Home প্রচ্ছদ রচনা শীতের বৈচিত্র্য -মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম

শীতের বৈচিত্র্য -মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম

আট বছরের তিথি। ঢাকা শহরের একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বছরে একবার গ্রামের বাড়িতে আসা হয় তার। তবে করোনার কারণে গত দু’বছরে শহরে বন্দি থাকতে হয়েছে। গ্রামে আসা হয়নি। এ বছর পরিস্থিতি একটু ভালো। তাই আব্বুও ছুটি নিয়েছেন। সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে।
তিথিদের গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদি থাকেন। ছোটো চাচারাও গ্রামে থাকেন। ওদের গ্রামের নাম ভুবনডাঙ্গা। এখানকার প্রকৃতি অসম্ভব সুন্দর লাগে ওর। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গাছ। বিলের পাশে ছোটো খাল আর খালে ফুটে থাকা শাপলা ওর কাছে দারুণ লাগে। ইটপাটকেলের শহরে ধুলাবালি আর যানজট ছাড়া কিছু নেই। এই যেমন ওরা যখন ঢাকা থেকে আসছিল তখন শহরে কত গরম। আর এখানে এসেই রাতে কম্বল গায়ে দিতে হচ্ছে। সকালে কুয়াশা পড়ছে। কুয়াশায় ভেজা ঘাসগুলো কত্ত সতেজ। তিথির কুয়াশা ভেজা ঘাসের ওপর হাঁটতে খুব ভালো লাগে। তখন শিশিরে দু’পা ভিজে যায়। তাই গ্রামে এলে সকালবেলা দাদুর সাথে হাঁটতে বের হতেই হবে ওর। আজও ওরা হাঁটতে বের হয়েছে।
তিথি দাদুকে বলল, ‘আচ্ছা দাদু, গ্রাম এত সুন্দর। কিন্তু শহর সুন্দর না কেন। দেখো না শিশিরে পা ভিজে যাচ্ছে। আমার খুব ভালো লাগছে। আর ঢাকায় শিশিরের দেখা পাওয়া যায় না।’

দাদু হাসতে হাসতে বলল, ‘দাদু ভাই এসব তো মানুষের কারণে হয়েছে। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে শহর তৈরি করেছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে। শহরে লাখ লাখ মানুষের বসতি। অনেক দোকানপাট ও কলকারখানা। তাই গ্রামের তুলনায় শহরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা কম। শীতের আসল চেহারা আর রূপ পুরোপুরি দেখা যায় গ্রামে। যা তুমি উপভোগ করছ। কিন্তু, তুমি এখন যে শীত দেখছ, আগে এই শীতকাল আরও সুন্দর ছিল। শীতকালে আমাদের পরীক্ষা শেষ হতো। কোনো পড়া থাকত না। আমরা খুব মজা করতাম।’
তিথি তখন বলল, ‘দাদু আমাকে শীতের গল্প শোনাও। আমি শীত ঋতু নিয়ে আরও জানতে চাই।’
ঠিক আছে বলে দাদু তখন বলতে শুরু করল-
তুমি তো জানোই বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু। বাংলা ক্যালেন্ডারের মধ্যে পৌষ ও মাঘ মাস হলো শীতকাল। আর শীত মানেই হিমহিম কনকনে ঠান্ডার অনুভূতি। আমরা ছোটোবেলা বলতাম ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’। আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন পৌষ ও মাঘ মাসে কনকনে শীত পড়ত। তখন মানুষও শীতে কাঁপতো। তবে, শীত হলো বৈচিত্র্যময় ঋতু। শীত আমাদের জন্য উপহারের ডালি নিয়ে আসে। মূলত অগ্রহায়ণ মাস থেকেই আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। আর মূল শীত শুরু হয় পৌষ-মাঘে। ফাল্গুনের শেষ পর্যন্ত শীতের রেশ থাকে।
শীত কিন্তু একা আসে না। সে আসে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে। প্রকৃতিকে সেই চাদর দিয়ে ঢেকে রাখে। এ সময় সন্ধ্যার আগেই শিশির আর কুয়াশার চাদর মুড়ি দিতে শুরু করে প্রকৃতি। গ্রামের মানুষ তখন দ্রুত বাড়িতে ফেরে।

শীতের সবচেয়ে মজার জিনিস হলো ভোরে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা। তারপর হাঁড়িতে জ্বালিয়ে সেই রস দিয়ে গুড়-পাটালি তৈরি করা। এছাড়া, শীতের কৃষকের খেত নানান সবজিতে ভরে ওঠে। শীতের সময় যে পরিমাণ তরিতরকারি, শাকসবজি পাওয়া যায় অন্য ঋতুতে কিন্তু এতো পাওয়া যায় না। এ সময় লাউ, কুমড়ো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পালংশাক, শালগম, বেগুন, টমেটো, মেটে আলু, পেঁয়াজের কলি এসব তরকারিতে কৃষকের খেত ভরে থাকে। টাটকা এসব তরকারি ক্ষেত থেকে সরাসরি বিক্রি হয়। কী তরতাজা আর কী স্বাদ সেগুলোর! যা তোমরা শহরে কখনো পাবে না।
শীতকালে গ্রামের বিল-বাঁওড়, নদী-খালের মিঠেপানির হরেক রকম মাছ পাওয়া যায়। এসময় বড়ো বড়ো শোল, বোয়াল, গজার, টাকি, শিং, মাগুর, কৈ, মনি, খয়রা, পুঁটি, সরপুঁটি, বাইন, পাবদা, ট্যাংরা ইত্যাদি মাছের স্বাদ শীতকালে অনেক বেড়ে যায়।

