Home গল্প খোকনের স্মৃতির ধুলো -কামাল হোসাইন

খোকনের স্মৃতির ধুলো -কামাল হোসাইন

খোকনের নানাবাড়ি গ্রামে। মানে তার দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ি প্রায় কাছাকাছি। মাঝখানে মাত্র কয়েকটা বাড়ি। তারপর নানাবাড়ি। তাই খোকনদের বাড়ি থেকে ওই বাড়ি যেতে পাঁচ মিনিটও সময় লাগে না। আর সে কারণেই খোকনের বেশির ভাগ সময়ই ওর নানা বাড়িতেই কেটেছে।
(খোকন তার দাদাকে দেখেনি। দাদিকেও না। তার জন্মের আগেই তারা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। এক চাচা আছেন। তিনিও গ্রামে থাকেন না। তাই খোকনের কাছে দাদা-দাদি-চাচা বিষয়ে কোনো গল্প নেই। স্মৃতি নেই।)
মামা-খালা আর নানা-নানির আদরে আর দুষ্টুমিতে খোকনের কেটে যেত দিনরাত। ওই বাড়িতে ছোটোবেলায় খোকনের সবচেয়ে প্রিয় ছিল ওর ছোটোমামা। নাম লাল্টু।
আর ছিল আরেক মামা মিন্টু মামা। দারুণ সুন্দর হাতের লেখা ছিল তার। ছবি আঁকতে পারত। বেশ সুরেলা গলা ছিল তার। খুব ভালো গান গাইতে পারত। মিলিয়ে মিলিয়ে বেশ কবিতার মতো ছন্দ কাটত মুখে মুখে। ওই মামার কাছ থেকেই খোকন পরে একটু আধটু ছড়া-কবিতা লেখার চেষ্টা করে এসেছে।
খোকনের হাতের লেখাও মোটামুটি মানের। এই অবদান ওই মিন্টু মামারই। যে খোকনের মামা।

আরো তিন মামা ছিল খোকনের। তারা বড়ো। তাদের তেমন নাগাল পায়নি খোকন।
আর খালাদের মধ্যে ছোটোখালা স্বপ্না। খোকনের মা কিংবা অন্য সবাই এই ছোটো খালাকে খুকি বলে ডাকত। ছোটোখালা খোকনকে খুব আদর করত। গোসল করানো, তেল মাখিয়ে জামাকাপড় পরিয়ে ভাত খাওয়ানো, কোলে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো— এসবই ছিল ছোটোখালার নিত্যদিনের কাজ। মোটামুটি কোলেকাঁখে করেই মানুষ করেছে খোকনকে এই খুকি খালাই।
খোকনের নানা আবদুস সোবহান খান। ডাকনাম রনু খা। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। সরল মানুষ হিসেবে তার সমধিক পরিচিতি ছিল। আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষ তাকে এক নামে চিনত। সমীহের চোখেও দেখত সবাই।
শুরুতে সেকালে খোকনের নানা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করতেন। পরে তার বাবার ইচ্ছেয় তিনি সেই চাকরি ছেড়েও দেন। সে সময় নানাদের অনেক জমিজমা ছিল। সেগুলো দেখাশুনা করলেই সারাজীবন কেটে যাবে, তার আবার চাকরি করতে হবে কেন? এই যুক্তিতে তার বাবার কথায় চাকরি করেননি নানা। এর অনেক পরে অবশ্য তিনি পোস্ট অফিসে চাকরি নিয়েছিলেন।

খোকনের এই নানা ভীষণ বইয়ের পোকা ছিলেন। দেশ-বিদেশের নানা রকম বই তার সংগ্রহে ছিল। তার কাছেই খোকন দেখেছে, হাজার এক আরব্য রজনী, দাতা হাতেম তাই, পারস্য উপন্যাস, নানারকম রূপকথার বই, ঠাকুরমার ঝুলি, আর দেখেছে জিম করবেটের দুঃসাহসিক শিকার কাহিনির রোমাঞ্চকর যত বই। হরেক রকম বইয়ের ভেতর শিকার কাহিনি ছিল নানার ফেভারিট।
নানা এসব বই নেশার মতো পড়তেন আর সেসব কাহিনি থেকে মাঝে-মাঝে খোকনের কাছে গল্প করতেন। সেই মজাদার, আবার কখনো ভয়ধরানো গল্প শোনার লোভে প্রায় সন্ধ্যায়ই নানার ঘরে ঢুঁ মারত খোকন।
নানা নিজেও বন্দুক দিয়ে শিকার করতেন। সেই শিকার কাহিনিও নানা কখনো-কখনো খোকনকে শুনিয়েছেন। সেসব গল্পের কোনোটায় চরম আনন্দ মেশানো, কখনো ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়ার গল্প। ভয়ের গল্প শুনে কতদিন নানার ঘর থেকে মামাদের ঘরে ফিরতেও এক পা ওঠাতে পারেনি খোকন। ভয়ে অজানা আশঙ্কায় ঘুম হয়নি সারাটা রাত। এই ভয়ের প্রভাবটা টানা কয়েকদিন থেকে যেত খোকনের মনের ভেতর।

