Home নাটিকা কোলাকুলি -জাকারিয়া আজাদ

কোলাকুলি -জাকারিয়া আজাদ

দৃশ্য : ১
দিন। ক্লাস রুম। নাঈম, রাফি, ফরহাদ, মাসুদ স্যার এবং অন্যান্য ছাত্ররা।

সিক্সের ক্লাসরুম। রফিক স্যার আরবি ক্লাস নিচ্ছেন। ক্লাসে আছে নাঈম, রাফি, রফিক স্যার এবং কিছু ছাত্র। সবার সামনে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বই। ক্লাসে রাফি পড়া না পারার অপরাধে বেঞ্চের ওপর কান ধরে চোখে লজ্জা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মনোযোগ রাফির দিকে। শুধু নাঈম নিচে তাকিয়ে আছে। রফিক স্যারের হাতে লাঠি। লাঠিটা এদিক ওদিক নাড়াচ্ছেন।
রফিক স্যার : সবাই ওর (রাফি) দিকে তাকিয়ে আছিস ক্যান? সবাই বইয়ের দিকে তাকা। (রাফিকে) আগামীকাল পড়া শিখে আসবিতো?
রাফি : জি স্যার।
রাফিক স্যার : তোরতো প্রতিদিনই একই কথা! জি স্যার, জি স্যার। পড়া তো একদিনও শিখে আছিস না। তোর অপরাধ দুইটা, একতো পড়া পারিস না, আবার মোবাইল নিয়ে ক্লাসে গেম খেলিস। এই বয়সে পোলাপানদেন কেন যে মোবাইল কিনে দেয় আমি বুঝি না। এই সমস্ত বাবা মায়ের কারণেই পোলাপান নষ্ট হয় বেশি। তোরে যদি আর কোন দিন ক্লাস রুমে মোবাইল নিয়ে আসতে দেখি তাইলে তোর খবর আছে। আচ্ছা ঠিক আছে বস।
রাফি : জি স্যার।
রফিক স্যার : জি স্যার জি স্যার না বলে প্রতিদিন পড়া শিখে এসে বলবি, পড়া শিখেছি স্যার। অন্তত তুই একটা দিন পড়া দিতে পারলে কীযে খুশি হতাম! তোর কাম শুধু স্কুলে আসা আর যাওয়া। তাও ভালো, অন্তত স্কুলে তো আসিস!
রাফি : জি স্যার।
রফিক স্যার : (মনের ভেতর চাপানো মেজাজ দেখিয়ে) আমি শুনেছি তোর জি স্যার। এবার বেঞ্চে বস।
(রাফি কান ছেড়ে বেঞ্চে বসবে)
রাফিক স্যার : ঠিক আছে, আজ এই পর্যন্তই। সবাই ঠিক মত পড়িস।

দৃশ্য : ২
দিন। স্কুলের সামনে। নাঈম এবং রাফি।

স্কুল ছুটি হলো। নাঈম স্কুল থেকে বেরুচ্ছে। কাঁধে স্কুল ব্যাগ। পেছন থেকে কাঁধে ব্যাগসহ রাফি দৌড়ে এসে নাঈমকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে নাঈমের সামনে দাঁড়ালো। নাঈম মাটিতে পড়ে গেলো। খুব হয়রান অবস্থা রাফির। ক্লান্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললো রাফি। নাঈম উঠে দাঁড়ালো।
রাফি : ব্যথা পেয়েছিস?
নাঈম : তেমন না!
রাফি : বেশি ব্যথা পেলেও ব্যাপার না। আমি এমনই। তুইতো জানিসই আমার সম্পর্কে। আমি কাউকে ল্যাং না মারতে পারলে রাতে আমার ভালো ঘুম হয় না। যাক, আজকে আমার ভালো ঘুম হবে।
নাঈম : কিছু বলবি?
রাফি : কিছুতো বলবোই। আচ্ছা, তুই এত পড়ালেখা করিস কখন? গেম খেলিস না?
নাঈম : আমার কোন মোবাইল নেই। আব্বা বলছে, কলেজে পড়লে মোবাইল কিনে দেবেন। এই বয়সে মোবাইল চালাইলে নষ্ট হয়ে যামু।
রাফি : (খুব হেসে) ধুর বোকা। মোবাইল চালাইলে কেউ নষ্ট হয়! আসল কথা, মোবাইল কেনার টাকা নেই। একটু ঐদিক ঘুরে দাঁড়া।
নাঈম : কেন
রাফি : ব্যাগের জিপার মনে হয় ঠিক নেই।
(নাঈম ঘুরে দাঁড়ালে রাফি নিজের ব্যাগ থেকে একটা টুকরো কাগজ নাঈমের ব্যাগের ওপর লাগিয়ে দিলো। তাতে লেখা আছে ‘আমি ভালো ছাত্র, আমার সাথে সবার বন্ধুত্ব হয় না’)
রাফি : এবার ঠিক আছে।
নাঈম : সারাদিন মোবাইল নিয়া পইড়া না থাইকা বাড়ি যাইয়া ক্লাসের পড়াটা পড়িস। আমি যাই।
(নাঈম চলে যাবে। রাফি হাসতে থাকবে)
রাফি : আরে যা। মোবাইল ছাড়া বাঁচা যায়!

