Home বিশেষ রচনা আসমানি খাবার আল মায়িদাহ আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব নিদর্শন -এস এম রুহুল আমীন

আসমানি খাবার আল মায়িদাহ আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব নিদর্শন -এস এম রুহুল আমীন

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা অসীম ক্ষমতার মালিক। তিনি যখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। যেমন রাতকে দিন আবার দিনকে রাত। মানে তাঁর পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব নেই, সব কিছুই সম্ভব। এজন্যই তাঁকে বলা হয় সকল শক্তির আধার। কিন্তু যুগে যুগে কিছু মুনাফিক লোক এতে করতো সন্দেহ, করতো অবিশ্বাস। বিশেষভাবে আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ. এর কাওম। এদেরেকে বলা হতো হাওয়ারি। তারা একবার বায়না ধরলো তারা আল্লাহর দেওয়া আসমানি খাবার খাবে। আসুন, শুনি আল কুরআনের ভাষায় সে গল্প। যখন হাওয়ারিগণ! বললেন, “হে মারইয়াম পুত্র ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি আসমান থেকে আমাদের জন্য খাদ্যভর্তি খাঞ্চা পাঠাইতে পারেন?” হজরত ঈসা আ. তখন বললেন, “আল্লাহকে ভয় করো যদি তোমরা মু’মিন হও।” অর্থাৎ মহান আল্লাহর কুদরতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করো না।
তাফসিরে কুরতুবির বর্ণনা অনুযায়ী- একদিন আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ. রাস্তায় বের হলেন। তার সঙ্গে নিলেন পাঁচ হাজার কিংবা তারচেয়ে একটু বেশি লোক। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন তাঁর অনুসারী বা হাওয়ারি। কেউ ছিলেন বিভিন্ন রোগে শোকে আক্রান্ত ও বিভিন্ন সমস্যায় দোয়া প্রার্থী। আর অনেকেই ছিলেন কেবলমাত্র দর্শক। চলতে চলতে তারা পৌঁছলেন জন মানবশূন্য এক নির্জন প্রান্তরে। তাদের কাছে খাবার না থাকায় সেখানে দেখা দিলো তীব্র খাদ্যসঙ্কট। তাদের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের প্রধান শামউন গেলেন হজরত ঈসা আ.-এর কাছে। সবিনয়ে বললেন, হে আল্লাহর নবী! লোকেরা ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছে। তারা আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা প্রার্থনা করছে। জবাবে ঈসা আ. বললেন, তুমি তাদেরকে গিয়ে বলো, যদি তোমরা মুমিন হও, তবে আল্লাহকে ভয় করো। শামউন তাদেরকে এ কথা শুনিয়ে দিলেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।
তারা সবাই আল্লাহর নবীকে বললেন, হে ঈসা! আপনি আপনার আল্লাহকে বলুন, আমাদের অন্তর পরিতৃপ্ত করে মায়িদাহ থেকে খেতে চাই। আর আমরা জেনে নিবো আপনি যা বলেছেন তা সত্য বলেছেন। আমরা হবো এর সাক্ষ্যদাতা। হাওয়ারিদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ. দোয়া করলেন। হে আল্লাহ! হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের জন্য আপনি পাঠান আসমান থেকে। খাদ্যভর্তি খাঞ্চা। তা আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হবে ঈদ বা আনন্দ উৎসব। আপনার পক্ষ থেকে হবে একটি চমৎকার নিদর্শন। আপনি মেহেরবানি করে আমাদেরকে রিজিক দান করুন। আর আপনিই হলেন উত্তম রিজিকদাতা।