খোকনের নানা এক গাছপাগল মানুষও বটে। নানাদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে অনেক গাছপালা। ফলের গাছ, ঔষধি গাছের পাশাপাশি অনেক কাঠজাতীয় গাছও ছিল। আম, জাম, জলপাই, বরই, গাবসহ কত না গাছ। কাঁঠাল গাছের আলাদা একটা বাগান ছিল নানার। সেখানে অনেক জাতের কাঁঠাল গাছের সমাহার ছিল।
খোকনের নানাদের বাগানে একটা বড়োসড় গোলাপজাম গাছ ছিল। শীতের মাঝামাঝিতে মনকাড়া বাহারি সুগন্ধিযুক্ত ফুল ফুটত সেই গাছে। তারপর একসময় জাম আসত গাছে। পাকা জামের কী মনোকাড়া গন্ধ! খেতেও অসাধারণ। খোকন সেসব অন্য বন্ধুদের সঙ্গে মনের আশ মিটিয়ে খেত।
খোকনের নানাদের রান্নাঘরের পেছনে ছিল দুটো পেয়ারা গাছ। খোকনের নানা নিজহাতে লাগিয়েছিলেন সেই গাছ দুটো। একটা গাছের পেয়ারার আকার ছিল একেবারে বোতলের মতো। প্রচুর ধরত। সারা বছরই পেয়ারা থাকত সেই গাছে। পেকে হলুদ হয়ে থাকত। সুস্বাদু সেই পেয়ারা পাড়ার সবাই যে যার মতো পেড়ে খেত। এই পেয়ারার গাছটা তেমন ঝোপালো নয়। খাড়া গাছ। উঠতে বেশ বেগ পেতে হতো। সেই গাছে ওঠা সবার কর্ম নয়।

অন্য যে পেয়ারা গাছ, সেটা বেশ ঝোপালো। ঘন পাতায় ছাওয়া। মাঝারি সাইজের পেয়ারা হতো। পাকলে ভেতরটা প্রায় টকটকে লাল। খোকনরা এটাকে বলত, কাসি পেয়ারা। এই পেয়ারাও কচকচা আর খেতে দারুণ মজার ছিল। খোকনের খুব প্রিয় ছিল এই পেয়ারা। এই পেয়ারা খাওয়ার জন্য সবাই বেশ মুখিয়ে থাকত।
ছিল জামরুল গাছ। ভরা বর্ষায় গাছ সাদা করে বেশ বড়োসড় জামরুল ধরত। কেবল ডাল নয়, গাছের মোটা কাণ্ডেও ধরত সাদা সাদা জামরুল।
এই জামরুল গাছ থেকে পড়ে একবার খোকনের বাম হাত মচকে গিয়েছিল। খুব ব্যথা পেয়েছিল সেদিন। হাত ফুলে হয়েছিল বালিশ।
মচকে যাওয়া হাত নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গেলে খোকনের মা তার পিঠে বেশ কয়েক ঘা লাগিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন। কারণ, খোকন গাছে ওঠায় তেমন পটু নয়। তবু কেন সে গাছে উঠতে গেল, এই হলো অপরাধ।
হলুদ আর চুনের মিশেলে একটা প্যাক তৈরি করে খোকনের মা সেই মচকানো হাতে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। এক রাত জ্বালা-যন্ত্রণায় খুব কষ্ট হয়েছিল তার। ঘুমাতে পারেনি খোকন সেদিন।

নানার বাড়ির আশপাশে বেশকিছু আমগাছ ছিল। সে গাছগুলোর নাম বেশ মজার। যেমন, পিঁপড়ে আম, পোকাড়ে আম, পানতরাসে আম, তিলে আম, লালমুখো আম, আর ফজলি, ল্যাংড়া আম তো ছিলই।
কাঁচা আমের স্বাদ নিতে চৈত্র মাসের মেলা থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত খোকনদের। তাদের গ্রামের পাশের গ্রাম বেলেডাঙার বাজারের চাঁদনিতে বসত এই মেলা। দা, বঁটি, খন্তা, ছুরি, চাকু, কাঠের গাড়ি, কাঠের পুতুল, মাটির হাঁড়ি, বাঘ, হাতি, ঘোড়াসহ নানারকম হস্তশিল্পের জিনিসপত্র পাওয়া যেত এই মেলায়। সেই সঙ্গে গুড়ের জিলাপি, বাতাসা, গজা, রসমুণ্ডু, রসোগোল্লা, বন্দেল ইত্যাদি মিলত মেলায়। তিনদিন ধরে চলা সেই মেলা থেকে ছুরি-চাকু কিনে নিত খোকনসহ ওর বন্ধুরা কাঁচা আম কাটার জন্য।

আমের আঁটি বাঁধার আগে আগে কাঁচা আম শুকনো মরিচ আর লবণ পিষে বানানো মশলায় ভরদুপুরে খাওয়ার সে কী মজা! প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে ছুরি-মশলা নিয়ে আম বাগানে দে ছুট। তারপর কলার কচিপাতায় কাঁচামিঠে আম কেটে মশলা মাখিয়ে তৃপ্তি নিয়ে খেতে খেতে অনেক সময় চলে যেত। এরপর মামাদের দিঘিসদৃশ তালপুকুরে অনেকেই প্যান্ট খুলে পাড়ে রেখে ঝপ্পাস!
দলবেঁধে পুকুরে ডুবসাঁতার করতে করতে চোখজোড়া কানাকুয়ো পাখির মতো হয়ে যেত। তাও যেন ওঠার নাম থাকত না কারো।

