Home বিশেষ রচনা স্মৃতিশক্তির গ্র্যান্ডমাস্টার! হতে পারো তুমিও! -ফাহিম ফয়সাল

স্মৃতিশক্তির গ্র্যান্ডমাস্টার! হতে পারো তুমিও! -ফাহিম ফয়সাল

নিশান্ত কাশিবাতলা (Nishant Kasibhatla) ২০১১ সালে অসাধারণ কাজ করে দেখান। তাকে লাল, নীল, সবুজ ও হলুদ রঙ ঘুরে ফিরে ১০০ বার দেখানো হয়। অতঃপর তিনি প্রথম থেকে ১০০তম পর্যন্ত কী কী রঙ দেখেছেন সিরিয়াল অনুযায়ী বলে দিতে পেরেছেন। এটা গ্রিনিজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। এর আগের রেকর্ড ছিল ৪০তম পর্যন্ত। এজন্য নিশান্তকে বলা হয় মেমরি গ্র্যান্ডমাস্টার।
স্মৃতিশক্তি বিষয়ে সিঙ্গাপুরের নাগরিক নিশান্ত কাশিবাতলার দক্ষতার কিছু ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যায়। একটি ভিডিওতে দেখা যায় তার সামনে টেবিলে ছোটো ছোটো ২০টি বিভিন্ন বস্তু রাখা হয়েছে। তাকে মাত্র দুই মিনিট দেখতে দিয়ে সেগুলো পেপার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। অতঃপর নিশান্ত সবগুলো বস্তুর নাম ঠিক ঠাক বলে দিতে পেরেছেন।
আচ্ছা, কারো মোবাইল নম্বর একবার শুনে কতক্ষণ সেটা মনে রাখতে পারবো? সাথে সাথে বলতে পারা গেলেও কিছু সময় পরে সেটা মনে রাখা সম্ভব হয় না। কিন্তু নিশান্ত ৩০টি ডিজিট একবার শুনে সেটা মুখস্থ বলতে পারেন। এমনকি আধা ঘণ্টা পর ওই ৩০টি নম্বর শেষের দিক থেকে বলে দিতে পারেন। দর্শককে মোহিত করতে নিশান্ত ১৯৪৪ ডিজিটের একটা সংখ্যা মুখস্থ করেছেন। ১ এবং ০ এর সমন্বয়ে ১২০০ পর্যন্ত বাইনারি সংখ্যা মুখস্থ করেছেন।
কোথাও গেলে নিশান্তকে অনেকে পরীক্ষা করে দেখে তার স্মৃতিশক্তি কতটা কাজ করে। এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ৩৪ জনের নাম একবার শুনে মুখস্থ বলতে পেরেছেন। তবে নিশান্তের দাবি, তার এই দক্ষতা জন্মগত নয়। ১৫ বছর বয়সে তিনি একবার সাইকেল চালিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরার সময় পায়ে হেঁটে বাসায় ফেরেন। তিনি যে সাইকেল ফেলে রেখে এসেছেন সেটা একদিন পর তার মনে পড়ে। তিনি জানান, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তিনি অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করেছেন। কিছু কৌশল ও অনুশীলনের সমন্বয়ে তার এই দক্ষতা তৈরি হয়েছে।

