Home খেলার চমক টি-টোয়েন্টির রান মেশিন -আবু আবদুল্লাহ

টি-টোয়েন্টির রান মেশিন -আবু আবদুল্লাহ

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই যে ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং করা নয়, সেই ধারণাটা সম্ভবত প্রথম বিশ্ববাসীকে দিয়েছিলেন বিরাট কোহলি। এক সময় মনে করা হতো, টি-টোয়েন্টি মানেই ক্রিস গেইলের বিশাল সব ছক্কা; কিন্তু ২০ ওভারের ম্যাচেও যে শৈল্পিক ব্যাটিং, নান্দনিক সব শট দিয়ে রান তোলা যায় সেটি এখন প্রমাণিত। বিরাট কোহলির পর এই ধারায় অনেক নাম যোগ হয়েছে- কেইন উইলিয়ামসন, স্টিভ স্মিথ, বাবর আজম। তবে ২০২১ সালে তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন পাকিস্তানের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান মোহাম্মাদ রিজওয়ান।
২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান এসেছে রিজওয়ানের ব্যাট থেকে। বিশ্বের বাঘা বাঘা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটারকে টপকে গেছেন তিনি। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে রিজওয়ান মোট করেছেন ২ হাজার ৩৬ রান। যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ৪৮ ম্যাচ খেলে ৪৫ ইনিংস ব্যাট করে ৫৬.৫৫ গড়ে তিনি এ রান তুলেছেন। এতদিন এই রেকর্ড ছিল ক্রিস গেইলের দখলে। ২০১৫ সালে গেইল করেছিলেন ১ হাজার ৬৬৫ রান।

অন্যদের মধ্যে পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম এক বছরে সর্বোচ্চ করেছেন ১ হাজার ৭৭৯ রান (২০২১)। বিরাট কোহলি ১ হাজার ৬১৪ রান (২০১৬), এবি ডি ভিলিয়ার্স ১ হাজার ৫৮০ রান (২০১৯)। ঘরোয়া ক্রিকেট বাদ দিয়ে শুধু আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির ক্ষেত্রেও রেকর্ডটি এখন রিজওয়ানের দখলে। ২০২১ সালে তিনি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে করেছেন ১৩২৬ রান।
২০১৫ সালে ঢাকার মাঠে ওয়ানডে সিরিজ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন রিজওয়ান। ওই সফরেই টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও অভিষেক। আর টেস্ট অভিষেক ২০১৬ সালের নভেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফরে। প্রথম কয়েক বছর খুব একটা ভালো করতে পারেননি। যে কারণে দলেও স্থায়ী হতে পারেননি। ২০১৯ এর মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক সিরিজে দুটো ওয়ানডে সেঞ্চুরি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু আসেনি তার ব্যাট থেকে। প্রথম টেস্ট খেলার তিন বছর পর ২০১৯ এর নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া সফরে দ্বিতীয় টেস্ট খেলার সুযোগ পান। ওই টেস্টে ব্রিসবেনে ৯৫ রানের একটি ইনিংস খেলে নজর কাড়েন। মূলত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই ইনিংসটির পরই আত্মবিশ^াস বেড়ে যায় তার। শুরু হয় নতুন এক রিজওয়ানের পথচলা।

২০২০ সালে করোনা মহামারীর মধ্যে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড সফর দারুণ কাটে তার। দুই সফর মিলে টেস্টে ৫টি হাফ সেঞ্চুরি করেন। আর নেপিয়ারে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে ৫৯ বলে খেলেন ম্যাচ জয়ী ৮৯ রানের ইনিংস। এসবের মধ্য দিয়ে সরফরাজ আহমেদকে সরিয়ে দলের এক নম্বর উইকেটরক্ষকের জায়গাটাও দখল করে নেন।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা দল যায় পাকিস্তান সফরে। রাওয়ালপিন্ডিতে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অপরাজিত ১১৫ রানের ইনিংস খেলার মাধ্যমে তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। এরপর লাহোরে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচেই খেলেন ৬৪ বলে অপরাজিত ১০৪ রানের ইনিংস। এর মধ্য দিয়ে তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি করা ক্রিকেটারদের তালিকায় নাম লেখান রিজওয়ান। পরের দুই ম্যাচে করেন যথাক্রমে ৫১ ও ৪২ রান।

এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরতি সফর (৭৪*, ০, ৭৩*, ০), জিম্বাবুয়ে (৮২*, ১৩, ৯১*) ও ইংল্যান্ড সফরে (৬৩, ৩৭, ৭৬*) অব্যাহত থাকে রান বন্যা। এরপর আসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। দুবাইতে প্রথম ম্যাচেই পাকিস্তান খেলতে নামে চিরপ্রতিন্দ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে। যাদের বিপক্ষে অতীতে বিশ^কাপের কোনো ম্যাচেই জয় পায়নি পাকিস্তান; কিন্তু এদিন যেন তারা ইতিহাস পাল্টাতেই মাঠে নামে। ১৫১ রানে ভারতকে আটকে রেখে, জয় তুলে নেয় কোনো উইকেট না হারিয়ে। রিজওয়ান ও বাবরের উদ্বোধনী জুটিতেই ম্যাচ শেষ। রিজওয়ান করেন ৫৫ বলে অপরাজিত ৭৯ রান। ওই বিশ্বকাপে আরো দুটি হাফ সেঞ্চুরি আসে তার ব্যাট থেকে। টুর্নামেন্টে ৭০ গড়ে করেন মোট ২৮১ রান।
রিজওয়ান তার সোনালি বছরটি শেষ করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৭৮, ৩৮, ৮৭ রানের ইনিংস খেলে। আর এসব কিছুর পুরস্কার হিসেবে বছর শেষে এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান উঠে এসেছেন আইসিসি টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের তিন নম্বরে।

ঘরোয়া ক্রিকেটে অধিনায়কত্বও করছেন সফলতার সাথে। পাকিস্তান সুপার লিগের গত আসরে তার নেতৃত্বেই শিরোপা জিতেছে মুলতান সুলতান্স। এছাড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কায়দ-এ আজম ট্রফিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক দলকে। যে কারণে আগামী দিনে পাকিস্তানের সম্ভাব্য অধিনায়ক হিসেবেও ভাবা হচ্ছে তাকে।
এতো গেল মাঠের রিজওয়ানের কথা। মাঠের বাইরেও অনন্য এক ব্যক্তিত্ব ২৯ বছর বয়সী রিজওয়ান। টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপের সেমিফাইনালের আগে তার জ্বর ও ফুসফুসে ইনফেকশন ধরা পড়ে। দুই রাত থাকতে হয়েছিল হাসপাতালের আইসিইউতে; কিন্তু ম্যাচের দিন সকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি সেমিফাইনাল খেলতে নামেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে খেলেন ৫২ বলে ৬৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস।

ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর যত কঠোরই হোন না কেন, ব্যক্তিগত জীবনে সদা হাস্যোজ্জ্বল আর ন¤্র স্বভাবের মানুষ রিজওয়ান। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন কঠোরভাবে। গত বিশ^কাপে ম্যাচের পানি পানের বিরতিতে তাকে দেখা গেছে মাঠেই মাগরিবের নামাজ আদায় করতে। পাকিস্তান দলের সাবেক ব্যাটিং কোচ ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার ম্যাথু হেইডেন বলেছেন, রিজওয়ানের কারণেই তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি মুগ্ধ হয়েছেন। অবসরে দু’জনের মাঝে আড্ডা হতো ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে। হেইডেনকে পবিত্র কোরআনের একটি ইংরেজি অনুবাদ উপহার দিয়েছেন রিজওয়ান। এক সাক্ষাৎকারে হেইডেন জানিয়েছেন, তিনি এখন নিয়মিত কোরআন পড়েন।

পেশোয়ারে জন্ম নেওয়া রিজওয়ানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ২০০৮ সালে। জাতীয় দলে আসার আগে খেলেছেন পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২৩ ও ‘এ’ দলের হয়ে। অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি লিগ ব্যাশে খেলেছেন সিডনি সিক্সার্সের হয়ে। গত দুই বছরে যেভাবে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে যাচ্ছেন তাতে অনেক দূর যাবেন বলেই ধারণা করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
রিজওয়ান কেমন খেলছেন সেটি বোঝার সুবিধার জন্য একটি উদাহরণ দিয়ে লেখা শেষ করবো। ঢাকার মিরপুরে ২০১৫ সালে একই ম্যাচ দিয়ে রিজওয়ান আর সৌম্য সরকারের টি-টোয়েন্টি অভিষেক; কিন্তু প্রথম তিন বছর ভালো না খেলার পরও পরিশ্রম আর শৃঙ্খলা দিয়ে রিজওয়ান নিজেকে নিয়ে যেতে পেরেছেন বিশ^সেরাদের কাতারে। ম্যাথু হেইডেন কী আর অকারণেই তাকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আখ্যায়িত করেন!

SHARE

Leave a Reply