Home তোমাদের গল্প বুলু মামার ইকুয়েশন -খালিদ হাসান

বুলু মামার ইকুয়েশন -খালিদ হাসান

প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে এক ধ্যানে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে বুলু মামা। কী সব হিজিবিজি লেখা লিখে রেখেছে, অনেক চেষ্টা করেও একটুও বুঝতে পারলো না তানভীর। অবশেষে অনেকটা বিরক্ত হয়েই মামাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এতো কী চিন্তা করতেছো মামা?’
বুলু মামা তানভীরের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ইকুয়েশন নিয়ে ভাবতেছি রে।’
তানভীর কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী ইকুয়েশন মামা?’
বুলু মামা গম্ভীর হয়ে বললো, ‘ডাইনোসর ইকুয়েশন।’
তানভীর অবাক হয়ে বললো, ‘ডাইনোসর ইকুয়েশন! এটা দিয়ে কী ডাইনোসরদের আবার ফিরিয়ে আনা যাবে নাকি মামা?’
মামা বললো, ‘না রে গাধা। ইকুয়েশনের নাম ডাইনোসর। মানে বিশাল বড়ো ইকুয়েশন। এই ইকুয়েশন দিয়ে প্রাচীন যুগের ডাইনোসরদের উচ্চতা মাপা যাবে।…’
তানভীর কথার মাঝখানে বোকার মতো বলে ফেললো, ‘সেটা ফিতা দিয়ে মাপলেই তো হয়ে যায়। এর জন্য আবার এতো অঙ্ক করা লাগে?’
মামা রেগে গিয়ে বললো, ‘তুই এসবের কী বুঝবি! মাথামোটা কোথাকার! সহজভাবে কাজ করলে কি নতুন কিছু বের করা যায়? এখান থেকে ভাগ্ এখন। আমি অনেক ব্যস্ত আছি।’

তানভীর কিছু মনে না করে রুম থেকে বের হয়ে এলো। তানভীর ক্লাস সেভেনে পড়ে। ভালো ছাত্র হিসেবে স্কুল থেকে এলাকায় মোটামুটি সবাই তাকে চেনে। বুলু মামা তার একমাত্র আপন মামা। দুইবার এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করা বুদ্ধিজীবী।
মামাকে সবাই বুলু বলে ডাকলেও তার আসল নাম বুলবুল। সেই নামই ভাষার বিবর্তনে এখন বুলুতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাসার ভেতরে বসে থাকতে থাকতে তানভীর যখন বোর হয়ে গেছে তখনই লকডাউন শিথিল হওয়ার পর বুলু মামার আগমন।
তানভীরের বাবা-মা দুজনেই ডাক্তার। লকডাউনে সবার ছুটি থাকলেও তাদের ছুটি নেই। এর মধ্যে করোনায় আরো চাপ বেশি। বাসায় তানভীর একা একাই দিন পার করে। এর মধ্যে সঙ্গী হিসেবে একজন জুটলে তো মন্দ হয় না।
বছর দুয়েক আগের কথা স্কুলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় তানভীর প্রথম হয়েছে। তার এই প্রাপ্তিতে সবাই খুশি। এমন সময় বুলু মামার আগমন। এসেই শুনলেন তার একমাত্র ভাগ্নে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। তানভীরের আম্মা ফাতেমা তানভীরকে ডেকে বললেন, ‘তোর মামাকে চিত্রটা এনে দেখা।’
তানভীর যাওয়ার আগেই বুলু মামা তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী আঁকতে দিয়েছিল রে তোদের?’
তানভীর বললো, ‘বিড়ালের ছবি।’
তানভীর চিত্রটা আনতেই বুলু মামা স্কেল নিয়ে বসলেন। একবার এদিক মাপেন তো আরেকবার ওদিক। আর মুখে চুক চুক শব্দ করেন। প্রায় তিন মিনিট গবেষণার পর বললেন, ‘না, কিছুতেই হচ্ছে না!…’
তানভীর জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হচ্ছে না মামা?’
মামা বললেন, ‘তোর চিত্রের হিসাব মিলছে না।’
তানভীর অবাক হয়ে বললো, ‘চিত্রে আবার অঙ্ক এলো কোথা থেকে! যে হিসাব ভুল হচ্ছে!’
মামা রেগে বললেন, ‘অঙ্ক না রে গাধা। যুক্তির নিক্তিতে মিলছে না! বিড়াল এঁকেছিস ভালো কথা, তা বিড়ালের পেট এতো ছোটো কেন? মাত্র এক ইঞ্চি! একটি ছোটো ইঁদুরও তো এর থেকে বড়ো! এখন বেচারা বিড়ালটা ইঁদুর কীভাবে খাবে?…’
তানভীর সবগুলো দাঁত বের করে বললো, ‘কেন মামা! ফ্রিজে রেখে রেখে খাবে!’
বলেই এক দৌড়ে খাতা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল তানভীর। এদিকে মামা হ্যাঙ হয়ে বসে আছে!
কিছুদিন পরের ঘটনা।
মামাকে কোথাও যাওয়ার জন্য রেডি হতে দেখে তানভীর জিজ্ঞেস করলো, ‘মামা কোথায় যাচ্ছো?’
মামা বললেন, ‘ডাইনোসর ইকুয়েশনের প্রমাণ জোগাড় করতে। মিশন টু বান্দরবান!’
তানভীর কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘বান্দরবানে ডাইনোসর ছিল আবার কবে?’
মামা বললেন, ‘তুই তো ইতিহাস-ই জানিস না‌। বান্দরবানে পাই-রেক্স ডাইনোসর ছিল অতীতে।’
তানভীর বললো, ‘টি. রেক্স ডাইনোসরের নাম পড়েছি। কিন্তু এই পাই-রেক্স ডাইনোসর আবার এলো কোথা থেকে!’
মামা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুই অতিরিক্ত বকবক করিস। খালি ঢোল বাজে বেশি। তোর সাথে অহেতুক কথা বলে সময় নষ্ট করার সময় নেই আমার।’
এই বলে মামা সাইক্লোন গতিতে বের হয়ে গেল বান্দরবানের উদ্দেশ্যে।
কয়েক মাস পর বের হয়েছে বুলু মামার গবেষণার খবর। দৈনিক রূপকথায় প্রথম পেজে বড়ো বড়ো শিরোনামে লেখা ‘বিজ্ঞানী বুলবুলের পাই-রেক্স ডাইনোসর’।
সংবাদের সারসংক্ষেপ হলো, বুলু মামা বড়ো প্রজাতির একটা টিকটিকি ধরে পাই-রেক্স ডাইনোসর ধরেছে বলছে। এটা নাকি বাচ্চা ডাইনোসর! বেচারা টিকটিকিকে কিছু পিটনাও দিয়েছে মুখ দিয়ে আগুন বের করতে! কিন্তু মামাকে বোঝায় কে, ডাইনোসর মুখ দিয়ে আগুন বের করে না।

SHARE

Leave a Reply