Home জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা চা বাগানের রিপীনা -ঋতশ্রী দে

চা বাগানের রিপীনা -ঋতশ্রী দে

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর ক-গ্রুপে
পঞ্চম স্থান (যৌথ) অধিকারী গল্প

আজ সকালে রিপীনার মা তাকে দেখতে এসেছিলেন। রিপীনা তো কী খুশি। এতদিন পর তার মাকে দেখে রিপীনার আনন্দের শেষ নেই। মা আসার পর রিপীনা তার মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে হাত খালি। সে ভেবেছিল এতদিন পর তার মা তাকে দেখতে এসেছেন নিশ্চয়ই তিনি তার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসবেন। যে রকমভাবে রিপীনার স্যার কোথাও গেলে তার সন্তানদের জন্য কিছু আনেন। কিন্তু কই? রিপীনার মা তার জন্য কিছুই নিয়ে আসেননি। কিন্তু তবুও রিপীনা মন খারাপ করলো না কারণ তার মাতো এসেছেন আর কী চাই? তারপর মায়ের সাথে তার কত কথা। এতদিনের জমানো কথা এত তাড়াতাড়ি আবার শেষ হয় নাকি। কথার মধ্যে হঠাৎ হাসি আবার হঠাৎ চোখের জলও ছিল। এতদিন পর মাকে দেখে রিপীনার চোখ মুখ পাল্টে গিয়েছিল। তার মনে আনন্দের শেষ নেই। রিপীনা তার মাকে বলছিল তার কোনো এক প্রিয় জামার কথা যেটা সে আসার সময় তার বাড়িতে ফেলে এসেছিল। সে তার মাকে বলছিল যে ‘এর পরের বার আসার সময় আমার ঐ জামাটা নিয়ে এসো মা।’ রিপীনার মা উঠে বললেন যে তিনি সেই জামাটা বেচে দিয়েছেন কারণ তাদের কাছে সেদিন নাকি খাবারের টাকা ছিল না।
তাই নাকি তিনি রিপীনার এক বান্ধবীর কাছে জামাটা বেচে দেন। রিপীনা তখন মনে মনে ভাবে সত্যিই কি খাবারের টাকা ছিল না নাকি নেশা করার টাকা ছিল না। রিপীনার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছিল। সে বললো ‘মা তুমি এটা কী করে করতে পারলে, একদিন নেশা না করলে কী হতো বলো তো? তাই বলে তুমি আমার ঐ শখের জামাটা বেচে দেবে? আমি কত কষ্ট করে টাকা জমিয়ে পূজার সময় জামাটা কিনেছিলাম।’
তারপর সেদিন রিপীনার মা চলে যাওয়ার পরও তার মন খারাপ ছিল, ঐ প্রিয় শখের জামাটার জন্য সেদিন সে অনেক কাঁদে। কারণ ঐ জামাটা ছিল তার জীবনের প্রথম দুর্গাপূজার জামা। তার আগে সে কোনদিন পূজায় নতুন জামা পরতে পারেনি।
রিপীনার পুরো নাম হলো রিপীনা মুন্ডা। রিপীনা একটা চা বাগানের মেয়ে। অত্যন্ত দরিদ্র একটি পরিবারের সে জ্যেষ্ঠ কন্যা। সে তার জীবনে স্কুলের বারান্দায় যাওয়ারও সুযোগ পায়নি। অনেক ছোটবেলায় তার মা তাকে চাকরিতে দিয়ে দেন। খুব ছোটবেলা থেকে কাজ করার কারণে পরিবারের সাথে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি তার। রিপীনার মা তাকে ঢাকা শহরে একটি বাড়িতে কাজে দিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে প্রথম প্রথম রিপীনার তার চা বাগানের কথা, ঝর্ণার কথা, পাহাড়ের সেই সুন্দর পরিবেশের কথা খুব মনে পড়ত কিন্তু পরে আস্তে আস্তে তার অভ্যাস হয়ে যায়। রিপীনা যে বাড়িতে কাজ করত সে বাড়ির ছোট মেয়ের কাছ থেকে একটু অক্ষর পরিচয় হয়েছিল তার। রিপীনা ছিল খুব মেধাবী, তাই ধীরে ধীরে সে ঐ মেয়েটির কাছ থেকে পড়ালেখা শিখতে শুরু করে। মানে ঐ ছোট মেয়েটি যা পড়ত রিপীনা তা মন দিয়ে শুনতো আর মেয়েটিও তাকে অনেক সাহায্য করত। এভাবেই ঐ মেয়েটির সাহায্যে রিপীনা ইংরেজি পর্যন্ত পড়তে শিখে গিয়েছিল।
রিপীনারা তিন বোন দুই ভাই। তাদের পরিবারে সব ভাই-বোনেরাই এভাবে কাজ করে। কেউই স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়নি। রিপীনা যখন দেখলো যে, সে ইংরেজিও পড়তে পারছে, বাংলাও ভালো লেখে তখন সে তার মায়ের কাছে স্কুলে ভর্তি হতে আবদার করলো।
উত্তরে তার মা-বাবা তাকে বললেন, ‘তুই যে স্কুলে পড়বি তাতে খরচ আছে না? খাবার টাকা কীভাবে জোগাড় হবে? যেখানে কাজ করছিস সেখানেই থাক।’ কিন্তু রিপীনার মা-বাবা যখন দেখলেন যে, এই বাড়িতে থেকে রিপীনার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে তখন তারা রিপীনাকে সেই বাড়ি থেকে নিয়ে এলেন। তার মা তাকে এবার এক নতুন বাড়িতে নতুন শহরে কাজে নিয়ে এলেন। সে বাড়িতেও রিপীনা খুব ভালো ছিল। অল্প কয়েক দিনের মাঝেই রিপীনা এই বাড়ির সকলেরও মন জয় করে নিলো। এবার রিপীনার এক নতুন বন্ধু জুটলো, সে বাড়ির ছোট মেয়েটি। ছোট মেয়েটির নাম হলো বিথী। বিথী রিপীনাকে অনেক ¯েœহ করত, আর রিপীনাও বিথীকে অনেক পছন্দ করত। রিপীনা বিথীকে মিষ্টিমাসি বলে ডাকতো। রিপীনা খুব ভালো গানও গাইত। সে যে গান শুনতো সে গানই তার মুখস্থ হয়ে যেত। অনেক কঠিন সুরের গানও রিপীনা সহজে গেয়ে ফেলতো। সে বাড়ির সকলে রিপীনার গান খুব পছন্দ করত। আর বিথীও রিপীনার গান শুনতে খুব ভালোবাসতো। রিপীনার মধ্যে কোনো লজ্জা, ভয় ছিল না। যখন যে বলত গান গাওয়ার কথা, রিপীনা সঙ্গে সঙ্গে গান গাওয়া শুরু করে দিতো। অপরিচিত মানুষের সামনেও সে একটুও লজ্জা করত না। শহরে থাকতে থাকতে সেখানকার আর পাঁচটা মেয়ের মতো রিপীনাও ধীরে ধীরে রুচিশীল হয়ে উঠলো। তাকে দেখলে বা তার কথাবার্তা শুনলে কেউ বুঝতে পারতো না যে, সে স্কুলের বারান্দায় পর্যন্ত যায়নি। তাকে দেখে মনে হতো সে পড়ালেখা করেছে। রিপীনা খুব ভালো গল্পও লিখতো। সে যে বাড়িতে থাকতো সে বাড়ির স্যার, ম্যাডামসহ প্রত্যেক সদস্যকে নিয়ে সে গল্প লিখতো। তা ছাড়াও রিপীনা তার চা-বাগান, সেখানকার মানুষজন, ফুল-পাখি এগুলো নিয়েও গল্প লিখতো। রিপীনা গল্প লিখতে খুব ভালোবাসতো।
