Home ধারাবাহিক উপন্যাস গহিন বনের অবাক রাজ্যে -মুহাম্মাদ দারিন

গহিন বনের অবাক রাজ্যে -মুহাম্মাদ দারিন

[গত সংখ্যার পর]

নীলদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় সাবিতের। মড়ার মতো পড়ে থাকে ও। এক সময় লম্বা চিকন জন্তুটা সাবিত যে ডালে আঙ্গুর ঝুলিয়ে রেখেছে সেখানে গিয়ে থামে। তারপর ডাল পেঁচিয়ে আঙ্গুরে মুখ বাড়িয়ে দেয় ওটা।
সাবিতের ঘোর কাটতেই পাশে রাখা লাঠিটা হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে। তারপর নিঃশব্দে মাজার বাঁধন ছিঁড়ে সজোরে বাড়ি মারে ওটাকে। নিচে ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে ঝপাৎ করে একটা শব্দ হয়। আর আঙ্গুরগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এদিক সেদিকে।
আর এক মুহূর্ত এ গাছে নয়। সাপটা নাও মরতে পারে। কিংবা ওর জোর থাকতে পারে। এসে একটা ছোবল দিলেই কেল্লা ফতে।
ও যে গাছে রয়েছে সেটার গোড়ায় পড়েছে সাপটা। অন্য একটা গাছের ডাল রয়েছে ফুট দুয়েক দূরে। সেটাই ধরে নিচে নামার সিদ্ধান্ত নিলো ও।
গাছ থেকে নেমে অনুমানের ওপর নির্ভর করে পূর্বদিকে চলল ও। কারণ পূর্বদিকে সূর্য আগে উঠবে। লাঠিটা তখনও ওর হাতে ধরা ছিল। ওটার দিকে তাকিয়ে সমস্ত শরীর ঘৃণায় ঘিন ঘিন করে উঠলো। পেট মোচড় দিয়ে নাড়ি-ভুঁড়ি সব বের হতে চাইলো। টান দিয়ে ফেলে দিল লাঠিটা। ওটা দিয়ে সে সাপ মেরেছে বলেই ঘৃণায় এমন হচ্ছে। কাজেই ওটা আর রাখা চলবে না।
সাপটা কিছু আগে পাখিটার ডিম অথবা বাচ্চা খেয়েছে এটাই সাবিতের অনুমান। তাই করুণ সুরে ডাকছিল।
পেছনের পকেট থেকে ছুরিটা বের করে বাট থেকে ফলা মেলে ডান হতে শক্ত করে ধরে বা হাত দিয়ে ঝোপ-ঝাড় লতা-পাতা সরতে সরাতে এগিয়ে চলে সাবিত।
রাতের আঁধারে খান খান করে তখন ওর কণ্ঠে বাজছে:
‘আঁধারকে মাড়িয়ে নতুন সূর্য আনবো।
প্রভাতের আলো দিয়ে বনটাকে রাঙাবো।
গাইবে পাখি, হাসবে ফুল, ফুটবে নতুন কুড়ি
নতুন প্রভাত এলে পরে থাকবে নাতো জুড়ি।’

চার.

রাতের বাকি অংশে আর কোন অসুবিধা হয়নি। তবে সকাল যে কখন হয়েছে সেটা সাবিত জানতো না, যদি না পাখিরা ডাকতো।
এক গাছের তলে বসে আছে সাবিত। পেটে ক্ষুধার আগুন। ইতোমধ্যে আর এটা লাঠি বানিয়েছে। সেটা পাশে পড়ে আছে।
পায়ের যা অবস্থা তাতে আর এক পাও হাঁটতে পারবে না। সমস্ত গিরায় গিরায় ব্যথা।
চোখ তার চারিদিকে ঘুরছে। যদি কোন ফলের সন্ধান মেলে। কিন্তু না! হতাশ হতে হলো ওকে। ক্লান্ত শরীরে সে ওখানেই শুয়ে পড়ল। হারিয়ে গেল ঘুমের মাঝে। ঘুম ভাঙলো দুটো শালিকের ঝগড়ায়। ও দুটো গাছের ডালে বসে ঝগড়া করছে।
উঠে বসতেই পেট সঙ্কেত দিলো তাতে কিছু না দিলে সে এখান হতে উঠতে পারবে না। ভাবটা এমন, সামনে যা পাও তাই খাও।
সত্যি সত্যি ও হাত বাড়ালো গাছের গোড়ায় গাছ বেয়ে উঠে যাওয়া লতা-পাতার দিকে। ছিঁড়ে আনলো লতা-পাতা আর শিমের মতে চিকন ফল। মুখে পুরতে যাবে এমন সময় সে চিনলো লতা গাছটাকে। আরে এটাতো শাক আলু গাছ। এই লতার গোড়ায় অর্থাৎ মাটির নিচে আলু হয়। মামা বাড়ি সে কত তুলে খেয়েছে এই আলু।

