Home স্বপ্নমুখর জীবন বড়ো হতে চাই জ্ঞানের শক্তিতে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

বড়ো হতে চাই জ্ঞানের শক্তিতে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

(দ্বিতীয় পর্ব)

মানুষ যে আশরাফুল মাখলুকাত তার পেছনেও রয়েছে এক মজার কাহিনী। হযরত আদম (আ)কে সৃষ্টির পরপরই একটি চমৎকার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। একদিকে সকল ফেরেশতা, অপরদিকে হযরত আদম (আ) শুধু একা। স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন প্রধান বিচারক। প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু ছিল ইলম তথা জ্ঞান। বিপুল নম্বর পেয়ে সেদিন আদম (আ) বিজয়ী হয়েছিলেন। সেই দিনকার হযরত আদম (আ)-এর বিজয়ী হওয়ার শ্রেষ্ঠত্ব স্বরূপ আমাদের মর্যাদা, আমরা আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে খেতাব লাভ করেছি।

তোমরা সবাই বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থী।
আচ্ছা তাহলে বলোতো, জ্ঞান বাড়ানোর জন্য আমাদের ক্লাসের বই-পুস্তক-ই কি যথেষ্ট? আসলে তা কিন্তু নয়। জ্ঞান বাড়াবার জন্য ক্লাসের বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে আরও অনেক বই তোমাদের পড়তে হবে। তোমরা হয়তো বলবে পড়তে ভালো লাগে না। কিন্তু পড়াটাকে ভালো লাগাতে হবে। প্রথমে না হয় কোনো মজার গল্প কিংবা হাদিসের গল্প দিয়েই পড়ার অভ্যাস তৈরি করো। তারপর ধীরে ধীরে কুরআন, মনীষীদের জীবনী, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়বে। ভ্রমণ কাহিনি পড়লে তার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশ ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে। বড়ো কোনো মানুষের আত্মজীবনী পড়লে জানতে পারবে তাঁদের কঠোর জীবন সংগ্রামের কথা। গোয়েন্দা উপন্যাস পড়লে তার মধ্য দিয়ে উপস্থিত বুদ্ধি তৈরি হবে। ইতিহাস পড়লে জানতে পারবে পৃথিবীর সূচনা থেকে এতটা বিবর্তন কীভাবে হলো, বিভিন্ন জাতি- সম্প্রদায়ের উত্থান-পতন সম্পর্কে। তবে তোমরা শুধু এমন বইগুলো পড়বে যেগুলো পড়লে জ্ঞানার্জন হয় এবং কিছু নতুন বিষয় জানা যায়। আজেবাজে লেখা, বটতলার বাজে উপন্যাস পড়ে সময় নষ্ট করা চরম বোকামি। এতে মেধা এবং সময় দুটোরই অপচয় হয়। দৈনিক পত্রিকা পড়বে; তা না হলে সাধারণ জ্ঞানে পিছিয়ে পড়বে। দেশ-বিদেশের কোথায় কী হচ্ছে এ বিষয়ে অবশ্যই নিজেকে আপডেট রাখতে হবে।

তোমরা শুনে হয়তো অবাক হবে, জ্ঞানের শক্তি দিয়েই একদিন মুসলমানেরা সারা পৃথিবীতে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১২৫০ সালে স্পেনের টলেডো ও কর্ডোভা ছিল মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মারকায। মুসলমানেরা সেখানে প্রথমে ‘‘School of Oriental Studies’’ নামক একটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। মুসলমানেরা-ই কর্ডোভাতে সর্বপ্রথম পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। যেই শিক্ষাকেন্দ্রে সব সময় ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করত। যে বিষয়ে খ্যাতনামা ঐতিহাসিক যোশেফ হেল বলেন- ‘Cordova shone like light our on the darkness of Europe.’

তাহলে বুঝা গেল তৎকালীন সময়ে জ্ঞান বিজ্ঞানই ছিল পৃথিবী শাসনের একমাত্র হাতিয়ার। খোদ ইসলামেও জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে শক্তি বলা হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান যে অর্জন করে সেই মানবজগতে প্রাধান্য পাবে। কেননা জ্ঞান-বিজ্ঞানই হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো শক্তি।
এ বিষয়ে নবীজি (সা) বলেছেন- একদিন আমি মসজিদে ঢুকে দেখলাম, দুটো আসর বসেছে। একটি ছিল ধর্ম শিক্ষার তথা জ্ঞান চর্চার ও অন্যটি দোয়ার আসর। দুটিই ছিল উত্তম বৈঠক। একটিতে আল্লাহকে স্মরণ করা হচ্ছে আর অন্যটিতে মানুষ যা জানে না- তা শেখানো হচ্ছে। আমি দ্বীনি ইলম শিক্ষার আসরে গিয়ে বসলাম। কেননা আমি প্রেরিত হয়েছি মানুষকে ইলম শিক্ষা দেওয়ার জন্য। মুসলমানের উচিত, জ্ঞান-বিজ্ঞান জেনে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করা।

এ বিষয়ে আমিরুল মুমিনিন শেরে খোদা হযরত আলী (রা) বলেছেন, কিশোর-যুবকদের জন্য সেই শিক্ষাই ভালো, যে শিক্ষা বয়সকালে উপকারে আসে। জ্ঞানার্জন করতে হয় শৈশবেই। বড়ো হলে সেই জ্ঞান পথ দেখায় এবং সাফল্যের পথে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেছেন, জ্ঞানার্জন করলে তা দিন দিন বাড়তে থাকে। মানুষ যেন এমন জ্ঞান অর্জন করে যার মাধ্যমে তার মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

‘বিশ্বটাকে গড়তে হলে সবার আগে নিজেকে গড়ো’ এটা এক মহান ব্যক্তির মহৎ কথা। তিনি অসহায়ভাবে যখন রাশিয়ার এক রেলস্টেশনে মারা যান, তখন তাঁর ওভারকোটের পকেটে পাওয়া যায় মূল্যবান এক বই ‘The sayings of prophet Muhammad’. সেই নোবেল লরিয়েট লিও টলস্টয় (১৮২৮-১৯১০) কে বলা হয়েছিল, জাতীয় উন্নয়নে যুবসমাজের উদ্দেশে আপনি কিছু বলুন। টলস্টয় সেদিন বলেছিলেন, I have three advices for young generation; Read, Read and Read.

