Home তোমাদের গল্প পথের পথিক -আয়শা মুমিন

পথের পথিক -আয়শা মুমিন

বিস্তীর্ণ মাঠটার পরে সবুজ ক্ষেত দেখা যায়, যতদূর পর্যন্ত চোখ যায়। ভেজা বাতাসের সাথে বেশ আনন্দে মাথা দোলায় ধানের কচি চারাগুলো। কীসের এতো আনন্দ এদের! চারিদিকে মানুষের হাহাকার, ক্ষুধার তৃষ্ণা। ইশ! এই আনন্দটা মানুষের জীবনে নেই কেন? মানুষের জীবনে এতো কষ্ট কেন?
ধানের ডগাগুলোর দিকে চেয়ে চেয়ে সে এই কথাগুলো ভাবছে। ধূ ধূ মাঠের মরা ঘাসের ওপর বসে আছে সে। তার খানিক দূরে মানুষের কোলাহল। গটগট শব্দ করে ধান ভাঙছে মাড়াই মেশিন। মাড়াই কলের মুখ দিয়ে খড়কোটা বের হয়ে উড়ে গিয়ে দূরে জমা হচ্ছে। মোটামুটি একটা গদি হয়ে গেছে খড়ের। লোকের হইচই, চেঁচামেচি। দুজন ধানের আঁটিগুলো টেনে নিয়ে মাড়াইকলে দেয়, একজন কাঁচি দিয়ে আঁটির বান কেটে দিয়ে আঁটিগুলো ঠেলে মেশিনের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। বাতাসে হালকা-পাতলা খড়কোটাগুলো অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যায়। যেন পাখা পেলে তারা উড়ে চলে যেতো কষ্টের পৃথিবী ছেড়ে। আর কখনো ফিরে আসতো না। কিন্তু হায়! তারাও অসহায় মনুর মতো। পরাশ্রয়ী, বাতাসের ওপর নির্ভর করে তাদের উড়ে চলে যাওয়া, না যাওয়া। বাতাস যেখান পর্যন্ত নিয়ে যাবে, তারা সেখান পর্যন্ত যেতে পারে। এর চেয়ে বেশি যাওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। মনু ভাবে, পৃথিবীতে কতো অসহায় প্রাণী, অপ্রাণী আছে তার মতো। কত দুঃখ আছে তাদের মনে! সেই দুঃখ কি তার মতন? নাকি একটু বেশি অথবা একটু কম।

দক্ষিণ দিকটায় ছেলে-ছোকরারা খেলা করছে।
চল দাগা….দাগা…..দাগা…..দাগা….! উড়ি পাতা চড়াইয়া, বেটা হলে ধর আইয়া…!
চিৎকার, উল্লাস। কিন্তু কিছুই যেন মনুর কানে আসছে না। অর্ধেক পথ থেকে বাতাস যেন ছিনিয়ে নিয়ে যায় সব চিৎকার, সব কোলাহল। মনুর কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। এক এক করে অনেকগুলো ধানের চারায় দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে চোখ যখন দূর সীমানায় হারায় তখন বাবার কথা মনে পড়ে। কত দিন এই সবুজ ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বাবার জন্য ভাত নিয়ে গেছে সে। কত শালুক কুড়িয়েছে। কচুরিপানার ফুল নিয়ে সেকি ঝগড়া পাড়ার ছেলেদের সাথে। আহা! তার বাবা এখন আর নেই। সেই কবে মরে গেছে অথচ সবুজ মাঠটা এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই শান্ত। যেন একজন মানুষ হারিয়ে গেলে তার কিচ্ছু যায় আসে না। পৃথিবীটা এমনই। কেউ হারিয়ে গেলে পৃথিবীর কিছু আসে যায় না।
একদিন গ্রামের লোকেরা এই সবুজ ক্ষেতের মাঝখান থেকে তার বাবার লাশ তুলে নিয়ে আসে। তারপর বাবা আর কথা বলেনি। চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। মায়ের সেকি কান্না! হাউমাউ করে কেঁদেছিল। কতো দিন বাবার জন্য ভাত নিয়ে যায় না। কতো দিন বাবার সাথে জমির আইলে বসে ভাত খাওয়া হয় না। আহা, সে কী স্বাদ!
ক্ষেতের মাঝখানে কাকতাড়ুয়া দেখে কাকতাড়ুয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ানোর সে কী চেষ্টা! বাবা বলতেন, মানুষ মরে গিয়ে কাকতাড়ুয়া হয়ে যায়। বাবা সেই কবে কাকতাড়ুয়া হয়ে গেছে! তাহলে ফসলের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে না কেন? সবুজের মাঝখানে এক পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাইতো কাকতাড়ুয়ার কাজ। বাবা তাহলে কোন পৃথিবীর কাকতাড়ুয়া হলো?