কিন্তু আলু তুলবে কেমন করে? ছুরির ফলা অত বড়ো নয়, যে মাটি খুঁড়ে তোলা যাবে।
মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল সাবিতের। লাঠির এক মাথায় সে শাবলের মুখের মতো চেপ্টা করে নিলো ছুরি দিয়ে। তারপর শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে গাছের গোড়ায় নিয়ে গেল।
তুলতে আরম্ভ করল আলু। কিন্তু তর সইছে না। যেটা তুলছে সেটাই মাটি ঝেড়ে খোসা ছাড়িয়ে খাচ্ছে ও। এক সময় সমাপ্তি ঘোষণা করলো পেট। কারণ সবকিছুরই শেষ আছে। খাওয়া থামালো তবু আলু তোলা থামালো না সাবিত।
এক কেজির মতো তোলা হয়েছে, তখন খেয়াল করল পিছনে হিস হিস শব্দ হচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে ওর চোখ ছানাবড়া। তিন চার হাত লম্বা ডোরাকাটা একটা সাপ ফনা তুলে আছে। সাপটা ওর থেকে চার/পাঁচ হাত পেছনে।
কাল যেটা মেরেছিল হয় সেটা বেঁচে গেছে, না হয় তার জোড়া। হয়তো পতিশোধ নিতে এসেছে। এটা সাবিতের অনুমান।
লাঠিটা আবার নষ্ট করতে চাইলো না। তাই হাতে যে একদলা মাটি ছিল তা ছুড়ে মারলো সাপটার মাথা লক্ষ করে। নিখুঁত নিশানা। মাথায় লেগেছে। তবে সাপটার বিশেষ কিছু হয়নি। শুধু ফণাটা একবার নামিয়ে আবার উঠালো।
শেষ পর্যন্ত সাবিত লাঠিটা হাতে তুলে নিলো। সাথে সাথে লক্ষ গেল পাশে পড়ে থাকা একখণ্ড শুকনো ডালের ওপর। নিজের লাঠি ফেলে পড়ে থাকা শুকনো ডালটা হতে নিলো ও।

সাপটা ইতোমধ্যে তার এক হাত সীমানার মধ্যে চলে এসেছে। সজোরে বাড়ি মারলো ওঁর মাজায়। মাজাটা থেঁতলে গেল। আর এগুতে পারল না। ফণা মুহূর্তে একবার নামিয়ে আবার উঠালো সাপ। দ্বিতীয় বাড়ি মাথা লক্ষ্য করে মারলো। সমস্ত শরীর স্থির হয়ে গেল সাপটার কিন্তু লেজটা নড়তে লাগলো। লেজে আর একটা বাড়ি মারলো ও। অমনি লেজ নড়া বেড়ে গেল।
হাতের লাঠিটা সাপটার ওপর ফেলে নিজের লাঠি আর আলুগুলো নিয়ে রওয়ানা হলো সাবিত। সত্যি রাখে আল্লাহ মারে কে? দু’বার সাপের কবলে পড়লো ও। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
এক সময় ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিলো শালগাছের ছায়ায় সবুজ ঘারের ওপর। সবেমাত্র তন্দ্রা এসেছে এমন সময় লাল, নীল, সবুজসহ আরও অনেক রং ওয়ালা একটি পাখি এসে বসলো শাল গাছের ডালে।
পাখিটা দেখে মনে হচ্ছে কোন আনাড়ি শিল্পী যেন আনাড়িভাবে রং বুলিয়েছে পাখিটার গায়ে। রং যায় হোক দেখতে অপরূপ সুন্দর পাখিটা।
পাখিটা হঠাৎ মানুষের ভাষায় কথা বলে উঠলো।
সাবিততো অবাক।

