Home দেশ-মহাদেশ অ্যাটলাস পর্বতমালা ও সাহারা মরুভূমির দেশ তিউনিসিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

অ্যাটলাস পর্বতমালা ও সাহারা মরুভূমির দেশ তিউনিসিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

তিউনিসিয়া আফ্রিকার উত্তর উপকূলে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। আরবি ভাষায় দেশটির নামের উচ্চারণ তুনিস। সরকারি নাম তিউনিসিয়া প্রজাতন্ত্র। দেশটির মধ্য দিয়ে অ্যাটলাস পর্বতমালা চলে গেছে এবং দেশটিকে উত্তরের উর্বর সমভূমি ও দক্ষিণের শুষ্ক, উষ্ণ মরুময় অঞ্চলে বিভক্ত করেছে। ধারণা করা হয় যে, তিউনিস নামটি বারবার জাতির ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘শৈলান্তরীপ’ অথবা ‘রাত কাটাবার স্থান’। দেশটির উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত তিউনিস দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
আয়তনের দিক থেকে তিউনিসিয়া অন্যান্য উত্তর আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় খর্বাকৃতির। তিউনিসিয়ার আয়তন এক লাখ ৬৩ হাজার ৬১০ বর্গ কিলোমিটার (৬৩ হাজার ১৭০ বর্গ মাইল) এবং জনসংখ্যা এক কোটি ১৮ লাখ ১১ হাজার ৩৩৫ জন। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে আরব-বারবার ৯৮ শতাংশ, ইউরোপীয় ১ শতাংশ এবং অন্যান্য ১ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ৯৮ শতাংশ এবং খ্রিষ্টান, ইহুদি ও অন্যান্য ২ শতাংশ। এদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তিউনিসীয়দের গড় আয়ু ৭৬.৫৬ বছর : পুরুষ ৭৪.৮৮ এবং নারী ৭৮.৩৬ বছর।
তিউনিসিয়ার সরকারি ভাষা আরবি এবং তিউনিসীয় আরবি তাউনসি নামে পরিচিত। তাউনসি জাতীয় ভাষা এবং জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থানীয় ধরনের আরবি ভাষা। এছাড়া একটি ছোট্ট সংখ্যালঘু গ্রুপ বিভিন্ন বারবার ভাষায় কথা বলে। সেগুলোকে সামষ্টিকভাবে জেবালি বা শেলহা বলা হয়।
সরকারি মর্যাদা না থাকা সত্ত্বেও ফরাসি ভাষা তিউনিসীয় সমাজে প্রধান ভূমিকা রাখে। শিক্ষা (উদাহরণ স্বরূপ, মাধ্যমিক স্কুলের বিজ্ঞান শাস্ত্রগুলোতে নির্দেশিকার ভাষা হিসেবে), সংবাদমাধ্যম ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তিউনিসীয় জনসংখ্যার একটা ছোটো অংশ ইতালীয় ভাষা বোঝে এবং এই ভাষায় কথা বলে। তিউনিসিয়ার দোকান সঙ্কেত, খাদ্য তালিকা ও সড়ক সঙ্কেত আরবি ও ফরাসি উভয় ভাষায় লেখা হয়।
তিউনিসিয়া আফ্রিকার উত্তরতম দেশ। দেশটি উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চলের অংশ এবং এদেশের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে ও পূর্বে ভূমধ্যসাগর, পশ্চিমে আলজেরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বে লিবিয়া। উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত সাহারা মরুভূমি দক্ষিণ তিউনিসিয়া থেকে শুরু হয়েছে। দেশটির ৪৫% ভূমি সাহারা মরুভূমিতে পড়েছে। অন্য কথায়, তিউনিসিয়ার ভূখণ্ডের মধ্যে রয়েছে অ্যাটলাস পর্বতমালার পূর্ব প্রান্ত এবং সাহারা মরুভূমির উত্তর এলাকা। এদেশের অবশিষ্ট ভূমির বেশির ভাগই আবাদযোগ্য। এদেশের এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার (৮১০ মাইল) উপকূল রেখার মধ্যে রয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকার পশ্চিম ও পূর্ব অংশের আফ্রিকান মিলনস্থান। তিউনিসিয়ার মধ্যেই রয়েছে আফ্রিকার সবচেয়ে উত্তরাঞ্চলীয় স্থান কেপ এনজেলা এবং এর রাজধানী ও বৃহত্তম শহর তিউনিস। উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত তিউনিস থেকেই দেশটির নামকরণ করা হয়েছে তিউনিসিয়া।
সামরিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণে অভিলাষী বহু সভ্যতার সাথে তিউনিসিয়ার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এদের মধ্যে আছে ফিনিসীয় জাতি, কার্থেজীয় জাতি, রোমান জাতি, আরব জাতি এবং উসমানীয় তুর্কি জাতি।
