Home গল্প হেমন্তকাল -মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম

হেমন্তকাল -মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম

প্রায় দু’বছর স্কুল বন্ধ রিয়ানার। ঘরে বসে সময় কাটে। বাইরে বের হতে পারে না। স্কুল কবে খুলবে তারও ঠিক নেই। মাঝে মাঝে অনলাইন ক্লাস আর ভাল্লাগে না রিয়ানার। বাড়ির সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তবে, আজ রিয়ানার মন একটু ভালো। কারণ গ্রাম থেকে দাদু আসবে। সেই সকাল থেকে দাদুর জন্য অপেক্ষা করছে। এখনো দাদু পৌঁছায়নি। আসলেই অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয়। দাদুর কথা ভাবতে ভাবতে বিকেলেই ঘুমিয়ে গেল রিয়ানা।
রাতে দাদুর ডাকেই ঘুম ভাঙল রিয়ানার। চোখ খুলেই অবাক সে। তারপর লাফ দিয়ে দাদুর কোলে উঠে বসল। দাদুও পরম মমতায় রিয়ানাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। তারপর দাদুর কাছে বাড়ির সবাইকে নিয়ে কত অভিযোগ। কেউ তার সঙ্গে খেলে না, গল্প করে না ইত্যাদি। দাদুতো হেসেই বলল, এবার থেকে আমরা দু’জন অনেক গল্প করব। সেদিন রাতে আর ঘুমাল না রিয়ানা। দাদুর কাছে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে রাত পার হয়ে গেল। তারপর ভোরে ঘুমিয়ে পড়ল দুজন।

দাদু এসেছে দু’দিন হয়ে গেল। এই দুদিন ভালোই সময় কাটছিল রিয়ানার। কিন্তু, আজকের অনলাইন ক্লাসে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে। তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে সে। অ্যাসাইনমেন্ট হলো হেমন্তকাল নিয়ে রচনা লিখতে হবে। রিয়ানাকে চিন্তিত দেখে দাদু জানতে চাইল কী হয়েছে। তখন সে দাদুকে অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়টি জানাল। দাদু তখন জানিয়ে দিলো, হেমন্তকাল নিয়ে দাদু সব তথ্য দেবে। কিন্তু শর্ত হলো রিয়ানাকে নিজে হাতে লিখতে হবে। রিয়ানাও সেই শর্ত মেনে নিলো।
দাদু বলতে শুরু করল-
মহান আল্লাহর অপূর্ব নেয়ামত হলো প্রকৃতি। তিনি আমাদের জন্য প্রকৃতিকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন। যেখানে যেমন আবহাওয়া সেখানকার মানুষের জন্য তেমন পরিবেশ দিয়েছেন। যেমন- আমাদের দেশে দিয়েছেন ছয়টি ঋতু। প্রতিটি ঋতুর বৈশিষ্ট্য একেক রকম এবং তা মানুষের জন্য খুব উপকারী। এখন শোন হেমন্ত কালের কথা- হেমন্ত ছয় ঋতুর চতুর্থ ঋতু। মাস হিসেবে বাংলা পঞ্জিকার সপ্তম মাস, হেমন্ত ঋতুর প্রথম মাস। হেমন্ত আসে শরতের পরে এবং শীতের আগে। বলতে পার হেমন্ত শীতের বার্তা নিয়ে আসে। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্ত।

এ সময় মহান আল্লাহ প্রকৃতিতে অপরূপ সৌন্দর্যে সাজান। সবুজ ঘাস ও ধান গাছের ডগায় জমে থাকে শিশির বিন্দু। হালকা শীত অনুভূত হয়। শরতের কাশফুল হেমন্তে মাটিতে নুইয়ে পড়ে। হেমন্তে গাছের পাতা ঝরে পড়তে শুরু করে। শীতের আগেই গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ে। আর আগমন ঘটে নবান্নের।
নবান্ন শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো নতুন অন্ন বা নতুন ভাত। হেমন্তে ধান কাটার পর নতুন চালের পিঠা-পায়েস খাওয়ার উৎসব নবান্ন। মূল কথা হেমন্তের ফসল কাটাকে ঘিরেই নবান্ন উৎসবের সূত্রপাত।
মধ্যযুগে বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষদিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ব হয়। অগ্রহায়ণের শুরুতে সেই ধান কেটে মাড়াই করে গোলায় তুলে রাখেন কৃষকরা। অগ্রহায়ণ শব্দটির ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ দুটি অংশের অর্থ যথাক্রমে ধান ও কাটার মৌসুম। সম্ভবত এ কারণেই স¤্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস ঘোষণা দিয়েছিলেন।

হেমন্তে শিউলি, কামিনী, জবা, গোলাপ, মল্লিকা, বকফুল ইত্যাদি নানা ধরনের ফুল ফোটে। এ সময় সকালে ফোটা শিউলি ফুলের সৌরভ যে কোনো মানুষের মনকে সতেজ করে। ফজরের নামাজ শেষে শিউলির গন্ধে নিজেকে আরও শুদ্ধ মনে হয়। হেমন্তে ফল হলো কামরাঙা ও চালতা। নারিকেল এ ঋতুর প্রধান ফল।
কিন্তু, দুঃখের কথা কী জানো- নগরায়ণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে, আল্লাহর দেওয়া সেরা উপহার প্রকৃতিকে আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি। এসব কারণে দেখ- নতুন নতুন রোগ আসছে। যার কোনো চিকিৎসা নেই।
রিয়ানা সব শুনে বলল, দাদু তুমি ঠিক বলেছ। গত দুই বছর তো করোনা নামক ভাইরাসের সঙ্গে সারা পৃথিবী লড়াই করছে। পুরো পৃথিবীকে কীভাবে যেন থামিয়ে দিয়েছে ভাইরাস। যা আমরা কখনো ভাবিনি। দাদু আমি অনেক অনেক গাছ লাগাব। ব্যালকনিতে অনেকগুলো লাগিয়েছি। এবার যখন গ্রামের বাড়িতে যাব ওখানেও গাছ লাগাব।
দাদু খুশি হয়ে বললেন, হ্যাঁ তোমার মতো সবাইকে এভাবে ভাবতে হবে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। তাহলে পৃথিবী আবার সবুজ হবে। আমরা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারব। আসলে আমরা যদি চেষ্টা করি নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।

SHARE

Leave a Reply