Home স্বপ্নমুখর জীবন সুন্দর জীবনের সন্ধানে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

সুন্দর জীবনের সন্ধানে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

২য় পর্ব
জীবনে দুটো বিষয়কে পাশাপাশি রাখতে হবে। চিন্তা করা আর কাজ করে যাওয়া। যারা এ দুটো বিষয়ে সঠিক প্রয়োগ করতে পারেন তারাই জীবনযুদ্ধে সফল। তবে একাগ্রতার সাথে সবকিছু করতে হবে। আধাআধি বলে কিছু নেই। ধরি মাছ না ছুঁই পানিÑ এটা এক ধরনের কূটকৌশল। যারা এটা করেন তারা কেউ জনপ্রিয় হন না। এ ধরনের তেলাপোকা স্বভাবের মানুষকে কেউ পছন্দ করেন না। এরা বড়ো অসহায় লোক। আমাদের স্মৃতিশক্তিকে প্রখর করে তুলতে হবে। বারবার ঝালাই করতে হবে। ভুলোমন মানুষ বর্তমান সময়ে অচল। মনের দরোজা জানালা খুলে দিতে হবে। জানার জন্য আগ্রহ দেখাতে হবে। কোনো মানুষেরই স্মৃতিশক্তি কম নয়। পাগলের স্মৃতিশক্তি জট পাকানো। নিজের আস্থার ওপর নির্ভর করে স্মৃতিশক্তির মাপকাঠি। আস্থা যখন দৃঢ় হয় স্মৃতিশক্তি তখন প্রখর হতে থাকে। ঘটনার সাথে নিজের শিক্ষাটাকে মিলিয়ে রাখলে কোনো কিছু মনে রাখতে সুবিধা হয়। মানুষ যখন সানন্দে কোনো কিছু গ্রহণ করে তখন সে মাথা ঘামায়। এর ফলেই ঘটনা বা বিষয়টি স্মৃতিতে গেঁথে যায়।

ভালোবাসা, ঘৃণা, ভয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা, লোভ, অহঙ্কার এসব বিষয়গুলো যখন মানব চরিত্রের মাঝে প্রবল হয়ে ওঠে, তখন মানুষ বাস্তবতা ভুলতে থাকে। মানুষ আবেগের পথে চলতে থাকে। আবেগতাড়িত মানুষগুলো ভয়ঙ্কর। আবেগ যখন প্রবল হয় তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে সমাজ, সংসার, পৃথিবী সবার জন্যই অমঙ্গলের প্রতীক হয়ে ওঠে। এজন্যই আবেগতাড়িত মানুষগুলো বেশি ক্ষতিকর। স্রষ্টা এদেরকে ক্ষমা করেন না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আবেগ কোনোভাবেই যেন চালিকাশক্তিতে পরিণত না হয়। তবে আবেগের সাথে বিবেকের সমন্বয় জরুরি। আবেগ দিয়ে কাজ শুরু হয় কিন্তু বিবেক সেই কাজ এগিয়ে নেয়। আবেগ দিয়ে আমাদের জীবনে অনেক কাজ শুরু হয়েছে কিন্তু বিবেকের সাথে সমন্বয় না ঘটানোর কারণে সে কাজ এক কদমও এগোয়নি, এমন ঘটনা আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কমবেশি ঘটেছে।

বেঁচে থেকে সঠিকভাবে জীবন—যাপন করার ইচ্ছাই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইচ্ছা প্রবল হলে মনো—দৈহিক চাহিদার প্রকাশ পায়। এরপরই মানুষ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাজ সঠিক পদ্ধতিতে হলেই আসে সফলতা। এরপর আসে অভ্যাসের ব্যাপার। যেসব অভ্যাস নিজের কাছে অপ্রিয়, তা বিদায় করাই শ্রেয়। বাজে অভ্যাস ধরে রাখার মতো বোকামি মনে হয় দ্বিতীয়টি নেই। অথচ আমরা তাই করি। এই যে নিজের মধ্যে পরিবর্তন ঘটানো, নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়া এটা খুবই জরুরি। মানুষ পরিবর্তন গ্রহণ না করলে এখনো গুহাতেই বসবাস করত। যারা পরিবর্তন করতে চায় না, পরিবর্তন জানে না তারা স্থবির। তারা মৃত্যুর অপেক্ষায় বেঁচে থাকে। তাদের দলে নিজেকে কখনই অন্তর্ভুক্ত করবে না। তাই পরিবর্তনকে সাদরে গ্রহণ করা উচিত। এটা বলিষ্ঠ মানসিকতার পরিচয়। যারা নিজেদেরকে ভালো হওয়ার লক্ষ্যে পরিবর্তন করেছে তারাই সফল হয়েছে। আর যারা নিজেদের ঊমড় বা খেয়ালখুশিকে প্রায়োরিটি দিয়েছে তারা ধ্বংস হয়েছে। মনে রাখবে, ইগোর মৃত্যু মানেই আত্মার জাগরণ। স্বয়ং খোদ আল্লাহ বলেছেন, ‘তুমি তোমার খেয়ালখুশিকে প্রভু বানিও না।’

