Home ফিচার হারিয়ে যাওয়া গাঁও-গেরামের খেলা ও কিছু কথা -আবদাল মাহবুব কোরেশী

হারিয়ে যাওয়া গাঁও-গেরামের খেলা ও কিছু কথা -আবদাল মাহবুব কোরেশী

হাজারও খাল বিল নদীর সমন্বয়ে ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানান উপকরণ দিয়ে ভরপুর আমাদের জন্মভূমি শ্যামল সবুজ বাংলাদেশ। ২০১১ সালের পঞ্চম আদমশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৮৭,১৯১টি গ্রামের শান্ত শীতল পরিবেশমণ্ডিত দেশটাতে গ্রামীণ জনপদ ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে উঠেছে। ‘এক গাঁয়ের গালি আর অন্য গাঁয়ের বুলি’ এ যেন এক অন্য রকম রোমাঞ্চকর পরিবেশ। কালের বিবর্তনে অনেকটা পরিবর্তন এলেও সেটা যে খুব বেশি পরিবর্তন হয়ে গেছে তা বলা যাবে না। কারণ আজও গহিন গ্রামের কোনো এক মেঠো পথ ধরলে চোখের সামনে যা ভেসে উঠে তা যে বাংলার চিরন্তন রূপ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ছোটো ছোটো খাল আর বাঁশের বেড়ায় বাঁধা মাচাঘর প্রথম দৃষ্টিতে নজর কাড়বে সন্দেহ নেই। রাস্তার দু’পাশে ছায়া সুনিবিড় মুর্তাবন আর বাঁশের ঝাড়। দূরে কোথাও বিশাল দেহে ঝুরি নামিয়ে শতবর্শী বটগাছ সগৌরবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বটের শাখায় শাখায় পুবাল বাতাসের ছোটাছুটি সাথে কোকিল ডাহুকের সুরের তান, চাতকের করুণ ধ্বনি আর ঘুঘুর ক্লান্ত স্বর, গ্রাম্য প্রকৃতিকে এক উঁচু মাত্রায় তুলে ধরেছে। কিন্তু এমন নির্মল পরিবেশ আর প্রকৃতির মাঝে কোথাও যেন বিশাল এক ফারাক সৃষ্টি হয়েছে। একটি ঘাটতি আমাদের কপালে ভাবনার ভাঁজ এঁকে দিয়েছে। হতাশায় ফেলেছে আমাদের নতুন প্রজন্ম গ্রামের কিশোর কিশোরী ছোটো বড়ো সোনামণিরা। কারণ আজ থেকে ক’বছর আগেও যাদের দেখেছি গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথায় স্বাধীন বিচরণ হৈ-হুল্লোড় দৌড়-ঝাঁপ, জলাশয়, পুকুর, নদী, খালে কিংবা বিলে সাঁতার, নন্দাই, ছুঁয়াছুঁয়ি খেলা খেলতে তা দেখছি আজ অনেকটা উধাও। কোথাও যেন এ ডানপিটে চঞ্চলতা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, বধির হয়ে আছে পড়ন্ত বিকেলে খোলা মাঠে গ্রাম্য সংস্কৃতি ধারণ করা নানান ধরনের নানান খেলা।
সময়ের মাঝে গ্রামীণ এ খেলাগুলো বিলুপ্ত হতে হতে আজ যেন তার অস্তিত্বই হারাতে বসেছে। সাতগাঁও খুঁজেও এ খেলাগুলোর অবশিষ্ট পাওয়াই ভার। দিনকে দিন তা যেন চোখের আড়াল হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। খোদ অজপাড়াগাঁয়েও সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বৌচি, কানামাছি এমনকি আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু খেলারও প্রচলন নেই। গ্রামবাংলার খেলাধুলার মধ্যে যেসব খেলা হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে বা হারিয়ে গেছে তাদের মধ্যে মন্দুরুজ, গাদন, খো-খো, ডাংগুলি, গোশত তোলা, রান্নাবাটি, চিক্কা, এ্যাঙ্গো এ্যাঙ্গো, কুতকুত, ল্যাংচা, কিং কিং খেলা, কুস্তি, ডুবসাঁতার বোমবাস্টিং, হাঁড়িভাঙা, বুদ্ধিমন্তর, চাঁ খেলা, কাঠিছোঁয়া, দড়ি লাফানো, বরফ পানি, দড়ি টানাটানি, চেয়ার সিটিং, রুমাল চুরি, চোখবুঝাবুঝি, ওপেন্টি বাইস্কোপ, লাটিম, লুডু, এলাটিং বেলাটিং, আগডুম বাগডুম, ইচিং বিচিং, ইকড়ি মিকড়ি, ঝুম ঝুমা ঝুম, নোনতা বলরে, কপাল টোকা, বউরানী, ছক্কা, ব্যাঙের মাথা, লাঠিখেলা, বলীখেলা, আইচ্চা