Home গল্প ফাহিমের ঈদ -তোফাজ্জল হোসাইন

ফাহিমের ঈদ -তোফাজ্জল হোসাইন

ফাহিম, ফাহিম ওঠো মার্কেটিং করতে যাবে না? তোমার আব্বু তো চলে যাচ্ছে।
-জি মা। বলে লাফ দিয়ে উঠে কোনমতে হাতে-মুখে পানি দিয়ে হাজির।
– আমি মার্কেটিং করতে যাবো টাকা লাগবে।
– কত টাকা?
– এই জুতো কিনবো আর প্যান্ট-শার্ট। কত আর, ৬ হাজার হলেই হবে।
– ৩,৫০০ টাকা দিয়ে বললো এবার এটা দিয়ে সব কেনাকাটা শেষ করো বাবা। আর বাড়ানো সম্ভব নয়।
আব্বুর দেওয়া টাকাগুলো রাগ করে আব্বুর দিকেই ছুঁড়ে মেরেছে। ঈদের কেনাকাটার জন্য মাত্র ৩,৫০০ টাকা দিয়েছে।
ফাহিমদের পরিবারটা মধ্যবিত্ত। পরিবারের সদস্য বাবা, মা, ২ ভাই আর বোন মিলে ৫ জন। পরিবারের জন্য উপার্জন করে এক বাবা তাও একটা বেসরকারি কোম্পানিতে। স্যালারি মাত্র ১৮ হাজার টাকা। তাই সব সময় হিসাব করে চলতে হয়। একটু বাড়তি খরচ করলে মাসের শেষে না খেয়ে থাকতে হয় প্রায়ই!
আজকালকার যুগে আঠারো হাজার টাকায় তো এক সপ্তাহও চলা কঠিন। অথচ তার পরিবারকে চলতে হয় সারা মাস।
ফাহিম হিসাব করে চলা জীবন কখনোই পছন্দ না। ঈদের সময় ভেবেছিল সে দামি জুতো আর শার্ট, প্যান্ট কিনবে। অথচ তার আব্বু তাকে দিয়েছেন মাত্র ৩,৫০০ টাকা। এই টাকায় তো শুধু জুতোটাই হবে, জামা প্যান্ট কিনবে কী দিয়ে? আব্বু পরে আরো ৫০০ টাকা বাড়িয়ে পুরো টাকাটা তার টেবিলের ওপর রেখে যান। ফাহিম টাকাগুলো নিয়ে কতগুলো কথা শুনিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। প্রচ- রাগ হচ্ছে! ফ্রেন্ড সার্কেলে কীভাবে সে মুখ দেখাবে ভেবে পাচ্ছিল না। ওদের বলেছিলাম দামি জুতো কিনবো, তা আর হলো না। পাড়ার দোকানটায় গিয়ে এককাপ রং চা খায়। কিছু ভালো লাগছে না তার। রিকশা ডাক দিয়ে সে পার্কের দিকে যেতে থাকে।
পার্কে বসে আছে, আর ভাবছে। কেন তারা এত গরিব? কেন তাদের টাকা নেই? কেন তার পিতা পছন্দের জিনিস কেনার জন্য টাকা দিলো না তাকে? কেন আল্লাহ তাকে এ রকম পরিবারে পাঠালো? এতসব ভেবে সে হতাশ। নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

