Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস নো ম্যানস ল্যান্ড -আহমদ মতিউর রহমান

নো ম্যানস ল্যান্ড -আহমদ মতিউর রহমান

নিস্তব্ধ আরাকান। যেন এক মৃত জনপদ। রাত দুপুর। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাংলাদেশ মিয়ানমার যুদ্ধ লাগবে লাগবে করেও লাগেনি। মিয়ানমারের আগ্রাসী তৎপরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ অনেকটা চুপচাপ। যুদ্ধ লাগলে কেমন হতো? নো ম্যান্স ল্যান্ডে বসে কল্পনা করার চেষ্টা করে মায়মুনা। বয়স বারো। অতি সাধারণ একটি রোহিঙ্গা পরিবারের কন্যা। আরাকান থেকে উচ্ছেদ হয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে।
মায়ের মুখটা মনে পড়ে মায়মুনার। আগে আম্মা বলতেন—
: বুঝলেন মায়মুনার আব্বা, আল্লাহ আমগোর একটা জিনিস দিছেন, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। রূপ গুণত বেকগিন সুন্দর আমগোর মেইয়া। মেয়ের প্রশংসা নিজেই করতেন মায়মুনার মা। শুনে বাবা মোহাম্মদ সলিম হাসতেন।
: তাতো তো হাছাই কইছো মায়মুনার মাও, সুখ কি আমাগো কোয়ালত আইয়ের? আল্লা আল্লা কইরা মাইয়াডার একটা ভালা বিয়া দিতে অইব। এটা বলতেন ঠিকই তারপর চুপসে যেতেন মায়মুনার বাবা। তার মনে হাজার চিন্তা। কী থেকে কী হয়ে গেল! কতো আরাকানি মুসলমান নারী পুরুষ ২৫ আগস্টের ঘটনার পর বাড়িঘর ছেড়ে বাংলাদেশে চলে গেছে।
মায়মুনার মা রোশনারা। ইয়ন মিয়ং তার বমীর্ নাম। স্বামীর উত্তর রোশনারার ভালো লাগতো না। তিনি বলতেন—
: আপনি বিয়া বিয়া কইরেন না তো! এতটুকুন মেইয়া কি বিয়া দিমু?
এর পর আরো কতগুলো মাস পার হয়ে গেছে। এখন কঠিন বাস্তব মায়মুনার সামনে। চোখের সামনে মা রোশনারাকে বমীর্ হানাদারদের দ্বারা সম্ভ্রমহানি হতে দেখেছে। ভাবতে গেলেও গা ঘিন ঘিন করে মায়মুনার। তার মা, প্রতিবেশী হালিমা খালা, সুফিয়া ফুপু, উত্তর পাড়ার ফুল বানু, শামসি আরা, বিলকিস বানুসহ দশবারো জন মহিলাকে বেয়নেটের মুখে ধরে নিয়ে গেল বমীর্ বাহিনী। সবাই তখন থরথর করে কাঁপছে আর আল্লাহর নাম জপছে। ছিল সীমান্ত রক্ষী লুন্টেন বাহিনী ও রাখাইন নেতারাও। অসহায় মহিলারা ধান খেতের আল বেয়ে ওদের কথা অনুযায়ী দূরে রাখা সেনা জিপের উদ্দেশে হেঁটে যাচ্ছিল। তাদের মনে মনে ছিল আতঙ্ক। বাতাসে দোল খাচ্ছিল ধান খেতের চিরল চিরল পাতা, অপুষ্ট ধানের ছড়া। ওরা কি টের পেয়েছিল এই অসহায় মহিলাদের আসন্ন দুর্যোগের কথা?

২.