একেবারে প্রাচীনকাল থেকে, তিউনিসিয়ায় আদিবাসী বারবাররা বসবাস করতো। ফিনিশীয়রা খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীতে আসতে শুরু করে এবং বেশ কয়েকটি বসতি স্থাপন করে। এগুলোর মধ্যে কার্থেজ খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রধান বণিক সা¤্রাজ্য এবং রোমান প্রজাতন্ত্রের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী কার্থেজকে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৬ সালে রোমানরা পরাজিত করে। রোমানরা পরবর্তী ৮০০ বছরের বেশির ভাগ সময় ধরে তিউনিসিয়া দখল করে রাখে। তারা এখানে খ্রিষ্টধর্ম প্রবর্তন করে এবং আল জেমের অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো কিছু স্থাপত্য নিদর্শন রেখে যায়।
৬৪৭ সালে শুরু করে বেশ কয়েকটি চেষ্টার পর মুসলিমরা ৬৯৭ সালের মধ্যে গোটা তিউনিসিয়া দখল করে নেয় এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ইসলাম ও আরব সংস্কৃতি নিয়ে আসে। উসমানীয় সা¤্রাজ্য ১৫৭৪ সালে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করে। ফরাসিরা ১৮৮১ সালে তিউনিসিয়া দখল করে। এর পর থেকে তিউনিসিয়া ফ্রান্সের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৯৫৬ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। আধুনিক তিউনিসিয়ার স্থপতি হাবিব বোরগুইবা দেশটিকে স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেন এবং ৩০ বছর ধরে দেশটির রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিউনিসিয়া উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বর্তমানে, তিউনিসিয়া উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে ছোটো দেশ।
তিউনিসিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সমন্বয় রক্ষা করে চলে। দেশটি অন্যান্যের মধ্যে জাতিসংঘ, লা ফ্রাংকোফোনি, আরব লিগ, ওআইসি, আফ্রিকান ইউনিয়ন, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, গ্রুপ অব ৭৭ এর সদস্য। কতিপয় ইউরোপীয় দেশ বিশেষ করে ফ্রান্স ও ইতালির সাথে এদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে দেশ দু’টি তিউনিসিয়ার খুব কাছে অবস্থিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে তিউনিসিয়ার সংশ্লিষ্টতা চুক্তি রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ন্যাটো বহির্ভূত মিত্রের সম্পর্ক রয়েছে।
বর্তমানে তিউনিসিয়া পর্যটকদের একটি জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। এর রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া, নয়নাভিরাম বেলাভূমি, বিচিত্র ভূ-প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, সাহারার মরূদ্যান এবং সুরক্ষিত প্রাচীন রোমান প্রত্নস্থলগুলি বিখ্যাত। তিউনিসিয়ার পর্যটন আকর্ষণগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে এর বিশ্বজনীন রাজধানী নগরী তিউনিস, কার্থেজের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ সমূহ, জেরবার মুসলিম ও ইহুদি কোয়ার্টার এবং মোনাস্তিরের বাইরে উপকূলীয় অবকাশ কেন্দ্রগুলো।
উত্তর আফ্রিকার একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ তিউনিসিয়া ২৪টি গভর্নরেটে (উইলায়েত) বিভক্ত। দেশটিতে মোট ২৬৪টি জেলা (মুতামাদিয়াত) রয়েছে যেগুলো আবার বিভিন্ন পৌরসভা (বালাদিয়াত) এবং সেক্টরে (ইমাদাত) বিভক্ত। তিউনিসিয়ায় একক, আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ গত ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হিশেম মেচিচিকে তার ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেন। পার্লামেন্টের নাম গণপ্রতিনিধি পরিষদ। সদস্য সংখ্যা ২১৭। এদেশে শতাধিক বৈধ রাজনৈতিক দল রয়েছে।
তিউনিসিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপিয়ান নাইরোবহুড পলিসির (ইএনপি) অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তার প্রতিবেশীদের কাছাকাছি আনার লক্ষ্যে ঐ পলিসি তৈরি করা হয়েছে।
তিউনিসিয়ার আইন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ফরাসি দেওয়ানি আইন দ্বারা প্রভাবিত, তবে ব্যক্তিগত মর্যাদার আইন ইসলামী আইনভিত্তিক।
তিউনিসিয়া উত্তর আফ্রিকা, আটলান্টিক মহাসাগরের নীল নদের বদ্বীপ এবং ভূমধ্য উপকূলের মধ্যে অবস্থিত।
তিউনিসিয়ার আবহাওয়া উত্তরে ভূমধ্যসাগরীয় অর্থাৎ নাতিশীতোষ্ণ। শীতকালে হালকা বৃষ্টি হয় এবং গ্রীষ্মকাল গরম ও শুষ্ক। দেশটির দক্ষিণে রয়েছে মরুভূমি। উত্তরের ভূমি পর্বতময় যা দক্ষিণে এগিয়ে গিয়ে গরম, শুষ্ক মধ্যঞ্চলীয় সমভূমির দিকে পথ করে দিয়েছে। দক্ষিণ অঞ্চল আধা-উষর এবং সাহারা মরুভূমির সাথে মিশে গেছে। চট বা শাট নামে পরিচিত বেশ কয়েকটি লোনা পানির হ্রদ সাহারার উত্তর প্রান্তে পূর্ব-পশ্চিম রেখায় অবস্থিত যা গেবস উপসাগর থেকে আলজেরিয়ার মধ্যে বিস্তৃত। এদেশের সবচেয়ে নিচুতম স্থান হচ্ছে চট আল ডজেরিট সমুদ্র স্তর থেকে ১৭ মিটার (৫৬ ফুট) নিচে অবস্থিত এবং সবচেয়ে উচ্চতম স্থান জেবেল এচ চামবি যার উচ্চতা ১,৫৪৪ মিটার (৫,০৬৬ ফুট)।
তিউনিসিয়ায় পাঁচটি স্থলীয় বনাঞ্চল রয়েছে। সেগুলো হলো ভূমধ্যসাগরীয় মোচাকৃতির ও মিশ্র বন, সাহারান হ্যালোফাইটিকস, ভূমধ্যসাগরীয় শুষ্ক বনভূমি ও তৃণময় বৃক্ষহীন প্রান্তর, ভূমধ্যসাগরীয় বনভূমি ও জঙ্গল এবং উত্তর সাহারান শুষ্ক, তৃণময় ও বৃক্ষহীন প্রান্তর ও বনভূমি।
তিউনিসিয়া একটি বহুমুখী ও রফতানিমুখী অর্থনীতির দেশ। কৃষি, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য থেকে পর্যটন পর্যন্ত এদেশের অর্থনীতি বিস্তৃত। শিল্প খাতের মধ্যে রয়েছে প্রধানত পোশাক তৈরি, পাদুকা তৈরি, গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উৎপাদন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তিউনিসিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে আছে। তিউনিসিয়ার মোট আমদানির ৭২.৫ শতাংশ এবং রফতানির ৭৫ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে হয়ে থাকে। তিউনিসিয়া হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক অংশীদার। এছাড়াও তিউনিসিয়া ইইউয়ের সাথে অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রথম ভূমধ্যসাগরীয় দেশ। এদেশের মুদ্রার নাম তিউনিসীয় দিনার (টিএনডি)।
ফুটবল তিউনিসিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ‘দ্য ঈগলস অব কার্থেজ’ নামেও পরিচিত তিউনিসিয়ার জাতীয় ফুটবল দল ২০০৪ সালের আফ্রিকান ন্যাশন্স কাপ জয় করে, যা তিউনিসিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। তারা জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৫ সালের ফিফা কনফেডারেশনস কাপে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু তারা প্রথম পর্বই অতিক্রম করতে পারেনি।
তিউনিসিয়ার পুরুষ জাতীয় হ্যান্ডবল দল বেশ কয়েকটি হ্যান্ডবল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করে। ২০০৫ সালে তিউনিসিয়া চতুর্থ হয়। সবচেয়ে বিখ্যাত তিউনিসীয় হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হলেন উইসেম হমাম। ২০০৫ সালে তিনি টুর্নামেন্টের শীর্ষ গোলদাতার মর্যাদা লাভ করেন। তিউনিসীয় জাতীয় হ্যান্ডবল দল ১০ বার আফ্রিকান কাপ জয় করে। তিউনিসীয়রা গ্যাবনে মিসরকে পরাজিত করে ২০১৮ সালের আফ্রিকান কাপ জয় করেন।
তিউনিসিয়ার জাতীয় বাস্কেটবল দল আফ্রিকার শীর্ষ পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দলটি ২০১১ সালের আফ্রোবাস্কেট জয় করে এবং ১৯৬৫, ১৯৮৭ ও ২০১৫ সালে আফ্রিকার শীর্ষ বাস্কেটবল খেলাগুলোর আয়োজন করে। বক্সিংয়ে, ভিক্টর পেরেজ (“ইয়াং”) ফ্লাইওয়েট ওজন শ্রেণিতে ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন।

SHARE

Leave a Reply