২.
– ভাইয়া, ভাইয়া বাদাম নেবেন? ১০ টাকার বাদাম। গরম আর মজাদার। বলে ১২-১৩ বছরের এক বাদাম বিক্রেতার ডাকে হুঁশ এলো ফাহিমের।
– না…রে। এখন এসব খাবো না। যা এখান থেকে। বিরক্তি সহকারে বললো ফাহিম।
– নেন না ভাইয়া। বাদামই তো। নেন, বাদাম খেলে খুব ভালো লাগবে আপনার।
– আহা! লাগবে না তো।
– ভাইয়া, ঈদের বাজার কিনবো আর একটা জামা কিনবো। নেন না ভাইয়া।
ছেলেটিকে দেখে বেশ মায়া লাগলো। তারপর ২০ টাকার বাদাম কিনলো আর বললো এখানে বস আমরা দু’জনে খাই আর কথা বলি।
– কী নাম তোর?
– শরিফ
– স্কুলে যাস না?
– আগে যেতাম। এখন যাই না।
– তোর পরিবারে কেউ উপার্জন করার নেই?
– ছিল। এখন নেই বললেই চলে। এরকম নানা কথাবার্তা চলতে থাকে। বাদামবিক্রেতার জীবনের গল্প শুনতে শুনতে এক পর্যায়ে ফাহিম বললো,
– ঠিক আছে শরিফ, তুই বাদাম বিক্রি কর। আমি মার্কেটে যাই, আমার পরিচিত এক দোকানে। ফাহিম দোকানে গিয়ে দেখে তার পরিচিত দোকানদার নেই। অপেক্ষা করতে হবে। বসে বসে ফোনটা বের করে ফেসবুকে স্ক্রলিং করে দেখে, তার অন্য ফ্রেন্ডরা বড়ো বড়ো শপিংমলের চেক-ইন দিচ্ছে! এগুলো দেখে মেজাজটা আরো গরম হয়ে গেলো। ফোনটা পকেটে রেখে চুপচাপ বসে আছে। একটু পর পরিচিত দোকানদার আসে। তার কাছে নতুন কী এসেছে তা দেখতে চাইলো। নতুন কিছু পাঞ্জাবি আর শার্ট এসেছে। সেগুলো দেখছিল। হঠাৎ দেখে সেই ছেলেটা দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
গ্লাসের বাইরে থেকে ভিতরে ঝুলিয়ে রাখা পাঞ্জাবি আর শার্টগুলো দেখছে। কিন্তু ফাহিম অবাক হচ্ছিল এটা ভেবে যে, বাদামবিক্রেতা ছেলেটি এই দোকানে কী করছে? এখানে অনেক দামি দামি জামা কাপড় রয়েছে।
হয়তো ভুলে চলে এসেছে, বুঝতে পারেনি। আবার নতুন কালেকশনগুলো দেখতে শুরু করে সে। একটু পর দেখে দোকানের এক কর্মচারী বাদামবিক্রেতা ছেলেটির ওপর রাগ করছে। ফাহিম দোকান থেকে বের হয়ে দেখছে, দোকানের কর্মচারী খুব রাগারাগি করছে।
– এই ছ্যামড়া, প্রত্যেকদিন তুই এই জায়গায় আইসা দাঁড়ায় থাকস ক্যান?
– আমি ঐ জামাটি কিনমো।
– এটা তো অনেক দাম। এত টাকা আছে? যেদিন টাকা নিয়ে আসতে পারবি সেদিন আসবি।
– কিন্তু, ততদিনে যদি ঐ জামাটা বিক্রি হয়ে যায়? আমার তো ঐটাই পছন্দ হইছে।
– হলেই হইবো? টাকা নেই আবার জামা কিনবে? এখন যা ভাগ! তোরে যেন আর না দেখি এখানে।
কর্মচারীর কথায় কষ্ট পেয়ে ছেলেটা চলে যাচ্ছিলো। ফাহিম ডাক দিয়ে জানতে চাইলো,
– তুমি না বললে জামা কিনবে? এখানে তো সব বড়ো মানুষের পাঞ্জাবি আর শার্ট। তুমি পাঞ্জাবি আর শার্ট দিয়ে কী করবে?
– আমি একটা পাঞ্জাবি কিনবো। ঐ যে দেখতেছেন না ঝুলানো আছে, ঐ পাঞ্জাবিটা কিনবো।
– কার জন্য?
– আমার বাবার জন্য।
– বাবার জন্য? তুমি এতটুকু একটা ছেলে, বাবার জন্য পাঞ্জাবি কিনবে? তখন বাদামবিক্রেতা শরিফ বলে, ভাইয়া আসলে ৪ মাস আগে আমার আব্বা সিএনজি চালাতে গিয়ে ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট করে পায়ে আঘাত পায়। কাজে যাইতে পারে না। মা দরজির কাম করে কোনো মতে সংসার চালায়।
প্রতি বছর আব্বা আমাদের জন্য নতুন জামা কিনে আনতো। কত খেলনা ও খাবার কিনে আনতো। কিন্তু এবার আব্বা ঘর থেকেই বের হতে পারে না। তাই ভাবছি এবার আমি বাদাম বেচে বেচে আব্বারে এই পাঞ্জাবিটা কিনে দিবো। আব্বার হাসিমুখ দেখলে আমারও খুব ভালো লাগে। ছেলেটার কথাগুলো শুনে ফাহিমের চোখের কোণায় পানি চলে এলো, শুধু ভিজেই যাচ্ছে। এতটা কান্না বোধ হয় আগে কখনো আসেনি তার। কী বলবে বা করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না সে। স্তম্ভিত হয়ে বসে পড়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে। এত ছোট বাচ্চা একটা ছেলে এত কিছু বোঝে, অথচ আমি এত বড়ো হয়েও ইচ্ছামতো টাকা না দেওয়ার জন্য আব্বার মুখের ওপর টাকাগুলো ছুঁড়ে মেরেছি!