মায়মুনার কাছে সব দুঃস্বপ্ন। ওর আর ওর ছোট দুই ভাইয়ের বেেঁচ যাওয়া, এইখানে আশ্রয় পাওয়া। বাবা ও দাদাকে ওরা মেরে ফেলতে দেখেছে। ঝোপের পাশে লুকিয়ে তিন ভাই বোন দেখেছে এই পৈশাচিক দৃশ্য। মিয়ানমার বাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে ওদের বাবা সলিমের রাখাইন বন্ধু উ খিউ চাচা। ছি ছি ছি। ওর বাবার সঙ্গে সম্পর্ক এত ভালো ছিলÑ সবাই বলবে দু ভাই। সেই খিউ চাচা কি না ….। একবার মায়মুনা ভাবে পেছনের কথা চিন্তা করে কী লাভ? চিন্তাটা তবু চলে আসে। ওদের বড় দু ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে লুন্টেন বাহিনী। শুনেছে ওদের মেরে ফেলেছে। আর মাকে? আর তার সাথে থাকা নারীদের! সেটা ভাবতে গিয়ে গা গুলিয়ে আসছে আবার। বমি আসছে। ছি! সড়ক পর্যন্ত তাদেরকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে খোলা জিপে আর রাস্তায়, কিংবা ঝোপের আড়ালে নিয়ে রোশনারাসহ সবাইকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে লাশ রাস্তার পাশে খালে ফেলে দিয়েছে। এসব বর্ণনা দিয়েছেন বেঁচে আসা আকিয়াবের উত্তর পাড়ার এক নারী। মায়মুনা তাকে চেনে।

যুদ্ধ লাগলে দু’ দেশের বিমান ও কামানের গোলার আঘাতে আর নিচে জ্বলতে থাকা আগুনে রাতের নিকষ কালো অন্ধকার হয়তো কমতো। ওরাও যদি গোলার আঘাতে উড়ে যেত সেটাই ভালো হতো! ভাবছে মায়মুনা। পনের দিন হলো জনা পঞ্চাশেক রোহিঙ্গা আরাকানের উত্তর প্রান্তের বাংলাদেশ সংলগ্ন এই ঢিবির মধ্যে বসে আছে। ফিরে যেতে ভয়, বমীর্ সেনারা মেরে ফেলবে।
মায়মুনার বাবা ও দাদাকে গুলি করে মারার পর মশাল দিয়ে ওদের ঘর বাড়িতে আগুন দেয় খিউ চাচা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। মাকে তো ধরেই নিয়ে গেল। ওরা ঝোপের পাশে লুকিয়ে সব দেখতে পেয়েছে আর থর থর করে কেঁপেছে। করার কিছুই ছিল না। তিন ভাইবোন অন্য আরো শত শত রোহিঙ্গার সাথে ধান খেতের আল বেয়ে বেয়ে রাতের আঁধারে নৌকাঘাটে এসে পেঁৗছে। ওরা জেনেছে এই জায়গাটাকে বলে নো ম্যান্স ল্যান্ড। দুদেশের মাঝখানে মনুষ্যবিহীন এলাকা। এখানে যারা আছে অধিকাংশই মুসললমান, তবে কয়েকটি হিন্দু পরিবারও রয়েছে। যুদ্ধে সংঘাতে হিন্দু মুসলমান আলাদা করার কিছু নেই। যুদ্ধের আর আগ্রাসনের কাজই হলো সবাইকে ধ্বংস করা।
ভাই দুটোর দিকে তাকায় মায়মুনা। ফ্যাকাসে কয়েক দিনের না খাওয়া চেহারা। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশী সেনারা এসে দু’বেলা কিছু খাবার দিয়ে যায়। তা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। ওরা কোন দিন পায় কোন দিন পায় না। না পেলে অভুক্তই থাকতে হয়। আজলা ভরে নাফ নদ থেকে তুলে পানি খায় মায়মুনা। তবে এখন আর এই পানি খাওয়া যায় না। পানিতে রক্তের গন্ধ।
