Home নিবন্ধ কুফি ক্যালিগ্রাফির গল্প -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

কুফি ক্যালিগ্রাফির গল্প -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

আজ সকালে খুব কুয়াশা পড়েছে। শীত এবার কুয়াশার হিমেল চাদর নিয়ে একটু আগেই চলে এসেছে। গ্রামের বাড়িতে আদনানের বড়ো খালু আর রায়হান এসেছে গত রাতে। সকালে তাই খেজুর রসের পায়েস তৈরি হচ্ছে। চারদিকে রসের ঘ্রাণে মাতোয়ারা বাতাস। আদনান বড়ো ঘরের দক্ষিণমুখী বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখে খালুজান রায়হানকে কী যেন করে দেখাচ্ছেন। আদনানের কৌতূহল হলো এই সাতসকালে কী হচ্ছে ওখানে! কাছে গিয়ে দেখে খালুজান একটা বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে আরবির মতো কিছু লিখছেন। তাদের ঘরে যে কুরআন আছে সে রকম আরবি নয় টানা টানা সোজা হরফ। কিন্তু তা দেখতে খুব সুন্দর!
খালুজান লেখা শেষ করলে রায়হান জানতে চাইল ওটার নাম। তিনি আদনানকে দেখে বললেন, তুমিও কি এটার গল্প শুনতে চাও। আদনান মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিলো।
খালুজান মুচকি হেসে বললেন, হাজার বছর আগের কথা। বলা যায় পনেরো শ’ বছর মানে দেড় হাজার বছর আগে আরব দেশে পবিত্র কুরআন লেখা হতো এক ধরনের লিপিতে। দেখতে হুবহু এই রকম, তবে তাতে জের জবর পেশ ছিল না, এমনকি নোকতাও ছিল না। যখন হযরত আলী রা. খলিফা হলেন, তখন ইরাকের কুফা নগরে আরবি লিপির একটি ধরন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হযরত আলী রা. নিজে ওস্তাদ ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। তিনি দেখলেন ক্যালিগ্রাফারগণ লাম-আলিফ লিখতে সমস্যায় পড়ছে। কলমের একটানে লেখা যাচ্ছে না এবং সেটা মানানসই হচ্ছে না। তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করে একটা নতুন কিসিমের লাম-আলিফ লিখলেন, তার নাম হলো ‘দুই শিংওয়ালা লাম-আলিফ’। এরপর কুফি শৈলীতে কুরআন লেখা খুব সহজ হয়ে গেল।
আচ্ছা, খালুজান নোকতা নিয়ে কি যেন বলছিলেন! আদনান জানতে চাইল। তিনি বললেন, হ্যাঁ, ভালো কথা মনে করেছো। হযরত আলী রা. একজন বিখ্যাত আরবি শাস্ত্রবিদ আবুল আসওয়াদ দোয়াইলিকে বলেন আরবি হরফগুলো অনারবরাও যাতে সহজে পড়তে পারে সে ব্যবস্থা করতে। তখন আসওয়াদ হরফ চেনার জন্য নোকতা সংযুক্ত করেন।
রায়হান এতক্ষণ চুপ ছিল, এবার সে বলল, তাহলে জের জবর পেশ কি তখন ছিল।
জবাবে খালুজান বললেন, সেটা তখনও আরবিতে যুক্ত করা হয়নি। কিন্তু সিরিয়ার লিপিতে ছিল। উমাইয়া আমলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন হেজাজের শাসনকর্তা ছিলেন, আরব ছাড়িয়ে ইসলাম তখন বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষরা কুরআন পড়তে অসুবিধার কথা জানাচ্ছে, তখন তিনি খলিল ইবনে আহমদ নামে আরেকজন বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ও শাস্ত্রবিদকে এ সমস্যার সমাধান করতে অনুরোধ করেন। খলিলও সিরিয়ার লিপি থেকে জের জবর পেশ ও অন্যান্য ধ্বনিচিহ্ন নিয়ে কুরআনে যুক্ত করেন। তবে সাধারণভাবে আরবি লিপিতে এগুলো ব্যবহার হয় না। শুধুমাত্র কুরআনে ব্যবহার হয়।
আচ্ছা, এবার কুফি শৈলী নিয়ে কিছু বলেন খালুজান। আদনানের আগ্রহ দেখে তিনি বললেন, শোনো, খলিফাদের আমল থেকে প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছরব্যাপী কুফি শৈলীতে কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশে দেশে এর বৈচিত্র্যময় রকমফের আবিষ্কার ও প্রচলন হয়। তবে কুফি শৈলীর প্রধান দুটি ধারা থেকে এগুলো বের হয়েছে। মিশর থেকে মরক্কোব্যাপী পশ্চিমের দেশগুলোতে মাগরেবি কুফি এবং সৌদি আরব থেকে পূর্বের দেশগুলোতে মাশরেকি কুফি। মাগরেবি কুফিতে কুফি মুরাবেতি ও কায়রোয়ানি কুফি খুব বিখ্যাত আর মাশরেকি কুফিতে মুসহাফি, কারামাতি, নিশাপুরি জনপ্রিয়। আমাদের বাংলামুলুকে সুলতানি আমলে কুফি আল বাঙালি নামে একটা কুফি শৈলী ছিল। এখানে তোমাদেরকে যে কুফি শৈলীতে লিখে দেখালাম সেটা কুফি আল বাঙালি। এ ছাড়া মুসহাফি কুফিতে আমরা লিখে থাকি। এ কথা বলে তিনি ব্যাগ থেকে একটা ক্যাটালগ বের করে কুফি মুসহাফির একটা ক্যালিগ্রাফি দেখালেন। আদনান ক্যাটালগটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল, সুবহানাল্লাহ! কী সুন্দর সব ক্যালিগ্রাফি। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে এমন ক্যালিগ্রাফি করার! রায়হানও সায় দিলো তার কথায়। এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে খালাম্মা রসের পায়েস খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। খালুজান বললেন, চলো নাস্তা করি। সবাই খাতা বই গুছিয়ে ভেতরে গেল পায়েস খেতে।

SHARE

Leave a Reply