তবে হ্যাঁ, ডাক্তার মামার উপস্থিতি টের পেলেই আর রক্ষে নেই। যে যেমনি পারত দে দৌড়। তিনি খোকন শুধু নয়, পানিতে অতিরিক্ত কারো ঝাঁপাঝাঁপি দেখলেই লাঠি হাতে তাড়া করতেন। আর যদি তার গোসলের সময় এই অবস্থা দেখতেন, তাহলে পানিতে নেমেই যাকে পেতেন তাকে ধরেই পিটনি লাগাতেন।
খোকন কতবার যে এই পিটনি থেকে বাঁচতে পুকুরের পাড়ে প্যান্ট রেখেই পালিয়েছে, তার হিসেব নেই। ওই সময় তিনি যে কাউকে পিটিয়ে দিলেও পাড়ার অভিভাবকরা কেউ কিচ্ছু বলত না। তার মানে সমাজে যারা বড়ো ছিলেন, তাদের সকলেরই ছোটোদের শাসন করার অলিখিত একটা অধিকার বিদ্যমান ছিল। বড়োরা ছোটোদের অনায়াসে শাসন করতে পারতেন। তাতে কেউই কিছু বলত না। মানে গোটা সমাজে একটা নিয়মের বলয় ছিল। বড়োদের সম্মান করতে হবে, এটা সবাইকে পারিবারিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হতো। তাই তখন সবাই বড়োদের সম্মান ও ভয় করত। খোকনও তাই ওই ডাক্তার মামার হাত থেকে রেহাই পায়নি। সেই ডাক্তার মামার প্রতি এই বড়ো বয়সেও সেই ভয়মেশানো শ্রদ্ধা এখনো অটুট রয়েছে।
খোকন তার নানাকে কখনোই সাইকেল চড়তে দেখেনি। অনেক দূর দূর রাস্তা হেঁটেই পার করে দিয়েছেন। নিতান্ত হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়, বা সময়ে কুলাবে না এমন হলে গাড়িতে বা ট্রেনে চড়ে যেতেন।

একবার খোকন তার নানার সঙ্গে ট্রেনে চেপে খুলনা গিয়েছিল। এই ছিল তার জীবনের সবচে দূরের যাত্রা। যেদিন খুলনা যাওয়া হবে, সেদিন রাত তিনটার সময় বাড়ি থেকে হেঁটে ৮ মাইল দূরের শহর কালীগঞ্জে ট্রেনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল তারা। সকালের মধ্যে প্লাটফর্মে পৌঁছতে হবে। না হলে সেই ট্রেন ধরা যাবে না। শাহ মখদুম না কি রূপসা জানি নাম ছিল সেই ট্রেনের। এতদিন পর ঠিক সেই নাম মনে নেই খোকনের।
সেদিন একটা অযাচিত ঘটনাও ঘটেছিল। যে ঘটনার কথা এখনো খোকনের মনে রেখাপাত করে আছে। সঙ্গে ছিল খোকনের বড়ো নানার ছোটো ছেলে লাল মামা। ওই যাত্রায় সেও খোকনদের সঙ্গে শামিল হয়েছিল।
খোকনের লাল মামা অন্যদের মতো নয়। শরীর-স্বাস্থ্যে স্বাভাবিক হলেও তার একটা ব্যাপারে প্রতিবন্ধিতা ছিল। এখনো আছে। জন্মের পর থেকেই সে অন্যদের মতো কথা বলতে পারে না। মুখে কিছু শব্দ সে উচ্চারণ করে বটে, তা ঠিক বোঝা যায় না। অনেকক্ষণ শোনার পর কিছু উদ্ধার করা গেলেও পুরোপুরি কোনোভাবেই বোঝা সহজসাধ্য নয়। অজানা-অচেনা কেউই তার কথা বুঝতে পারত না। জানাশোনা অনেকেই যা বুঝে উঠতে পারত না, সেখানে অজানা কারোর বেলায় তো প্রশ্নই ওঠে না।

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রখর বুদ্ধিতে শাণিত করেছেন। কোথাও থেকে কারিগরি জ্ঞান না নিয়েও সে নিজের বুদ্ধিতে অনেক কিছু করতে পারে।
এই যেমন, কারো মোটরসাইকেল খারাপ হয়েছে, লাল মামা এসে মেরামত করে দেবে। এভাবে স্যালো মেশিন, পানির পাম্প, বৈদ্যুতিক পাখাসহ নানারকম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সে সারাতে পারত। নিজে নিজে কারো সাহায্য ছাড়াই যশোর থেকে যন্ত্রপাতি কিনে সে রাইস মিল স্থাপন করেছিল। এরকম অনেক কাজ সে করত, যা দেখে সবাই অবাক হয়। কিন্তু মুশকিল হলো তার কথা সবাই বোঝে না। তবে খোকন তার অনেক কথাই কেমন কেমন করে যেন বুঝতে পারত। এ জন্য বয়সের ব্যবধান অনেক হলেও খোকনের সঙ্গে তার লাল মামার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। নতুন কোথাও যেতে হলে ওই মামা খোকনকে সঙ্গী করতে চাইত। মানে খোকনকে তখন দোভাষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হতো।