পাখিটা তাকেই লক্ষ্য করে বলেছে, ‘কেমন আছ ছোট্ট খোকা?’
নিজেকে পাখির মুখে ছোট্ট খোকা শুনে রাগ হয়ে গেল ওর। রাগত স্বরে ও বলল, ‘আমি এখন আর ছোট্ট আছি নাকি হে? জান আমি এখন কীসে পড়ি?’
‘জানি। তুমি ক্লাস সিক্সে পড়তে তবে এখন আর পড় না। কারণ তুমি আজ বেশ ক’দিন হলো বনে এসেছো।’
‘তুমি এত কিছু জান?’ কৌতূহলী হয়ে বলল সাবিত।
‘শুধু তাই নয়? আরও জানি তুমি সাবিত।’
‘আমার নামও তুমি জান!’
‘হ্যাঁ আরও কিছু জানি।’
‘কী জান?’
‘তুমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছো।’
‘দেখ, তুমি ঐ পালানো কথাটা আর বলবে না। যদি বলো তাহলে আমার এই লাঠি দেখেছো তো। এটা দিয়ে তোমার একটা ঠ্যাং ভেঙে দেব।’ লাঠি দেখিয়ে বলে সাবিত।
‘তুমি আমাকে মারত পারবে না।’ বলে পাখিটা।
‘কেন?’
‘তুমি মারতে আসলেই আমি উড়ে যাব।’ বলল পাখিটা।
‘তুমি কী করে ভাবলে যে তোমার মত ক্ষুদ্র পাখিকে আমি মারতে যাব?’ চোখ বন্ধ করে বলে সাবিত।
‘সেটাও জানি। তুমি খুব ভালো। পাখিদের তুমি খুব ভালোবাস।’
‘আচ্ছা তুমি আমার সম্পর্কে আর কী কী জান?’ জানতে চায় সাবিত।
‘জানি তুমি রাগ করে বাড়ি থেকে এসেছো। তোমার মা তোমার জন্য খুব কাঁদছেন।’
অমনি সাবিতের মনটা যেন কেমন হয়ে গেল। মনের পর্দায় ভেসে উঠলো মায়ের মুখ। বেশ ক’দিন সে মাকে দেখেনি। তার আদরও পায়নি। সাবিত আস্তে আস্তে বলে, ‘আমার মা আমাকে কি কিছু বলছেন।’
‘হ্যাঁ বলেছেন। বলেছেন, সাবিত তুমি ফিরে এসো। আমি আর কখনও তোমাকে বকবো না।’
‘আম্মু কি আমার জন্য খুব কাঁদছেন।’ মন মরা হয়ে জানতে চায় সাবিত।
‘হ্যাঁ।’
কিছুক্ষণ নীরব থাকে দু’জন।
পাখিটা আবার বলে ওঠে, ‘ওহে ঘর পালানো ছেলে। বাড়ি চলে যাও।’
মুহূর্তের মধ্যে সাবিতের মাথায় রাগ চড়ে গেল। লাঠিটা হাতে নিয়ে উঠে বসে বলল, ‘ওরে শয়তান পাখি, তুই আমাকে উপদেশ দিতে এসেছিস? দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা।’
অমনি পাখিটা ফুড়–ত করে উড়ে বনের মধ্যে হারিয়ে গেল। সাবিত ভাবতে বসলো, এভাবে বনের মধ্যে ঘুরে বেড়ালে তো আর চলবে না। তাকে একটা আশ্রয়ের স্থান যোগাড় করতে হবে। বর্তমানে সে বনের যে স্থানে আছে সেখানে সূর্যের আলো পুরোপুরি মাটি পর্যন্ত এসে পৌঁছে না। তাকে এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে সূর্যের আলো ঠিকমত আছে। খাদ্যের উৎস এবং পানির উৎস আছে।

সাবিত উঠে হাঁটা ধরলো। কিছুদূর এসেছে এমন সময় বানরের বাচ্চার চিঁ চিঁ চিঁ শব্দ তার কানে গেল। সে এই শব্দ চিড়িয়াখানায় বহু শুনেছে।
শব্দটা হচ্ছে ডান দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে। ছুটলো শব্দ লক্ষ্য করে সাবিত। ছোটা বলা যাবে না কারণ বন যেভাবে তাতে ছোটাতো দূরে থাক জোরে হাঁটাও যাচ্ছে না।
যাই হোক এক সময় সে পৌঁছলো শব্দের উৎসে। মাটি থেকে তিন/চার ফুট ওপরে গাছের দো ডালে একটা বানরের বাচ্চার পা আটকে যাওয়ায় ডাকছে। আশপাশে অন্য কোন বানর নেই।
সাবিত গাছের দুই ডালের ফাঁক থেকে বাচ্চাটাকে ছাড়িয়ে এনে মাটিতে ছেড়ে দিলো। যে পাটা আটকে ছিল ওটা মাটিতে পাততে পারছে না। পাটা ফুলে গেছে। সাবিত আবার ওকে কোলে তুলে নিলো। হাত দিয়ে ব্যথাওয়ালা পাটা ম্যাসেজ করে দিলো।

