Home চিত্র-বিচিত্র আর্কিওপটেরিক্স পাখি -সজীব আহমেদ

আর্কিওপটেরিক্স পাখি -সজীব আহমেদ

পাখি এক বৈচিত্র্যময় প্রাণী। পাখি একই সাথে হাঁটতে ও উড়তে পারে। পাখির উড়তে পারা নিয়ে প্রাচীন মানুষের মাঝে ছিল অসীম কৌতূহল। সেই কৌতূহল থেকে নানা রকম গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় প্রাচীন অনেক পাখির সম্পর্কে। গ্রিসের প্রাচীন নগরী থিবস থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নাখতের সমাধি মন্দির। সেই ধ্বংসাবশেষের দেয়ালে মিলেছে নানা প্রজাতির পাখির দেয়াল চিত্র।
সেখানে মূলত একটি পাখির দু’টি বৃহৎ ডানার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ধারণা করা হয়, এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম পাখি। তবে এ নিয়ে বিতর্কও আছে। তবুও প্রত্নতাত্ত্বিক ও পাখি বিজ্ঞানীরা অনেকটা একমত যে, আবিষ্কৃত আর্কিওপটেরিক্সই পৃথিবীর প্রাচীনতম পাখি।

আর্কিওপটেরিক্স একটি গ্রিক শব্দ যার অর্থ প্রাচীন ডানা অর্থাৎ পৃথিবীর প্রাচীনতম পাখির ডানা।
১৮৬০ সালের দিকে জার্মানিতে অদ্ভুত এক প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। যা নিয়ে গোটা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে, জীবাশ্মটা ছিল কিছুটা ডায়নোসর আর কিছুটা পাখির মতো দেখতে এক অদ্ভুত প্রাণীর! পৃথিবীর মানুষ প্রথমবারের মতো খুঁজে পেয়েছিল প্রাচীন এক পাখি আর্কিওপটেরিক্সের জীবাশ্ম।

ধারণা করা হয়, এই পাখিটির অস্তিত্ব প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর পুরনো। জীববিজ্ঞানীদের অধিকাংশের মতে, এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম পাখি।
জীবাশ্ম মূলত এক ধরনের পাথর। কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী মারা যাওয়ার পর অনেক সময় তা নদীর ধারে বা আশপাশের অঞ্চলের পলিমাটিতে এসে জমা হয়। তারপর সেই দেহের ওপর মাটি জমতে থাকে। স্তরের পর স্তর মাটি জমা হয়ে সেই উদ্ভিদ বা প্রাণী দেহের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এতে উদ্ভিদ বা প্রাণিদেহ কঠিন পাললিক শিলায় পরিণত হয়।

ধীরে ধীরে সেখানে চাপ আরও বাড়তে থাকে। অনেক সময় এর সাথে যুক্ত হয় তাপের প্রভাব। এর ফলে ধীরে ধীরে সেই পাললিক শিলা পরিণত হয় পাথরে। আর সেখানে পাথরের মধ্যে উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহ প্রতিস্থাপিত হয়।
হয়তো সেই উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহ পচে গলে যায়, কিন্তু তার দেহের আকৃতির একটি অবিকল ছাপ সেই পাথরের মধ্যে থেকে যায়। এই পাথরকেই আমরা বলে থাকি জীবাশ্ম।

গবেষণা ও পরীক্ষা—নিরীক্ষার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বছর আগের উদ্ভিদ ও প্রাণীদের সম্পর্কে জানা যায় এসব জীবাশ্ম থেকে। প্রাচীনকালের পাখিদের ব্যাপারেও আমরা এসব জীবাশ্ম থেকে নানা তথ্য জানতে পারি। আর্কিওপটেরিক্সের প্রথম ধারণা পাওয়া যায় একটি চিত্র থেকে। প্রাচীন যুগের নানা সভ্যতায় দেখা গেছে পাখির চিত্র। তারা তাদের ব্যবহার্য জিনিসে বিভিন্ন পাখির অঙ্কন করতে পছন্দ করত। প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতায়ও ছিল পাখির প্রভাব। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর তীরে আবিষ্কৃত এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গেছে একাধিক পাখি মূর্তির সন্ধান।

ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু নদের তীরে আবিষ্কৃত প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতায়ও ছিল পাখির সরব উপস্থিতি। মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীদের তৈজসপত্রের গায়ে পাওয়া যায় অসংখ্য পাখি—চিত্রের সন্ধান।
এ পর্যন্ত পাখির সবচেয়ে প্রাচীন ‘চিত্র’ পাওয়া গেছে এক গুহায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, সেগুলো পনেরো থেকে ষোলো হাজার বছর আগের গুহা মানবদের অঁাকা। তখনকার দিনে শিকারে যাওয়ার আগে গুহার দেয়ালে পশুপাখির ছবি অঁাকার একটি রেওয়াজ ছিল।
বাভারিয়ার লাইমস্টোন খনিটি ছিল রাভেগনালথেইম এলাকায়। এরিক হারম্যান ভন মেয়ের নামের এক জার্মান জীববিজ্ঞানী প্রথমে এর সন্ধান পান।
তিনি এটি উদ্ধার করে একজন স্থানীয় পদার্থবিদ কার্ল হবারলে ইনের কাছে গবেষণার জন্য দিয়ে দেন। তিনি এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে লন্ডনের ইতিহাস জাদুঘরে খবর দেন। লন্ডনের ‘ন্যাচারাল হিস্টোরি মিউজিয়াম’ কর্তৃপক্ষ ৭০০ ইউরোর বিনিময়ে তার কাছ থেকে ঐতিহাসিক এই জীবাশ্মটি কিনে নেন।
আবিষ্কারের পর পাখির এই জীবাশ্ম জীববিজ্ঞানীদের মাঝে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর ফলে পাখিদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে জানার এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়।