নিশান্তের মতো ব্যক্তি আমাদের চারপাশেও রয়েছে। আমার বাবা মসজিদে জুমার নামাজে ইমাম সাহেবের খুতবা শুনে বাসায় এসে সেটা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দেন। তিনি কোনো রেকর্ডার বা কাগজ-কলম ব্যবহার করেন না। একবার শুনে এসে কীভাবে লেখেন সেটা সত্যি আশ্চর্যজনক। আমার মরহুম মেজো চাচা মোবাইলে নম্বর সেভ করতেন না। রাজ্যের সব নম্বর তার মুখস্থ থাকতো।
মজার বিষয় হচ্ছে, তারা কেউ খাতা কলমে লিখে এগুলো বারবার পড়ে মুখস্থ করেনি। একবার শুনেই মনে রেখেছেন। কীভাবে সম্ভব? আমরা কি করতে পারবো?
হ্যাঁ আমরাও পারবো ইনশাআল্লাহ। তারা কেন পেরেছে সেটা বুঝতে হবে। মসজিদে ইমামের খুতবা শুনে বাসায় এসে খাতায় লিখতে হবে এমনটি যদি আপনার ক্ষেত্রে হতো তাহলে কী পরিমাণ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনতেন? মোবাইল নম্বর একবার শুনে মুখস্থ রাখতে হবে এমন প্যাড়ায় থাকলে নম্বর শোনার সময় খুব মনোযোগী হতেন এটাই স্বাভাবিক। তাহলে প্রথম কাজ হচ্ছে খুব মনোযোগ দিয়ে শোনা।
কারো সাথে বহুদিন পরে দেখা হলে আমরা বলি, ‘তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি কিন্তু তোমার নাম মনে করতে পারছি না’। কিন্তু ‘তোমার নাম মনে আছে কিন্তু তোমার চেহারা যেন কী’ এমনটি কিন্তু বলি না। অর্থাৎ আমাদের স্মৃতিতে চেহারা বা ছবি মনে থাকে। বইয়ে পড়া অনেক গল্প আমরা ভুলে যাই। কিন্তু সিনেমা বা নাটকের অনেক দৃশ্য আমাদের মনে থাকে। মনে রাখার জন্য মনোযোগ দেওয়ার পরের কাজ হচ্ছে সেই বিষয়টা মনের দৃশ্যপটে ছবির মতো এঁকে ফেলা। কেউ যখন তার নাম বলবে খুব মনোযোগ দিয়ে তার চেহারার দিকে তাকাতে হবে। তাহলে নামটা মনে থাকবে।

মেমরি গ্র্যান্ডমাস্টার নিশান্ত কাশিবাতলা নম্বর মনে রাখার জন্য তিন-চারটা ডিজিট একসাথে মনে মনে বড় আকারে কল্পনা করেন। এভাবে ছোটো ছোটো অংশগুলোকে তিনি জোড়া লাগান। এর সাথে আরো একটা কাজ করেন। সেটা হচ্ছে পরিচিত কিছুর সাথে মিলিয়ে মনে রাখার চেষ্টা করেন। যেমন ১৯৭৩৩৪৭২২৮১২ এই সংখ্যাটা এভাবে মনে রাখা যায়.. ১৯৭৩ সালে ৩৪ হাজার ৭২২ টাকা নিয়ে ৮১২ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছিলাম। একটা একটা করে ডিজিট মনে রাখার চেয়ে এমন গল্প আকারে মনে রাখা তুলনামূলক সহজ।
পড়া মনে রাখার জন্য শিক্ষার্থীদেরকে নিশান্ত কাশিবাতলা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পড়ার জন্য নিরিবিলি সময় ও পরিবেশ পছন্দ করা। মোবাইলের নোটিফিকেশন পড়ালেখায় মনোযোগ নষ্ট করে। এজন্য মোবাইল, ল্যাপটপ ও টেলিভিশন থেকে দূরে থাকা। পড়ার সময় অন্য কোনো কাজ না করা।
পড়ালেখা যাতে মনে থাকে সেজন্য নিশান্ত কাজগুলোকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। ইনপুট এবং আউটপুট। শিক্ষকের ক্লাস করা, বই খুলে পড়া, কারো কাছ থেকে বুঝে নেওয়া, ইউটিউব ভিডিও দেখে শেখা এগুলো হচ্ছে ইনপুট। আর আউটপুট হচ্ছে ইনপুট নেওয়ার পর চিন্তা করা কী কী বিষয় শিখলাম। অতঃপর বই বন্ধ করে পঠিত বিষয় সম্পর্কে নিজে নিজে বলা বা লেখার চেষ্টা করা।
স্বাভাবিকভাবে পড়া বেধে যাবে, মনে আসতে চাইবে না। যখন কোনোভাবেই মনে আসছে না তখন বই খুলে আবার পড়তে হবে। এক সপ্তাহ পর সাত দিন ধরে পঠিত বিষয় সম্পর্কে মনে আছে কি না যাচাই করতে হবে। মনে না থাকলে আবার বই খুলে পড়তে হবে। এক মাস পর আবার চেক করতে হবে। কিন্তু আউটপুটের পেছনে সময় না দিলে শুধু ইনপুট নিয়ে গেলে পরীক্ষার হলে কিন্তু ঠিকই মনে থাকবে না।
স্মৃতিশক্তির বিষয়ে কিছু ভুল ধারণা-
আমার কি আর ভালো মাথা আছে? সবার দিয়ে সবকিছু হয় না! থানকুনি পাতা বা ওষুধ খেলে স্মৃতিশক্তি ভালো কাজ করে! বেশি শিখলে মনে রাখতে পারবা না! ইত্যাদি।

SHARE

Leave a Reply