আবার হাঁটাতে লাগলো পূর্বদিকে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে। লাঠিতে ঝুলানো আলু নিজে খেল এবং বাচ্চাটাকেও খাওয়ালো। বিরাট এক জারুল গাছের কাছে আসতেই বড়ো এক মেয়ে বানর দাঁত মুখ খিঁচিয়ে সাবিতের দিকে তেড়ে এলো। ওর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এটা বাচ্চা বানরের মা। তাই বাচ্চাটাকে কোলে থেকে নামিয়ে দিলো।
বাচ্চাটা কিচির কিচির করতে করতে মায়ের কাছে দৌড়ে গেল। মা বানরটা বাচ্চাকে কোলে তুলে নিলো। কিন্তু মুহূর্তে বাচ্চাটাকে নামিয়ে দিয়ে পূর্বে অগ্নিমূর্তি নিয়ে তেড়ে এলো সাবিতের দিকে।
বানরকে মারার ইচ্ছা সাবিতের নেই। কিন্তু বানরটা যেভাবে এগিয়ে আসছে তাতে আত্মরক্ষার জন্য লাঠি হাতে সাবিত প্রস্তুত হলো।
সাবিতের চার/পাঁচ ফুটের মধ্যে এসেছে বানরটা। অমনি বাচ্চাটা কিচির কিচির করতে করতে মায়ের সামনে এসে চিঁ চিঁ চিঁ করে কী যেন বলল এবং ব্যথা পা ও পেট দেখালো।
ধীরে ধীরে মা বানরটার অগ্নিমূর্তি কমে এলো। তারপর বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। বাচ্চাটা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। সাবিত দুটো শাকআলু ছুঁড়ে দিল মা বানরটাকে লক্ষ্য করে। মা বানর ও দুটোকে লুফে নিয়ে বাচ্চাটাকে বুকের সাথে ধরে লাফ মেরে গাছে উঠে লাফিয়ে লাফিয়ে এগাছ থেকে ওগাছে করে এক সময় হারিয়ে গেল বনের মধ্যে।

পাঁচ.