নাহ, তার ভালো লাগে না আর ভাবতে। সে হাঁটতে থাকে। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় কতো শত ভাবনা। হেঁটে হেঁটে নদীর ধারে চলে আসে সে। নদীতে চর জেগেছে। কড়া রোদে ঘাসগুলো জ্বলে পুড়ে ছারখার। ধূসর বর্ণ হয়ে আছে চর। তার ফাঁকে ফাঁকে যে দু একটা ঘাস বেঁচে আছে সেগুলো খেয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে গরুগুলো। শুকনো গোবর পড়ে আছে।
ভাঙা সাঁকোটা পার হয়ে হেঁটে চলে আইল দিয়ে। কতো স্মৃতি জাগে মনে। সামনে বড়ো কাঁচা সড়ক। ও পাশে বড়ো একটা হিজল গাছ। তার ডালপালাগুলো এতো বিস্তীর্ণ হয়েছে, বেশ কিছু জায়গা পর্যন্ত তার ছায়া পড়ে। সড়ক পেরিয়ে পুরনো সেই স্কুলটা, টিনের বেড়া, টিনের চালা। ঐ স্কুলে কতো এসেছে সে। কতো দিন স্কুল পালিয়েছে। সেকি মারামারি, খুনসুটি ছেলেদের সাথে। একদিন সে স্কুলে যায়নি। বৈশাখের কড়া রোদ। মাস্টার মশাই স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় মনুদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। মনুদের বাড়ির সামনে বিশাল একটা মাঠ। ওখানে গাঁয়ের লোকেরা ধান ভাঙে, ধান শুকায়, খড়কোটা শুকায়, ছেলেরা খেলে, কত কি! মনু সবার সাথে ধান নাড়তে ব্যস্ত।