রিপীনা খুব হাসি-খুশি ছিল। শরীরে কোনো ক্লান্তি ছিল না তার। কিন্তু তার মনে দুঃখের শেষ নেই। কারণ তার বাবার যক্ষ্মা রোগ হয়েছিল এবং এখনও তার বাবা শারীরিক দিক দিয়ে অনেক অসুস্থ আর তার মায়ের শরীরও ভালো না, কিন্তু তার মা-বাবা খুব বেশি নেশা করেন। চা-বাগানগুলোতে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই গরিব-শ্রমিক মানুষগুলোকে প্রতি রাতে নেশা করার অভ্যাস করানো হয়েছে। যাতে তারা অল্প খেয়ে না খেয়ে খুব কষ্টে জীবন-যাপন করেও কাজ করতে বাধ্য হয়। কত কঠিন তাদের কাজ। তাই তারা নেশার ঘোরে তাদের দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকে। রিপীনার মা-বাবা তাদের একটা ভাই-বোনকেও পড়াননি। রিপীনা যখন দেখে যে, তার মালিক মানে তার স্যার-ম্যাডাম তাদের সন্তানকে খুব আদর করেন, নিজে না খেয়ে তাদের খাওয়ান, সবসময় খাবারের বড়ো অংশটা তাদের সন্তানদের দেন তখন রিপীনার মনও খুব খারাপ হয়। রিপীনা দুঃখ করে বলে, ‘আমার মা-বাবা কোনো দিন আমায় এভাবে আদর করেননি।’ আমরা আমাদের মা-বাবাকে কত ভালোবাসি। কত কষ্ট করে টাকা রোজগার করে সবটা মা-বাবাকে দিয়ে দিই, নিজেদের জন্য কিছুই রাখি না। কিন্তু মা-বাবা সেই টাকা ভালো কাজে না লাগিয়ে নেশা করে শেষ করে দেন। আমাদের এতো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্কুলে যেতে দিলেন না। এগুলো বলে আর রিপীনা কাঁদে। কিন্তু আবার পরক্ষণেই রিপীনা নিজেকে বুঝিয়ে ফেলে। আর বলে মা-বাবা আমাদের কথা ভাবেন নাতো কী হয়েছে, ওনারা আমাদের জন্ম দিয়েছেন এটাই অনেক। আর একটা ছোট হাসি দিয়ে বলে আমি এভাবেই সারাজীবন আমার মা-বাবার জন্য করে যাবো। রিপীনা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতো। রিপীনা এ বাড়িতে এসেছে এক বছরের ওপরে হয়ে গেছে কিন্তু বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়নি তার। কিন্তু তার জন্য সে একটুও মন খারাপ করতো না। রিপীনা বিথীর সাথে নাচতো, খেলতো। রিপীনা বিথীর সাথে সুখ-দুঃখের গল্প করতো। বাড়িতে যখন কেউ থাকতো না তখন রিপীনা আর বিথী গান ছেড়ে নাচতো। আর সময় পেলেই পড়ালেখা শিখতো।
রিপীনার সঙ্গী ছিল বিথী আর বিথীরও সঙ্গী ছিল রিপীনা।
বাড়ির সকলে রিপীনাকে অনেক ভালোবাসতো আর রিপীনাও তাদের ভালোবাসতো।
একদম পরিবারের মতো। রিপীনার মা মাঝে মাঝে বাগানের এক দোকানের ফোন থেকে রিপীনাকে ফোন দিতেন। ফোন করে তিনি রিপীনার বিয়ের কথা বলতেন। তখন বিথী রিপীনাকে জিজ্ঞেস করে বলতো ‘রিপীনা তুই বিয়ে করে আমাদের ছেড়ে চলে যাবি?’