পরবর্তী দুই দিন ভালোভাবে কাটে। সাবিত এখন বনের এমন এক জায়গায় আছে যেখানে সূর্যের আলো মোটামুটি আছে। আশপাশে ছোটখাটো একটা আঙ্গুর বাগান আর চারপাশে আছে প্রচুর শাকআলুর গাছ।
সাবিত গাছে একটা মাচা তৈরি করেছে। দুটো গাছের ডাল এমনভাবে মিশে আছে যে সাবিত একটু একটু করে সহজে মাচা তৈরি করেছে। অন্য গাছের ডাল কেটে লতা দিয়ে বেঁধেছে। এখানে এখন একজন মানুষ অনায়াসে শোয়া যাবে। মাচার দু’পাশে ডাল দিয়ে এবং লতা দিয়ে রেলিং মতো তৈরি করেছে। যাতে ঘুমের মাঝে পড়ে না যায়।
সাবিতের মাচার থেকে দক্ষিণ দিকে একশ গজ দূরে একটা ডোবা আছে। পানি কাচের মতো স্বচ্ছ পরিষ্কার। ডোবার পূর্বদিকে একটা সরু নালা চলে গেছে বহুদূরে। হয়তো কোন নদী বা ঝরনার সাথে মিলিত হয়েছে গিয়ে।
সাবিতের পরনে এখন লতাপাতা দিয়ে তৈরি প্যান্ট, যা হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে আছে। সাবিত জামাটা খুলে ফেলল। তাকালো একবার নিজের দিকে। পরক্ষণে পা থেকে জুতো খুলল। এবার তাকে আফ্রিকা মহাদেশের কোন জংলির মতো লাগছে।
কী মনে করে সাবিত জুতো জোড়া ফেলে দিল পাশের ঝোপে। তারপর জামা ও প্যান্ট নিয়ে বন্য পোশাক পরা অবস্থায় চলল ডোবাটার দিকে। এখন সাবিতকে যদি কেউ দেখে তাহলে ভাববে ও একজন জংলি।
সাবিত ডোবার একপাশে ঘাট মতো জায়গা দেখে হাঁটু পানিতে নেমে জামা-প্যান্ট ধুয়ে রোদ দেখে বিছিয়ে দিল সবুজ ঘাসের ওপর শুকাতে।
আবার এগিয়ে গেল ডোবার দিকে। আগের জায়গা দিয়ে নেমে পড়লো পানিতে। বুক পানিতে গিয়ে থামলো। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ডুব দিয়ে, পাত-পা চালিয়ে সাঁতার কাটলো সাবিত। আজ অনেক দিন সে গোসল করেনি। তাই তৃপ্তির সাথে গোসল করে উঠে এলো ভাঙায়। এগুলো জামা-প্যান্টের দিকে।
কিন্তু একি?
জামা-প্যান্ট হওয়া? আরে এখানেইতো রেখেছিল সাবিত।
নিল কে? বাতাসে?
নাহ! বাতাসতো অত জোরে বয়নি। তাহলে?
ঠিক তখন পাশের কড়ইগাছ থেকে চিঁ চিঁ করে ডেকে উঠলো একটা বানরের বাচ্চা। সাবিত তাকিয়ে দেখলো সেই বাচ্চাটা। তার মায়ের গলা ধরে ঝুলে আছে। তার আশপাশে রয়েছে আরও তিনটা বানর। গাছের বিভিন্ন ডালে। ওদের মধ্যে একটার পরনে সাবিতের প্যান্ট আর একটার গায়ে জামা।
সাবিত পড়ল মহাবিপদে। কী করে এখন সে জামা-প্যান্ট উদ্ধার করবে?
হাতের ইশারায় সাবিত জামা-প্যান্ট চাইলো। কিন্তু বানরগুলো তো দিলই না, বরং সাবিত যেভাবে হাত নেড়েছিল ঠিক সেইভাবে ওরাও হাত নেড়ে ওর সাথে যেন ঠাট্টা করলো। তবে বাচ্চাসহ মা বানরটা কিন্তু তা করেনি।
সাবিতের তখন মনে পড়ল বানররা অনুকরণ করতে ভালোবাসে। সেই টুপি ওয়ালার গল্প ওর হৃদয়পটে ভেসে উঠলো। তাই সে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখলো কেউ আছে কি না? যদিও সাবিত ভালো করেই জানে এই গহিন বনে কোন মানুষ নেই। তবুও একবার দেখে নিল মনের সান্ত¡নার জন্য। তারপর ঝটপট করে জংলি প্যান্টটা খুলে ফেললো। বেরিয়ে পড়লো তার জন্ম পোশাক। আর দেরি না করে ওটা ছুড়ে দিলো সবুজ ঘাসের ওপর।
