Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব জ্বর থেকে মহামারী -সায়েম আক্তার

জ্বর থেকে মহামারী -সায়েম আক্তার

মধ্যযুগে মানুষ অনেক বেশি রোগাক্রান্ত হতো। রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণে তৎকালে মানুষের মনে ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করত। স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাব এবং রোগের ধরন বুঝতে না পারাই হয়তো তাদের রোগের প্রধান কারণ ছিল।
তখন কয়েক বছর পর পর একেকটি মহামারী আঘাত হানত। গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহরে মৃত্যুর ঢল বসিয়ে দিত সেসব মহামারী। তখনকার মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং সঠিক ঔষধ না থাকায় মৃত্যুর হার ছিল বেশি।
যুগের পর যুগ ধরে ত্রাস সৃষ্টিকারী এসব রোগ জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ধীরে ধীরে মানুষের কাছে তার রহস্য খোলাসা করেছে। রোগের কারণ, প্রতিকার সবকিছু নির্ণয়ের মাধ্যমে মানুষ এসব মহামারীকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই তালিকা থেকে বাদ যাবে একটি মহামারীর নাম তা হচ্ছে ঝবিধঃরহম ঝরপশহবংং বা স্বেদন বালাই।

১৪৮৫ সালের এক বিভীষিকাময় দিনে লন্ডনের বুকে হানা দেয় এই অদ্ভুত রহস্যময় রোগ। এই রোগের নেই কোনো ভয়ঙ্কর লক্ষণ। মধ্যযুগের অন্যান্য ভয়াবহ কলেরা, প্লেগ, ম্যালেরিয়া, পীতজ্বর, কালাজ্বর, স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর মতো অসহনীয় ক্ষত বা জখম সৃষ্টি হতো না এই রোগে। দেখতে সুস্থ-সবল হাসিখুশি মানুষ এই রোগের কবলে পড়লে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আর মৃত্যুর পূর্বে মানুষের দেহ থেকে নির্গত হতে থাকত ঘাম।
পঞ্চদশ ও ষষ্টদশ শতকে এই রহস্যময় মহামারী রোগ ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই মহামারী রোগে আক্রান্ত রোগী প্রথমে জ্বর এবং ঠাণ্ডা কাঁপুনি নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেত। এছাড়াও এসবের পাশাপাশি মাথা ধরা, ঘাড়, কাঁধ এবং পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করত। এ সময় রোগী মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ত।

প্রথম ধাপে শুরু হওয়া ঠাণ্ডা কাঁপুনি আধা ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত থাকত। এরপর দ্বিতীয় ধাপ শুরু হতো। দ্বিতীয় ধাপে গরম পর্ব শুরু হতো। অর্থাৎ রোগীর শরীর গরম হয়ে যেত।
এ সময় ঘাম ঝরা শুরু হতো এবং পিপাসা লাগত। পাশাপাশি রোগী প্রলাপ বকতো। নাড়ির স্পন্দন বেড়ে যেত, বুক ধড়ফড় করত এবং বুক ব্যথা করত। তৃতীয় ধাপ তথা চূড়ান্ত পর্বে রোগী অবসন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। এই ঘুম থেকে আর জেগে উঠত না!
সোয়েটিং সিকনেস রোগের সবচেয়ে মারাত্মক দিকটি ছিল দ্রুত মৃত্যু ঘটানোর বিষয়টা। অধিকাংশ রোগীই লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ১৮ ঘণ্টার মধ্যে মারা যেত। এত দ্রুত মারা গেলেও রোগটির আরেকটি আশ্চর্যজনক রহস্য ছিল। তা হচ্ছে কোনো রোগী যদি ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকত তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতেন।
পৃথিবীর বুকে স্বেদন রোগ মহামারী হিসেবে আঘাত হেনেছে মোট ৫ বার। ১৪৮৫ সালে সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডের বুকে এই রোগের দেখা মিলে। সর্বশেষ মহামারীর সময়কাল ছিল ১৫৫১ সাল। এর দু’শ বছর পর ‘পিকার্ডি সোয়েট’ নামে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি রোগ ফ্রান্সে মহামারী ঘটিয়েছিল। সে সময় দুই শতাধিক ব্যক্তি অসুস্থ হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুহার খুব কম ছিল।কিন্তু এই দুই রোগের মধ্যে শক্ত যোগসূত্রতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।

সোয়েটিং সিকনেস সপ্তম হেনরির রাজত্বকালে বোসওয়ার্থ যুদ্ধের পরপরই প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল। এর সময় এক মাসের ভেতরেই ১০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল।
১৫০৭ সালে কিছুটা দুর্বলভাবে এই রোগটি বিস্তার লাভ করেছিল। তবে এই দুর্বলভাবে বিস্তার হওয়া রোগটিই পরবর্তীকালে তৃতীয়বারের মতো মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। যা ফ্রান্স পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
তৃতীয়বার ছড়িয়ে পড়া রোগটি কিছু কিছু এলাকার অর্ধেকের বেশি লোককে মেরে ফেলেছিল। চতুর্থবার যখন এই রোগ প্রকাশ পায় তখন দ্রুত পুরো ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল।
জানা যায়, চতুর্থবার ইংল্যান্ডজুড়ে রোগটি বিস্তার লাভ করলে অষ্টম হেনরি ভয়ে লন্ডন থেকে পালিয়েছিলেন। রোগ থেকে বাঁচার আশায় নিয়মিত এক বাসভবন থেকে অন্য বাসভবনে চলে যেতেন। প্রতিরাতে ভিন্ন ভিন্ন বিছানায় ঘুমাতেন।
এরপর এই রোগ হঠাৎ হামবুর্গে ছড়ায়। সেখানে লন্ডনের মতোই কাজ করতে থাকে রোগটি। হামবুর্গেও দ্রুত ছড়ায় এবং মাত্র এক সপ্তাহের মাঝেই এক হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু ঘটায়।