আর রেগে গেলে কেউ তাকে ঠেকাতে পারত না। পাড়ার দুষ্ট অনেকেই তাকে পাগল বলে ক্ষেপাত। আর ব্যাপারটা বুঝতে পারলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে বসত সে। এ নিয়ে অনেক মারামারিও হয়েছে। কারো ওপর ক্ষেপে গিয়ে মারতে চাইলে তাকে না মারা পর্যন্ত তার স্বস্তি হতো না। আমাদের যেমন রাগ হলে বেশি সময় তা স্থায়ী হয় না, লাল মামার বেলায় তা নয়। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তা সে মনের মধ্যে পুষে রাখত। ফলে তার চোখে যে অপরাধী হয়ে যেত, তাকে অন্তত সপ্তাহখানেক পালিয়ে বেড়াতে হতো। না হলে যেখানেই দেখত, সেখানেই ধরে মেরে তবেই তার শান্তি। গায়ে শক্তিও অনেক তার। কারো কথাতেই সে শান্ত হতো না। খোকন দেখেছে, কেবল বড়ো নানাই তাকে থামাতে পারতেন। তাও নানার কথায় সে বাড়ি ফিরে গেলেও রাগ প্রশমিত করতে একবেলা ধরে ঘরে বসে কাঁদত। তারপর আস্তে আস্তে সে স্বাভাবিক হয়ে আসত।

লাল মামার হাতের লেখাও অসাধারণ। আর্ট করতে জানত। ছবি আঁকত। আর্ট পেপারে দারুণ সব ফুলের স্কেচ আঁকত। খোকন সেসব অবাক হয়ে দেখত।
তো তারা তখন ঈশ্বরবা নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছেছে, তখন ভোর হয় হয় করছে। সামনে থেকে বেশ হট্টগোলের শব্দ কানে আসতে লাগল তাদের। অনেক মানুষের চিৎকার, চেঁচামেচি। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে জানা গেল, রাতে চলা এক নাইটকোচ ঈশ্বরবার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কড়ইগাছে এসে সজোরে ধাক্কা মেরেছে। এক্সিডেন্ট এমনভাবে হয়েছে যে, গাড়ি দু’ভাগ হয়ে গাছের ভেতর ঢুকে গেছে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল সেদিন। খোকনরা ভয় পাবে ভেবে নানা একটু ঘুরপথে মাঠ দিয়ে তাদের নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে বিকেলে খুলনায় চাঁপা খালার বাসায় পত্রিকায় খোকনদের এলাকার সেই সংবাদ বড়ো করে ছবিসহ ছাপা হতে দেখেছিল।

খোকনের চাঁপা খালা এবং সুজা খালু খুলনার এক কলেজে পড়াতেন। এই খালা খোকনের নানার আপন বড়ো বোনের মেয়ে। মানে সম্পর্কে তার ভাগ্নি। খালাও খুব দিলখোলা মানুষ। সেই প্রথম দেখেছিল খোকন তাকে। পরিচয় পেয়ে খুব স্নেহ করেছিলেন তিনি। ফেরার সময় খালা খোকনের হাতে বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। এর আগে একসঙ্গে এত টাকা কখনো কেউ খোকনকে উপহার দেয়নি। এজন্য সেই কথা খোকনের বেশ মনে আছে।
খুলনায় গিয়ে নানা খোকনদের অনেক জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। সেই প্রথম কোনো বড়ো নদী দেখেছিল খোকন। বইতে পড়া রূপসার বিশাল রুপোলি রূপ দেখে খোকন বিমোহিত হয়ে গিয়েছিল। জোয়ারভাটা দেখেছিল নদীর। নানা রকম নৌকা, বিশাল বিশাল স্টিমার, লঞ্চ দেখেছিল। পানির নিচ থেকে ভুস করে ভেসে ওঠা কালোপিঠ শুশুকও সেই প্রথম দেখা খোকনের।
খোকন তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। খোকনের সেই খালার বাসা খুলনার কোথায় যে ছিল, তা আজ আর মনে নেই। নানা থাকলে ঠিক জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারত খোকন। কিন্তু তা আর আজ হবার নয়। নানাও একদিন চিরায়ত নিয়মে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

খোকন যখন বড়ো হয়ে সাইকেল চালাতে শিখল, তখন চলতি পথে অনেকবার নানাকে সাইকেলে চড়াতে চেয়েছে। কিন্তু নানা কখনোই তাতে সাড়া দেননি। চড়ানো যায়নি তাকে। কিন্তু নানার কেন যে সাইকেলভীতি ছিল, তা খোকনের আর জানা হয়ে ওঠেনি।
খোকনের বড়োনানা মনু খা। পুরো নাম তবিবুস সোবহান খান। খোকনের নানা ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবার ছোটো। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, খোকনের নানার মাথার চুল কাশফুল হয়ে গেলেও বড়ো নানার মাথার চুল একেবারে কুচকুচে কালো। রোদে ঝিলিক দিত। খোকন বড়ো নানার মিশমিশে কালো চুলের দিকে অবাক তাকিয়ে থাকত। বয়সের পার্থক্য বিস্তর হলেও চুল দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। মনে হতো খোকনের নানাই বুঝি বয়সে বড়ো। মৃত্যুর সময়ও সেরকম চুল অক্ষুণœ ছিল বড়ো নানার।