ঠিক একই কাজ করল বানর দুইটা। ওরাও ওর জামা-প্যান্ট খুলে ঘাসের ওপর ছুড়ে দিলো। সাবিত তাড়াতাড়ি গিয়ে জংলি প্যান্টটা আবার পরল। আর বানরের ফেলে দেওয়া জামা-প্যান্ট নিয়ে চললো ডোবার দিকে। আবার ধুবে এগুলো। বানর পরেছে। কাজেই না ধুয়ে আর পরা যাবে না।
জামা-প্যান্ট কচলে কচলে ধুতে ধুতে সাবিত বাচ্চাটার সেই চিঁ চিঁ ডাক শুনতে পেল। যেন বাচ্চাটা বলছে, যাই হে বন্ধু।
সাবিত পিছে তাকালো, দেখলো বানরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে বনের মাঝে।
ও এবার জামা প্যান্ট ধুয়ে একটা শক্ত লতা দিয়ে বেঁধে গাছের ডালে নেড়ে দিল। যাতে বানর নাগাল পেলেও আর পরতে না পারে।
তারপর পাশের ঝোপ থেকে কিছু শাকআলু তুলে মাচার ওপর এসে বসে। আলুগুলো খেয়ে শরীরটাকে এলিয়ে দেয় মাচার ওপর।
এক সময় দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়। বানরের বাচ্চার চিঁ চিঁ ডাকে ঘুম ভেঙে যায় সাবিতের। উঠে দেখে সেই বাচ্চাটা পায়ের কাছে বসে ডাকছে। যেন তার সাথে অনন্তকালের পরিচয় সাবিতের।
সাবিত গাছ থেকে নামে। বাচ্চাটাও নামে। তারপর ও বাচ্চাটার হাত ধরে উত্তর দিকে হাঁটা ধরে। উদ্দেশ্য উত্তর দিকটা একটু দেখা। ওর এক হাতে লাঠি অন্য হাতে ধরা বানরের বাচ্চা, যেন কোন আদিবাসী হেঁটে চলেছে বনের ভিতর দিয়ে পোষা বানর নিয়ে।
বেশ কিছু দূর চলে এসেছে ওরা। সামনে এখন মানুষসমান উঁচু ঘাস। তার ওপাশে কিছু ফাঁকা জায়গা। তার ওপাশে একটা আপেলের মতো গাছ। যে ফল সাবিত বনে এসে প্রথম খেয়েছিল।
বানরের বাচ্চাটাকে একটা গাছের ছায়ায় রেখে তার হাতে লাঠিটা দিয়ে সাবিত চলল ঘাস মাড়িয়ে গাছটার দিকে। অনেক কষ্টে ঘাস মাড়িয়ে যেই ফাঁকা জায়গায় পা দিয়েছে অমনি ঘটল আর এক বিপত্তি।
এই বালি মতো ফাঁকা জায়গাটা চোরা কাদা। সাবিত ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। হাচড়-পাচড় করে উঠতে চেষ্টা করল ও। কিন্তু লাভ তো হলো না। হলো উল্টা। আরো বেশি ডেবে যাচ্ছে এখন।
সাবিতের মাথার দশ ফুট মতো ওপরে একটা গাছের ডালে রয়েছে। ওদিকে তাকালো। কিন্তু তাকানোই সার। এটা ধরা এখন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার সমান। কারণ ওটা যে নাগালের বাইরে।
সাবিত বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার দিলো। ও জানে এই বনে এই চিৎকার আর সমুদ্রের তলে চিৎকার একই কথা। গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে। হাত দুটো ওপরে তুলে ও চিৎকার করেই যাচ্ছে।
বানরের বাচ্চাটাও চিৎকারে করছে চিঁ চিঁ করে বন্ধুর চিৎকার শুনে।
ইতোমধ্যে নাক পর্যন্ত ডুবে গেছে ও। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ মাথার ওপরের ডালটাই ঝপ ঝপ শব্দ হলো। ও দেখলো চারটা বানর একে অন্যের পা ধরে শিকল তৈরি করে নিচে ঝুলে পড়েছে। সবচেয়ে নিচে আছে ঐ বাচ্চা বানরটার মা। তার হাতে সাবিতের লাঠি।
লাঠিটা সাবিতের মাথা লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। চোখ বন্ধ করে সাবিত দু’হাত উঁচু করে লাঠির আঘাত ঠেকাতে প্রস্তুত হয়ে থাকলো।

