Home সাক্ষাৎকার এ লিটল পিস অফ গ্রাউন্ড-এর লেখিকা এলিজাবেথ লেয়ার্ড ও সোনিয়া নাম্র আহমদ...

এ লিটল পিস অফ গ্রাউন্ড-এর লেখিকা এলিজাবেথ লেয়ার্ড ও সোনিয়া নাম্র আহমদ মতিউর রহমান

শিশু-কিশোর বিষয়ক বিশ্ব-সাহিত্যের পুরস্কার জয়ী উপন্যাস ‘এ লিটল পিস অফ গ্রাউন্ড’। এটি ফিলিস্তিনবিষয়ক খ্যাতনামা কিশোর উপন্যাস। বইটির দুইজন লেখিকা। একজন এলিজাবেথ লেয়ার্ড। তিনি একজন ব্রিটিশ লেখিকা, যিনি ১৯৪৩ সালে নিউজিল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন এবং লন্ডনে বড়ো হয়েছেন। তার পিতা স্কটিশ ও মাতা নিউজিল্যান্ডের। এলিজাবেথ মালয়েশিয়ার একটি স্কুলে এবং এর পর যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। তিনি ইথিওপিয়ায় শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়াও ইরাক ও লেবাননে থেকেছেন। লেবাননে থাকার সময়ে তিনি ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের বিষয়ে ভালো মতো জানতে পারেন, যা এই বই লেখায় কাজে লেগেছে। মানবতাবাদী এই লেখিকার লেখায় নির্যাতিত শিশুদের কথা আছে। তার লেখা প্রথম বই ‘রেড স্কাই ইন দ্য মর্নিং’ (১৯৮৮) একটি প্রতিবন্ধী শিশুর কাহিনি। এটাতে অল্প বয়সে মারা যাওয়া তার ভাইয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। এছাড়া তার লেখা ‘কিস দ্য ডাস্ট’ (১৯৯১) ইরাকে আশ্রয় প্রার্থী কুর্দিদের কাহিনি, এবং ‘দ্য গারবেজ কিং’ (২০০৩) আদ্দিস আবাবায় ইথিওপিয়ান পথশিশুদের নিয়ে কাহিনি। স্কটল্যান্ডের উপকূলের দূষিত পানি থেকে ডলফিনকে বাঁচাতে চায় এমন একটি ছেলেকে নিয়ে লেখা তার সাম্প্রতিক বই, ‘সং অফ দ্য ডলফিন বয়’ (২০১৮)। তার বই ১৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

এ লিটল পিস অফ গ্রাউন্ডের অপর লেখিকা ডক্টর সোনিয়া নাম্র একজন ফিলিস্তিনি লেখিকা, অনুবাদক এবং বিরজেইট বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও কালচারাল স্টাডিজ বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রধান শহর রামাল্লায় থাকেন। নাম্র ১৯৫৫ সালে ফিলিস্তিনের জেনিনে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর বিরজেইট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যেখানে তিনি ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ছাত্র সংগ্রামে যোগ দেন। এই কর্মকাণ্ডের জন্য ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে এবং তিন বছর কারাভোগ করেন তিনি। কারাবাসের সময় তিনি শিশুসাহিত্য রচনায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরে তিনি পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। তিনি ১৯৮৬ সালে লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রথম দিকের রচনাগুলো ছিল ফিলিস্তিনি লোককাহিনি ভিত্তিক এবং আরবিতে প্রকাশিত। উল্লিখিত উপন্যাসটিতে তার জেনিনে থাকার সময়ের অভিজ্ঞতার চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি শিশুদের জন্য ইংরেজি ও আরবি দুই ভাষাতেই লিখে থাকেন। তিনি কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন। ২০১৪ সালে তিনি ‘এতিসালাত অ্যাওয়ার্ড ফর অ্যারাবিক চিলড্রেন্স লিটারেচার’ পুরস্কার লাভ করেন।