হজরত ঈসা আ- এর দোয়ার জবাবে মহান আল্লাহ তায়ালা বললেন, অবশ্যই সে আসমানি খাবার মায়িদাহ আমি আসমান থেকে অবতরণ করাবো। অতঃপর যারা বা যে ব্যক্তি আমাকে অবিশ্বাস বা কুফরি করবে আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো, যে শাস্তি বিশ্বজাহানের অপর কাউকেও দেবো না।
মায়িদা সম্পর্কে এক বর্ণনায় হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, হজরত ঈসা আ. একদিন বনি ঈসরাইলদের বললেন, তোমারা ত্রিশ দিন সিয়াম পালন করো। এরপর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। তোমরা যা চাইবে তিনি তোমাদেরকে তাই দান করবেন। ব্যস! সিয়াম রাখা শেষ, তারা ঈসা আ.-এর কাছে আরজ করলেন। আমরা সিয়াম রেখেছি। উপবাস থেকেছি। আপনি আপনার রবের কাছে প্রার্থনা করুন। যাতে তিনি আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা নাজিল করেন। কিছুক্ষণ পরই একজন ফেরেশতা খাদ্যে পরিপূর্ণ একটি খাঞ্চা নিয়ে হাজির হলেন। যাতে ছিল সাতটি রুটি এবং সাতটি মাছ, তা তাদের সামনে রাখা হলো। তারা সবাই তা থেকে পেট পুরের্ করে খেয়ে নিলেন।
অপর বর্ণনায় হজরত সালমান ফারসি রা. বলেন। যখন হাওয়ারিগণ হজরত ঈসা আ. এর কাছে মায়িদা দাবি করলেন। তখন তিনি পশমের বস্ত্র রেখে দিয়ে কালো পায়জামা পরলেন। এর পর পায়ের সাথে পা, গোড়ালির সাথে গোড়ালি এবং দুটো পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিগুলো একত্র করে দাঁড়ালেন। রাখলেন বাম হাতের ওপর ডান হাত। এর পর মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে কাঁদতে থাকলেন। চোখের পানিতে তার দাড়ি মুবারক ভিজে গেল। এ অবস্থায় আল্লাহর কাছে বললেন, হে আল্লাহ! আমাদের রব! আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। অতঃপর দুটো মেঘের টুকরার মাঝে গোলাকার লাল বর্ণের একটি দস্তরখানা নাজিল হলো। মানুষেরা তা চেয়ে চেয়ে দেখলেন।
হজরত ঈসা আ. তখন বললেন। হে আল্লাহ! একে রহমত হিসেবে নির্ধারণ করুন। পরীক্ষার বিষয় বানাবেন না। আমি আপনার কাছে অলৌকিক কিছু আশা করছি। আপনি তা আমাকে প্রদান করুন। মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করলেন। অতঃপর রুমাল দিয়ে ঢাকা খাঞ্চা হজরত ঈসা আ.-এর সামনে উপস্থিত হলো। আর তখন তিনি রবের প্রশংসায় সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। হাওয়ারিগণ তখন তাঁর সাথে সাথে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তারা এই আসমানি খাবারে এমন সুগন্ধি অনুভব করলেন, যা তারা ইতিপূর্বে আর কখনো অনুভব করেননি। হজরত ঈসা আ. বললেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক আবিদ ও পুণ্যবান সে খাও। হাওয়ারিগণ তখন বললেন, আমরা তা থেকে খাবো এবং মহান আল্লাহর প্রশংসায় মশগুল হবো।
হাওয়ারিগণ আরো বললেন, হে রুহুল্লাহ বা আল্লাহর আত্মা! আপনিই এর সবচেয়ে বেশি বা অধিক হকদার। হজরত ঈসা আ. অজু করলেন এবং সালাত আদায় করলেন। করলেন দীর্ঘ মুনাজাত রবের শাহি দরবারে। তার পর বসে খাঞ্চাটি খুললেন। এ খাঞ্চাটি যেদিন অবতীর্ণ হয় সে দিনটি ছিল শনিবার। তাই ইয়াহুদিরা এ দিনটিকে পবিত্র ও ঈদের দিন মনে করেন। খাঞ্চায় যেসব খাবার ছিল তা হলো: কাঁটাবিহীন তৈলাক্ত একটা ভুনা মাছ। মাছের চতুর্পার্শ্বে ছিল বিভিন্ন ধরনের সবজি। মাছের মাথার কাছে ছিল লবণ ও ঝোল। মাছের লেজের কাছে ছিল পাঁচটি রুটি। রুটিগুলো ছিল আনার, যাইতুন, খেজুর, ডিম, পনির ও মধু দিয়ে তৈরি।