বড়োনানা ডাক্তারি করতেন। সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামে গ্রামে। গরিবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। খুব সামান্যই পয়সা নিতেন রোগীদের কাছ থেকে। কখনো চেয়ে নিতেন না। যে যা পারত দিয়ে যেত। না দিলেও কিছু বলতেন না তিনি। পাড়ার মসজিদে দীর্ঘদিন ইমামতি করেছেন। পোস্ট মাস্টারও ছিলেন।
তাকে ছোটো-বড়ো সবাই সম্মান করত। খোকন দেখেছে, এই নানা যখন রাস্তা দিয়ে যেতেন, তখন আশপাশের সবকিছু কেমন চুপচাপ হয়ে যেত। হইহট্টগোল থেমে যেত, যতক্ষণ না তিনি ওই জায়গা থেকে দূরে যাচ্ছেন। কেউ সাইকেলে গেলে তাকে দেখে দূর থেকে সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে এগিয়ে আসত। নানা সাইকেলে আরোহী হলেও এটাই করত সবাই। তিনি কাছে এলে তাজিমের সঙ্গে সালাম-আদাব দিয়ে তারপর সাইকেলে চড়ত লোকেরা। কোনো শিক্ষককে দেখলেও এটাই করত সবাই। কিন্তু আজ সেই রেওয়াজ, সেই চল উঠে গেছে। সম্মানিত মানুষের সম্মান উঠে গেছে। এখন সম্মানিত মানুষের নিজের সম্মান নিজেরই রক্ষা করে চলতে হয়। খোকনদের বেড়ে ওঠা পর্যন্ত এই সম্মান দেওয়ার রেওয়াজটা চালু ছিল। তখন হয়তো মানুষের এত জ্ঞানগরিমা ছিল না, কিন্তু সমাজে মানুষকে মানুষ শ্রেণিভেদে সম্মান প্রদর্শন করত।

খোকন এখন মনে করে, মুরব্বিদের সম্মান সমাজ থেকে যখন উঠে গেল, তখন থেকেই সমাজের মূল কাঠামো ভেঙে গেল। সব ধরনের নিয়মশৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে গেল।
যেই নানাকে মানুষ এত সম্মান জানাত, দেখলেই সাইকেল থেকে নেমে ভক্তিশ্রদ্ধা দেখাত, সেই নানাই একদিন সাইকেলে চড়া অবস্থায় এ যুগের উগ্র এক ছেলের সঙ্গে এক্সিডেন্ট করে ওই বুড়ো বয়সে হাত ভেঙে বসলেন! তার মানে খোকনদের পরের জেনারেশন বড়ো নানাদের মতো সম্মানীয় মানুষকে কোনোভাবেই তোয়াক্কা করেনি। খোকনকে এও দেখতে হয়েছে। দেখেছে আর মনে মনে দুঃখ পুষেছে মনের গভীরে।
খোকনের ছোটোমামা যে দুরন্ত স্বভাবের ছিল, তার প্রমাণ একটু পরেই মিলবে। লেখাপড়ায় তেমন মন ছিল না তার। স্কুলে গেলেই একটা না একটা ঝামেলা বাধিয়ে আসত। ফলে দু’দিন বিদ্যালয়ে গেলে চারদিন লাপাত্তা।
আগেই বলেছি, খোকন এই মামার খুব ভক্ত ছিল। তার যে কোনো কাজে খোকন তার সঙ্গী। সারাদিন গুলতি নিয়ে বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো। গুলতিতে তার হাত ছিল দারুণ পাকা। যে কোনো নিশানা সহজে ভেদ করায় তার কোনো জুড়ি ছিল না।
এঁটেল মাটিতে গুরোল বানাত মামা। তারপর রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে প্রস্তুত হয়ে যেত গুলতির জন্য।

পরে গুলতিতে কাচের মারবেলও ব্যবহার করত ছোটোমামা।
মামাদের অনেক বড়ো এক বাগান ছিল। এমন ঘন বাগান যে, দিনের বেলায় সূর্যের আলো ভেদ করাও মুশকিল ছিল। সেই বাগানে দাঁতাল বুনো শুয়োর থাকত। সজারু, মেছোবাঘ, বড়ো বড়ো ঘড়েল আর অনেক রকমের বিষধর সাপ বাস করত। রাতের বেলা রীতিমতো ঘরে শক্ত করে খিড়কি এঁটে রাখতে হতো। গোয়াল আর ছাগলের খোঁয়াড়ও বেশ শক্তপোক্ত করে বেঁধে রাখতে হতো। না হলে রাতে সব সাবাড় হয়ে যেত।
সেই বাগানে দিনের বেলা পারতপক্ষে কেউ মাড়াত না।
কিন্তু দুঃসাহসী ছোটোমামা সেই বাগানে দিনের বেলা নির্ভয়ে গুলতি নিয়ে ঘুরে বেড়াত। খোকনের অবশ্য সে সাহস কখনো হয়নি। মামাও কখনো খোকনকে নিয়ে ওই বাগানে ঢোকেনি। পাছে খোকন ভয় পায়, এটাই মূলত বিষয়।
অন্য দিকে মাছ ধরার কথা আর কী বলব?
এই ছোটোমামা একটা মাছপাগল মানুষ। বিল পুকুর খানাখন্দ থেকে মাছ ধরাতেও তার জুড়ি ছিল না। শিং মাছ দেখে কে না ডরায়। অথচ খোকনের এই ছোটোমামা অনায়াসে গর্ত থেকে ধরে আনত শিং মাছ। একবার খোকন নিজে দেখেছে, অল্প পানির জমির আইলে একটা গর্তে হাত ঢুকিয়ে বের হতেই দেখা গেল তার হাতের তালুতে ঝুলছে একটা বড়োসড় পাকা শিং মাছ। তার মানে গর্তের ভেতর থেকেই মাছটি তার হাতের তালুতে বিষযুক্ত কাঁটা বিঁধিয়ে দিয়েছে।
তারপর মাছটি হাত থেকে বড়শি ছাড়ানোর মতো ছাড়িয়ে দিব্যি আবার মাছ ধরতে লেগে গেছে।