বইটির দুই লেখিকার সংক্ষিপ্ত
সাক্ষাৎকার

এলিজাবেথ লেয়ার্ড

প্রশ্ন : আপনি কীভাবে বই পড়ায় আগ্রহী হলেন?
উত্তর : ১৯৫০ এর দশকের কথা। আমি তখন ছোটো। সে সময় শিশু-কিশোর উপযোগী খুব বেশি বই ছিল না। তখন এনিড ব্লাইটনের বই খুব চলতো, তিনি খুবই জনপ্রিয় লেখিকা ছিলেন। আমি পড়তে চাইলাম। বাবা মা শিক্ষকরা দেখি নিরুৎসাহিত করছেন। তবে এর পরও পড়েছি, লুকিয়ে। তার ‘দি আইল্যান্ড অফ অ্যাডভেঞ্চার’ পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। কিপলিং প্রিয় লেখক ছিলেন। জিওফ্রে ট্রিজের ইতিহাসভিত্তিক বইগুলোও ভালো লাগতো।
প্রশ্ন : আপনি কী কারণে বা কার প্রভাবে লেখক বা ইলাস্ট্রেটর হয়েছেন?
উত্তর : আমি কোন একজনের বা একটা ঘটনার কথা বলতে পারবো না। আমি নিজেকে সব সময় লেখক ভেবেছি এবং পরে তা বুঝতে শিখি, সেই পথ বেছে নেই।
প্রশ্ন : ভালো বই / ইলাস্ট্রেটর কীভাবে লেখা বা সৃষ্টি করা যায়?
উত্তর : ভালো গল্পই হচ্ছে আসল কথা। যা সত্যি মনে হবে, সুন্দর একটা সমাপ্তি থাকবে। গল্পের চরিত্রটি পছন্দের না হলেও চরিত্র সৃজনের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লেখার স্টাইলও গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি বেশি সাসপেন্স ও উত্তেজনা পছন্দ করি না, এগুলো গল্পের বা কাহিনির ভাবকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রশ্ন : কারো কথা মাথায় রেখে গল্প বা কাহিনি তৈরি করেন? কোনো পরিকল্পনা থাকে?
উত্তর : না আমি আমার পাঠকের কথা মাথায় রাখি না, শুধু গল্পের কথা ভাবি। তবে কোন বয়সের পাঠকদের জন্য লিখি সেটা মাথায় থাকে, সেভাবে শব্দ ব্যবহার করি।
প্রশ্ন : প্রচলিত বই (ফিজিক্যাল বুক) এর ভবিষ্যৎ কী? ই-বুক কি ফিজিক্যাল বুকের স্থান দখল করে নেবে?
উত্তর : আমি মনে করি প্রচলিত বইয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। মোটামুটি দামের মধ্যে যতদিন এগুলো পাওয়া যাবে ততদিন পর্যন্ত ই-বুক প্রচলিত বইয়ের স্থান নিতে পারবে না। ভ্রমণের সময় ই-বুক ভালো, বই ক্যারি করতে হয় না। কিন্তু শেলফ ভর্তি বই চেয়ে দেখা, কারো কাছ থেকে চেয়ে এনে পড়া, কাউকে ধার দেওয়া, বারবার ভালো লাগা স্থানগুলো পড়া, চরিত্রের নাম মনে রাখা বই পড়ে সম্ভব, ই-বুকে এটা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন : আপনি কি বই সংগ্রাহক? এমন কোন বিশেষ বইয়ের কথা বলবেন?
উত্তর : আমি অতীতে ইথিওপিয়া বিষয়ে অনেক বই সংগ্রহ করেছি। এ বিষয়ে অনেক বই রয়েছে আমার সংগ্রহে। আমি লোককাহিনি পছন্দ করি। এখন এত বই আছে যে শেলফে জায়গা হয় না। মোট কথা– আরো শেলফ বানাতে হবে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ‘দি লেটার প্রেস প্রজেক্স’ এর একজন সাংবাদিক