কী দোষ তাদের? তারা শতশত বছর ধরে আছে আরাকানে। এখন নাম দিয়েছে রাখাইন। আগের অনেক কিছুই আর নেই। তাদের পরিচয় ছিল মুসলিম। এটা কি অপরাধ? যদিও প্রত্যেক আরাকানির মুসলিম নামের পাশাপাশি একটি করে বমীর্ নাম থাকা চাই। রাখাইন বা বার্মিজদের সঙ্গে কথা বলার জন্য এই ভাষা। নিজেদের ঘরে মক্তবে আরবি ভাষার পাশাপাশি চলতো তাদের নিজেদের আরাকানি ভাষা। সেই ভাষায় আছে গান ও কবিতা। সেগুলো শেখানো হতো ছেলে মেয়েদের। কখনো কখনো ওরা কবিতা পড়তো, গান গাইতো। কখনো আনন্দের গান, উদ্দীপনার গান। কখনো কখনো দুঃখের গান। হামদ নাত।
কয়েক বছর আগের ঘটনা। কোন এক বাহানায় রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা শুরু। গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল মিয়ানমার সেনারা। দেশের নতুন নেত্রী অং সান সু চিকে সবাই ভালো বলে মনে করেছিল। কিন্তু না, সেও বিষদাঁত বের করে কামড় বসালো। মা বলতেন—
: সু চি জেনারেল অং সানের মেইয়া না ছাই, ডাইনি একখান।
: তোরা জানোস না রে, জেনারেল অং সান আমাগোর মুসলমানগোর কেতা গিন ভালাবাসতেন। ওনার মেইয়াখান সেই গুণ ন পাইয়ের। মিছা মিছাই এদ্দিন আঁরা আশাত আছিলাম। আমাগোর আশার গুড়ত বালি পইরে বৌ মা। দাদা বলতেন।
তারপর যা হলো। প্রাণের ভয়ে ছুটে পালালো লাখ লাখ রোহিঙ্গা। পাশের দেশ বাংলাদেশে। অল্প কিছু গেল থাইল্যান্ড মালয়েশিয়া।
: আফা রে। এট্টু পানি দে। ধড়মড় করে জেগে ওঠে ছোট ভাই বশির। একটা বোতলে সামান্য পানি ছিল।
: এই নে। খেয়ে ঘুমা।
: আফারে, আতকা মা’র কথা মনত পইরের। মার মুখখান ভুলত ন পারির। মা তঁুই কই? এই বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে বশির।
: ও সব ভাইবা আর কাজ নাই। নে পানি খাইয়া অহন ঘুমা। মায়মুনা আবার তাড়া লাগায়। কতক্ষণ কাঁদে। তার পর বস্তার ওপর ঘুমিয়ে পড়ে বশির। ওর আরেক পাশে আরেকটি বস্তার ওপর ঘুমিয়ে বড় ভাই ইব্রাহিম। রাত তখন কত হবে? দুটোও হতে পারে তিনটেও হতে পারে। শুধু মায়মুনা জেগে আছে।
এখন ওদের একটাই স্বপ্ন বাংলাদেশে ঢোকা। সেটা কি সম্ভব হবে? গতকাল বাংলাদেশী সেনারা সাহায্য দেওয়ার সময় শাসিয়ে গেছে। আর কোন রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ওদের চাওয়া ওপার যাওয়া, সেটা বোধ হয় আর হবে না এটুকু বুঝতে পারে মুনা। এর মানে নির্ঘাত মৃত্যু।

৩.
ক্রমশ আকাশ ফসার্ হয়ে আসে। দেখা দেয় দূরের পাহাড়। নলখাগড়ার বন। লাল মাটির ঢিবি। আহা এগুলো কোথায় ছিল সারা রাত। ভাবে মায়মুনা। মনে পড়ে ওদের বাড়ির কাছে একটা ছোট্ট পাহাড় ছিল। সবাই বলতো কাটা পাহাড়। এই নাম হওয়ার দুটো কারণ। একটা হচ্ছে অনেকেই পাহাড় কেটে মাটি এনে ঘরবাড়িতে লাগাতো। আর একটা হচ্ছে যখনো যুদ্ধ বাধেনি, তখন দুষ্ট লোকেরা বা রাখাইনরা সেই পাহাড়ে নিয়ে মানুষ কেটে হত্যা করতো। সে থেকেই এই নাম। আকিয়াবে উত্তর পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, আহমদবাগ, নামা পাড়া, জাইলা পাড়া কত গ্রামের নাম। সবই ছিল সবুজ সবুজ গ্রাম। রোহিঙ্গারা রাখাইনরা প্রাণপাত করে সেখানে ফসল ফলাতো। কই সে সময় তো তেমন বিরোধ ছিল না বৌদ্ধ রাখাইন আর রোহিঙ্গা মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে। আহ সে সব এখন বাসি কথা, পুরনো দিনের গল্প। ভাবলে অবাক লাগে!
