Home স্মরণ কবি আহমদ বাসির তারুণ্যের বাতিঘর -সৈয়দ আল জাবের

কবি আহমদ বাসির তারুণ্যের বাতিঘর -সৈয়দ আল জাবের

মৃত্যু অনিবার্য অপরিহার্যও বটে। তবুও কারো কারো পৃথিবীর জীবনের অবসান ঘটানো, সমাপ্তি টানা, মৃত্যু বাকরুদ্ধ করে দেয়। বেদনায় বিদ্ধ করে হৃদয়। নদী ভাঙনের মতো ভেঙে যায় মনের তীর। কবি আহমদ বাসির (জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৮০-মৃত্যু ১৮ নভেম্বর ২০২০)-এর আখেরাত গমন আমাদের হৃদয়-মন ভেঙে চুরে দলিত মথিত করে দিয়েছে। এক বছর পার হয়ে গেল তাঁর প্রস্থানের। হঠাৎ এ ডাক আসা আমাদের খুব নাড়া দিয়ে গেছে। মনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস। আহ! এপারের জীবন এত ছোটো! অথচ কী আশ্চর্য! সময়ের বিচারে ছোট্ট জীবনে কত বড়ো হয়েছিলেন তিনি, তা তাঁর মৃত্যুই জানান দিয়ে গেছে। কিছু কিছু বড়ো মানুষ অনাদরে অযতেœ বড়ো হয়ে ওঠেন। এ বড়ই করুণ নিয়তি যা অতিক্রম করা যায় না, যায়নি, অন্তত ইতিহাস তা-ই বলে। এমনই একজন ছোটো দেশের বড়ো রত্ন বড়ই অযতেœ বেড়ে উঠতে উঠতে চলেই গেলেন সব ছেড়ে, সবাইকে ছেড়ে। কবি আপনি নন বরং আমরাই বঞ্চিত হলাম, হারালাম অমূল্য সম্পদ।

এমন গুণী মানুষ কি আমরা সহসা আর পাবো? আসবে কি আর এই নিরন্ন জনপদে? সেটা অন্তত আমার অজানা। কবি আহমদ বাসির কেমন গুণী ছিলেন? কেন আমরা সবাই কাঁদলাম এমন কষ্ট পেলাম? আমরা যারা বাংলা ভাষায় শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করি কেবল তারা-ই সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন। এটা কত বড়ো শূন্যতার সৃষ্টি করলো তা ভাবতে গেলে অশ্রু বয়ে যায়। তবে আমরা হতাশ নই; বিশ^াসীদের জন্য তা শোভনীয়ও নয়। কবি আহমদ বাসির তাঁর চার দশকের জীবনে আমাদের আনন্দ দিয়ে গেছেন, মুগ্ধ করে রেখেছিলেন, কি অনুজ কি অগ্রজ কি সমবয়সী সবাইকে সমভাবে। অভাবের অভাবিত যাপন! আমাদের আনন্দ আপন।

তিনি বিশ্বাসের আদর্শের মহান শিল্পী ছিলেন। কবিতা গান গল্প গবেষণা উপন্যাস প্রবন্ধ সম্পাদনা উপস্থাপনা আবৃত্তি এবং বক্তৃতা এ সকল ক্ষেত্রে-ধারায় সাবলীল বিচরণ ছিল তাঁর। সাহিত্যের বিপুল সম্ভারে সাগরের মতো গভীর ও আকাশের মতো প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন কবি আহমদ বাসির। অসামান্য স্মৃতিশক্তিও ছিল তাঁর। সমবয়সী কেউই তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না, এমনকি বড়োরাও তাঁকে ¯েœহের সাথে সমীহ করতেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের সেরা অর্জন-উপার্জন। ভালোবাসা পেয়েছেন দিয়েছেন, বিনিময়ে কিছুই নেননি। কবি আহমদ বাসিরের সাথে মিশেছেন তাঁকে দেখেছেন কথা বলেছেন শুনেছেন অথচ মুগ্ধ হননি এমন কেউ কি আছেন কিংবা ছিলেন? আমি জানি, নেই। এখানেই তিনি অনন্য। যা জানতেন স্পষ্ট জানতেন, যা ভাবতেন গভীরভাবে ভাবতেন, যা বলতেন বিশ্বাস থেকে বলতেন, যা লিখতেন সত্য জেনেই লিখতেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক যখন ছিলেন সে সময়ের এক পর্যায়ে এসে এবং যখন ছিলেন না তখনও এক ঝাঁক তরুণ উদীয়মান কবি-সাহিত্যিক কবি আহমদ বাসিরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। তাঁর সঙ্গ-উৎসঙ্গ সাহচর্য পূর্ণিমার চাঁদের মতো মুগ্ধ করে রাখতো তাদের। তারুণ্যের বাতিঘর ছিলেন কবি আহমদ বাসির। তারা আজ স্মৃতি কাতরতায় ভারাক্রান্ত পাথর। তাদের চোখ ফেটে আসে জল অবিরল। প্রিয়তম মধুময় সম্বোধন বাসির ভাই! নাই নাই আহ! সূর্য ওঠে ভোর হয়; পাখি ডাকে সন্ধ্যা নামে কিন্তু হৃদয় থেকে বাসির ভাই নামে না আহা! কী টান! ভালোবাসার বাঁধন। কী জীবন ভাই করলে গঠন কেঁদে কেঁদে যায় প্রাণমন হায় থামে না হৃদয়ের ক্রন্দন।
কবি আহমদ বাসিরের সাথে আমার পরিচয়-সম্পর্ক এক যুগের। আমার অগ্রজ ছিলেন তিনি। একসাথে একই মঞ্চে আবৃত্তি করেছি, আবৃত্তির প্রশিক্ষণ দিয়েছি একসাথে, একসাথে বের করেছি আবৃত্তির অ্যালবাম, আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিচারকও ছিলাম একসাথে। সাহিত্য বিষয়ে কত আড্ডা কত গল্প। শেষ দেখা শেষ কথা শেষ আবৃত্তি করেছি একসাথে মৃত্যুর পনেরো দিন আগে ৩ নভেম্বর ২০২০; কী জীবন্ত সে ছবি চোখে ভাসে হাসে মুখ এখন ছায়াছবি, স্মৃতি।

কবি আহমদ বাসির প্রচুর লিখেছেন। তবে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা কম, মাত্র তিনটি- কাব্য- গোপন মাটির বীজতলা, কিশোর উপন্যাস- দীনেশের কালোরাত, সম্পাদনা- কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সাক্ষাৎকার। তাঁর ‘কাজলের শরবত’ নামের গল্পটি ‘কাজলের গল্প’ নামে টিভি নাটক হিসেবে নির্মিত হয় যা ইউটিউবে পাওয়া যায়।

বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। অপ্রকাশিত আছে অনেক লেখা, আছে গান ও পাণ্ডুলিপি। তাঁর কয়েকটি গান গীত হয়ে আছে ইউটিউবে, আছে আবৃত্তিও। কবি আহমদ বাসির জীবনের শেষ দিকে গান রচনায় মনোনিবেশ করেন বেশি আর শিশু-কিশোরদের শিক্ষা-দীক্ষায় ও শিল্পচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। গড়ে তোলেন ‘সংকল্প’ নামে সংগঠন। তাঁর অপ্রকাশিত লেখাসমূহ প্রকাশিত হোক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কবি আহমদ বাসিরকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন, আমিন।

SHARE

Leave a Reply