। আর বারবার স্মরণ করতে হবে পবিত্র আল কুরআনের সেই কথা ‘তোমরা সেই উত্তম জাতি, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের উপকারের জন্য। তোমরা মানুষকে ভালো কাজের উপদেশ দেবে আর অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করবে।’ সূরা আলে ইমরান-১১০
আল কুরআনে বর্ণিত এই আদর্শ চর্চা ছাড়া রক্তে রঞ্জিত স্বাধীনতার সুফল মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
স্বাধীনতার ৫০ পেরিয়ে এটাই এখন বাংলাদেশের ভাবনা, আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এখন আমরা চেষ্টা করবো এই স্বাধীনতার সুফল সর্বত্র কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আমাদের দায়িত্ব কর্তব্যের পরিধিকে এজন্য অনেক গুণে বাড়িয়ে দিতে হবে।
এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের সুদৃঢ় প্রত্যয় ও অঙ্গীকার।

SHARE

Leave a Reply