তখন রিপীনা বিথীকে বলে উঠত ‘নাগো মিষ্টিমাসি আমি আপনাদের ছেড়ে এতো তাড়াতাড়ি যাবো না আর যদি বাড়িতে বেড়াতে যাই আমি আবার চলে আসবো।’
বিথী আর রিপীনার মধ্যে যে শুধু মিষ্টি সম্পর্ক ছিল তা না দুষ্টু সম্পর্কও ছিল বটে। বিথী হঠাৎ হঠাৎ কোনো কারণে তাকে বকাও দিতো, আবার তাকে অনেক ভালোবাসতো।
রিপীনা এটা অনুভব করতে পারতো। কিন্তু ওদিকে বাড়ি থেকে রিপীনাকে তার পরিবার যাওয়ার জন্য বলছে। রিপীনার মা নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তাকে আর বাইরে নয় এবার থেকে বাগানের কাজ করাবেন। কিন্তু রিপীনা যায় কীভাবে? কারণ বিথীর কয়েক দিন পরেই জেএসসি পরীক্ষা। এভাবে পরীক্ষার আগে রিপীনা কীভাবে তার মিষ্টিমাসিকে ছেড়ে চলে যায়। আর রিপীনাও চায় না বাগানে একেবারের জন্য চলে যেতে। সে এখানে থেকে তার মিষ্টি মাসি এবং ম্যাডামের কাছ থেকে পড়ালেখা শিখতে চায়, হাতের কাজ শিখতে চায়। কিন্তু তার পরিবারকে তা বোঝায় কে? রিপীনার বয়স ১৫ বছরেরও নিচে কিন্তু তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য সব উঠে পড়ে লেগেছে। রিপীনার মন তাই খারাপ কারণ সে বড়ো মানুষ হতে চায়, নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়, সে চায় না এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিজের জীবনকে নষ্ট করতে। এদিকে আবার দেখতে দেখতে বিথীর জেএসসি পরীক্ষা চলে এলো। বিথী রাত জেগে পড়াশোনা করতো আর বিথীকে যাতে মশা না কামড় দেয়, বিথীর যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তাই রিপীনাও সঙ্গে রাত জাগতো, একটু পরপর জল দিতো, খাবার এনে দিতো, আর বিথী যখন পরীক্ষা নিয়ে ভয় পেতো তখন রিপীনা বলতো ‘ভয় পাবেন না মিষ্টিমাসি। আপনি দেখবেন, আপনি গোল্ডেন অ+ পাবেন। আমি আপনার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবো।’ বিথীর জেএসসি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো, আবার রিপীনার পরিবার থেকে তাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য জোর করছে। এবার রিপীনার মনও গলে গেলো কারণ অনেকদিন সে তার মা-বাবাকে দেখে না। তাই রিপীনার বাড়ি যাওয়া ঠিক হলো, কিন্তু সে বারবার বিথীকে বলতো দেখবেন মিষ্টিমাসি আমি আবার ফিরে আসবো, আবার এসে আপনার কাছে পড়ালেখা শিখবো। বিথী রিপীনাকে পড়ালেখার জন্য একটা খাতা আর পেন্সিল বক্স দিয়েছিল। যাওয়ার আগে রিপীনা সেগুলো রেখে গেলো, বললো আবার আসবো তো, আবার এসে পড়াশোনা করবো। বাড়িতে নিয়ে গেলে বাবা-মা দেখলে রাগ করবে।
এগুলো এখানেই থাক। রিপীনা তার খাতা, পেন্সিল বক্স রেখে গেলো। যাওয়ার আগে রিপীনা ম্যাডামকে ধরে অনেক কাঁদলো, ম্যাডামও কাঁদলেন। যাওয়ার সময় রিপীনা বিথীকে বললো ‘আপনার রেজাল্ট আমায় জানাবেন কিন্তু মিষ্টিমাসি, আমি অনেক আশায় থাকবো আর আপনি গোল্ডেন অ+ পেলে আমি মিষ্টি খাবো। রিপীনার মনে অনেক আনন্দ এতদিন পর নিজের বাড়ি যাবে। সবার সাথে দেখা হবে। আবার একদিকে মনের মধ্যে ভয় যদি আমায় আবার আসতে না দেয়, যদি জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়। রিপীনা বাড়ি পৌঁছে গেলো। ফোন করে সেটা তার মিষ্টিমাসিকে জানালো। তারপর বিথীর সাথে রিপীনার আর কথা হয়নি। বিথীর রেজাল্ট বের হলো, রিপীনার কথা সত্যি হলো তার মিষ্টিমাসি সত্যিই গোল্ডেন অ+ পেয়ে গেছে। কিন্তু রিপীনার আর জানা হলো না। বিথী রেজাল্ট জানানোর জন্য বাগানের ঐ দোকানে অনেকবার ফোন দিলো। রিপীনাদের বাড়িতে মানুষও পাঠালো কিন্তু রিপীনার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। বিথী পড়ার টেবিলে বসে রিপীনার রেখে যাওয়া সেই পেন্সিল বক্সটি হাতে নিয়ে তার কথা ভাবে আর তার দুচোখ দিয়ে উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোতে এভাবে কতো রিপীনা অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে কে জানে? বীথি ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ^াস ফেলে চোখের জল মোছে আর পেন্সিল বক্সটি রিপীনার স্মৃতি হয়ে তার পড়ার টেবিলেই পড়ে থাকে।

SHARE

Leave a Reply