ক্ষিদেয় পেটে মোচড় দিয়ে উঠছে। গতকাল যা যা শুকনো খাবার দিয়েছিল বাংলাদেশী সেনা আর সাহায্য কমীর্রা তা দু’ ভাই ইব্রাহিম আর বশিরকে খাইয়েছে মায়মুনা। আগের দিন সামান্য খেয়েছিল, আজ তার খেতে ইচ্ছে করেনি। আমিনা ফুপু বলছিল —
: মায়মুনা, লাজ করিস না। খাওন লাগলে কইবি।
: না ফুপু, লাগবো না আমরা খাইছি তো। জবাব দেয় মায়মুনা। মহিলাকে ভালো লাগে তার। কে বলবে তার আপন ফুপু নয়। যুদ্ধ আর সংঘাতের এই এক কাজ। সবাইকে আপন করে দেয়। আমিনা ফুপু বুচিডং এর সরদার পাড়ার এক মহিলা। ওদের সঙ্গে এখানে পড়ে আছে। পেছনে রেখে এসেছে স্বামী, দেবর, এক ছেলে ও মেয়ে পরিবানুকে। মেয়েটার বিয়ে হয়েছিল, বাচ্চার মা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। এখন আমিনার কেউ নেই। স্বামী, দেবর আর ছেলে বৌদ্ধদের হাতে মারা পড়েছে। বমীর্ সেনারা ইজ্জতহানি করে মেরে ফেলেছে পরিবানুকে। ওরা পিশাচ, ওদের কোন দয়া মায়া নেই। একটা সন্তান সম্ভবা কিশোরীর সঙ্গে ওরা এই ঘৃণ্য আচরণ করে কীভাবে? পরিবানুর এই হাল দেখে পাগল হয়ে গেলেন ওর স্বামী জুলহাস। জানা যায় পাড়ি জমিয়েছে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে। সেটা আরেক ভয়ংকর যাত্রা। অনেকেই নাকি পৌঁছতে পারে না, মাঝসমুদ্রে মারা পড়ে। জামাই বাবাজির কী হাল জানা নেই আমিনার। মায়মুনার কাছে এসব দুঃখের কথা বলে মাঝে মাঝে মন হালকা করেন আমিনা।
: বশির, উইঠা পড় ভাই। একটা ঝোপের আড়ালে যাইতে হইব। এই হানে থাকন যাইব না, রইদ যেভাবে চড়তাছে। ইব্রাহিম বশিরকে লক্ষ্য করে বলে মায়মুনা। অন্যান্য নারী পুরুষ শিশুরাও উঠতে শুরু করেছে। বশির উঠি উঠি করেও আবার পাশ ফিরে শোয়। যেন তাদের আকিয়াবের বাড়িতে শুয়ে আছে। তার পাশে মায়মুনা এইমাত্র শুয়েছে। নিজেদের জীবনের ওপর ঘেন্না ধরে যায় ইব্রাহিমের। এর নাম জীবন? এর নাম বেঁচে থাকা? থুক। সব ঠিকঠাক থাকলে ও এ বছর ক্লাস সিক্সে উঠতো। হাইস্কুলে। কী থেকে কী হয়ে গেল। কেউ একটা লাঠি ধরলো না প্রতিবাদ করলো না?

৪.
