Home প্রচ্ছদ রচনা আমাদের বিজয় আমাদের পতাকা -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

আমাদের বিজয় আমাদের পতাকা -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

বিজয় শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। ঐ একটাই শব্দ যা সবাই নিজের করে পেতে চায়। ছুঁতে চায়। ইংরেজি ভিক্টোরি শব্দের বাংলা বিজয়। শব্দটার আভিধানিক অর্থ জিত, জয়ী হওয়া, হারিয়ে দেওয়া, অধিকার করা, পদানত করা। আর কবির ভাষায়-
‘বিজয় মানে লড়া
লড়াই করে স্ব-অধিকার নিজের মতো গড়া।
বিজয় মানে খুশির তুফান মোহন বাঁশির সুর
মরা গাঙে চাঁদের হাসি আলোর সমুদ্দুর।
বিজয় মানে সুখ
খুশির ছোঁয়ায় ভুলে থাকা ভাই হারানোর দুখ।
সূর্যোদয়ের দিন
দোর লাগোয়া পুঁইয়ের ডগা আনন্দে রঙিন।’

সত্যিই তাই। বিজয় একটি আনন্দসূচক শব্দ। খুশির শব্দ। বাতাসের দোলায় দোল খাওয়ার শব্দ। খুশির উচ্ছলতায় তা ধেই ধেই করে নাচার শব্দ। তাইতো পৃথিবীর সব মানুষের কাছে এ শব্দটি বুকের গভীর থেকে বহুল উচ্চারিত ও সমাদৃত একটি শব্দ।
ডিসেম্বর! আমাদের বিজয়ের মাস। রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ শেষে টগবগে লাল-সূর্য উদিত হওয়ার মাস। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে নিজেদের মতো করে জীবন-যাপন করার মাস। এ মাসেই অর্জিত হয় আমাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতা। একটি মুক্ত-স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হই এ মাসেই। সৃষ্টি করি একটি যুগান্তকারী ইতিহাস। নির্মাণ করি একটি ভূখণ্ড। বিজয়ের নিশান উড়িয়ে বিশ্বের বুকে আমরা দাঁড় করাই একটি জাতি- বাংলাদেশী; একটি দেশ- বাংলাদেশ; একটি ভাষা- বাংলা; একটি পতাকা- লাল-সবুজ। হ্যাঁ, গাঢ় সবুজের বুকে টকটকে লাল সূর্য খচিত চমৎকার একটি পতাকা আমাদের। যা দুর্গম রক্ত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে। পত্পত্ করে সগৌরবে উড়তে থাকা লাল-সবুজের এই পতাকা যুগ-যুগান্তর ধরে বহন করে চলেছে আমাদের গর্বিত ইতিহাস। আমাদের ভূ-খণ্ডের ইতিহাস। আমাদের সার্বভৌমত্বের ইতিহাস। আমাদের পতাকার গাঢ় সবুজ রঙটি আমাদের শস্য-শ্যামলা, সুজলা-সুফলা দেশটির নির্মল-বিশুদ্ধ-পরিশুদ্ধ সবুজ প্রকৃতির প্রতীক। আর টগবগে লাল সূর্যটি শহীদের পবিত্র রক্তের প্রতীক। এমন গর্বিত ইতিহাস আর কার আছে? আমরা সত্যিই গর্বিত এমন একটি পতাকা পেয়ে, এমন একটি দেশ পেয়ে, এমন একটি জাতি পেয়ে, এমন এক উর্বর ভূখণ্ড পেয়ে।
ডিসেম্বর এলেই আমাদের চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী এক ভয়াবহ যুদ্ধ। যে যুদ্ধে অনিবার্য বিজয় এসেছিল আমাদের। আর তার জন্য হারাতে হয়েছিল শহীদের তরতাজা প্রাণ। ঝরেছিল সাগরসম রক্তবৃষ্টি। বিন্দু বিন্দু রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা। আহ্! কী বিভীষিকাময় সেইসব দিনরাত্রি! সেই ১৯৭১! আমরা স্বাধীনতার জন্য গর্জে উঠলাম। যে যেখানে ছিলাম- শিক্ষক, ছাত্র, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কৃষক, জেলে, শ্রমিক, বাওয়ালি, কামার, কুমার, কুলি, চাকরিজীবীসহ সকল ধর্মের সকল স্তরের মানুষ। শুরু হলো যুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর আমরা অর্জন করলাম চূড়ান্ত বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে অঙ্কিত হলো একটি দেশের নাম- বাংলাদেশ। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠলো সমগ্র পৃথিবী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়-
‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে
মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে…
মন ছুটছে গো আজ বল্গাহারা অশ্ব যেন পাগলা সে।
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!!’

অধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে আজ আমরা স্বাধীন। আমরা রক্তের বিনিময়ে স্বাধিকার লাভ করেছি। যেখানে কেউ আর কর্তৃত্ব ফলাতে আসবে না আমাদের ওপর। আমাদের কথা-কাজে কোনো প্রকার বাধা দিতে আসবে না কেউ। এখন আমরা আমাদের ইচ্ছেমত শান্তিময় সুশৃঙ্খল জীবন-যাপন করবো। ধর্মে-বর্ণে সর্বত্র ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বজায় রেখে চলবো। এই তো আমাদের স্বাধীনতার স্বাদ। এই তো আমাদের বিজয়। এ জন্য ডিসেম্বর আমাদের প্রিয় মাস। আমাদের বিজয়ের মাস। রক্তগোলাপ ফোটার মাস। তাই তো বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদ বলেছেন-
‘যুদ্ধ ছাড়া কেউ কি পারে ফোটাতে লাল ফুল
ফুলের হাসি আড়াল করে বোনের কালো চুল।
বিজয় দিবস বিজয় দিবস আজ বিজয়ের মাস
শহীদ প্রাণের রক্তে ভিজে সবুজ হলো ঘাস।’

আমরা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই সেইসব শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি, যাঁদের আত্মত্যাগে আমরা এমন সুন্দর একটি দেশ পেয়েছি; আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমরা আমাদের জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কখনোই ভুলবো না। যতদিন রবে আমাদের এই সোনার দেশ, আমাদের লাল-সবুজের পতাকা; ততদিন তাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করবে, গেঁথে রবে আমাদের অন্তরে। সশ্রদ্ধ সালাম তাঁদের প্রতি। আর সদা-সর্বদা আমরা সেই মহান প্রভুকে স্মরণ রাখবো, যার অপার অনুগ্রহে আমরা এতবড় নিয়ামত- বিজয় লাভ করেছি।
মহান বিজয়ের পর দেখতে দেখতে ৫০টি বছর কেটে গেছে। লক্ষ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত ভৌগোলিক স্বাধীনতা ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’ লাভ না করায় বাংলার জনগণের জীবন-মান কাক্সিক্ষত উন্নতি লাভ করেনি। অর্জিত সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনও হয়নি। ফলে শহর ও নগর কেন্দ্রিক কিছু উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও বাকি সমগ্র দেশ অনগ্রসর রয়ে গেছে। অথচ আমাদের প্রায় কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনতা লাভকারী মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত; এমনকি আফ্রিকার উগান্ডাসহ বহু দেশ আমাদের চাইতে অর্থনৈতিকভাবে অনেক অনেক উন্নতি লাভ করেছে। সেসব দেশে বাংলাদেশের নাগরিকরা দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। এটি আমাদের জন্য গৌরবের না লজ্জার? অবশ্যই লজ্জার। এটি বিজয় উদ্যাপনের বিপরীত চিত্র।
পৃথিবী অসীম গতিতে এগিয়ে চলেছে। আমাদের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। আগামী প্রজন্ম নিজেদেরকে শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তিতে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার মধ্যেই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।’ প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষার মাধ্যমে বেড়ে ওঠা নাগরিকগণ কখনো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে না। ফলে আমাদের দেশ পুনরায় পেছনের দিকে ছুটবে। এ অবস্থায় জাতিকে সময়ের প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে চোখ-কান খোলা রেখে সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই এই বিজয়, এই স্বাধীনতা সার্থক বলে গণ্য হবে। কবির ভাষায় ডাক দিয়ে যাই-
‘আগামী পৃথিবী তোমাকে ডাকছে-
ডাকছে শ্যামল এই বাংলাদেশ
যার মমতায় বিঁধে আছে আমাদের যাবতীয় স্বপ্নের ঘ্রাণ।
বিজয়ই তো আমাদের স্বপ্নের কথা বলতে শিখিয়েছে
এসো কণ্ঠে কণ্ঠ রেখে বলো- বিজয় বিজয়
আমাদের তোমাদের সকলের বিজয় এবং বিজয়।’

SHARE

Leave a Reply