পৌষের শুরুতে পুরোদমে আমন ধান কাটা শুরু হয় গ্রামের বিলে বিলে। পাকা ধানের শিষের ওপর শিশির জমে থাকে। আর শিশির ফোঁটার ওপর সূর্যের আলো পড়লে তা মুক্তার মতো ঝলমল করে। এই দৃশ্য অবশ্য গ্রামে ছাড়া দেখা সম্ভব নয়। পাকা ধান কৃষকের কাছে সোনার চেয়েও মূল্যবান। কারণ এই ধানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের স্বপ্ন ও সাধনা।
আগে আমরা দেখেছি শীতকালে গ্রামের নারীরা ঢেঁকিতে ধান ভানতো। এখন তো গ্রামে গ্রামে মেশিন আছে। তাই আর ঢেঁকি আগের মতো দেখা যায় না। তবে, ঢেঁকিতে চিঁড়ে কোটার দৃশ্য এখনো দেখা যায়। ঢেঁকির ঢুকুর ঢুকুর শব্দ শোনা যেত সব বাড়ি থেকে। আর উঠোনের কোণায় নতুন চাল দিয়ে মুড়ি ভাজার রেওয়াজ এখনো আছে গ্রামে। আমরা সকালে মিষ্টি রোদে বসে খেজুরের রসে ভেজানো মুড়ি, গুড়-মাখানো মুড়ির মোয়া কিংবা পান্তাভাতে গুড়ের পাটালি দিয়ে ভাত খেতাম। এসব কথা মনে পড়লে মন ভালো হয়ে যায়।
দাদু এবার একটু বিরতি নিলেন। তারপর তিথিকে বললেন, তুমি এখন চোখ দুটো বুজে কল্পনা করো তো ফিনফিনে পাতলা ধূসর কুয়াশা তোমাকে ঘিরে ধরেছে। আর তুমি দাঁড়িয়ে আছ একটি ফুলের বাগানে। যেখানে ফুটে হলুদ গাঁদার দল, শিশিরে ভিজছে চন্দ্রমল্লিকারা।’

তিথি বলল, ‘দাদু এগুলো কি শীতের ফুল?’
দাদুর উত্তর, হ্যাঁ এগুলো শীতের ফুল। শীতকালে অনেক ধরনের ফুল ফোটে। তোমাকে সেসব ফুলের নাম বলছি- নানা জাতের গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, অ্যাস্টার, ডেইজি, কসমস, সিলভিয়া, এন্টিরিনাম, ন্যাস্টারশিয়াম, প্যানজি, ডায়ান্থাস, ফ্লক্স, ভারবেনা, কারনেশান, পপি, সূর্যমুখী, পর্টুলেকা, ক্যালেন্ডুলা, হলিহক, মর্নিং গ্লোরি, অ্যাজালিয়া, জারবেরা, গ্ল্যাডিওলাস ইত্যাদি।
শীতের নানা ধরনের খেলাও আছে। এসময় ভলিবল এবং ব্যাডমিন্টন বেশি খেলা হয়। তবে, শীতে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো ব্যাডমিন্টন। শীতের সময়ে এটিই হয়ে ওঠে প্রধান খেলা। শীতের বিকেলে কিংবা কুয়াশামাখা সন্ধ্যায় এই খেলার আয়োজন করা হয়। এই খেলার জন্য অনেক জায়গা লাগে না। একটু খালি জায়গা পেলেই তৈরি করে নেওয়া যায় ব্যাডমিন্টনের কোর্ট। সেটা বাড়ির আঙিনায় বা খেলার মাঠেও হতে পারে।

তিথি খুব মনোযোগ দিয়ে দাদুর কথা শুনছিল আর হাঁটছিল। ও এবার জানতে চাইল, আচ্ছা দাদু শীত নিয়ে তো অনেক কথা বললে। কিন্তু তুমি তো কোনো ফলের কথা বললে না। শীতের কি কোনো ফল নেই।
দাদু তখন বলল, শোনো দাদু ভাই- শীতের অনেক ফল আছে। আমি বলতে ভুলে গেছি। তোমার আগ্রহ আমার খুব ভালো লেগেছে। আসলে শীত মানে ফলের বাহার। এ সময় কমলা, বরই, সফেদা, জলপাই, আমলকী পাওয়া যায়। তবে, শীতের জনপ্রিয় ফলের একটি ডালিম। এটি আবার কারো কাছে বেদানা, কারো কাছে আনার নামে পরিচিত। তবে, শীতের ফলের রাজা বলা হয় কমলাকে।
দাদু এবার বলল, তোমাকে এখন যে কথাটি বলব। সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। এই কথাটা শুধু তোমাকে না আমি সবাইকে বলছি। তাই শীত যেমন আমাদের জন্য মজার ঋতু। একইভাবে এটি কারো কারো জন্য খুব নির্মম। বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য শীত এক প্রকার অভিশাপ হয়ে আসে। কনকনে শীত নিবারণের পোশাক ওদের থাকে না। শীতে তাদের কাছে হয়ে ওঠে বেদনাদায়ক। তাই আমরা যদি গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে মমতার হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে তারাও শীতের কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারবে। আমরা সবাই শীতের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারব।

SHARE

Leave a Reply