ভাঙা, এক্কাদোক্কা, মইলা, রাম সাম যদু মদু, চোর ডাকাত, মার্বেল, সাতচাড়া, ষোলগুটি, চিলমোরগ, বুঝাবুঝি, বদন, লাফালাফি, ডালিম খেলা, পুতুল বৌ, ফুল টোক্কা, বাঘ-ছাগল অন্যতম। ঐতিহ্যবাহী এ খেলাগুলো আর কোথাও কোনো খোকা-খুকিকে খেলতে দেখা যায় না। এমনকি এসব খেলাধুলার নামটা পর্যন্ত কারো মুখে শোনা যায় না। যার উপসংহার বা সারকথা হচ্ছে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এসব খেলা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। যা আমাদের এ প্রজন্মের জন্য মোটেও সুখবর বহন করে না।
কে না জানে একটি রাষ্ট্র তার মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্কিম হাতে নিতে পারে তার মধ্যে খেলাধুলা একটি অন্যতম মাধ্যম। খেলাধুলার মাধ্যমেই শিশু তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে নেয় অনেকটা। বিজ্ঞজনের মতে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যে ভূমিকা রাখে তা অন্য কিছুতে আশা করা কঠিন। খেলাধুলার মাধ্যমে একটি শিশু তার মনোবল, চিন্তার উন্মেষ এবং নতুন নতুন আইডিয়া প্রয়োগ করতে পারে, যার ফলে তার দক্ষতা, সৃজনশীলতা সর্বোপরি সে তার নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন বা প্রকাশ করতে পারে, যা তার ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। তাছাড়া জয়-পরাজয়কে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। ‘পরাজয়ে ডরে না বীর’ এ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সে নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে চলে। ‘কে কী বলল সেটা মনে না করে আমি কী করলাম’ সেটাই বিবেচ্য বিষয় বিবেচনা করে বুকে সাহস নিয়ে পরিবার, সমাজ তথা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, খেলাধুলা বা ছোটাছুটি করতে না পারা শিশুরা পরবর্তীকালে নানা সমস্যায় ভোগে। মাঠে খেলাধুলার সময় শিশুদের শরীরে রক্তপ্রবাহ অনেক বেড়ে যায়। এটা শিশুদের দেহ-মন গঠন এবং সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা নানা পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পরাজয় মেনে নিতে শিখে। তাই বলা যায় শিশু মানেই দুষ্টামি, শিশু মানেই চঞ্চল-চপলতা, শিশু মানেই দৌড়ঝাঁপ, শিশু মানেই কোলাহল আর দুরন্তপনা। দুরন্তপনা ছাড়া কোনো শিশুর শৈশব কল্পনাই করা যায় না। অথচ প্রযুক্তির এ যুগে শিশুদের মধ্যে সে দুরন্তপনা, চঞ্চল-চপলতা নেই বললেই চলে, বিশেষ করে শহরের শিশুদের মধ্যে। এক জরিপে দেখা গেছে শহরের বেশির ভাগ শিশুই তুলনামূলক গ্রামের শিশুদের শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্যের উপকরণ থেকে বঞ্চিত, তা মোটেই শিশুর মেধা-মনন বিকাশে সন্তোষজনক নয়। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে বেশির ভাগ দুরন্তমনের শিশুরাই জীবনের প্রতিটি স্তরে তাদের মেধা মমন ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে। তারা নিজেকে অনেক উঁচু মাত্রায় তুলে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। এ দিক বিবেচনায় এনে আমরা যদি বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করি তা হলে আমাদের হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হতে হয়। এই কয় দশক আগেও গাঁও-গেরামের খোলা মাঠ ছিল শিশু-কিশোরদের দখলে। তারা দল বেঁধে নানান রঙের খেলায় মত্ত থাকতো। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও ছিল খেলার উপযোগী মাঠ, কিন্তু সেটাও আজ অনেকটা গল্প। আজকের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে শহর অঞ্চলের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠের বড়ো অভাব। যার কারণে বিঘিœত হচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ। পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়কার গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা কুস্তি, ডুবসাঁতার, দড়িলাফ, বুদ্ধিমন্তর বন্দিখেলাসহ নানান খেলা। ক্রমবর্দ্ধমান আধুনিক সভ্যতার ছোবল এবং স্যাটেলাইটের মায়াবী ছোবলে এ সমস্ত গতরখাটা আর মেধা খাটিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনা খেলা বর্তমান শিশু-কিশোরদের মধ্যে এক আতঙ্ক বা ভয়ের নাম। এ সমস্ত চ্যালেঞ্জিং খেলা থেকে ডিশ এন্টেনার টিভি চ্যানেল, ‘টম অ্যান্ড জেরি, ‘ডরিমন, ‘মুটো-পাটলো, ‘কম্পিউটার, ‘ইন্টারনেট, ফেসবুকসহ নানা ধরনের বিনোদন তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসায় তারা আসক্ত হয়ে পড়েছে এসব বিনোদনে। ফলে শারীরিক শ্রমের মতো বিনোদনগুলো কোনো অবস্থাকেই ধারণ করতে পারছে না আধুনিক সমাজ তথা এ নতুন প্রজন্ম। যার কারণে টিভি, মোবাইল, ভিডিও গেম, ল্যাপটপ, তাদের আঁতুড়ঘরে ঠেলে দিয়ে কুনোব্যাঙ করে রেখেছে। তাছাড়া এ সমস্ত প্রযুক্তিনির্ভর খেলায় শিশুরা নিজেদের আটকিয়ে রেখে নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছে এক আলাদা জগৎ। যে জগৎ শিশুর সহজ-সরল জীবনকে অবলীলায় ধ্বংস করে দিতে বাধ্য। সুতরাং আর দেরি নয় আমাদের যথাশিগগির টেকসই একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আমরা আমাদের বাপ-দাদার শিকড়গাঁথা ঐতিহ্যবাহী খেলাকে কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারিয়ে দিতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমাদের আদি ক্রীড়া সংস্কৃতিকে যে কোনোভাবে নতুন করে উজ্জীবিত করে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এখানে কোনো ধরনের আপস করা চলবে না। যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করে ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক-বাহক পূর্বপুরুষদের নাড়ির স্পন্দন, ঐতিহ্যের ধারা। আমাদের গ্রামীণ ক্রীড়া সংগঠন সৃষ্টি করে সোনামণিদের ঘর থেকে বের করে মাঠে নিয়ে আসতে হবে। আনতে হবে শহরে বসবাসরত শিশু-কিশোরদেরকেও, তাদের জানাতে হবে আমাদের বুনিয়াদি নিজস্ব ক্রীড়া ঐতিহ্যের ইতিহাস। এ জন্য রাষ্ট্র তথা সরকারকে অবশ্যই অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে সামনে আসতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া যায়। এ জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রামের পঞ্চায়েত বা বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে বছরে অন্তত একবার হলেও গ্রামীণ খেলা দিয়ে বড়ো একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে। তাছাড়া স্কুল মাদরাসার গ্রামীণ বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলে এ ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো মৃত্যুর গহ্বর থেকে আলোয় ফিরে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

SHARE

Leave a Reply