ঐ দূরের পথে এক লোক আসছে ছাতা মাথায়। কড়া রোদে কুঁকড়ো হয়ে আসছে। ঐ লোককে মনু চেনে, ঐ ছাতা তার চেনা। ঐ হাঁটাও তার চেনা। ইনি স্কুল মাস্টার। মনু দৌড়ে গিয়ে বাবার হাত ধরে। মনু আজ স্কুল পালিয়েছে। তাই মাস্টারকে দেখে ভয়ে বাবার হাত ধরে। বাবা মনুকে টেনে নিয়ে গেলেন মাস্টার মশাইয়ের সামনে। বললেন,
‘দেখেন মাস্টার মশাই, আজ মনু স্কুলে যায় নাই। কতো করে বলছি স্কুলে যাবার কথা, সে কে শুনে কার কথা।’
মাস্টার মশাই তার চোখ থেকে পুরনো গোলগাল ফ্রেমের চশমাটা খুলে মনুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘কেন বাচা? স্কুলে যাওনি কেন? স্কুল ফাঁকি দেওয়া ভালো না। কাল থেকে স্কুলে যেও।’
মনু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। বাবা ধমক দিয়ে বলেন, ‘এই বেয়াদব, মাথা নাড়াস ক্যান? বল, জি, যামু।’
ওহ! খিদে লাগছে খুব। তার আর ভালো লাগছে না এসব ভাবতে। সে ভাবতেও চায় না। এসব মনে করতে চায় না সে। তার খারাপ লাগে। তবু মনে পড়ে। নাহ্, আর ভাববে না সঙ্কল্প করে। খিদে লেগেছে। বাড়িতে গেলে মা হয়তো কিছু খেতে দেবে। পেট ভরে খাবে সে। তারপর আরাম করে এক পশলা ঘুম দেবে। বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটে সে। মা হেলান দিয়ে বসে আছে। কী ভাবছে কে জানে! চোখ দুটো জলে টলমল করছে। মাটিতে গড়াচ্ছে না। যন্ত্রণা পেতে পেতে হয়তো চোখের জলও ধৈর্য ধরা শিখে গেছে। তাই চোখের জল আর মাটিতে গড়ায় না। চোখেই আটকে থাকে। জীবন এতো নিঠুর! এক জীবনে এতো কষ্ট আর কতো সহ্য করা যায়! মনুর বাপ মরে গিয়ে মুক্তি পেয়েছে জীবনের এই কঠিন যন্ত্রণা থেকে। সংসারের বেড়াজালে মনুর মাকে ঠেলে দিয়ে সে পালিয়েছে জীবন ছেড়ে। আর সহ্য হয় না তার। ইচ্ছে করে গলায় দড়ি দিয়ে মরে যেতে। মনুর জন্য দড়ি দেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছে। সে মরে গেলে ছেলেটার কী হবে? নাহ্, মরে যাওয়ার চেয়ে পুড়তে পুড়তে বেঁচে থাকা ভালো। এর নামই জীবন। তবু মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে ওঠে। কষ্ট যখন সহ্যের বাইরে তখন নিজেকে সামলাতে পারে না। গত চৈত্রে কড়া সুদে ঋণ এনেছিল পাটুয়ারীর কাছ থেকে। বৃষ্টি না হওয়ায় এক মুঠো ফসলও সে পায়নি। খেয়ে পরে বাঁচবে কী করে? তার ওপরে আবার সুদসহ ঋণ। পাটুয়ারী কদিন পরপর এসে টাকার জন্য তাগিদ দিয়ে যায়। কড়া কড়া কথা শুনিয়ে যায়। গালিগালাজ করে। জুলেখার আর সহ্য হয় না। সে ভাবে, ভাবতে থাকে।
: মা খাতি দাও, খিদা লাগছে।
: আমায় খেয়ে ফেল। আর কী আছে খাবার? আমায় খেয়ে শান্তি হ। বাপেতো মইরা গিয়া পলাইছে। আমায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলাই তই গেছে। এমন কপাল লই তুই জন্মেছিস ক্যান? মরতে পারিস না কোথাও গিয়ে?
মনু বুঝে, আজ পাটুয়ারী এসেছিল।
খানিক পর জুলেখা থালায় করে পান্তা নিয়ে এসে মনুর দিকে ছুড়ে মারে। মনু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ভাতগুলো সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। গড়াতে গড়াতে থালাটা মনুর পায়ের কাছে গিয়ে থামলো। মনু কিছু বলে না। বলার ভাষা খুঁজে পায় না। সে হাঁটা শুরু করে। গ্রামে পুরনো একটা পুকুর আছে। অনেক বড়ো। বিশাল এই পুকুরটা কে কবে খুঁড়েছিলো কেউ জানে না। বাবা বলেছিলেন, দেও-দানবরা নাকি এটা খুঁড়েছিল। এসবে মনুর ভয় নাই। যে ক্ষিধার ভয়কে জয় করেছে, পৃথিবীর আর কিছুকেই সে ভয় করে না। মনু সিঁড়িতে বসে পরে। জীবনের ভাবনা এসে তাকে গ্রাস করে। ভাবনা ছেড়ে সে হাঁটতে থাকে। কখন যে সেই পরিচিত নদীটার ধারে চলে এসেছে বুঝতে পারে না।