মায়িদাহ নাজিলের খবর পৌঁছলো ইয়াহুদিদের কাছে। তারা ছুটে এলো দলে দলে। তারা দেখে অবাক ও আশ্চর্য হলো। হাওয়ারিদের সরদার শামউন বললেন, হে রুহুল্লাহ! এটা কি দুনিয়ার না জান্নাতি খাদ্য? হজরত ঈসা আ. বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমরা মায়িদাহ চাওয়ার পর এমন প্রশ্ন কেন করছো? এ ব্যাপারে আমি শাস্তির আশঙ্কা করছি। শামউন বললেন, হে আল্লাহর নবী! এ নিদর্শনের সাথে আরেকটি নিদর্শন হলে ভালো হতো। তখন ঈসা আ. বললেন, হে মাছ! আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে যাও। সাথে সাথে মাছটি জীবিত হয়ে গেল। হাওয়ারিগণ তা দেখে রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। হজরত ঈসা আ. আবার বললেন, হে মাছ! পূর্বে যেমন ছিলে তেমন হয়ে যাও। সাথে সাথে আবার মাছটি ভুনা হয়ে গেল। হাওয়ারিগণ বললেন, হে আল্লাহর নবী! এটা থেকে আপনিই প্রথম ভক্ষণ করুন বা খান।
হজরত ঈসা আ. বললেন, আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি। তা থেকে তারা খাবে, যারা তা প্রত্যাশা ও প্রার্থনা করেছে। কিন্তু হাওয়ারিরা ফিতনার ভয়ে তা থেকে খেতে অস্বীকৃতি জানালো। অবশেষে হজরত ঈসা আ. হত দরিদ্র, নিঃস্ব, অসুস্থ প্রভৃতি লোকদের খেতে আহ্বান জানালেন এবং বললেন, তোমাদের রবের রিজিক খাও, তোমাদের নবীর দাওয়াত কবুল করো। সদা সর্বদা আল্লাহর হামদ বা প্রশংসা করো।
অতঃপর সাত হাজার তিনশত লোক উদারপূর্তি করে তৃপ্তিসহ খেলো। অন্যরা স্পষ্টত দেখতো পেলেন। আসমানি খাবার মায়িদা খাবারের ফলে অসুস্থরা পরিপূর্ণ ও দিব্যি সুস্থ হয়ে গেলেন। হতো দরিদ্র অসহায় গরিবেরা আমরণ ধনী হয়ে গেলেন।
লেগে গেল হুলস্থুল কাণ্ড। প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। ছোটো-বড়ো, যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব সকলেই খাবারের জন্য ভিড় জমাতে লাগলো। করতে থাকে একের প্রতি অন্যের হিংসা। তা দেখে হজরত ঈসা আ. ঝামেলা এড়ানোর জন্য পালা করে দেন। অতঃপর মায়িদাহ একদিন পর একদিন করে চল্লিশ দিন পর্যন্ত অবতীর্ণ হতে থাকে। চল্লিশ দিন পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা হজরত ঈসা আ.-এর কাছে অহি পাঠালেন, হে ঈসা! আমার এ মায়িদাহ আপনি গরিবদের জন্য নির্দিষ্ট করুন। ধনীদের জন্য নয়।
ঘটে গেল এক বিপত্তি! ধনীরা করতে থাকে ঝগড়া বিবাদ ও মারামারি। আর শত্রু ভাবতে থাকে অভাবী অসহায় আর গরিবদের। তখনই আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে ঈসা! আমি আমার ওয়াদা ও শর্তানুযায়ী এদেরকে পাকড়াও করবো। অতঃপর ভালো মানুষ ঘুমিয়ে থাকার পর সকালবেলা তেত্রিশজন মানুষকে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার কারণে শূকর বানিয়ে দিলেন। তাদের জীবনে নেমে এলো চরম দুর্ভাগ্য। চারদিন জীবিত থাকার পর তারা করুণ ও নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করলো।
এসো বন্ধুরা! মহান আল্লাহ প্রদত্ত নাজ নিয়ামত ভোগ করি। আল্লাহর শোকর গোজারকারী বান্দা বা আবিদ হই। আর ইয়াহুদিদের মতো অকৃতজ্ঞ ও অভিশপ্ত না হই।
(সূরা আল মায়িদাহ অবলম্বনে)

SHARE

Leave a Reply