একবার দখিনকুড়ের বিলের পানিতে নেমে এক শিং মাছের কাঁটার গুঁতো খেয়েছিল খোকন। তারপর আর নিজের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারেনি খোকন। ওই শিং মাছের গুঁতো খেয়েই জ্বরে জেরবার অবস্থা হয়েছিল তার। ওই মামাই সেদিন খোকনকে কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।
খোকনদের বিলের মাঝখানে বেশ কটি আপা কাটা ছিল। মানে বেশটা জায়গা নিয়ে গর্ত করে পাড় বেঁধে দেওয়া। একদিকে তা খোলা রাখা হতো। পাড়টি খুব বেশি উঁচু করা থাকত না। মানে আলাদা একটা জলাধার তৈরি করা হতো সেখানে। বর্ষাকালে পাড় ছাপিয়ে একাকার হয়ে থাকত। শীতের শেষে যখন বিলের পানি কমে আসত, তখন বিলের বেশির ভাগ মাছ আপায় বেশি পানি থাকায় সেখানে গিয়ে জমা হতো। আর একটা সুবিধাজনক সময়ে সেই আপা সেঁচে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। খোকনরা ওই জায়গাটাকে আপা বলত। ওই আপায় মুনিষ সমান পানিতে ডুব দিয়েও খোকনের ছোটোমামা কত যে মাছ ধরেছে, তার ইয়ত্তা নেই। অনেকে ওখানটায় নামতেই সাহস পায়নি। মাছের সঙ্গে সাপখোপও থাকত আপায়। তাতেও তোয়াক্কা নেই তার। কত সাপের লেজ ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছুড়ে ফেলেছে, তারও লেখাজোখা নেই।

মারবেল খেলায় তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। অসামান্য তার হাতের টিপ। গ্রামের কেউ তার সঙ্গে খেলে পেরে উঠত না। জোটবদ্ধ হয়ে খেলেও একা তার কাছে হার মানতে হতো সবাইকে।
সারাদিন না খেয়ে না নেয়ে খোকন এসবেরও সাক্ষী হয়েছে অনেকবার।
সন্ধ্যায় পড়েটড়ে রাতেও খোকন মামার গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকত। নানারকম গল্প শুনতে শুনতে গভীর ঘুমে হারিয়ে যেত।
অনেক গল্পের মধ্যে ছোটো মামার কাছে শোনা পেঁচো চোরের গল্পটা আজও খোকনকে পুলকিত করে। আনন্দে ভাসায়। ইচ্ছে করে আবার নতুন করে সেই গল্প মামার কাছে বসে শুনতে। কিন্তু সে কথা ওঠাতেই খোকনের কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে। কারণ খোকন এখন বড়ো হয়েছে না? তেমন করে কি আগের সেই বাচ্চা ছেলেদের মতো গল্প শোনার বায়না ধরা কি আর তার সাজে? সাজে না বলেই খোকন নীরব হয়ে থাকে।

হঠাৎ প্রাণ কাঁপিয়ে ধুপ্পুস! মানে মামাদের তালপুকুরের তালগাছ থেকে মস্তবড়ো পাকা তাল পড়েছে পুকুরের পানিতে।
সঙ্গে সঙ্গে খোকনের ঘুম থেকে তুলে টর্চ লাইট হাতে মামাসহ পুকুরের দিকে ছুট। দেরি হলেই কেউ তাল কুড়িয়ে পগার পার হয়ে যাবে। সুতরাং…
দেখা যেত কানায় কানায় পূর্ণ পানিতে বেশ বড়োসড় তাল নেচে বেড়াচ্ছে। কে তুলে আনবে সেই তাল? কে আবার? খোকনকেই নামতে হতো। ওই রাতের বেলা শুকনো কাপড় আর কোথায়? অগত্যা খোকনকে উদোম করে নামিয়ে দিত মামা। খোকন সাঁতরে অনেকটা দূরে গিয়ে তাল উদ্ধার করে পাড়ে উঠে আসত। তারপর তাল নিয়ে বাড়ি ফিরে শান্তির ঘুম।
এই পুকুরের গভীরতা অনেক। ছোটোমামার গলা জড়িয়ে খোকন সাঁতার শেখার পাঠ নিয়েছে। পানি কম থাকলে ডুব দিয়ে এপার-ওপার করেছে কত।
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে পুকুর টইটম্বুর হলে ছোটোমামা খোকনকে পুকুরের মাঝখানে নিয়ে বলত, বুঝলি খোকন, তুই আমার গলা ধরে থাকবি। আমরা ডুব দিয়ে একদম পানির তলায় চলে যাব। তারপর ওই তলা থেকে কাদা তুলে আনব। পারবি না?
খোকন সানন্দে রাজি হয়ে যেত। বিকেলে কাঠি লজেন্সের লোভে খোকন আর না করত না। তার ওপর অত নিচে থেকে কাদা তুলে আনাটা একটা বীরত্বের ব্যাপারও বটে।

