Home গল্প রম্যগল্প দন্তকাহন -জাফর তালুকদার

দন্তকাহন -জাফর তালুকদার

মগবাজার-মালিবাগ রাস্তাটি পিক-আওয়ারে জাহান্নাম বনে যায়। নাদান ঢাকাবাসী হিসেবে এই অধমও নগর-নরকের একজন গর্বিত কীট।
কীটের যেমন স্বভাব, আজ সেই ভয়ঙ্কর গণকুস্তির মধ্যে বুকে হেঁটে, পায়ে দৌড়ে, শুঁড় নাচিয়ে রওয়ানা দিলাম দন্ত-পরীক্ষার উদ্দেশ্যে।
এযাবৎ দেঁতো-হাসি হেসে বহু মানুষের জ্বালা ধরিয়েছি। ভাবছি, হাড়-হাড্ডি বয়সে এই বত্রিশপাটি খুচরো-অঙ্গটির খামোখা আর দরকার কি! সুন্দরবনের চোরা বাওয়ালির মতো ইতোমধ্যে ঝেড়েকেটে শুইয়ে দিয়েছি অনেকগুলো। কিন্তু মুশকিল হয়েছে অন্যত্র। দন্তের ফাঁকে সাপের মতো ঝুলন্ত জিভের নড়াচড়া দেখে নাতিরা হাততালি দিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচে- ‘বোকরা দাদু, বোকরা দাদু…!’
শরমে মরে যাই। অগত্যা ডাক্তারের কাছে গিয়ে আছড়ে পড়ি চোখ ভাসিয়ে, ‘আর পারি না বাবা! দাও তো পুরোটা ব্রিজ করে।’
ডাক্তার গরু-জবাই করা পাকা জল্লাদ।
উনি হাতুড়-বাটাল নিয়ে কয়েকদিন খেটেখুটে খাঁটি স্টিলের ব্রিজ বানালেন একখানা- দ্য ব্রিজ ওভার দ্য রিভার বুড়িগঙ্গা।
ব্রিজে দৌড়াদৌড়ি করে কাটলো কিছুদিন। কিন্তু যার শুরু আছে, তার শেষও ঘটে এক সময়। অচিরে দৌড়ের মাজেজা শেষ হলো। উদভ্রান্ত ফেরির মতো নানা কিসিমের খায়খাদ্যের ধাক্কায় ব্রিজের পিলারে তৈরি হলো অগণিত ফাঁকফোকর। সেখানে ফুচুত ফুচুত ঢুকে পড়ে বেধড়ক খড়কুটোর জঞ্জাল। আর যায় কোথায়! টুথপিক, খুন্তি, শাবল, মাউথওয়াশ, ফ্লশ, ব্রাশ, লবণ পানি, কুলকুচি- কিচ, কিচ, ফিচ, ফিচ…।
নাতিরা দাদুর মুখভঙ্গি নকল করে মুখ বেঁকিয়ে নাচে- চিক, চিক, চিক…।
আজ শপথ করে উদ্বাহু নৃত্য শুরু করলাম। আর নয়। যা থাকে কপালে। গাছের সব গুঁড়িগাড়া উপড়ে দেব আমূল।
খোঁজ পেয়েছি, বাঘিনী এক দেঁতো ডাক্তার এসেছেন বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে।
খিঁচে দৌড় দিলাম চার হাত-পায়ে। রাস্তায় তখন ভিড়ের মহামারী। যত ধুলো তার চেয়ে বেশি মানুষ। ঝাপসা চোখে মানুষ নাকি কীট কিছু ঠাহর করতে পারি না! নিজের শরীরেও সেটা রূপান্তর ঘটেছে দেখে অবাক হলাম। স্পষ্টত টের পেলাম, না মানব, না কীটের বিস্ময়কর অনুভূতি! যাকে সবদিক বিবেচনায় মানবকীট বলাই যুক্তিযুক্ত।
ডাক্তারের দরবারে কায়দা-কানুনের অন্ত নেই। নার্স এসে নভোচারীর পোশাক পরিয়ে মুড়ে দিলেন আগাগোড়া। শেষে ক্ষেতে কীটনাশক ছিটানোর মতো সামনে-পিছনে স্প্রে করে খেদিয়ে দিলেন অদৃশ্য যতো করোনা ভাইরাস। এবার হেলেদুলে আমস্ট্রংয়ের মতো চাঁদে পা রাখার ভঙ্গিতে উঁকি দিলাম ভেতরে। কিন্তু গাম্ভীর্যের খোলসটি অচিরেই ধূলিসাৎ হলো। ডাক্তার মহিলাটি সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গলের চেয়েও সরেস। উনি ক্যাত করে বুড্ডা আদমিকে শুইয়ে একটা যন্ত্র ঢুকিয়ে দিলেন খাদ্য-চুলোর গহ্বরে-
‘অ্যাঁ, সব তো দেখি ডোবানালা আর জঙ্গুলে গর্ত! এর ভেতর সাপবিচ্ছু থাকবে না তো গোলাপ ফুটবে নাকি?’
আমি আজীবন সমরখন্দের গোলাপের জন্য মাতোয়ারা থেকেছি। কিন্তু এই কীটদুষ্ট বাগানে কী করে সেটা ফোটাতে হয় তা শেখা হয়নি!

SHARE

Leave a Reply