Home স্মরণ শেখ ফজলল করিমের জীবন ও সাহিত্য -ড. মোজাফফর হোসেন

শেখ ফজলল করিমের জীবন ও সাহিত্য -ড. মোজাফফর হোসেন

‘এতকাল নদীকূলে / যাহা লয়ে ছিনু ভুলে /
সকলি দিলাম তুলে / থরে বিথরে.. .. ..’ /
এখন আমারে লহ করুণা করে (সোনারতরী)
না; রবীন্দ্রনাথকে করুণা পেতে হয়নি। আশঙ্কা সত্ত্বেও বাঙালি জাতির ছোটো তরীতে রবীন্দ্রনাথ ঠিকই ঠায় পেয়েছেন। কিন্তু ঠায় করে দেওয়া যায়নি রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক সাহিত্যবিশারদ কবি শেখ ফজলল করিমের। অথচ
‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক / কে বলে তা বহুদূর!
মানুষেরই মাঝে স্বর্গনরক / মানুষেতে সুরাসুর’।
এই কবিতার ভাবসম্প্রসারণ স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় পড়েনি এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া ভার, তবে অপ্রত্যাশিত সত্য যে, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই জানে না, কবিতাটির লেখক শেখ ফজলল করিম। জানে না বললে ভুল হবে, জানতে দেওয়া হয় না। কেননা বাংলাসাহিত্যের জগৎটাকে একটা বিশেষ শ্রেণির মানুষ তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তা সত্ত্বেও বাংলাসাহিত্য এগিয়েছে সব কূল রক্ষা করে অবিরাম।
শেখ ফজলল করিমের জন্ম হয়েছিল ১৮৮৩ সালে ৯ এপ্রিল। কবির নিবাস ছিল রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কাকিনা বাজার গ্রামে। তার বাবার নাম আমিরউল্লা সরদার। দাদার নাম জশমত উল্লা সরদার। দাদা ছিলেন কাকিনা রাজসংসারের প্রসিদ্ধ কর্মচারী। মা, কোকিলা বিবি। পাঁচ ভাই তিন বোনের মধ্যে শেখ ফজলল করিম ছিলেন দ্বিতীয়। কবির পড়াশোনার হাতে খড়ি বাড়িতে। কাচারির বড়ো টেবিলে বসে দোয়াতের কালি আর পাখির পালকের কলম দিয়ে তিনি অ আ ক খ লেখা শিখেছেন। ছোটো বয়সে লেখাপড়ার প্রতি কবির আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। সাধারণত অল্প বয়সের শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে পালিয়ে বাড়ি আসে কিন্তু শেখ ফজলল করিম বাড়ি থেকে পালিয়ে স্কুলে যেতেন। পাঁচ বছর বয়সে ফজলল করিমকে কাকিনা স্কুলে ভর্তি করানো হয়। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তিনি প্রতি বছর পুরস্কৃত হতেন। বই পড়া ও কবিতা লেখা ছিল কবির শখ। মাত্র ১২ বছর বয়সে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সরল পদ্য বিকাশ’ হাতের লেখায় প্রকাশিত হয়। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর ষষ্ঠ শ্রেণিতে কবিকে রংপুর জেলা স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এ স্কুলে মন বসাতে না পেরে তিনি আবার কাকিনা স্কুলে ফিরে আসেন এবং ১৮৯৯ সালে সেখান থেকে মাইনর পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হোন। মাইনর পাসের পর কবিকে আবারও রংপুর জেলা স্কুলে পাঠানো হয়। স্কুলের বাঁধাধরা নিয়মে পড়তে ভালো না লাগায় জেলা স্কুল থেকে তিনি ফিরে এসে নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের বই পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন বিষয়ের বই সংগ্রহ করে পড়তে গিয়ে তিনি ১৮৯৬ সালে ‘আহামদিয়া লাইব্রেরি’ নামে একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার তৈরি করেন। পত্রপত্রিকার পেছনে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করে নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেন। এ সময় বসিরন নেছা খাতুনের সাথে কবির বিয়ে হয়। সে সময় অল্প বয়সেই বিয়ে হওয়ার প্রচলন ছিল। বিয়ের পর কবির প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা আর এগোয়নি।
শেখ ফজলল করিমের প্রধান পরিচয় তিনি কবি। কিন্তু কবিতা ছাড়াও তিনি লিখেছেন প্রবন্ধ, নাট্যকাব্য, জীবনীগ্রন্থ, ইতিহাস, গবেষণামূলক নিবন্ধ, সমাজগঠনমূলক ও তত্ত্বকথা গল্প, শিশুতোষ সাহিত্য, নীতিকথা চরিত এবং সমালোচনামূলক অন্যান্য রচনা। শেখ ফজলল করিমের কাব্যচর্চা ছিল অসাধারণ। তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য হলো তৃষ্ণা (১৯০০), পরিত্রাণকাব্য (১৯০৪), অগ্রবীণা বা ইসলামচিত্র (১৯০৪), ভক্তিপুষ্পাঞ্জলি (১৯১১), খাজাবাবার জীবনচরিত; বিবি রহিমা; রাজর্ষি এবরাহীম; পয়গম্বরজীবনী; অন্যতম। ‘লাইলী-মজনু’ নামে তাঁর লেখা উপন্যাসও রয়েছে। শিশুসাহিত্যের মধ্যে রয়েছে ‘হারুন-অর-রশিদের গল্প’। নীতিকথা ‘চিন্তার চাষ’। ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ‘পথ ও পাথেয়’। মহর্ষি খাজা মইনউদ্দীন চিশতি; মুনশি মেহেরুল্লাহ শোকগাথা; রাজা মহিমারঞ্জন শোকগাথা; সরদার বংশ চরিত; মুনশী মোহাম্মদ সাহেবের স্বর্গারোহাণের মর্মগাথা; মহর্ষি আব্দুল কাদের জিলানী পরশমণি; ছোটদের কবিতা উচ্ছ্বাস, পান্থশালা, আফগানিস্তানের ইতিহাস, সোনার জাতি, প্রেমের স্মৃতিসহ ওমর খৈয়ামের অনুবাদও তিনি করেছেন। শেখ ফজলল করিমের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশেরও অধিক। কবি শেখ ফজলল করিম ছিলেন সুফিবাদে বিশ্বাসী। ইসলামী মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রভাব তার রচিত সাহিত্যে সমুজ্জ্বল। মানবপ্রেমে নিমজ্জিত শেখ ফজলল করিম জাতি-বিজাতি নিয়ে মানুষের মূল্যায়নে বিশ্বাসী ছিলেন না।
শেখ ফজলল করিম ছিলেন সাহিত্যের কারিগর। যে সাহিত্য মানুষের মনকে প্রশান্ত করে। নিবিড় করে। সাহিত্যের সংস্পর্শে থাকা মানুষ নিজেকে তৈরি করতে পারে পরার্থ করে। শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যও সে পথ বেয়ে এগিয়েছে। সাহিত্য বোঝা না বোঝা মানুষের মহামিলন তাকে আপ্লুত করে। মানুষই জগতের সব। মানুষকে উপলক্ষ্য করে পৃথিবীকে সাজানো হয়েছে। মানুষ সুন্দর হলে পৃথিবীও সুন্দর হয়ে ওঠে। শেখ ফজলল করিম সেই সুন্দর মানুষেরই মাঝে স্বর্গ খুঁজেছেন; মানুষকে ভালোবাসার মধ্যে। সকল মানুষই তার প্রিয়। ধর্ম দিয়ে, অর্থবিত্ত দিয়ে তিনি মানুষকে মাপেননি। ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাকে তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকল্পে কবির নিরলস প্রচেষ্টা বাংলাসাহিত্যকে ঐশ্বর্য দিয়েছে পথ ও পাথেয় সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে। মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে তিনি সমাজকে সচেতন করেছেন কবিতা ও নীতির চাষ গ্রন্থের মাধ্যমে। সে কারণেই কবি বলতে পেরেছেন-