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে। সকালে বাংলাদেশের সেনারা এসে কিছু খাবার দিয়ে গেছে। সেগুলো খেয়ে সবাই হালকা ফিকে হয়ে আসা রোদের মধ্যে বসে আছে। এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, নাফ নদের কাছে মনে হচ্ছে কোন খবর নেই। খরতর বেগে সে আপন মনে বয়েই চলেছে। মানুষের জীবন মরণ কান্না তাতে তার কি আসে যায়? পৃথিবীতে সত্যি অর্থে কে কার? নদীর কান্নাই বা কয়জন শোনে। দূরে দেখা যায় জাহাজ যাচ্ছে। এটা বাংলাদেশের না মিয়ানমারের বোঝার উপায় নেই। অন্য সবার সঙ্গে মায়মুনাও বসে আছে। মনটা একটু উৎফুল্ল। শোনা যাচ্ছে তাদেরকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হতে পারে আজ।
: যা হুনছি তা কি সত্যি রে বুজি? ইব্রাহিমও প্রশ্ন করে।
: হ, চুপচাপ বইসা থাক। যখন অইব দেখতেই পাবি। কথা আর আগায় না। একটা রহস্য থেকেই যায় তার মনে।
ধীরে ধীরে রাত্রি নামে। কারো চোখে ঘুম নেই। কি জানি কী হয়।
ওদেরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার খবর গেছে দূরে মিয়ানমার সেনা ও বর্ডার পুলিশ ক্যাম্পেও। বমীর্ ভাষায় কথা হচ্ছে তাদের মধ্যে। তার বাংলা বিবরণ এ রকম। একজন সাধারণ সেপাই বললো—
: যাক ভালোই হয়েছে, আপদ বিদায় হচ্ছে।
: বিদায় হচ্ছে না ছাই। এগুলো ঠিকই এক সময় ফিরে আসবে। বললেন ওদের ওয়ারেন্ট অফিসার মিন ইউ খিন।
: জি স্যার। স্যালুট মারে সেপাই অং কিন মিন্ট।
: ওপর থেকে অর্ডার হয়েছে, কিল দেম। গোলার আঘাতে যে কটাকে পারো শেষ করে দাও। সাপের বাচ্চাও রাখতে নেই। ওরা আমাদের বহু দিনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

: ইয়েস স্যার, তাই হবে। বলে আবার স্যালুট দেয় মিন্ট।
ভোর চারটা। একটা ট্রলার ভিড়ে আছে চরের পশ্চিম তীরে। একে একে সবাই উঠে বসছে। গন্তব্য বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির। এক খাঁচা থেকে আরেক খাঁচায়। হোক না খাঁচা! জীবন তো বাঁচবে। আচমকা পূবের পাহাড়ের দিক থেকে গোলার আঘাত শুরু হলো। গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে মিয়ানমার বাহিনী। যে যার মতো নিরাপদ হওয়ার বৃথা চেষ্টা করে নো ম্যান্স ল্যান্ডের রোহিঙ্গারা। একটা গোলার আঘাত মায়মুনার পাশ দিয়ে গিয়ে এক রোহিঙ্গা নারী মিনার দেহ ভেদ করে চলে গেল। ভয়ে লুটিয়ে পড়ে মায়মুনা। মহিলার রক্তে লাল নো ম্যান্স ল্যান্ড। আরো কয়েক জনের একই করুণ দশা। একি হলো? তীরে এসে তরী ডুবলো? মায়মুনার আতঙ্ক এখনো কাটেনি। গোলা তাকে না অন্য কাউকে ভেদ করে গেছে সে হুঁশ তার নেই। সে মৃত না জীবিত এটাও ভাবতে পারছিল না যেন। মায়মুনাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে দৌড়ে কোন রকমে ট্রলারে উঠলো ইব্রাহিম ও বশির, সাথে আমিনা ফুপু। গুলির পর গুলি চলছে, গোলার আঘাত এসে পড়ছে পানিতে। এক সময় ট্রলার ছেড়ে দিল। নিকষ কালো অন্ধকারে নৌযানটা এগিয়ে চলেছে নাফের বুক চিরে। পেছনে পড়ে রইল কয়েকটি লাশ, বারুদে পোড়া আরাকান।

৫.