একটা লম্বা করে শ্বাস নিয়ে ছোটো মামার সঙ্গে খোকন সাঁই সাঁই করে পুকুরের একেবারে তলায় চলে যেত। তারপর এক খামচি কাদা নিয়ে শুশুকের মতো ভুস করে ভেসে উঠত।
পানির তলায় গিয়ে খোকনের অবশ্য মাঝে মধ্যে দম আটকে যেতে চাইত। কিন্তু এসব পরোয়া করত না খোকন। গ্রামের অনেককে ওই ভরা গভীর পুকুরের তলা থেকে কাদা তুলে এনে তাক লাগিয়ে দিত। যা অনেক বড়োরাও পারত না।
অবশ্য প্রথম প্রথম তেমন কোনোই সমস্যা হতো না। অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে পানির নিচে গেলে কানে পানির প্রচণ্ড চাপ অনুভব করত। কান ফেটে যেতে চাইত।

অবশ্য খোকন কখনো মামার মতন ওরকম দুরন্তপনায় লিপ্ত ছিল না। সবাই তাকে শান্ত একটা ছেলে হিসেবে জানত। কারো কোনো ক্ষতি করেনি সে কখনো। অকপটে একটা ব্যাপার জানাবে সে। তবে হ্যাঁ, সেটা কারো জন্য ক্ষতিই। তারপরও সে করেছে। সেটা অন্যায় ছিল কি না তা না হয় আজ তোমরাই বিচার করবে।
খোকনের ডাক্তার মামার ছোটো ছেলে ওয়ারিচ সোবহান খান। ডাকনাম লাড্ডু। খোকনের লাড্ডু ভাই। বয়সে তা সাত-আট বছরের বড়ো। তবে সম্পর্ক বন্ধুর মতো। খোকনের লাল্টু মামা যখন বড়ো হয়ে গেছে, তখন এই লাড্ডু ভাইয়ের সঙ্গে তার চলাফেরা শুরু হয়ে যায়। এক সঙ্গে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো। কানায় কানায় পূর্ণ তাল দিঘিতে সাঁতরে বেড়ানো। মজার কোনো বই পেলে পালাক্রমে পড়া ইত্যাদি ছিল নিত্যদিনের কাজ। একটা আদর্শ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা এবং একটা ভালো পাঠকশ্রেণি গড়ে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল লাড্ডু ভাই আর খোকনের। যেখানে ঘরভর্তি গল্প কবিতা, উপন্যাস, শিকার কাহিনি, ভ্রমণ কাহিনিসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা রকম বইয়ে ঠাসা থাকবে। কিন্তু অনেকবার চেষ্টা চালিয়েও তা সফলতার মুখ দেখেনি।
একদিন এই লাড্ডু ভাই জানাল, তাদের মাঠের এক জমিতে শিম চাষের আড়ালে গাঁজার গাছ লাগানো হয়েছে। শিমের মাচা উঁচু হয়ে থাকায় গাছটি সেভাবে দেখা যায় না। আর জমিটির চারপাশ শক্তপোক্ত করে বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। এ কারণে সচরাচর কেউ সেখানে ঢোকেও না। এরই সুযোগ নিয়ে গাঁজার গাছ লাগানো হয়েছে সেখানে।

শুনে খোকনের মাথায় আগুন লেগেছে। এটা তো এক ধরনের মাদক। অবৈধ। এটা সেবন করা, বিক্রি করা, উৎপাদন করা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী কাজ। সুতরাং এটাকে কিছুতেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। লাড্ডু ভাইকে খোকন বলল, ওটা ওখান থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।
লাড্ডু ভাই যেন খোকনের কাছ থেকে এ কথাই শুনতে চেয়েছিল। সেও বলল, ওকে ডান। আজ রাতেই ওই গাঁজা গাছ অপসারণ অভিযান শুরু হবে। ঠিক হলো রাত দশটার দিকে লাড্ডু ভাই একটা ধারালো দা নিয়ে লুকিয়ে সেখানে হাজির হবে। খোকনও যাবে একটু পর।
সাবধানে যেতে হবে। কারণ গাঁজাসেবীরা আবার পাহারায় থাকতে পারে।
কার্তিক মাস। ফুটফুটে চাঁদনি রাত। খোকনরা গিয়ে দেখে কেউ কোথাও নেই। খোকন গাঁজার গাছ দেখেনি কখনো। লাড্ডু ভাই চিনিয়ে দিলে সেই প্রথম দেখল।
একটু আড়ালমতো জায়গায় লাড্ডু ভাই সতর্ক পাহারায় ন্যস্ত হলো। কাউকে দেখলেই খোকনকে সঙ্কেত দেবে।
খোকন কি আর সময় নষ্ট করে? অঁাঁটোসাঁটো বেড়ার ফাঁকে মাথা ঢুকিয়ে দিল সে। লাড্ডু ভাই বলে দিয়েছে, বেশি সময় নেওয়া যাবে না। দ্রুত কাজ সেরে কেটে পড়তে হবে।