বিজ্ঞানীরা জীবাশ্মটি পরীক্ষা করা শুরু করলে দেখা গেলো যে দোপায়ী প্রাণী এবং হেঁটে চলা মাংসাশী ডায়নোসরদের মতোই ছিল তাদের চালচলন। কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করা গেল, যা এর আগে কোনো ডায়নোসরের ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি। আর তা হলো পালক! প্রাণীটির দুটো ডানাতেই ছিল পাখির মতো পালক। এখান থেকেই এর নামকরণ করা হয় আর্কিওপটেরিক্স। কারণ পৃথিবীর প্রথম জীবাশ্ম যেখানে পালক পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের ভাষায় পৃথিবীর প্রাচীনতম ডানার অধিকারী এক প্রাণী।
এই পাখি আকারে বর্তমান সময়ের কাকের চাইতে একটু বড়ো ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি পুরোপুরি উড়তে পারতো না। তবে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে যাতায়াত করতো।
পাখিটির মাথা দেখতে গিরগিটির মতো। চোয়ালে রয়েছে সারি সারি দাঁত। মেরুদণ্ড অনেকটা গিরগিটির লেজের মতো লম্বা। লেজটা কতগুলো জোড়া দেওয়া হাড়ের মতো দেখতে, যার দু’পাশ জুড়ে থাকতো ঘন পালক। এ কারণেই একদল পাখিবিজ্ঞানীর অনুমান, গিরগিটি থেকে বিবর্তিত হয়ে পাখির উৎপত্তি হয়েছে।

এদের ডানার সামনের দিকটা অনেকটাই ছিল মানুষের হাতের মতো। তবে সেখানে থাকতো ধারালো নখ। আর পা দুটোও এরকমই ছিল। ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, বর্তমান সময়ের পাখিদের সাথে এর কোনো মিলই নেই।
হাত আর পা দিয়ে ডাল আঁকড়ে ধরে গাছে উঠে যেতো পাখিটা। তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে শিকার ধরতো এই গাছ থেকে ওই গাছে।
পাখির পালক ও হাড়গুলো লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্টোরি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। বিজ্ঞানীরা এই পাখির নামই দিয়েছেন আর্কিওপটেরিক্স। তাদের ধারণা, এর বয়স ১৩ থেকে ১৪ কোটি বছর।
বিজ্ঞানীদের আরেকটি দলের মতে, আর্কিওপটেরিক্স আসলে বিবর্তিত এক প্রকার বিশেষ ডায়নোসর, যা আকারে ছিল খুবই ছোটো। বেশ হালকাও ছিল এগুলোর শরীর। ১৮ আউন্সের বেশি কখনোই ওজন হতো না।
ছোটো ছোটো পোকামাকড় ছিল আর্কিওপটেরিক্সের প্রিয় খাদ্য। তবে মৃত ডায়নোসরদের শরীর থেকে মাংস খুবলেও খেতো এই পাখিগুলো। যদিও আকাশে উড়তে পারা ডায়নোসরদের এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করতো এরা।

২০০১ সালে একদল ওলন্দাজ বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেন, বেশিরভাগ আর্কিওপটেরিক্সের পালকের রঙই দাঁড়কাকের মতো কালো হতো। এজন্য আর্কিওপটেরিক্সকে ‘র‌্যাভেন অব দ্য ডায়নোসর এরা’ উপাধি দেওয়া হয়।
২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের একদল জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী গবেষণা করে প্রমাণ করে যে, আর্কিওপটেরিক্সের পালকগুলো বর্তমান যুগের পাখিদের চাইতে অনেক বেশি নরম ছিল। তাদের মতে, আর্কিওপটেরিক্স মাটি থেকে সর্বোচ্চ এক ফুট ওপরে উঠতে পারতো।

এদের ব্যাপারে আর তেমন কিছু জানা যায়নি। শুধু এটুকু বলা যায় যে, এরা বিবর্তিত হয়ে নতুন কোনো প্রজাতিতে পরিণত হয়নি; বরং ১৫০ মিলিয়ন বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এই প্রাণীটি।
সম্ভবত একটা সময়ে, ক্রমাগত আকাশচর ডায়নোসরদের খাদ্যে পরিণত হতে থাকে এরা। ডায়নোসরদের সময়ে টিকে থাকা ক্রমাগতই কঠিন হয়ে যেতে থাকে এদের জন্য। এজন্যই সম্ভবত এদের বিলুপ্তি ঘটে। তবে এটা শুধুই একটা ধারণা।
এখন পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় আট জায়গাতে আর্কিওপটেরিক্সের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। জার্মানি, স্পেন আর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে সেগুলো। অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতে এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম পাখি।

SHARE

Leave a Reply