ট্রলার বাংলাদেশ অংশে পৌঁছে গেছে। সামনেই টেকনাফ। বাংলাদেশ মায়ের মতো আশ্রয় দিয়েছে বটে, কিন্তু ট্রলার থেকে টেকনাফের ভূখণ্ডে নেমে কেঁপে উঠেছিল ইব্রাহিমের দেহ। এটা যে কেমন অনুভূতি বুঝাতে পারবে না ইব্রাহিম। মনটা বার বার মায়ের জন্য হাহাকার করে উঠছে। কতক্ষণ মাটিতে বসেছিল বলতে পারবে না। মায়মুনার জ্ঞান ফিরেছে, চোখের সামনে মিনা খালার মৃত্যুদৃশ্য তাকে তাড়িয়ে ফিরছে। ইব্রাহিমের দেখাদেখি কাদায় বসে আছে মায়মুনা ও বশির। একজন নারী ভলান্টিয়ার ও একজন সেনা পরম স্নেহে হাত ধরে টেনে তুললেন ইব্রাহিমসহ তিন জনকে।
: ওঠো আর ভয় নেই। আর কেউ তোমাদের মারতে পারবে না। বড় মিষ্টি লাগলো কথাগুলো। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আবার কেঁদে উঠলো ইব্রাহিম। মায়মুনা ও বশিরও কাঁদছে। পোশাক পরা আর্মি বা নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কে তাদের ধারণাই বদলে গেল। এত দিন তাতমাদো মানে বমীর্ সেনা আর লুন্টেন বাহিনী বা বিজিপি— বমীর্ বডার্র গার্ড পুলিশ বাহিনীর তাণ্ডবই দেখেছে, কোন মনুষ্যত্ববোধ দেখেনি। টেকনাফের কাদামাখা নদীর ঘাটে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবি সেনার আদর মাখা কথা আর ভলান্টিয়ারের স্নেহের পরশ অন্য এক অনুভূতির জন্ম দিল যেন ইব্রাহিমের মনে।
: উঠে এসো খোকা। তোমরা পোশাক পাল্টাবে, নাস্তা খাবে। আর তোমাদের কোন ভয় নেই। আবার হাত বাড়িয়ে দিলেন এক নারী ভলান্টিয়ার। এরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হয়ে কাজ করেন। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে নিয়ে যেতে এসেছেন। এবার মায়মুনা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কাঁদছেন আমিনা ফুপু। কেঁপে কেঁপে উঠছে দশ বছরের বালক ইব্রাহীমের শরীর। রোগা লিকলিকে। বোঝাই যায় পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। প্রাণই বাঁচে না, আবার পুষ্টি! নারী ভলান্টিয়ার ওর হাতটি এখনো ধরে আছেন, আর সাথে সাথে হাঁটছেন। ইব্রাহিম জানতে চাইলো
: আঁরা কই যাইয়ম? বাংলামতো ভাষাই, তবে চট্টগ্রামের মতো টান।
: তোমরা যেখানে থাকবে। সেই ক্যাম্পে। সেখানে খাবার পাবে, থাকার জায়গা পাবে। জামা কাপড় পাবে। ভলান্টিয়ার উত্তর দেন। পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরাও আছে।

একটি বাসে করে ওদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো যেখানে, স্থানটার নাম কুতুপালং। নামটা খুব ভালো লাগলো মুনার। সে জানতে পেরেছে সেখানে আশ্রয় শিবিরে তাদের স্থান দেওয়া হবে। একটা খাড়া পাহাড়ের ঢালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাশে পড়লো নদী। ডান পাশে পাহাড়, বাম পাশে নদী। কী সুন্দর স্থানটা। ওর দৃষ্টি চলে গেল দূরে, নদীর অপর পাড় ছাড়িয়ে বহু দূর। তাহলে ওটাই তাদের দেশ বার্মা, বর্তমানের মিয়ানমার। বার্মা নামটাই এতদিন ছিল, সামরিক জান্তা এসে নতুন নাম দিয়েছে মিয়ানমার। যেমন আরাকানের নাম দিয়েছে রাখাইন। বার্মার সবচেয়ে বড় শহর রেঙ্গুনের নামও পাল্টে দিয়ে করেছে ইয়াঙ্গুন। আর এটা এখন রাজধানীও নয়। রাজধানী সরিয়ে নিয়েছে নেইপিডো শহরে। মায়মুনার