টলস্টয়ের এই বাণী যেন মহান আল্লাহর সেই প্রথম বাণীর প্রতিফলন ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে জ্ঞান শিখিয়েছেন কলমের মাধ্যমে, এমন জ্ঞান যা সে জানতো না।’ লিও টলস্টয় নিয়মিত প্রার্থনা করতেন। নাচতেন না, গাইতেন না, মদ পান করতেন না, থিয়েটারে যেতেন না। তিনি নিয়মিত কুরআন পাঠ করতেন যদিও তিনি মুসলমান ছিলেন না।

তুমি প্লেটোর কথাই ধরো। জ্ঞান অর্জন এবং জ্ঞান বিতরণই ছিল যার সারাজীবনের ধ্যান। প্রিয় গুরু সক্রেটিসকে হারিয়ে প্লেটো যখন শোকে মুহ্যমান, তখন তিনি ভাবলেন মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এবং গুরু সক্রেটিস এর আদর্শ চর্চার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়লে কেমন হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। নগরের উপকণ্ঠে প্লেটোর একটি বাগান বাড়ি ছিল। সেখানেই খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৭ অব্দে প্রতিষ্ঠা করলেন পৃথিবীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাপীঠ অ্যাকাদেমিয়া (Acadamy); যা এখন ‘University of Athence’ নামে পরিচিত।

প্লেটো বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু জীবন ধারণের জন্য নয়; জীবনে উত্তম কিছু করার জন্য। যতদিন মানুষ জীবিত থাকবে, ততদিনই সে উত্তমভাবে জীবনযাপন করবে। তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন তার মূল কথা হলো একটি দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে উঁচু নিচু কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রীতির সম্পর্ক। তাঁর রচিত The Laws গ্রন্থে তিনি বলেছেন-‘নগরবাসীরা পরস্পরকে জানবে এবং বুঝবে।’

এজন্য ছোটোবেলা থেকেই তোমাকে বহুমুখী প্রতিভা বিকাশের দিকে নজর দিতে হবে। প্রচণ্ড স্মরণশক্তিসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে টানা দশ বছর ব্যাপক গবেষণা করেছেন আমেরিকার এক্সেটার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মাইকেল হাও। এ বিষয়ে গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রিও পেয়েছেন। তাঁর এই গবেষণায় কিছু অসাধারণ তত্ত্ব উঠে এসেছে যা সারাবিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সাধারণ মানুষ এবং জিনিয়াসদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থ্যক্য নেই।’ তাঁর মতে, জিনিয়াসরা নিজেরাই ধীরে ধীরে নিজেদের তৈরি করে নেন। এই গবেষণায় তিনি আরও একটি বিষয়ের ওপর খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। সেটি হলো পারিবারিক শান্তি। ‘যে পরিবারে যত বেশি শান্তি বিরাজ করে সে পরিবারে তত বেশি জিনিয়াস জন্ম নেবে। এ ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গীর অনুপ্রেরণাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরো বলেছেন-‘পৃথিবীতে যারাই বড়ো কাজ করেন, তার সব ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। কেউ অলৌকিক শক্তির বলে কিছু করতে পারেন না, সবকিছুরই বাস্তব কারণ আছে। গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখেই নিউটন তাঁর থিওরি পেয়ে যাননি; বরং এর আগে নিউটন বছরের পর বছর জ্যামিতির বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। যখন তিনি আপেলটি মাটিতে পড়তে দেখেন, তখন তাঁর কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।’
প্রফেসর হাও-এর মতে, একজন মানুষের সাফল্যের মূল বিষয় হলো- ব্যক্তিগত পরিশ্রম, স্ত্রীর সহযোগিতা, কাজ করার সুযোগ, পারিবারিক উৎসাহ এবং শান্তি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন-‘পরিবারে টাকার চেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তির।’

সুতরাং ভালো পড়াশোনার জন্য সময় ও পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআন অধ্যয়নের জন্য শেষ রাতের সময়টিকে বেশি উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ এই সময়ে সারা পৃথিবী নিস্তব্ধ থাকে। আর পরিবেশও থাকে অনেকটা ঠান্ডা। কোলাহলমুক্ত পরিবেশ আর অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা আবহাওয়া মগজকে কার্যকর করার জন্য বেশি উপযোগী। তাই গরম দেশের তুলনায় শীতপ্রধান দেশের মানুষ বেশি মেধাবী হয়।

আজকের এই নিবন্ধটি এমন একজন মহামনীষীর বক্তব্য দিয়ে শেষ করতে চাই যিনি জ্ঞানার্জনে উৎসাহিতকরণে আমাদের প্রেরণার বাতিঘর। তিনি আর কেউ নন, বহু ভাষাবিদ, জ্ঞান তাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘যারা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আরোহণ করে তাদেরকে আমি পণ্ডিত মনে করি। তবে কুরআনুল কারিমের জ্ঞান ছাড়া তারা মূর্খ পণ্ডিত।’

SHARE

Leave a Reply