এই রোগ পুরো ইউরোপে ছড়িয়েছিল। পরে সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড এবং রাশিয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। তবে রোগটি ১৫৫১ সালের পর থেকে আর দেখা যায়নি।
সোয়েটিং সিকনেস রোগটির আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল। রোগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পদশালী ও ওপরের শ্রেণির লোকদের আক্রমণ করত। তৎকালে ডিউক, বিশপ, মেয়ররা আক্রান্ত হয়েছিল।
ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড হলের ডায়েরি থেকে এই মহামারীর সাথে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের আক্রান্ত হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। অবশ্য হলো একাই নন, সমসাময়িক পাণ্ডুলিপিগুলো একই কথা বলছে।
এই রোগে রাজা সপ্তম হেনরির স্ত্রী অ্যানি বলেইনও আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থও হয়েছিলেন। তবে তাদের সন্তান আর্থার টিউডর মারা গিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
রোগের আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতো না। এমনকি সেসব দেশে বসবাস করা ইংরেজরা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মরতে থাকে। যারা এই রোগে মারা গিয়েছিল তাদের সবাই মাঝবয়সী তরুণ বা তরুণী ছিল।
তৎকালে রোগটির কারণ সম্পর্কে কারও কোনোকিছু জানা ছিল না। বর্তমান সময়ের অনেক গবেষক মনে করেন রোগটির কারণ ছিল হান্টাভাইরাস। যা রোডেন্ট বা গর্তবাসী প্রাণী থেকে ছড়িয়েছিল। হান্টাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত রোগীর ফুসফুসে মারাত্মক প্রদাহ হয়, ফ্লুর মতো উপসর্গ যেমন- জ্বর, সর্দি, পেশিব্যথা, মাথা ধরা এবং অবসাদ প্রকাশ পায়। মৃত্যুহার ছিল শতকরা ৩৬ ভাগ!
আবার অনেক গবেষক মনে করেন, ভাইরাসটি আর্থ্রোপোডা পর্বের পতঙ্গ যেমন-এঁটুল এবং মশার মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। ধারণা করা হয়, মুষলধারে বৃষ্টি এবং বন্যার পর এই রোগটি বিস্তার লাভ করত। সমসাময়িক অনেক বিজ্ঞ পণ্ডিত ইংল্যান্ডের আর্দ্র জলবায়ুকে দায়ী করতেন।

প্রথম কে সোয়েটিং সিকনেসে আক্রান্ত হয়েছিলেন সেটিও পরিষ্কার জানা যায় না। তবে অনেক ঐতিহাসিকগণের মতে, হেনরির বাবা ইংল্যান্ডের রাজত্ব পাকাপোক্ত করার জন্য বেশকিছু সৈন্য ভাড়া করে এনেছিলেন। এই ভাড়াটে সৈন্যদের থেকেই এই রোগটি ছড়িয়েছিল।
এই রোগটি ছড়ানোর বিষয়ে আরও একটি অনুমাননির্ভর তথ্য রয়েছে। ধারণা করা হয়, রোগটি খাদ্যবাহিত বটুলিজম এবং ছত্রাকজনিত কারণে হওয়া খাদ্যের বিষক্রিয়া। তবে অধিকাংশ মহামারী রোগের মতো এই রোগও হঠাৎই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
বর্তমান সময়ে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে বিরল। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরিয়ার যুদ্ধের সময় সৈন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই রোগের কারণ ছিল হান্টাভাইরাস। সে সময় প্রতি দশজন রোগীর মধ্যে একজন মারা যেত হান্টাভাইরাসের কারণে। সমসাময়িক অনেক বিজ্ঞ পণ্ডিত ইংল্যান্ডের আর্দ্র জলবায়ুকে দায়ী করতেন।

ইরাসের বাইরে অ্যানথ্রাক্স রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া Bacillus anthracis-কেও অনেকে দায়ী করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালে জৈব অস্ত্র হিসেবে অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর ব্যবহারের ফলে প্রায় ২২টি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আক্রান্তের দেহে প্রচুর পরিমাণ ঘাম নির্গত হয়েছে এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথার সূত্রপাত ঘটেছে।
এডওয়ার্ড ম্যাক সুইগান নামক এক অণুজীববিজ্ঞানীর মতে, ইংরেজ মুলুকে মহামারীর পেছনে ওলের মাধ্যমে ছড়ানো অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর স্পোর দায়ী থাকতে পারে। যদিও অদ্ভুত এই মহামারী তার রহস্য নিয়েই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়েছে তবুও বিজ্ঞানীরা এখনও এই রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা করছেন। হ

SHARE

Leave a Reply