সোনিয়া নাম্র

প্রশ্ন : যখন লেখেন কোন পরিকল্পনা মাথায় থাকে কি? নাকি কাহিনিটি এমনি এমনিতে তৈরি হয়ে যায়?
উত্তর : আমি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করি না। হয়তো এমন হয়, গ্রামটি সম্পর্কে কিছু লিখলাম। তারপর লেখা বন্ধ রাখি কিছু সময়। আমি যে চরিত্র তৈরি করবো, মনে করুন কোনো মেয়ে সে কোথায় ভ্রমণে যাবে ইত্যাদি— শুরুতে এই বিষয়ে ভাবি না সে কোথায় যাচ্ছে। পরে কাহিনির প্রয়োজনে একটা স্থান সেট করি। তা গাজা হোক বা অন্য কোথাও।
প্রশ্ন : আপনি কি কোনো লেখা রি-রাইট করেন? বারবার খসড়ায় পরিবর্তন করেন?
উত্তর : আমি লেখায় খুব বেশিবার পরিবর্তন করি না। কখনো যদি করি যেমন প্রথম অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে কোন গ্রাম সম্পর্কে, সেটা আমার মাথায় থাকে এবং প্রয়োজন হলে কিছুটা পরিবর্তন করি। বলতে পারেন আমি রি-রাইট করি বা খসড়ায় পরিবর্তন করি, তবে বেশি না।
প্রশ্ন : আপনার লেখায় ভ্রমণের ছাপ দেখা যায়। এটা কি নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন?
উত্তর : আমি যখন ছোটো ছিলাম আমি বড়ো ট্র্যাভেলার বা ভ্রমণকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, অনেকটা মহান আরব ভ্রমণকারী ইবনে বতুতার মতো। বহু স্থান ঘোরার স্বপ্ন ছিল আমার। আমার মনে হয় আমার লেখার চরিত্রগুলোর মধ্যে সেই ছাপ আছে। আমি ভারত, ইরান, আমেরিকা, আরব দেশগুলো এবং ইউরোপের দেশগুলো ভ্রমণ করেছি। আমার এখনো চীন, জাপান, ল্যাটিন আমেরিকায় ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন আছে। মাঝে মাঝে আমি কল্পনায় মরুভূমির অভিযাত্রীদের সঙ্গে এবং পুরনো সিল্ক রোড হয়ে ঘুরি।
প্রশ্ন : আপনার সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে ফান বা মজা করতে দেখা যায়। এগুলো লেখার সময় বা অনুবাদের সময় কি আনন্দ পান? যেখানে অনুবাদ কঠিন হয় বা বেদনাদায়ক অংশ থাকে সেখানে কী করেন? অনুবাদের কোনো কৌশল আছে কি আপনার কাছে?
উত্তর : সাধারণত নতুন কোনো কাহিনি লেখা আমার কাছে ফান বা আনন্দদায়ক মনে হয়। আমার চরিত্রগুলো যখন কোনো নতুন কিছু আবিষ্কার করছে তখন সেটা আমি উপভোগ করি। লেখা আনন্দদায়ক মনে না হলে লেখা বন্ধ করে দেই। কখনো কখনো পুরোটাই বাদ দিয়ে দেই। দুটো কঠিন মুহূর্ত আছে, যখন আমি কোনো চরিত্রকে মেরে ফেলি, কিন্তু আমার তরুণ পাঠকরা বিশেষ করে মেয়েরা চায় যে আমি যেন না মারি। আরেকটা বেদনাদায়ক বিষয় হলো যখন কোনো চরিত্র তার কাছের কেউ, যেমন কন্যাকে মরতে দেখে তখন আমি কষ্ট পাই। এ দুই ধরনের লেখা লিখতে গিয়ে আমিও সত্যিকার অর্থে কাঁদি।
প্রশ্ন : আপনি ২০১৪ সালে ‘ওয়ান্ডারার্স জার্নি’ বইয়ের জন্য ‘ইতিসালাত অ্যাওয়ার্ড ফর অ্যারাবিক চিলড্রেন লিটারেচার’ পুরস্কার পেয়েছেন। পাঠক বৃদ্ধির জন্য এ ধরনের পুরস্কারের বা স্বীকৃতির প্রয়োজন কতখানি? এটা ইংরেজি ভাষায় বই অনুবাদে কতখানি সহায়ক।
উত্তর : ইতিসালাত ও অন্যান্য পুরস্কার আরব বিশে^ আমার পাঠক বাড়াতে যথেষ্ট উপকারে এসেছে। এটা আমার লেখক হিসেবে একটা স্বীকৃতিও। পুরস্কার বইটির ব্যাপারে আগ্রহ ও বিতর্ক বাড়িয়ে দেয়, এটা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেই সাথে স্বীকৃতিও। পুরস্কার পাওয়ার পর যে প্রচার হয়েছে তাতে আমার এই বইটি স্প্যানিশ ও কাতালান ভাষায় অনুবাদের ব্যাপারে প্রকাশকদের আকর্ষণ করে। আমার অনুবাদক মার্সিয়া লিংক্স কোয়ালেকে ধন্যবাদ, এর ফলে সেও এটি ইংরেজিতে অনুবাদের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার চেষ্টায় প্রকাশকও জুটে যায়।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে : ক্লেয়ার স্টোরে

SHARE

Leave a Reply