পাশে বসেছে আমিনা ফুপু। পেছনের সিটে বসেছে ইব্রাহিম আর বশির। কি জানি একটা পাখি ফুড়–ত করে উড়ে গেল। এমন পাখি আরাকানেও দেখেছে। একই রকমের পাখি রয়েছে তাহলে বাংলাদেশে? অবাক হয় মায়মুনা। আহা পাখিদের কত আনন্দ। তারা জন্ম স্বাধীন। তাদের আলাদা কোন দেশ নেই। আকাশসীমা নেই। বিশাল পৃথিবীর সমস্তটা আকাশই ওদের বিচরণ ক্ষেত্র। সেই সাথে আছে ওড়ার সীমাহীন স্বাধীনতা। এবার পাখি হতে ইচ্ছে করছে মায়মুনার। যদি পাখি হতে পারতো কী মজা হতো।
বাসটা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। তার মানে এসে গেছে নির্ধারিত স্থানে। বিজিবি সেনা আর ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার ভলান্টিয়াররা ওদের নেমে পড়ার নির্দেশ দিলেন।
: আপনারা সবাই আস্তে আস্তে নেমে পড়–ন। সামনে বসার স্থান আছে সেখানে বসবেন। সেখানে নাস্তা খেয়ে নাম রেজিস্ট্রি শেষে নিয়ে যাব ক্যাম্পের ভেতরে। যেখানে আপনারা থাকবেন।
মায়মুনাও তাকালো মহিলার দিকে। জরিনা বুবু, নাসির কাকা, কান্তামনি, ওর মা শৈবালিনী, ভাই সৌমেন্দ্র, পরিচিত আরো কিছু মুখ আস্তে আস্তে বাস থেকে নামছে। ওদের সাথে কয়েকটি হিন্দু পরিবারও আছে। যুদ্ধ আর মেশিন গানের গুলি হিন্দু মুসলমান কেয়ার করে না। ফলে ওরাও থাকতে পারেনি আরাকানে। সমবেত সবার উদ্দেশ্যে ভলান্টিয়ার মহিলা আবার কথা বলে উঠলেন। এবার তিনি তার নাম বললেন — ফারহানা পারভিন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউইনএইচসিআরের কমীর্। তিনি বললেন-
: আপনারা সবাই আমার সালাম নিন। আমাদের গ্রুপের দাছিু¡ আপাতত শেষ। আমরা ফিরে যাবো। এখন থেকে আপনাদের দেখাশোনা করবেন এই স্যার। বলে একটি লোককে দেখালেন। গুড বাই। এ পর্যন্ত বলে থামলেন ফারহানা। এর পর তার টিম নিয়ে বাসে করে ফিরে গেলেন। এরপর একজন ভলান্টিয়ার সবার খাবাব দিয়ে গেল। ওরা খাবার খেতে বসলো। খিচুড়ি। মোটামুটি গরম। আমিনা অর্ধেক খাবার খেয়ে হড় হড় করে বমি করে দিল।
: কি অইল ফুপু তোমার। ক্ষিদা নাই? খাইতা পারলা না। মায়মুনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
ধাতস্থ হয়ে আমিনা বললেন; কিছু নারে মায়মুনা। পেটটা আতকা মোচড় দি উঠলো। খাইবারে ইচ্ছা ন লয়। খাওন পেডত ন যায়। কি গড়িম। পরিস্থিতি দেখে অভ্যর্থনা কেন্দ্রের এর নারী ডাক্তার ছুটে এলেন। আমিনার কথা শুনে আর অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তার বললেন —
: বিষয়টা জটিল। তবে ভয়ের কিছু নেই। আমিনার সাথে আছে তার ভাই জাফর আলম। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। জাফর নো ম্যানস ল্যান্ডে ছিল দক্ষিণ প্রান্তে পুরুষদের এলাকায়।

৬.
হলুদ বিকেল। গাছের পাতা বিকেলের তেরসা রোদের আলোয় ভিন্ন রূপ নিয়েছে। ভিন্ন দেশের এই বিকেলের সাথে আরাকানের বিকেলের কোন পার্থক্য আছে কি? কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সামনে বসে আমিনা তাই ভাবছেন। বমীর্ স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন আমিনা। তখন পরিস্থিতি ভালো ছিল। রোহিঙ্গা বমীর্তে সদ্ভাবও ছিল। বাবা মা এসময় বিয়ে দিলেন আমিনাকে। বর দক্ষিণ পাড়ার মোখতার আলী। শ^শুর ইয়াসিন আলী পুত্রবধূ আমিনাকে খুবই স্নেহ করতেন। আদর করতেন শাশুড়ি রওশনবানু। তার পর এল সেই কঠিন সময়। সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল। তাদের বাড়ি শ^শুরবাড়ি লুট করলো রাখাইন আর পোশাক পরা লুন্টেন বাহিনী।