মানুষের যুক্তিবাদী চিন্তার নিচেই বসবাস করে অযৌক্তিক অনুভূতি। মানুষ যখন অযৌক্তিক অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তখনই সে সফলতা অর্জন করে। এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা হচ্ছে মহৎ কাজ। আর সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য চাই ইতিবাচক পরিবর্তন। মানুষের ভেতরে রয়েছে দু’টি সত্তা। একটি আত্মা এবং অন্যটি রিপু বা জৈবিক তাড়না। আত্মা ভালো এবং সুন্দরের দিকে যায়। জৈবিক তাড়না খারাপে তুষ্ট হয়। যার আত্মা শক্তিশালী সে ভালো মানুষ, সমাজের জন্য সে উপকারী। আর যার রিপু শক্তিশালী সে দুষ্ট মানুষ, শয়তান তাকে পরিচালিত করে। সে সমাজ এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর। এ দুটোকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং এদের মাঝে সমন্বয় করা জরুরি। শান্তির জন্য জরুরি হলো নিয়ন্ত্রিত জীবন। অবচেতন বা অচেতন মন নিয়ে বড়ো বড়ো মনোবিজ্ঞানীরা কথা বলেছেন। এটাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। মানুষের অনেক কাজেরই ব্যাখ্যা নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে নিয়ন্ত্রণহীন কাজ অকাজেই পর্যবসিত হয়।

বাস্তবে আমরা নিজেরা যা ভাবি আসলে আমরা তাই। আমাদের স্বাভাবিক ক্ষমতা আমাদের এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। মন ও শরীরকে বুঝিয়ে চলতে পারলে সফলতা অর্জন সহজ হয়ে ওঠে। ইচ্ছাশক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে মন ও দেহকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়। মাথা ছাড়া যেমন কল্পনা করা যায় না তেমনি কোনো কিছু পাওয়ার প্রবল ইচ্ছে না থাকলে সে জিনিসটি লাভ করা যায় না। ইচ্ছাশক্তিই মূলত মানসিক শক্তির ভিত্তি গড়ে দেয়। তাই মানসিক অবস্থার উন্নয়ন করা আমাদের প্রত্যেকেরই প্রাথমিক দায়িত্ব। দুর্বলচিত্তের মানুষ সামনে এগোতে পারে না, সে পাঁচ কদম এগোলে সাত কদম পিছিয়ে যায়, সে যতই প্রতিভাবান হোক না কেন। পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। তীব্র প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়েই পৃথিবীতে আমাদের আগমন ঘটেছে। নিজের মধ্যে প্রতিযোগী মনোভাব না থাকলে কেউ কাউকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে না। সামনে যাওয়ার প্রাথমিক ধাক্কা বা Starting করে দিতে পারে আপনজনরা। সামনে এগোতে হয় নিজেকেই। নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়, কেউ কাউকে পথ তৈরি করে দেয় না। মানুষ একাকীই নিজের স্থান নির্ণয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। জীবনের সবচেয়ে বড়ো জয় কী জানো? জীবনের সবচেয়ে বড়ো জয় হলো এমন কিছু করে দেখানো, যা সবাই ভেবেছিল তুমি কখনই করতে পারবে না।

পারা আর না পারা আমি পারব আর আমার দ্বারা সম্ভব নয়, এ সবই মানসিকতা আর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। মানুষকে মহান স্রষ্টা অনেক যোগ্যতা দিয়েছেন। এসব যোগ্যতাকে ব্যবহার করে সফলতার পথে এগোতে হয়। আমি পারি এবং আমি পারব কথাটি যারা বলে তারা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়। মনের দৃঢ়তার ওপরই পারা না পারা নির্ভর করে। সমাজের বেশির ভাগ মানুষই না পারার দলে। তাই আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর মনোবল ছাড়া সামনে এগানো সম্ভব নয়।
আমাদের অনেকেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা, বিপত্তি, প্রতিকূলতা, সংশয় এবং দুশ্চিন্তার মাঝে পতিত হয়। তবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু হলো আমাদের সংশয়। যা আমাদের পক্ষে করা সম্ভব ছিল সংশয় আমাদেরকে তা থেকেও দূরে রাখে। আমাদের যাদের দৃঢ়বিশ্বাস, শক্তি ও ক্ষমতা আছে তাদের কাছে বাধা, বিপত্তি, সংশয় ও প্রতিকূলতার কোনো স্থান নেই। মানুষের দুর্বল দিক হলো হীনম্মন্যতা। যার মাঝে হীনম্মন্যতা আছে তাকে দিয়ে অতি সহজ কাজ করানোও সম্ভব নয়।
হীনম্মন্যতা হলো এই ধারণা যে, আমি অন্য মানুষটির মতো উপযুক্ত নই। আমার বুদ্ধি, শক্তি, ক্ষমতা, পদ—পদবি, অর্থসম্পদ, শিক্ষা ও যোগ্যতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আমি পারি না এবং পারব না। আর অন্য মানুষটি পারে এবং পারবেও। হীনম্মন্যতা থেকে জন্ম নেয় হতাশা। এরপর আসে জীবনের প্রতি অনীহা এবং বিতৃষ্ণা। হীনম্মন্যতা থেকে সব রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। মানুষ দুর্বল, ব্যর্থ এবং তেলাপোকারূপী প্রাণীতে পরিণত হয়।