খোকনও তাই আর দেরি করে না। গাঁজার গাছের গোড়ায় গিয়ে খোকনের চোখ কপালে ওঠে। বাপরে! এ তো বিশাল বড়ো আর বেশ মোটা গাছ! ভেবেছিল চিকনচাকন ঢ্যাঙাপটকা নরমগোছের একটা গাছ হবে। কিন্তু না, বেশ মোটাসোটা। অল্প সময়ের কাজ না। কী করবে? এই দা দিয়ে কি কাজ হবে? লাড্ডু ভাই দূরে পাহারারত। তার সঙ্গে কিছু আলাপ করারও সুযোগ নেই। বুকটা যে ঢিবঢিব করছে না, তা নয়। ভয়ও লাগছে। আবার এটাকে উচ্ছেদ না করলেই নয়।
আর কোনো ভাবনা নয়। আগ বাড়তে হবে। এই ভেবে লেগে গেল কাজে। হেঁসোটাইপ দা। কোপাতে গেলে শব্দ হবে, তাই পোঁচাতে লাগল। ওরেব্বাস! যা ভেবেছিল তার চেয়েও শক্ত এ গাছ!
এর আগে এরকম কোনো কাজ করেনি সে। ভয়ে দরদরিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। দায়িত্ব যখন নিয়েছে, কাজ সমাধা করতেই হবে তাকে। আল্লাহর নাম নিয়ে প্রাণপণ পোঁচাতে থাকল গাছের গোড়া বরাবর।
প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় সফল হলো খোকন। গাছ কাটা শেষ। ঝোপাল গাছের কাণ্ড ও পাতা শিম গাছের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সহজে বের করা যাচ্ছে না। শেষে হ্যাঁচকা টানে বের করে ফেলল বেশ বড়োসড় সেই গাঁজার গাছ।
এটাকে কেটে ফেলে কাজ শেষ করলে চলবে না, তাহলে আসল উদ্দেশ্য সাধন হবে না। দূরে নিয়ে গিয়ে কুচিকুচি করে কেটে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। আর দেরি নয়, গাছটা টেনে নিয়ে বিজয়ীর বেশে বের হলো খোকন। লাড্ডু ভাই আড়ালে দাঁড়িয়ে দমবন্ধ করে খোকনেরই অপেক্ষা করছিল। খোকন বের হতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ছুটে এলো খোকনের কাছে। বলল, জলদি চল। এখান থেকে এক্ষুনি সরে পড়তে হবে। কেউ দেখে ফেললে ঝামেলা হয়ে যাবে।
দু’জন ধরাধরি করে গাছটাকে বেশ দূরে নিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটল। তারপর সদ্য পেকে ওঠা বিভিন্ন ধান ক্ষেতের মধ্যে আর বিলের পানিতে অল্প অল্প করে ছড়িয়ে দিল।

কাজটা শেষ করে তৃপ্তির হাসিটা মুখে লেপ্টে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে লাড্ডু ভাই বলল, জানিস, এই গাছটার দাম কত হতে পারে? খোকন কেবল মাথা নাড়ল। ওর এ বিষয়ে একটুও ধারণা নেই।
লাড্ডু ভাই বলল, কমপক্ষে পনেরো-বিশ হাজার টাকা হবে।
এত দাম? খোকনের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
লাড্ডু ভাই বলল, ওদের বড়ো ধরনের ক্ষতি হয়েছে। প্রকাশ্যে কিছু বলতে না পারলেও ওরা হন্যে হয়ে খুঁজবে, কে করেছে এই কাজ তা জানার চেষ্টা করবে। সাবধান থাকিস।
তারপর একদম চুপ। আজ অবধি খোকন কাউকে বলেইনি। গল্পচ্ছলেও না। মুখে কুলুপ এঁটে এতদিন পর তা প্রকাশ করল।
ব্যাপারটা অন্যায় ছিল কি না, সে বিচারের ভার তোমাদের ওপর দিয়ে রাখল খোকন ।…
খোকন এখন বড়ো হয়েছে। চাকরি করে দূর শহরে। গ্রামের সেই আবহ এখন আর নেই। সেই তাল পুকুর থাকলেও অত গভীরতা নেই। পাড়ে তালগাছ নেই। টইটম্বুর পানিও থাকে না এখন। সেই আম জাম জামরুল পেয়ারা গাছ আর ঘন জঙ্গলও নেই।
এখন গ্রামে গেলে খোকন কেবল ছেলেবেলার ওসব কথা ভেবে পুলকিত হয়। স্মৃতিকাতর হয়। আর ভাবে, আহারে কোথায় হারিয়ে গেল সেই স্মৃতিমাখা দিনগুলো!!
মুখ থেকে খোকনের অজান্তেই অস্ফুটে একটি শব্দ বেরিয়ে আসে– হায়!!

SHARE

Leave a Reply