দৃশ্য : ৩
দিন। স্কুল। নাঈম, রাফি এবং ফরহাদ।

নাঈম স্কুলের দিকে যাচ্ছে। সাথে ফরহাদ আছে। রাফি এসে তাদের সাথে হাঁটতে শুরু করেছে। রাফি নাঈমকে ল্যাং মারতে গিয়ে আর মারলো না। তার মনে পড়েছে, ফরহাদ যখন তাকে ল্যাং মেরেছিল তখন সে ব্যথা পেয়েছিল, সেই ঘটনা।
রাফি : নাঈম, আমি তোর বন্ধু হতে চাই। আমাকে কি তোর বন্ধু বানাবি না?
নাঈম : তুইতো আমার স্কুল বন্ধু আছসই। আবার কি?
রাফি : তোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে চাই। ফরহাদ যেরকম তোর বন্ধু সে রকম।
নাঈম : আমার শর্ত আছে।
রাফি : কী শর্ত?
ফরহাদ : তুই নাঈমকে জ্বালাতে পারবি না। ল্যাং মারতে পারবি না।
রাফি : আচ্ছা, আমি রাজি।
নাঈম : না, এসব কিছু না। আমার শর্ত হইলো, তোর নিয়মিত ক্লাসের পড়া শিখে আসতে হইবো। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হইবো। আর একটা কথা, স্কুলে মোবাইল নিয়ে আসতে পারবি না। রাজি থাকলে আমি বন্ধু হতে রাজি।
রাফি : (কিছু সময় ভেবে) শর্তের সবইতো আমার ভালোর জন্যে। আচ্ছা, আমি রাজি।
(নাঈম, ফরহাদ এবং রাফি খুব খুশি হয়ে হাসবে এবং বন্ধুত্বের হ্যান্ডশেক করবে।
ফরহাদ : ওয়েলকাম টু আওয়ার ফ্রেন্ডশিপ।
রাফি : আসলেই তুই অনেক ভালো। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। আমাকে তোর ক্লাসে হেল্প করা লাগবে।
নাঈম : আরে আমিতো আছিই। কোনো সমস্যা নেই।

দৃশ্য : ৪
দিন। সিক্সের ক্লাস রুম। নাঈম, ফরহাদ, রাফি, রাফিক স্যার এবং অন্যান্য ছাত্ররা।

সিক্সের ক্লাস রুমে নাঈম, ফরহাদ, রাফিসহ উপস্থিত আছে অন্যান্য ছাত্ররা। রফিক স্যার ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাস নিচ্ছেন। সবার সামনে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার বই। সবার পড়া নিচ্ছেন। রাফি দাঁড়িয়ে আছে বেঞ্চের ওপর।
রাফি : স্যার, আমি বসবো?
রফিক স্যার : তুই কোন কারণে বা কী জন্যে বসতে চাস? এমন কোন কি কিছু হইছে যে তুই বসবি?
রাফি : (মন খারাপ করে) না, হয়নি স্যার।
রফিক স্যার : তাইলে দাঁড়িয়েই থাক। আচ্ছা, তোরা সবাই ছোটদের স্নেহ, বড়োদের সম্মান করিস?
ছাত্ররা : (সবাই একত্রে) জি স্যার।
রফিক স্যার : তোরা কি জানিস, আমাদের মহানবির নাম শুনলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে হয়? না পড়লে গুনাহ হয়?
(সবাই চুপ )
নাঈম : আমি জানি স্যার। মহানবির নাম শুনলে দরুদ পড়তে হয়। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়লে দরুদ পড়া হয়ে যায়।
রফিক স্যার : তুই কোথায় শিখছিস ?
নাঈম : আমার আব্বার কাছে।
রফিক স্যার : তোরা অর কাছে শিখ। অয় এই ক্লাসের শুধু ছাত্র না, অয় এই ক্লাসের একজন আদর্শ ছাত্র।