‘রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয়
আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনি পুড়িতে হয়
প্রীতির প্রেমের পুণ্য বাঁধনে মিলি যবে পরস্পরে
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখনি আমাদেরই কুঁড়েঘরে’।

শেখ ফজলল করিম যে সময় সাহিত্য রচনা করেছেন সে সময়ে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল সবলদের অনুকূলে। এ সময়টা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতবর্ষের মানুষ দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল। হিন্দু ও মুসলিম। এ বিভক্তিতে উসকানি দিয়েছিল ইংরেজরা। শেখ ফজলল করিম ইংরেজদের হঠকারিতা ধরতে পেরেছিলেন। তাদের উসকানিকে উপেক্ষা করে চিন্তার চাষ গ্রন্থে বললেন-‘সূর্য যেমন ধনীর প্রাসাদ হতে কাঙালের কুটির পর্যন্ত সমানভাবে আলো বিতরণ করে, লোকসেবার সময় তুমিও তেমনি জাতি, ধর্ম, দেশকাল, পাত্রী-পাত্র কিংবা উচ্চ-নীচের তফাৎ করো না।’ বিত্তে গোত্রে দুর্বল মানুষকে যারা অবহেলা করে তাদের পরিণতি সুখকর হয় না। সৃষ্টিকর্তার নিকট দুর্বলদেরও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ‘কিসের চিন্তা কর? পিতা-মাতা অক্ষম সন্তানকেই অধিক ¯েœহ করেন।’
শেখ ফজলল করিম ছিলেন মুসলিম কবি এবং মুসলিম কবিদের মধে তিনি ছিলেন অন্যতম। ইংরেজ আমলে বাংলাসাহিত্যে হিন্দু কবিদের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। সে কারণে কাব্যপ্রেমিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব বিস্তার করে চলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশসহ অনেকেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ রোমান্টিক ভাবের কবি। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক কাব্যধারার বাইরে এসে শেখ ফজলল করিম সাহিত্য অনুরাগীদের শেখালেন নীতিকথা। বললেন- ‘চিন্তাই আমাদের জীবন, চিন্তা ফুরালেই জীবন ফুরালো। যিনি জীবন দিয়েছেন, তিনি আহার দিবেন না-এ কথা যে বিশ্বাস করে, সেই জগতের সবচেয়ে মূর্খ।’ তিনি আরো বললেন-‘গৃহজাত পশুগুলো বাঁধবার পূর্বে তুমি তোমার উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তি-পশুকে শক্ত করে বাঁধ; সেটাই বীরত্বের কথা। পতঙ্গের ন্যায় আত্মদান কর, ভ্রমরের মতো স্বার্থপর হয়ো না। মনের মাধুর্য না বাড়ালে দেহের সে সৌন্দর্য বাড়িয়ে কি লাভ? মাকাল ফল দেখতে সুন্দর হয় বটে; কিন্তু তাই বলে কি কেউ তাকে বেদানার মতো আদর করে?
শেখ ফজলল করিমের এই যে নীতিকথা, তা আজও মনুষ্য জগতে অনুরণ সৃষ্টি করে। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে মানব মহিমাকে উচ্চাসনে রাখার চেষ্টা করলেন। মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেখালেন জীবনের পরিপূর্ণ পথ। ধর্মকে সহজ করে ব্যাখ্যা করে ঠেকানোর চেষ্টা করলেন হিন্দু-মুসলিম রায়ট। হিন্দু-মুসলিমের মনোমালিন্য দূর করে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন ভ্রাতৃত্ব। ভারত উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিষবাষ্প অব্যাহত রয়েছে সেটা ধর্মের কারণে নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে; তা ফজলল করিম বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আরো বুঝতে পেরেছিলেন, পৃথিবী থেকে পরান্ন কেড়ে খেতে যারা চায় তারাই দুনিয়াকে অশান্ত রাখতে চায় কৌশলে। এই কৌশলও ধরতে পেরেছিলেন শেখ ফজলল করিম। সেজন্য তিনি হিন্দু-মুসলিমকে এক সুতায় বাঁধতে চেয়েছেন সাহিত্য দিয়ে। অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধে পরিপুষ্ট শেখ ফজলল করিম বোঝাতে চাইলেন, ধর্মের মূলবাণী হচ্ছে শান্তি আনয়ন। সুখের জন্য, শান্তির জন্য, সমৃদ্ধির জন্য ধর্ম, গোত্র, জাত-পাত, উঁচু-নিচুতে সম্প্রীতির যে বিকল্প নেই, সেটি তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ছোটো বয়স থেকেই।
ফজলল করিমের সাহিত্য সাধনার উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা কবিতা, ছড়া কবিতা, গল্প। প্রকৃতির সাথে শিশু-কিশোরের যে চিরন্তন মেলবন্ধন তা তিনি প্রকাশ করলেন ‘গাঁয়ের ডাক’ কবিতায়-
‘ধানের ক্ষেতে বাতাস নেচে যায়
দামাল ছেলের মতো
ডাক দে বলে, আয়রে তোরা আয়
ডাকব তোদের কত।
মুক্ত মাঠের মিষ্টি হাওয়া
জোটে না যা ভাগ্যে পাওয়া
হারাসনে ভাই অবহেলায় রে
দিন যে হলো গত।
ছোট্ট নদী কোন সুদূরে
বক্ষে রজত ধারা
ডাক দে বলে, আয়রে ছুটে আয়
রুগ্ন সাহস হারা।
লাগলে মাথায় বৃষ্টি-বাতাস
উলটে কি যায় সৃষ্টি আকাশ?
রোদের ভয়ে থাকলে শুয়ে রে
নৌকা বাইবে কারা’?