একদিন সকাল। এলাকার রাখাইন নেতা ইয়ু হান সুন বাড়িতে এসে শাসিয়ে গেল। বাড়ি ছেড়ে ভাগো সবাই। নইলে বিপদ হবে। আমিনার স্বামীর ভালো বন্ধু ছিল হান সুন। কোন বাধায় কাজ হলো না। ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না মোখতারসহ তার ভাইরা আর রোহিঙ্গা যুবকরা। একদিন হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। বাড়ির মেয়েরা অবস্থা বেগতিক দেখে আশ্রয় নিল গোয়াল ঘরের পেছনের জঙ্গলে। চোখের সামনে হানের সাঙ্গোপাঙ্গরা পিটিয়ে মেরে ফেললো মোখতারের দুই ভাই জেয়াদ আলী ও জাওয়াদ আলীসহ কয়েকজন রোহিঙ্গা যুবককে। দুই ভাইকে হারিয়ে সারা শরীরে মারামারির রক্তের দাগ নিয়ে কোন রকমে জঙ্গলে এলো আমিনার স্বামী। মোখতার বললো—
: তোরা এ হান দি পলাই গাঙ্গের ঘাটে যাও গি। নাও আছে, বেবাকগুন নায়ে উঠি যাইবা। আমরা কয়েকটারে মাইরে বাকিগুলারে তাড়াই দিছি। ওরা আবারও আইবো।
: তুঁই। তোয়ার কিতা অইব? ইবা করি কতখন টিকি থাকপা। বললো আমিনা।
: আঁই ভাই দুগার লাশর খোঁজ গড়ি। পাইয়ের তো দাফন দিউম। আঁর কথা চিন্তা ন কর। আব্বা দোকানত আছিল, তারও তো খেঁাজ লওন পড়িব। আঁই কাম শেষ গরি আইউম।
দুই দেবরের মৃত্যুর কথা শুনে কেঁদে ওঠে আমিনা। আর সেই যাওয়াই মোখতারের শেষ যাওয়া হয়েছে। সে আর ফেরেনি। সেদিনও সময়টা বিকেলই ছিল। তাই বিকেলকে আমিনার এত ভয়। ওদের দুই মেয়ে জমিলা ও জাহেদাকে এরও কয়েক দিন আগে মক্তব থেকে কারা যেন ধরে নিয়ে গিয়েছিল। শোনা যায় বমীর্ সেনা আর রাখাইন বাহিনীর কথা। ওরা আর ফিরে আসেনি। নিজের বাবা মা আর শ^শুরেরও কোন খোঁজ পায়নি।
বিজিবি সদস্য আর রোহিঙ্গা সরদাররা কুতুপালং ক্যাম্পের বাইরে এসে নতুন আগত দলকে গ্রহণ করলো। নিয়ে গেলো ক্যাম্পের ভেতরে। আমিনা মায়মুনাদের এক কক্ষেই থাকার ব্যবস্থা হলো। ওদের ৫ জনের সাথে দুটো পরিবার। কুতুপালং ক্যাম্পের থাকার জায়গা সুবিধের নয়। টিনের চালা। একটি রুমে ১০—১২ জন করে থাকতে হয় গাদাগাদি করে। রোহিঙ্গারা শরণার্থী। ওদের জন্য এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কে করবে? দুপুর নাগাদ একটি ভালো খবর এল। আমিনা মা হতে চলেছেন। নতুন অতিথি আসার খবরে ওরা তিন ভাইবোন খুবই খুশি। খুশি আমিনার ভাই জাফর। আমিনার কাছ থেকে এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মায়মুনারা। আমিনার জন্য বরাদ্দ হয়েছে নতুন ঘর। হাসপাতাল জোনে এ ব্যবস্থা। বিদায়কালে আমিনা খুব করে কেঁদেছিলেন। জাতিসংঘের একটি টিম এসে আমিনাকে নানা প্রশ্ন করলো। কী হয়েছিল? কী কী সে দেখেছে। তারা জিজ্ঞেস করছে আর নোট করছে। কেউ কেউ টেপ করছে। রোহিঙ্গাদের ওপর বমীর্ নিপীড়নের প্রত্যক্ষদশীর্ বলে কথা। আমিনা বললেন, বর্মী সেনারা বহু নারীর চূড়ান্ত সম্মানহানি করলেও সে ভাগ্যের জোরে বেঁচেছে। এগুলো বলতে তার লজ্জা করছে। কানের কাছে এসে এক নারী কর্মকতার্ জানতে চাইলেন। তাই সে বলে দিয়েছে। [চলবে]

SHARE

Leave a Reply