৩.
ফাহিমের নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে। সে নিজের জন্য, নিজের স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য দামি দামি জিনিস কিনেছে সব সময়। অথচ কখনো ভেবেই দেখেনি একটা মানুষ ৬ বছর ধরে একই পাঞ্জাবি পরে ঈদ কাটিয়ে দিচ্ছে!
ঈদ উপলক্ষ্যে বাবা-মাকে খুব বেশি কিছু কিনতে দেখেনি সে। সবসময় তাদেরকেই কিনে দিতো। এসব ভাবতে ভাবতে আরো বেশি কান্না আসছিল ফাহিমের।
চোখ মুছে ছেলেটাকে দোকানের ভেতর নিয়ে গেলো। দোকানদারকে বললো, পাঞ্জাবিটা দিতে। তারপর ওকে নিয়ে পাশের মার্কেটে গিয়ে ওর জন্য একটা জামা আর ওর মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনলো। তারপর ফাহিম তার বাবার জন্য একটা পছন্দের পাঞ্জাবি আর মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনলো তার টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে।
ছেলেটাকে নিয়ে ঈদের বাজার ও পাশের হোটেল থেকে কিছু খাবার কিনে ওর বাড়ির দিকে গেল। ফাহিম যেমনটা ভেবেছিল, ছোট্ট একটা ঘর, বাবা শুয়ে আছে। তাদের দেখে ওর মা ও ছোট বোনটি পাশে চলে আসে। তাদেরকে পুরো ঘটনাটা বললে, তারা তাদের ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই যাচ্ছিলো। ফাহিম বিদায় নিয়ে চলে আসে, আসার সময় শরীফকে ঈদের দিন তাদের বাসায় আসার দাওয়াত দেয়।

৪.
বাসায় ফিরে দেখে ফাহিমের আব্বা-আম্মা বসে আছে ইফতারি নিয়ে। তার মা এগিয়ে এসে বললো,
– বাবা, কেনাকাটা করেছো? জবাব দেওয়ার পূর্বেই তার আব্বু হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে আসে। ফাহিমকে দিয়ে বলে ‘খুলে দেখ’ পছন্দ হয় কি না? পাকেট খুলে দেখে, সেই জুতোটা। যেটা সে কিনতে চেয়েছিল।
কিন্তু এত টাকা বাবা কোথায় পেলো? মাকে জিজ্ঞেস করলো, মা কিছুই বললো না। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলে, আব্বু জবাব দেয়, “তোর মায়ের গলায় যে স্বর্ণের চেনটা ছিল না? যেটা তোর নানী তোর মাকে দিয়েছিল, ওটা তোর মা বিক্রি করে দিয়েছে, তোর জুতো কেনার জন্য।”
এ কথা শুনে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না সে। মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলো বাচ্চা মানুষের মতো। তারপর আব্বার পা ধরে সকালের ব্যাপারটার জন্য ক্ষমা চাইলো। শেষে ফাহিম তার ব্যাগ থেকে আব্বা-আম্মার জন্য কেনা পাঞ্জাবি আর শাড়িটা দেয়। তারা তো মহাখুশি। সাথে প্রচ- অবাক। এবার খুশিতে তারা ফাহিমকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেয়।

SHARE

Leave a Reply