নদী শুকনো। নদীর তলায় সামান্য পানি জমে আছে। এটাই বোধ হয় নদীটির শেষ সম্বল।
পানির পরিমাণ এতো সামান্য যে, পা নামালে হয়তো পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভিজবে, তার বেশি না। পানি না থাকলে শীতকালে এই কাদা নিয়েই নদীকে বেঁচে থাকতে হয়। আর টাকা কড়ি না থাকলে মানুষকে কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। কাদা ভরা বুক নিয়ে নদী বেঁচে আছে। খেয়া নৌকাগুলো কাদার ওপরেই পড়ে আছে। তক্তাগুলো শুকনো, রুক্ষ। নদীর সাথে নৌকাগুলোরও মরমর দশা। অনেক দিন হয়ে গেছে কেউ বৈঠা হাতে নৌকায় উঠেনি। উঠার প্রয়োজন হয় না। ঐপাশে একটা বাঁধ আছে। বর্ষাকালে এ বাঁধ দেখা যায় না। পানিতে ডুবে থাকে। শীতকালে নদীর পানি শুকিয়ে গেলে বাঁধ জেগে উঠে। মানুষ ঐদিকেই চলাচল করে। নৌকার প্রয়োজন পড়ে না।

শীত এলে মাঝিদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। কেউ কেউ লোকের ক্ষেতে কাজ করে শীতকাল কাটিয়ে দেয়। তবু দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে পারে না। দুশ্চিন্তা থাকবেই। আজ কাজ পেয়েছে, দুটো পয়সা পাবে। কাল কী করবে? কাজ পাবে কি পাবে না? আরো কতে কী! গরিব মানুষের নানান চিন্তা। অঙ্ক কষে শেষ করা যাবে না।
বৃষ্টি এলো। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে, খুব হালকা। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়তে সময় লাগে কিন্তু ফোঁটাগুলো শুষে খেতে মাটির একটুও সময় লাগে না। লাগবে কেমন করে? মাটি বহু দিনের তৃষ্ণার্ত। মাটি, বৃক্ষলতা সবাই প্রতীক্ষায় আছে এক ফোঁটা বৃষ্টির। সবাই ক্ষুধার্ত, সবাই তৃষ্ণায় কাতর। পৃথিবীর কতো মানুষ এমন ক্ষুধার্ত, এমন তৃষ্ণার্ত! পৃথিবীর আনাচে কানাচে কত শত মানুষ না খেয়ে বেঁচে আছে! প্রভুর খেলা বুঝা দায়। বাঁচিয়ে যখন রাখবে তাহলে খাবার দেবে না কেন? খাবার যদি নাই দেবে তাহলে বাঁচিয়ে রাখবে কেন?
চারদিকে সন্ধ্যা নামে। মনু বিদায় জানায় মরা নদীকে। জুলেখা সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে অস্থির। ছেলেটা কোথায় গেল? বৃষ্টি হলো অথচ ছেলে ঘরে এলো না। এখন রাতের অন্ধকার পৃথিবী দখল করছে তবুও ছেলের বাড়ি ফেরার নাম নেই। মনুর মন খারাপ। ধীর পায়ে হেঁটে নদীর ধার থেকে এই পর্যন্ত এসেছে। ততক্ষণে অন্ধকার অনেক গাঢ় হয়েছে। পুরনো তেঁতুল গাছটার নিচে মূর্তির মতো কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা না গেলেও ছায়া দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। মনু দেখলো তার মা জুলেখা দাঁড়িয়ে আছে।
: মনু, ও মনু। কনে ছিলি তুই বাজান? মার লগে গোস্সা করিছিস?
: মা, তুমি এ অন্ধকারে বের হইছো ক্যান? আমি তোমার লগে গোস্সা করে থাকতে পারুম?
: সারা দিন কিছু খাস নাই। মুখখানা কেমন শুকাই গেছে! আয়, বাড়ি চল। চল।
মনু মায়ের সাথে বাড়ি যায়। জুলেখা ছেলেকে খেতে দেয়।
: মা, সালুন কী পাকাইছো আজ?
: শুঁটকি মাছ দিয়া লাউয়ের ডগা।
: প্রত্যেক দিন একই খাবার খেতে ভাল্লাগে না মা।
: কী করুম বাজান? গরিব মাইনষেরে এগুলান খাতি হয়।
মনু মায়ের দিকে তাকায়। মা বলেন,
: খাইয়া ল বাজান। কাল ভালা মন্দ কিছু পাকাইমু। খাইয়া ল।
খওয়া শেষে মনু শুয়ে পড়ে। জুলেখা ছেড়া কাঁথা দিয়ে ছেলের শরীর জড়িয়ে দেয়। ঘরের কোণে মিট মিট করে আলো জ্বলে। জুলেখা ল্যামটনের আলো কমিয়ে দেয়। কেরোসিন প্রায় শেষ। কাল রাত কিভাবে কাটাবে এই ভাবনা করে। মনুর শিওরের কাছে বসে জীবনের অঙ্ক কষে। কিছুতেই হিসাব মিলে না তার। কখনো তাকে শৈশবের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে, কখনো ভবিষ্যতের চিন্তা।