ছয়.

বাচ্চা বানরের ডাক শুনে ছুটে এলো তার মা। বাচ্চা তার মাকে কিচির কিচির করে কী জানি বলল। অমনি মা বানরটাও চিঁ চিঁ করে ডাল ছাড়লো। বন থেকে বেরিয়ে এলো আরো তিনটা বানর।
মা বানর বাচ্চার হাত থেকে লাঠি নিয়ে ছুটল সাবিতের মাথার ওপরের গাছের দিকে। অন্য তিন বানরও তাকে অনুসরণ করলো। শক্তিশালী বানরটা সাবিতের মাথার ওপরের ডালে জুতসই্ একটা ডালের খাঁজে বসে ওদের এক বানরের পা ধরল, সে ধরল আর একটার। তারপর তৃতীয় বানরটা ধরল মা বানরের পা।
মা বানর হাতে লাঠিটা শক্ত করে ধরল। তারপর ঝপ করে শিকলের মতো চার বানর ঝুলে পড়লো সাবিতের মাথার ওপর।
মা বানরটা যেন আগে থেকেই মেপে নিয়েছিল যে, গাছ থেকে ঝুলে তারা চারজন সাবিতের নাগাল পাবে না। তাই লাঠিটাও সাথে নিয়েছে।
সাবিতের মাথার ওপর লাঠি ঝুলিয়ে ধরলো মা বানরটি।
সাবিত ভাবলো আর বুঝি রক্ষা নেই। বানরের হাতেই শেষ পর্যন্ত মার খেতে হবে। ওদের মার খেয়ে আর কাদায় ডুবে শেষ পর্যন্ত মরতে হবে?
যা থাকে কপালে মনে করে সাবিত তার মাথা লক্ষ্য করে এগিয়ে আসা লাঠি দু’হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। মরলে মরবে কাদায় ডুবে। বানরের মার খেয়ে নয়।
মা বানর গাল দিয়ে কিঁচির শব্দ করতেই ডালে বসা তাজা বানরটা হ্যাচকা টান দিলো পা ধরা বানরটিকে। সে টান দিলে অপরটিকে। সে দিলো মা বানরটিকে। মা বানর টান দিলো লাঠি ধরা সাবিতকে। ফলে সকলে এসে পড়ল গালিচার মত করে বিছানো বড়ো বড়ো সবুজ ঘাসের ওপর। কারোর ব্যথা লাগলো না ঘাসের কারণে।
লাঠি ধরেই সাবিত ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল। তাই এখন কী হচ্ছে তা ও জানে না।
চার বানর তাকে ঘাসের ওপর দিয়ে চার হাত-পা ধরে টেনে নিয়ে এলো বাচ্চাটা যেখানে বসেছিল সেখানে।
মা বানরটা বসলো সাবিতের মাথার কাছে। আর বাকিরা ছুটলো ডোবা লক্ষ্য করে। কিছু পরে তিন বানর হাতের কোষ পুরে পানি এনে সাবিতের মাথায় দিল আর চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলো। জন্তুগুলো জানে কীভাবে জ্ঞানহারার জ্ঞান ফিরাতে হয়। তাই ওদেরকে কেউ এগুলা বলেনি। ওরা নিজের থেকেই করেছে।
অল্প পরে সাবিত চোখ খুললো। দেখলো বানরগুলো তাকে ঘিরে বসে আছে। সে উঠে বসল। মনে পড়লো লাঠি ধরেই ও জ্ঞান হারিয়ে ছিল। তাহলে ও বেঁচে আছে? বানরগুলো ওকে মারেনি! ও একে একে বানরগুলো মুখের দিকে তাকালো। সকলের চোখে চিন্তার ছাপ।
সাবিত চোখ মেলতেই মা বানরটা চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা শব্দ করে ছাড়লো। ওমনি বাকি বানরগুলোর মুখে খুশির ঝিলিক দেখলো সাবিত।
সাবিত বুঝলো ওরা উপকারের প্রতিদান দিতে জানে। তাই ওরা ওকে চোরা কাদা থেকে উদ্ধার করেছে। মনে মনে ওদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো সাবিত।
একপশলা বাতাস বয়ে গেল। সমস্ত শরীরে হাওয়া লাগলো সাবিতের। পরনের দিকে চোখ যেতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ওর। পরনে তার জন্মের পোশাক। জংলি প্যান্টটা চোরাকাদায় থেকে গেছে মনে হচ্ছে। পাঁচ বানরের সামনে সাবিতের লজ্জা করছে। মা বানর সেটা আঁচ করতে পেরেই ছুটলো সাবিত যেখানে জামা-প্যান্ট নেড়ে দিয়েছিল সেদিকে। হাফ মিনিট পরে হাজির হলো লতা দিয়ে বাঁধা জামা প্যান্ট নিয়ে।
সাবিত ওগুলো পরল। তারপর তাকালো ঐ আপেলের মতো গাছটার দিকে।
কিন্তু একি! অন্য তিন বানরতো ঐ গাছটিতে দিব্বি ঝুলছে। আসলে কখন যে ওরা ওখানে গেছে সাবিত তা খেয়ালই করেনি। সাবিতের পাশে ছোট একটা শুকনো ডাল পড়ে ছিল। সেটা তুলে ঐ তিন বানরকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। অমনি বানর তিনটিও পাল্টা জবাব দিল হাতের ফল দিয়ে অর্থাৎ ফলগুলো ছুঁড়ে মেরে। ও ওগুলো সাথে নিলো খাওয়ার জন্য।
সাবিত ওখান থেকে ফিরে আগের সেই ডোবায় আবার ভালোভাবে গোসল করলো।
পরবর্তী তিনদিন ভালোভাবে কেটেছে। ঐ চোরাবালির দিকে আর ফিরেও তাকায়নি সাবিত।
সূর্যটা এখন পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নামবে সন্ধ্যা। তাই সাবিত রাতে খাওয়ার জন্য কিছু শাকআলু তুলছে। এক সময় শাকআলু তোলা হলে মাচায় উঠে বসে। খেতে আরম্ভ করে।
এদিকে গুড় গুড় শব্দে মেঘ ডেকে ওঠে। সাবিত তাকায় আকাশের দিকে। চারিদিক ঘনকালো মেঘে ছেয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নামলো সন্ধ্যা। তবে অন্যদিনের তুলনায় একটু আগে। মেঘলা আকাশ নিয়ে সন্ধ্যা যেন বরাবরই আগে ভাগে আসে।
ঝুপ ঝুপ শব্দে শুরু হলো বৃষ্টি। প্রথমে গুঁড়ি গুঁড়ি তারপর তুমুল বেগে বৃষ্টি। সেই সাথে চলছে মেঘের গর্জন আর বিদ্যুৎ চমক। ভিজে চুপসে গেল সাবিত।
এক নাগাড়ে হয়েই চলেছে বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণ নেই। অনবরত বাজ পড়ছে আশপাশের গাছ-পালার ওপর। সাবিতের কাঁপুনি লেগেছে। সে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছে।
বৃষ্টির সাথে এবার শুরু হলো ঝড়। যেন ঝড় ও বৃষ্টি পাল্লাপাল্লি দিচ্ছে। পাশের গাছের মগডালটা মড়াৎ করে ভেঙে পড়ল। সাথে সাথে ওপাশে একটা বাজ পড়ল।