দৃশ্য : ৫
দিন। স্কুলের সামনে। নাঈম, ফরহাদ এবং রাফি।

ক্লাস শেষে নাঈম, ফরহাদ এবং রাফি এক সঙ্গে স্কুল থেকে বেরুচ্ছে। রাফির মুখে হাসি হাসি ভাব।
রাফি : আজকে আমি অনেক অনেক খুশি।
ফরহাদ : আজকেও পড়া পারস নাই। তো খুশি হওয়ার কারণতো দেখছি না। তো বল, কারণ কী?
রাফি : আজকে পড়া পারি নাই, তো কী হয়েছে! আগামী কাল থেকেতো পারবো।
নাঈম : বল, ইনশাআল্লাহ। তাহলে আল্লাহর সাহায্য পাবি। কারণ আল্লাহর সহযোগিতা ছাড়া কিছুই সম্ভব না।
ফরহাদ : ইনশাআল্লাহ।
রাফি : হ্যাঁ। ইনশাআল্লাহ।
নাঈম : খুশি হলাম।
রাফি : আমিও।

দৃশ্য: ৬
বিকাল। পথ। নাঈম এবং মাসুদ স্যার।

নাঈম যাচ্ছিল তার বাবা মহিউদ্দিনের কর্মস্থল ক্ষেতের দিকে। পথে দেখা হবে মাসুদ স্যারের সাথে।
নাঈম : আসসালামু আলাইকুম স্যার।
মাসুদ স্যার : ওয়ালাইকুম সালাম। কোথায় যাইতেছস?
নাঈম : যাইতেছি সামনের ক্ষেতে আব্বার কাছে। আব্বা সেখানে কাজ করতেছে।
মাসুদ : ভালো। তোর আব্বারে কাজে সহযোগিতা করতে?
নাঈম : আব্বার কোন কাজে আমারে সহযোগিতা করতে দেয় না। আব্বার কথা, শুধু পড়াশুনা করতে। ডাক্তার হতে হবে। গ্রামের মানুষের ফ্রি চিকিৎসা দিতে হবে।
মাসুদ : অনেক ভালো স্বপ্ন। আল্লাহ তোর আব্বার স্বপ্ন পূরণ একদিন করবেই ইনশাআল্লাহ।
নাঈম : দোয়া কইরেন স্যার।
মাসুদ স্যার : তোরে একটা ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছি না।
নাঈম : (একটু হেসে এবং অবাক হয়ে) কোন বিষয়ে স্যার?
মাসুদ স্যার : রাফির পরিবর্তন। রাফি এখন পড়াশুনা করছে ঠিক মত। শুনলাম, তুই ওকে বদলে দিয়েছিস। তুই একদিন পারবি এই সমাজকেও বদলে দিতে, এটা আমার ভবিষ্যদ্বাণী। তোর জন্য অনেক দোয়া রইলো আমার। ঠিক আছে যা।
নাঈম : আচ্ছা, আসি স্যার। আসসালামু আলাইকুম।
মাসুদ স্যার : ওয়ালাইকুম সালাম।

দৃশ্য : ৭
রাত। নাঈদের ঘর। নাঈম এবং মহিউদ্দিন।

মহিউদ্দিন ঘরের সামনে বেঞ্চে বসে আছেন। নাঈম ঘরের ভিতরে আছে। তিনি নাঈমকে ডাকবেন।
মহিউদ্দিন : আমার বাপটা কই? বাপ … ও বাপ …
নাঈম : (ঘর থেকে বের হয়ে এসে) জি আব্বা, আমারে ডাকছো?
মহিউদ্দিন : হরে বাপ। আয়, কাছে আয়।
(মহিউদ্দিনের কাছে এসে নাঈম দাঁড়াবে। মহিউদ্দিন নাঈমকে কোলে টেনে নেবেন)
নাঈম : কী হইছে আব্বা?
মহিউদ্দিন : কিছু না বাপ। তোরে একটু আদর করে দেই। কালকে ঈদ। খুশির দিন। কিন্তু বাপ, আমি তোরে যে কোন নতুন জামা কাপড় কিইন্যা দিতে পারি নাই, তোর কি অনেক মন খারাপ?
নাঈম : না আব্বা। মন খারাপ হইবো ক্যান? তোমারও তো নতুন কোন কাপড় নাই। কিনো নাই। তোমার কি মন খারাপ?
মহিউদ্দিন : আমার নিজের জন্যে মন খারাপ না। তুই ছোট মানুষ, তোর জন্য ঈদের আনন্দ বেশি। তোর বন্ধুরা সবাই নতুন কাপড় চোপড় গায় পইরা তোর সামনে দিয়া হাঁটবো। তখন তো তোর মন খারাপ হইবো। থাক, মন খারাপ করিস না। সামনের ঈদে তোরে নতুন জামা কিন্যা দিমু ইনশাআল্লাহ। ঠিক আছে বাপ?
নাঈম : আচ্ছা আব্বা।
মহিউদ্দিন : ঘরে যা। যাইয়া ঘুমা।