প্রকৃতি কখনই ঘরকুনো ছেলেদের পছন্দ করে না। ধান ক্ষেতে বাতাস নেচে যাওয়াকে কবি দামাল ছেলের সাথে তুলনা করেছেন। প্রকৃতির সাথে দামাল ছেলেদেরই বন্ধুত্ব জমে ওঠে। দামাল ছেলেরাই পারে প্রকৃতিকে সামলে রেখে বিশ্বকে জয় করতে। সে জন্যই কবি সাহস হারা রুগ্ন ছেলেদের ডেকে বললেন-‘লাগলে মাথায় বৃষ্টি বাতাস, উলটে কি যায় সৃষ্টি আকাশ? রোদের ভয়ে থাকলে শুয়ে রে নৌকা বাইবে কারা? ভগ্ন বাঙালি জাতির নৌকা বাইতে প্রকৃতিপ্রেমী সাহসী দামাল ছেলে আজ বেশি প্রয়োজন।
শেখ ফজলল করিমের সাহিত্য পাঠ করলে বোঝা যায়, সাধ্যমতো তিনি জ্ঞানের অনুসন্ধান করেছেন। জ্ঞান চর্চা ছিল তাঁর সাধনা। জ্ঞান যে মানুষকে অজ্ঞতা থেকে বের করে আনে সেটা তিনি ভালোমতো বুঝতেন। জ্ঞান তো আর অন্যকিছু নয়! জানবার ও জানাবার জিনিস মাত্র; উপলব্ধির বিষয়ই হলো জ্ঞান। জানাশোনা বোধসম্পন্ন মানুষকেই মানুষ জ্ঞানী মনে করে। জ্ঞানী মানুষ দরিদ্র হলেও সুখী। শেখ ফজলল করিম জ্ঞানী লোকের মাধ্যমে জ্ঞানকে তুলে ধরলেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি লিখলেন- ‘তুলনায় সমালোচনা’ কবিতা। এ কবিতায় তিনি বললেন-
শতশত ক্রোশ করিয়া ভ্রমণ জ্ঞানীর অন্বেষণে
সহসা একদা পেল সে প্রবীণ কোনো এক মহাজনে
সুধালো হে জ্ঞানী, আকাশের চেয়ে উচ্চতা বেশি কার?
জ্ঞানী বলে বাছা, সত্যের চেয়ে উঁচু নাই কিছু আর।
কহিল আবার, অনলের চেয়ে উত্তাপ বেশি কার?
জ্ঞানী বলে বাছা, ঈর্ষার কছে বহ্নিতাপও ছার।
পুছিল পথিক, বরফের চেয়ে শীতল কি কিছু নাই?
জ্ঞানী বলে, বাছা, স্বজন বিমুখ হৃদয় যে ঠিক তাই।
সুধালো সে জন, সাগর হইতে কে অধিক ধনবান?
জ্ঞানী বলে বাছা, তুষ্ট হৃদয় তারো চেয়ে গরীয়ান।

হৃদয় বড়ো হলে মানুষও বড়ো হয়। অল্পে সন্তুষ্ট হৃদয় ধনীর চেয়েও ধনবান। শেখ ফজলল করিম ধনের দাসত্ব করেননি। তিনি মানবিক প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের শুরুতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা আয়ত্ত করেছিলেন। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা তিনি নিজ হাতে নিজের বাড়িতে বসেই দিতেন। মানুষের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের ঘোর অন্ধকারকে ঠেলে ফেলতে চেয়েছিলেন। সেজন্য চিকিৎসা ও সাহিত্য দুটো নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। বিভিন্ন নামে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস’।
শেখ ফজলল করিম বেঁচে থাকা অবস্থায় সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। পথ ও পাথেয় গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন রৌপ্যপদক। নদীয়া সাহিত্যসভা কবিকে সাহিত্যবিশারদ উপাধিতে ভূষিত করেন। ‘চিন্তার চাষ’ গ্রন্থের জন্য নীতিভূষণ; কাশ্মীর শ্রীভারত ধর্ম মহামণ্ডল তাকে রৌপ্যপদক প্রদান করে। এছাড়াও তিনি কাব্যভূষণ, সাহিত্যরণ, বিদ্যাবিনোদ, কাব্যরত্নাকর ইত্যাদি উপাধিতে সম্মানিত হন।
শেখ ফজলল করিম ১৯৩৬ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। কাকিনা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে কবিকে সমাহিত করা হয়। বাঙালি মুসলিমদের হৃদয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় শেখ ফজলল করিম স্মরণ হতে থাকুক অবিরাম অবিচ্ছিন্নভাবে অবিরল।

SHARE

Leave a Reply