সাবিত গাছে আর নিজেকে নিরাপদ মনে করলো না। যখন তখন ভেঙে পড়তে পারে ওর গাছের ডাল। অথবা পড়তে পারে বাজ।
নামল গাছ থেকে ও। ছুটলো ফাঁকা জায়গার খোঁজে। এক পা বাড়িয়েছে অমনি একটা ডাল সামনে মড়াৎ করে ভেঙে পড়লো। মাত্র এক হাতের জন্য রক্ষা পেল ও।
ছুটলো ডালটাকে পাশ কাটিয়ে। সাথে সাথে ও যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল যেখানে মনে হলো ছোটখাটো একটা বাজ পড়লো কড়াৎ শব্দে। অন্তর-আত্মা শুকিয়ে গেল ওর। সমস্ত শরীর চিন চিন করে উঠলো। কেমন যেন একটা ঝিম ঝিম ভাব লাগছে ওর। হাত পায়ে বল কমে গেছে যেন। তবুও শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আরো জোরে দৌড়ালো সাবিত।
এক সময় ফাঁকা জায়গায় এসে থামলো। ক্লান্ত-শ্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লো ঘাসের ওপর। সমস্ত শরীরে তার কাঁপুনি লেগেছে। প্রচণ্ড শীত লাগছে। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাচ্ছে হাত পা। এক সময় জ্ঞান হারালো সাবিত। এভাবে কাটলো কয়েক ঘণ্টা।
চেতনা ফিরলো সাবিতের। তখন শীতে সমস্ত শরীর কাঁপছে।
অসহ্য জ্বর এসেছে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না ও। আবারও জ্ঞান হারালো। তখনো অবিরাম ঝড়-বৃষ্টি, মেঘের ডাক, আর বিদ্যুৎ চমক চলছে।
নিকটের ঝোপে কীসে যেন গর্জন করছে। ঝড়ের শাঁ-শাঁ-শাঁ-শাঁ শব্দ বাজের কড়াৎ কড়াৎ শব্দকে উপেক্ষা করে ঐ গর্জনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
এই গর্জনে আবারও সাবিতের চেতনা ফেরে। তাকিয়ে দেখে ডান পাশের ঝোপ থেকে এগিয়ে আসছে দুটো হলুদ আলো। আর সাথে সাথেই সেই গর্জন।
সাবিতের মনে পড়লো প্রথম দিনের কথা। সেদিন ও এই হলুদ আলো দেখেছিলো। কিন্তু আজকের আলো সেদিনের থেকে বড়ো।
অসহ্য জ্বরে সাবিতের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেছে। হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সেই গর্জন আর হলুদ আলো। এদিকে ঝড়বৃষ্টি চলছে তার আপন গতিতে।
গর্জনসহ হলুদ আলো দুটো সাবিতের চার ফুট দূরে এসে থামলো। ঠিক তখন বিদ্যুৎ চমকালো। ও দেখলো ওই জন্তুটাকে। ওটা আর কিছু নয়। জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কিন্তু এই ঝড় বৃষ্টির মাঝে ও কেন? হয়তো ও প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। তাই বলে কি ও সাবিতকে খাবে?
না তা হতে পারে না। সাবিত শরীরের সমন্ত শক্তি একত্রিত করে উঠতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। এদিকে টাইগার তার শিকারকে নড়তে দেখে গগনবিদারী এক হুঙ্কার ছাড়লো। আর সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো সাবিতের ওপর।
সাবিতও তার স্বরে চিৎকার করে উঠলো, ‘বাঁ-আ-আ-চা-আ-আ-ও-ও-ও-ও, বাঁ-আ-আ-চা-আ-আ-ও-ও-ও-ও, বাঁ-আ-চা-ও-ও-ও-ও-ও। আম্মু……আম্মু তুমি কো-ও-ও-থা-আ-আ-আ-ই?’
‘এই যে আব্বু সোনা, আমি তোমার পাশে বসে আছি।’
ধড়মড় করে উঠে বসলো সাবিত বিছানার ওপর। খেয়াল করে শোনে বাইরে তখনও শাঁ-শাঁ-শাঁ শব্দে ঝড় হচ্ছে। আর টিনের চালে নিনাদ বাজিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। ওর আম্মু পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ওর।
আম্মু সাবিতকে আবার বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ‘সেই দুপুর থেকে তো বৃষ্টি হচ্ছে। আর সন্ধ্যে থেকে তোমার সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ রেখে রাগ করে বেরিয়েছিলে। আর ফিরলে সন্ধ্যেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। তখন তুমি জ্বরে কাঁপছিলে। বারান্দায় পড়ে গিয়ে সেই যে জ্ঞান হারালে আর জ্ঞান ফিরল এখন। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই সোনা।’
একটু থেমে করুণ স্বরে আবার বলতে শুরু করলেন তিনি, ‘এই জ্বরের মধ্যে তুমি বেশ কয়েকবার চিৎকার করে উঠেছো।’ সাবিত কোন কথা বলে না। ও মনে করার চেষ্টা করলো এবং মনেও পড়লো। স্কুল থেকে ফিরে খেতে চাইলে আম্মুর হাতে কাজ থাকায় নিজে নিয়ে খেতে বলায় সাবিতের ভীষণ রাগ হয়। ও বাড়ি থেকে রাগ করে বের হয়ে সারাদিন টো টো করে ঘুরে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরে। তখন ওর সমস্ত শরীরে তীব্র শীত অনুভব করে। জ্বর আসে। প্রচণ্ড শীতে ও জ্ঞান হারায়।
আম্মু সাবিতের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মুখের ওপর ঝুঁকে এসে জানতে চাইলেন, ‘আব্বু সাবিত, তুমি ঘুমের ঘোরে কয়েকবার বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার করছো। কোন দুঃস্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?’
সাবিত আম্মুর হাত ধরে হাতের মধ্যে মাথা গুঁজে বলল, ‘আম্মু দুঃস্বপ্ন কি না জানি না, তবে একটা স্বপ্ন।’
আম্মু সাবিতের কপালে একটা চুমু এঁকে দেন।
সাবিত চোখ দু’টি বন্ধ করে।
ঠিক তখন দূরের কোন মিনার হতে ভেসে আসে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” ফজরের আজানধ্বনি।

SHARE

Leave a Reply