আমাদের চরিত্রে একটি মানসিক রোগ প্রবলভাবে বাসা বেঁধেছে তা হলো অতি সহজেই কোনো কিছুতে হার মেনে নেওয়া। লড়াই করার মানসিকতা আমাদের একেবারেই নেই। অথচ জীবনের এক নাম রহস্য আরেক নাম সংগ্রাম। প্রকৃত যোদ্ধারা কখনই হাল ছাড়ে না। কারণ তারা জানে সময় যখন সবচেয়ে খারাপ যায় তখনই স্রোত নতুন দিকে মোড় নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ প্রসঙ্গে টমাস আলভা এডিসন একটা চমৎকার কথা বলেছেন, ‘অনেক মানুষ ব্যর্থ হয়েছে শুধু হার মেনে নেওয়ার কারণে। অনেকেই হার মেনে নেওয়ার সময়ে বুঝতেও পারেনি তারা বিজয়ের কতটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।’
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আপনার এত বড়ো সাফল্যের গোপন সূত্রটা কী? চার্চিল জবাব দেন ‘আমার সাফল্যের গোপন সূত্র হলো আমি কখনও হার মানি না।’
ইংল্যান্ডের জাতীয় কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র বলেছেন, ‘সাফল্যের তিনটি শর্ত
অন্যের থেকে বেশি জানুন
অন্যের থেকে বেশি কাজ করুন
অন্যের থেকে কম আশা করুন।

লোকমুখে কথা শুনে কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া চরম বোকামি। এমন কোনো কাজ করবে না, যার জন্য ভবিষ্যতে আফসোস করতে হয়, মনঃকষ্টে পড়তে হয়। বন্দুকের গুলি বের হয়ে গেলে যেমন তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। আমাদের মুখের কটুকথাও তেমনি। এজন্য মুখ খোলার সময় আমরা সাবধানতা অবলম্বন করব। যা জানি না সে বিষয়ে কথা বলব না। চুপ থাকাই নিরাপদ। সুস্থ বিনোদনে অংশগ্রহণ করব। যে বিনোদন আমার চরিত্রকে কলুষিত করতে উৎসাহ জোগায় তা থেকে বেঁচে থাকব। আমি লক্ষ্য স্থির করে পথ চলব। পথে বাধা এলেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হব না। তবে বাস্তবতার নিরিখে যৌক্তিক পরিবর্তন সাদরে গ্রহণ করব। জীবনের কোনো স্তরে ব্যর্থতা আসতেই পারে। সেই ব্যর্থতাকে নতুন করে আবার কোনো কাজ শুরু করার সুযোগ হিসেবে ভাবতে হবে।

বর্তমান সময়ে সব কর্মপদ্ধতিই পরিবর্তনশীল। এজন্য প্রতিটি কাজে বেশ ক’টি সমাধান বা রাস্তা থাকাই স্বাভাবিক। এজন্য বাস্তবতা এবং সহজ পন্থা অবলম্বনই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে, অপরের ক্ষতি করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করা জঘন্যতম অপরাধ ও অমার্জনীয় পাপ। এ বিষয়ে দৃঢ় মনোভাব পোষণ করা জরুরি। স্রষ্টা সব কিছুই অবলোকন করছেনÑ তিনি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। স্রষ্টাকে পাশ কাটানোর মতো দুঃসাহস দেখানো সৃষ্টির জন্য চরমতম অপরাধ। স্রষ্টায় বিশ্বাসী হয়ে সত্যাশ্রয়ী থাকাতেই মঙ্গল। বেশি পেতে চাই, বেশি খেতে চাই, দ্রুত পেতে চাই, সহজ পন্থায় সফলতার পথ খোঁজা চরম বোকামি। স্বাভাবিকভাবে অর্জন করলে সব প্রাপ্তিই গ্রহণযোগ্য হয়, এতেই বেশি তৃপ্তি। সহজ সরল পথই আসল পথ। মধ্যম পন্থাই উত্তম পন্থা। স্রষ্টায় আস্থা রাখাই আসল মঙ্গল। সুখ, শান্তি ও সফলতার আসল মালিক মহান স্রষ্টা। তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে হবে। তাঁর কাছেই সদাসর্বদা চাইতে হবে। তিনি যদি মানুষকে কিছু দিতে চান তাহলে অন্যের দেওয়াটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বান্দাকে তিনি অন্য মানুষের মতো দেন না, মালিকের মতোই দেন। সঠিকভাবে চাইতে পারলে মহান স্রষ্টা কাউকে ফিরিয়ে দেন না। এজন্যই স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপনই হলো আসল সফলতা। সুন্দর জীবন মানেই সফল জীবন।

SHARE

Leave a Reply