(নাঈম ঘরে চলে যাবে। মহিউদ্দিন সেখানেই বসে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদবেন )
দৃশ্য : ৮
দিন। নাঈমদের ঘরের সামনে। আরিফ সাহেব, মহিউদ্দিন, নাঈম, ফরহাদ এবং রাফি।

ঈদের সকালে নতুন পায়জামা পাঞ্জাবি পরে আরিফ সাহেব, রাফি এবং ফরহাদ নাঈমদের বাড়ি আসবে। রাফির হাতে দুই সেট পায়জামা পাঞ্জাবি। মহিউদ্দিন এবং নাঈমের জন্য আনা হয়েছে। রাফি নাঈমকে ডাকবে।
রাফি : নাঈম … এই নাঈম …
(নাঈম এবং মহিউদ্দিন পুরাতন পোশাক পরিহিত অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়ে আসবেন)
নাঈম : আসসালামু আলাইকুম।
মহিউদ্দিন : আসসালামু আলাইকুম। আপনি কেমন আছেন? ঈদের দির আমার বাড়ি আইছেন, কোথায় যে বসতে দেই! আমাদের ঘরে আসেন।
আরিফ সাহেব : ওয়ালাইকুম সালাম। আমি এবং আমরা সবাই ভালো আছি। কোন কিছু করতে হবে না। আমরা বসবো না। (রাফিকে) এগুলো ওদেরকে দেও। (মহিউদ্দিনকে) আপনাদের জন্য রাফির পক্ষ থেকে ছোট্ট উপহার। আপনারা দুজনে এই পায়জামা পাঞ্জাবি পরে আসেন।
মহিউদ্দিন : আপনারা এইসব করতে গেলেন ক্যান? আমরা ঠিক আছিতো।
আরিফ সাহেব : আমি কিছুই করিনি। এটা রাফির কাজ। আমার ছেলের পেছনে আপনার ছেলের যে অবদান, সেই কৃতজ্ঞতা কোন কিছুতে প্রকাশ করা সম্ভব না। এই জামাগুলো পরে আসেন।
মহিউদ্দিন : ঠিক আছে।
(মহিউদ্দিন এবং নাঈম জামাগুলো নিয়ে ঘরে ঢুকবে)
আরিফ সাহেব : রাফি, তুমি খুশিতো?
রাফি : হ্যাঁ আব্বু। অনেক খুশি।
ফরহাদ : নাঈম অনেক ভালো ছেলে। ওর জন্য আমিও পড়াশুনায় মনোযোগী হয়েছি।
(পায়জামা পাঞ্জাবি পরে মহিউদ্দিন এবং নাঈম ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে)
আরিফ সাহেব : অনেক সুন্দর লাগছে। আসেন আমরা সবাই কোলাকুলি করি।
মহিউদ্দিন : আমাদের সাথে কোলাকুলি করবেন!
আরিফ সাহেব : আরে হ্যাঁ, আসেনরে ভাই। কিসের স্যার টার ডাকেন! আসেন।
(একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করবে। আরিফ সাহেব পকেট থেকে নতুন টাকার বান্ডিল থেকে সবাইকে এক হাজার টাকার একটা করে নোট দেবেন। শুধু মহিউদ্দিনকে পাঁচ হাজার টাকা দেবেন)
মহিউদ্দিন : টাকা ক্যান ? আমিও কি ছোট মানুষ! এসবের দরকার নাই।
আরিফ সাহেব : এটার নাম ঈদের খুশি। চলেন আমাদের বাসায়।
মহিউদ্দিন : না না স্যার।
আরিফ সাহেব : কোন না শব্দ শুনতে চাই না। চলেন সবাই। আজ সবাই এক সাথে ঈদ করবো। এর নামইতো ঈদ, এর নামই আনন্দ।

(সবাই হাতে হাত রেখে হাসিখুশিতে রওয়ানা দিবে)

SHARE

Leave a Reply