Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব পৃথিবীর দীর্ঘতম রেললাইন -মাহমুদুল হাসান

পৃথিবীর দীর্ঘতম রেললাইন -মাহমুদুল হাসান

ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা গন্তব্য ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথ। ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলওয়ে নেটওয়ার্ক। যা রাশিয়ার দূরবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চল সাইবেরিয়ার সাথে মস্কোকে যুক্ত করেছে। শত বছর আগে রাশিয়ানদের এই নির্মাণকাজ পৃথিবীর কাছে আজও এক বিস্ময়।
প্রায় ৯২৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট পৃথিবীর দীর্ঘতম এই রেলপথটি দু’টি শাখার মাধ্যমে চীন, মঙ্গোলিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে সংযোগ করেছে।
১৯১৬ সালে মস্কো থেকে ভস্নাদিভস্টক পর্যন্ত পুরো রেলপথের কাজ সমাপ্ত হয়। এর কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৯১ সালে। সেই হিসাব অনুযায়ী রেলপথটি নির্মাণে প্রায় ২৫ বছর সময় লেগেছিল। তবে, এই রেলপথের স¤প্রসারণ এখনো অব্যাহত আছে।
বর্তমানে এটি ভস্নাদিভস্টক থেকে আরো ১৫২ কিলোমিটার বর্ধিত হয়ে ভস্নাদিভস্টকের সাথে নাখোদকা পোর্ট স্টেশনকে সংযুক্ত করেছে। ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথটি রাশিয়া, ইউরোপ ও এশিয়া অংশের ছোটো বড়ো শত শত শহরকে যুক্ত করেছে।

রুশ শাসক তৃতীয় আলেকজান্ডার এবং তার পুত্র নিকোলাসের ইচ্ছার ফলে তৈরি হয় এই রেলপথ। বাবার পথ ধরে নিকোলাসও পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার জার হয়েছিলেন।
পৃথিবীর দীর্ঘতম এই রেলপথটি আটটি টাইম জোন অতিক্রম করেছে। ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথের প্রধান লাইনটি মস্কো থেকে শুরু হয়ে সাইবেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল হয়ে ভস্নাদিভস্টক পর্যন্ত গিয়েছে।
ট্রান্স—মঙ্গোলিয়ান রেলপথটি বৈকাল হ্রদের পূর্ব উপকূল থেকে শুরু হয়ে মস্কোর সঙ্গে মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনের পেইচিংকে যুক্ত করেছে। এছাড়াও মূল রেললাইনের কাজ সমাপ্ত হওয়ার প্রায় পাঁচ দশক পর ১৯৯১ সালে চতুর্থ একটি রেলপথ ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথে যুক্ত হয় যা ‘বৈকাল—আমুর মেইন লাইন’ নামে পরিচিত। এই লাইনটি বৈকাল হ্রদ থেকে কয়েকশ মাইল পশ্চিমে তাইশেত থেকে শুরু করে বৈকাল হ্রদ ও তার সর্ব উত্তরের অঞ্চলগুলোকে যুক্ত করেছে।
এই রেলপথটি আমুর নদী পার হয়ে তাতার সমভূমিতে এসে শেষ হয়েছে। ২০১১ সালে, ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথের খাসান অঞ্চল থেকে একটি ট্রেন উত্তর কোরিয়ায় প্রথম যাত্রা করে।
রাশিয়ান সাম্রাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথের গুরুত্ব অপরিসীম।

১৯ শতকের শেষের দিকে, সাইবেরিয়াসহ রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় দূরবর্তী স্থানগুলোতে দুর্বল যাতায়াতব্যবস্থার কারণে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছিলো। ফলে বছরের প্রায় পাঁচ মাস নদীপথই ছিল একমাত্র ভরসা। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় শীতকালে বরফের ওপর দিয়ে ঘোড়ায় টানা স্লেজ গাড়িতে করে পণ্য আনা নেওয়া করা হতো।
ধীরগতির ও অনুন্নত যাতায়াতব্যবস্থার কারণে রাশিয়ার এই অঞ্চলসমূহের সমস্যা কেবল দীর্ঘায়িত হচ্ছিল। এরপর বিভিন্ন আলোচনায় ১৮৯১ সাল থেকে ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রথম ধাপে ছিল নকশা চূড়ান্তকরণ ও পশ্চিম সাইবেরিয়া রেলপথের নির্মাণকার্য সম্পাদন, যার দৈর্ঘ্য ছিল, চেলিয়াবিন্সক থেকে অব নদী পর্যন্ত, অব থেকে আরকুস্ক পর্যন্ত সেন্ট্রাল সাইবেরিয়া রেলওয়ে এবং ভস্নাদিভস্টক থেকে গ্রাফস্কায়া স্টেশন পর্যন্ত দক্ষিণ উসুরি রেলওয়ে। এরপর যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে বাকি অংশের কাজ শেষ করা হয়।
ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলওয়ে নির্মাণে প্রাথমিকভাবে যে পরিমাণ শ্রমিক কাজ শুরু করেছিলেন পরবর্তী সময়ে তার বহুগুণ শ্রমিককে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই রেলপথ নির্মাণে কখনো কখনো একই সময়ে এক লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেছেন। কাজ যত এগিয়েছে, শ্রমিকের সংখ্যাও তত বেড়েছে। সে—সময় অসংখ্য শরণার্থীকে রাশিয়া এবং সাইবেরিয়ায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। এসব শরণার্থীই ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ করেছিলেন।

ভৌগোলিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রেলপথ নির্মাণে শ্রমিক সঙ্কট তীব্র আকার দেখা দিত। শরণার্থী ছাড়াও সাধারণত কৃষক, দিনমজুর, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথ নির্মাণের শুরুতে মাত্র ৯ হাজার ৬০০ শ্রমিককে নিয়ে কাজ শুরু হয়। কিন্তু ১৮৯৬ সালে এই সংখ্যাটি এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। তবে, নির্মাণের শেষের দিকে যখন আমুর রেলওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হয় তখন শ্রমিক সংখ্যা মাত্র ২০ হাজারে নেমে আসে। ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলওয়েতে হাজত আসামিদের কাজে লাগানোর মাধ্যমেই রাশিয়ায় শুরু হয় নির্বাসন ও সশ্রম দণ্ডবিধির মতো বিষয়গুলো।
ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথ ওই সময়ে শুধুমাত্র রাশিয়া নয় বরং সারা বিশ্বের মধ্যেই একটি বিস্ময়কর ও বড়মাপের প্রজেক্ট ছিল। এমনকি এত ‍বছর পরে এসেও ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথটি ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করার মাধ্যমে এর মূল উদ্দেশ্য সাধন করে যাচ্ছে।
২০১৬ সালে ট্রান্স—সাইরেবিয়ান রেলপথ নির্মাণের একশ বছর পূর্তি হয়। বর্তমানে মাত্র এক সপ্তাহে পাড়ি দেওয়া এই রেলপথটি ১০০ বছর আগে পাড়ি দিতে সময় লাগত প্রায় এক মাস। সে—সময় ট্রেনের গতি ছিল মাত্র ২০ কিলোমিটার।

রেলপথটি নির্মাণের সময় আবহাওয়া, দস্যু ও বাঘ—ভাল্লুকের মতো হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শিকার হতেন শ্রমিকরা। বৈকাল হ্রদসহ বেশ কিছু স্থানে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় শ্রমিকদের। মাঝে মাঝে রেলের বিভিন্ন অংশ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দিত দস্যুরা। তবে, এই রেলপথ এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে এই রেলপথে ভ্রমণ করতে পারেন। প্রত্যেকটি ট্রেনেরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব ভালো।
পরীক্ষমূলকভাবে রেলপথটিতে যাত্রী পরিবহন শুরু হয় ১৯০৪ সালে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯১৬ সালে যাত্রা শুরু করে ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথ।
রেললাইনটিতে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হয় ১৯২৯ সালে। ২০০২ সালের মধ্যে পুরো রেলপথই বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আসে।

২০০৯ সালে রেলপথের উন্নয়নের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে রুশ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে পুরো রেলপথটি মাত্র সাত দিনে অতিক্রম করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথ সামগ্রিকভাবে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী।
ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথে ভ্রমণের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ মূলত রাশিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বছরের যে কোনো সময় এই রেলপথে ভ্রমণ করা যায়। শীতকালে এই রেলপথের গড় তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে, ট্রেনের তাপমাত্রা থাকে নিয়ন্ত্রিত। কাচের জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যায় কেবল বরফের রাজ্য।
অন্যদিকে, গ্রীষ্মকাল, বিশেষ করে মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস ট্রান্স—সাইবেরিয়ান রেলপথে ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময়। এ—সময় আবহাওয়া মনোমুগ্ধকর থাকে। বর্তমানে এই রেলপথের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। প্রস্তাবনা অনুযায়ী এই দৈর্ঘ্য আরও বাড়বে।
ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথের মূল আকর্ষণ রাশিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ট্রান্স মঙ্গোলিয়ান রুটে ভ্রমণের সময় চোখ জুড়াবে গোবি মরুভূমির ঢেউ খেলানো বালুময় প্রান্তর দেখে। সবকিছু মিলিয়ে ট্রান্স সাইবেরিয়া রেলপথ এবং এর পরিবেশ অতুলনীয়।

SHARE

Leave a Reply