বিয়ের সময় জুলেখার বয়স ছিল ষোলো বছর। যখন একটা কিশোরীর হৈ-হুল্লোড় করে ঘুরে বেড়ানোর কথা তখন তাকে সংসার নামের বেড়াজালে আটকে দেওয়া হয়। চব্বিশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়ে বিধবা হতে হয়। এ গ্রামের পূর্ব মাথায় দাঁড়ালে তার বাবার বাড়িটা দেখা যায়। আহা! ঐ দূরের ছায়ার মতো গ্রামটা তার কতো আপন ছিল। এখন সে গ্রামটা অচেনা হয়ে গেছে। বাবা সংগ্রামের সময় সৎ মা আর ছোটো ভাইটাকে নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল আর ফিরে আসেনি। শূন্য ভিটা পড়ে আছে।
ল্যামটনের আগুন ধীরে ধীরে নিভে যায়। মুহূর্তেই শৈশবের ভাবনা তাকে ছেড়ে দেয়। গাঢ় অন্ধকার ঘরে। মনু গভীর ঘুমে মগ্ন। ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোছনার আলো ঘরে পড়ে। আস্ত এক টুকরো চাঁদ উঁকি দেয় তার ভাঙা ঘরের ভেতর।

নাহ! অন্ধকারে বসে থাকতে আর ভালো লাগে না। দরজার খিল খুলে বাইরে বের হয়ে আসে সে। চাঁদ দেখে, তারা দেখে। ভাবে, ঐ চাঁদ তারাগুলোর কত সুখ! কত সুখে তারাগুলো জ্বলে আর নিভে। জোরে নিঃশ্বাস ছাড়তে ইচ্ছে করে তার। লম্বা করে শ্বাস টান দেয়। ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকে বুকের জ্বালা নিভিয়ে দেয় কিছুক্ষণের জন্য। প্রশান্তির স্পর্শ লাগে মনে। তখন বাঁচতে ইচ্ছে করে। তখন পৃথিবীটা ভালো লাগে। উঠোনে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয় সে। ভেজা বাতাসে পেঁচার শরীরের গন্ধ নাকে ভেসে আসে। দূর হতে কুকুরের কান্নাও ভেসে আসে কানে। গভীর রাতের সাথে কুকুরের কান্নার এতো নিবিড় সম্পর্ক! কুকুর কান্না করলে রাত কেমন বিষাদময় হয়ে ওঠে। আবার রাত গভীর না হলে কুকুরের কান্না শুনতেও ভালো লাগে না। ভয়ঙ্কর হওয়া রাতের ধর্ম। কুকুরের কান্নার সুর না পেলে রাত ভয়ঙ্কর হয় না।
নাহ, রাত বিষণœ হয়ে উঠছে। বিষণœতা তার একটুও ভাল্লাগে না। কুকুরের কান্না ভেতরের আর্তনাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। এ সে মনে করতে চায় না।

SHARE

Leave a Reply